পাঠকের অভিমত
সারা বিশ্বে একই দিনে ঈদ করা সম্ভব
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৪, ২১:২২
ঈদের তারিখ ঘোষণা নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই বিভ্রান্তিকর কান্ড ঘটে। সৌদি আরবের মুসলমানরা চাঁদ দেখে যেদিন ঈদ বা রোজা শুরু করে সে দিনটিকে আমরা চাঁদের প্রথম তারিখ গণনা করতে পারি। কেননা সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান মাত্র ৩ ঘন্টা। তাছাড়া সারা পৃথিবীর সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্য সাড়ে ১১ ঘন্টার উর্ধ্বে নয়। এ বছরও সৌদি আরব চাঁদ দেখেই রোজা শুরু করেছে ২৯ জুন, রবিবার। আর আমরা শুরু করেছি ৩০ জুন, সোমবার অর্থাত্ একদিন পর। আমরা এ বছর ২৯ রোজা পূর্ণ করে ঈদ উদযাপন করব ২৯ জুলাই। অপরদিকে সৌদি আরবসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ ঈদ করবে ১ দিন আগে ২৮ জুলাই। কাজেই আর কত কাল চলবে ধর্মের এমন হাস্যকর কর্মকাণ্ড! আমরা সারা বিশ্বের মুসলমানরা এক কোরআনকে মেনে থাকি। একই ক্বাবাকে কেবলা করি। সৌদি নিয়ম-কানুন মেনে হজ্বব্রত পালন করি। একই দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে থাকি। ২৪ ঘন্টায় ১ দিন। ১ দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের কোনও ওয়াক্ত কিংবা শুক্রবারের জুমা কি কখনও শনিবারে ঢুকে পড়ে? তবে কোন যুক্তিতে রোজা বা ঈদের ক্ষেত্রে সৌদির সঙ্গে ৩ ঘন্টার পার্থক্যের স্থলে ১/২ দিন ব্যবধান হয়? জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির পাশাপাশি বাংলাদেশ এস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনকে চাঁদ দেখার দায়িত্ব দিলে তারা সঠিকভাবে বলে দেবে চাঁদ বাংলাদেশের আকাশে কখন কতটা কত মিনিটে কত বড় দেখা যাবে। মাত্র একজন মুসলমানের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রোজা বা ঈদ পালন করার সিদ্ধান্ত হাদীস শরীফে আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “নবী করিম (স.) এর কাছে এক বেদুঈন এসে বললো, আমি নতুন চাঁদ দেখেছি অর্থাত্ রমজানের নতুন চাঁদ। নবীজী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি এ সাক্ষী দাও যে, আল্লাহ ব্যতিত কোনও মাবুদ নেই? সে বললো, হ্যাঁ। পুনরায় নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি সাক্ষী দাও যে, মোহাম্মদ আল্লাহর রসূল? সে বললো, হ্যাঁ। নবীজী বললেন, হে বেলাল! লোকদের মধ্যে ঘোষণা করে দাও তারা যেন আগামীকাল রোজা রাখে” (আবু দাউদ, তিরমিজী)। চাঁদ তো সারা বিশ্বের জন্য একটিই। এক দেশে আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল অন্য দেশে পুনরায় নতুন চাঁদ দেখা তো সম্ভব নয়। হযরত আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, “পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত হতে চাঁদ দেখে মাত্র একজন মুসলমান সাক্ষ্য দিলে রোজা বা ঈদ পালন করা যাবে।” ফতোয়ায়ে আলমগীরিতে আছে, ‘চাঁদের উদয়স্থল বিবেচনার বিষয়বস্তু হবে না। চন্দ্র উদয়ের ব্যাপারই মূখ্য’। ফতোয়ায়ে কাজীখানে আছে, ‘যদি পশ্চিম দেশীয় লোক রমজানের চাঁদ দর্শন করে তবে পূর্ব দেশীয় লোকদের উপর রোজা রাখা ওয়াজিব হয়ে যাবে।’ আল কোরআনের কোথাও চাঁদ দেখার কথা বলা হয়নি। আল্লাহ বলেন, “(হে রসূল!) লোকেরা আপনার নিকট নতুন চাঁদ সম্পর্কে জানতে চায়। বলে দিন, এটি মানুষের জন্য এবং হজের সময় নির্ধারণ করার মাধ্যম” (সূরা বাকারা :১৮৯)। আরও বর্ণিত হয়েছে, “সূর্য ও চন্দ্র হিসাব মত চলে” (সূরা আর রহমান : ৫)। অপরদিকে চাঁদ দেখার যেমন হাদিস আছে, তেমনি চাঁদ গণনারও হাদিস রয়েছে। রসূলে পাক (স.) বলেন, “আমরা উম্মি সম্প্রদায় লিখতে জানি না, হিসাব-নিকাশও করতে জানি না। তবে মাস এতদিনে, এতদিনে এবং এতদিনে হয়ে যাবে। তৃতীয়বার হস্তদ্বারা ইঙ্গিতের সময় তিনি তাঁর দু’হাতের একটি বৃদ্ধাঙ্গুল গুটিয়ে নিলেন। তারপর আবার বললেন, মাস এতদিনে, এতদিনে এবং এতদিনে হয়। অর্থাত্ ত্রিশদিনে মাস হয়ে থাকে” (বুখারি ও মুসলিম)। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে আমরা ঘড়ি দেখে অফিস করি, নামাজ আদায় করি, সাহ্রী খাই, ইফতার করি, অথচ কেবল রোজা বা ঈদ এলে বাংলাদেশের মেঘলা আকাশে সরু-চিকন মাত্র কয়েক মিনিট বয়সের চাঁদকে দেখার বৃথা চেষ্টা করি। আমরা একটি স্থায়ী ইসলামী ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করে রোজা ও ঈদসহ ধর্মীয় সকল অনুষ্ঠান সঠিক সময়ে পালন করতে পারি। চাঁদের ১ কিংবা ২ দিনের হেরফেরের কারণে শবে বরাত, শবে কদর, জুমাতুল বিদা, হজ, তিন দিনের কুরবাণি ইত্যাদি ইবাদতসমূহ সঠিক সময়ে পালন করতে না পেরে এর ফজিলত থেকেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। প্রিয় পাঠক! চাঁদ দেখার বিভ্রান্তিতে যেসব অস্বস্থিকর কাণ্ড ঘটে তার কয়েকটি তুলে ধরছি। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তান থেকে চাঁদ দেখার ঘোষণা দেওয়া হতো। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা চাঁদও আলাদা করে ফেলেছি। উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুতে ৬ মাস দিন ও ৬ মাস রাত। সেখানে থাকা কোন মুসলমান চাঁদ দেখে কিভাবে রোজা ও ঈদ করবে? যদি মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী কেউ ২৮ রোজা সম্পন্ন করে দেশে ঈদ করতে আসেন, আর সে বছর যদি রোজা হয় ৩০টি তবে চাঁদ দেখার তারতম্যের কারণে ঐ প্রবাসীর রোজা হবে ৩১ বা ৩২টি। রসূল (স.)-এর বর্ণনা মতে, কেয়ামত হবে শুক্রবার। তবে কি বাংলাদেশে এই মহাপ্রলয়ও হবে ১ বা ২দিন পর?
—আলহাজ হাকীম সৈয়দ সালেহ আহমদ
মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, ঢাকা।