আগামী সপ্তাহে রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়া শুরু
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৪, ২২:৫০
আসছে ঈদুল ফিতরের আগেই রানা প্লাজায় নিহতদের পরিবার ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের একটি অংশ দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে নিহত শ্রমিকের পরিবার ও আহত শ্রমিক মিলিয়ে ৭৩০ জনকে তাদের ক্ষতিপূরণের ৪০ শতাংশ অর্থ দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই অর্থ নগদে দেয়া হবে না। তাদের স্ব স্ব ব্যাংক হিসাবে স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা দেয়া হবে। এই অর্থ থেকে ঈদের আগে নিহতদের উপর নির্ভরশীল প্রত্যেক সদস্য ৫ হাজার টাকা করে তুলতে পারবেন। রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) উদ্যোগে গঠিত তহবিল থেকে এ অর্থ প্রদান করা হবে। আইএলও’র উদ্যোগে রানা প্লাজার ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে গঠিত সমন্বয় কমিটির গত বুধবারের বেঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে আইএলও’র কান্ট্রি ডিরেক্টর শ্রীনিবাস রেড্ডিসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত কমিটির সদস্য বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিল্স) প্রতিনিধি সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ক্ষতিপূরণের অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থ আগামী সপ্তাহের (বৃহস্পতিবার) মধ্যে দেয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে। ঈদের আগে ৭৩০ জনকে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেয়া হবে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের উপর নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে (সন্তান, স্ত্রী-স্বামী, পিতা-মাতা বা ভাই-বোন) ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ১০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত হবে। এর মধ্যে গত বুধবার পর্যন্ত ৩৩৭ জনের ক্ষতিপূরণের অঙ্ক চূড়ান্ত করেছে আইএলও’র বিশেষজ্ঞ দল। আগামীকাল শনিবার নাগাদ বাদ বাকীদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, নির্ভরশীলদের ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ঠিক করার বিষয়টি খুবই জটিল। ফলে এ বিষয়ে খুবই সতর্কভাবে এগুতে চাইছে কমিটি। তবে আইনজীবীদের সঙ্গে আলাপ করে এ বিষয়ে একটি সমাধান এসেছে।
ক্ষতিপূরণ দেয়ার লক্ষ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে গত মার্চে দাবিনামা বা ক্লেইম ফরম পূরণ শুরু করে আইএলও’র উদ্যোগে গঠিত সমন্বয় কমিটি। এ জন্য সাভার ক্যান্টনমেন্টে একটি অফিস স্থাপন করা হয়। হতাহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনেরা এখানে গিয়ে ফরম পূরণ করেন। একই সঙ্গে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রত্যেক উত্তরাধিকারের জন্য আলাদা ব্যাংক হিসাব খুলে দেয়া হয়। ইতিমধ্যে দুই হাজার ৭৮০ জন হতাহত ব্যক্তির পরিবারের প্রায় সাড়ে চার হাজার সদস্যের দাবিনামা পূরণ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭৩ জন নিহত শ্রমিকের পরিবার রয়েছেন। আর আহত এক হাজার ৯৭১।
রানা প্লাজা ধসে নিহত হন ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক। আর আহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।
নিহত শ্রমিকের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে আইএলও ও আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ‘ইন্ডাস্ট্রিঅল’ গ্লোবাল ইউনিয়নের উদ্যোগে ৪ কোটি মার্কিন ডলার বা ৩২০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ হয়েছে। ঐ অর্থ থেকেই এই ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। রানা প্লাজায় ৫টি গার্মেন্টস কারখানা থেকে পোশাক রপ্তানি হতো ২৮টি ব্র্যান্ডের কাছে। এই তহবিলের মূল লক্ষ্য ছিল এসব ব্র্যান্ড। এর মধ্যে একমাত্র প্রাইমার্ক তাদের অর্ডার সরবরাহ করা নিউ ওয়েভ বটমস কারখানার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণে সম্পূর্ণ অর্থ প্রদান করেছে। এর বাইরে অন্যান্য ব্র্যান্ড নামমাত্র অর্থ প্রদান করেছে। আইএলও’র গত বুধবারের বৈঠকে এসব ব্র্যান্ডকে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করার জন্য চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়া দেশের ভেতরের ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১২৭ কোটি টাকা অর্থ সহায়তা করেছে। এর একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতিমধ্যে খরচ করা হয়েছে। বাদ বাকী অর্থ প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণের লক্ষ্যে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি উদ্যোগ নেন। গত বছরের আগস্টে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের তত্কালীন জিওসি চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। ঐ কমিটি নিহত ও নিখোঁজ প্রত্যেক শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ সাড়ে ১৪ লাখ টাকা করার সুপারিশ করে। আর আহতদের ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী দেড় লাখ টাকা থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঠিক করে হাইকোর্টে তাদের সুপারিশ জমা দেন । তবে এ বিষয়ে হাইকোর্ট এখনো কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি।