কর্নেল জিয়াকে চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় র্যাবের অতিরিক্ত মহা-পরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসানকে একটানা প্রায় চার ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল দশটা থেকে দুপুর ১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৫ তলায় কমিটি প্রধান জনপ্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান আলী মোল্লার কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় গত ৭ মে হাইকোর্টের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত শাহজাহান আলী মোল্লাকে প্রধান করে গঠন করা হয় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি ৩৫০ জনকে এ পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করেছে । তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্যদান শেষে সচিবালয়ে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, তদন্ত কমিটি সাত খুনের ঘটনা সম্পর্কে যেভাবে জানতে চেয়েছে, তাদের সেভাবেই জানিয়েছি। তারা যে সব প্রশ্ন করেছেন তার উত্তর দিয়েছি। অপরদিকে কর্নেল জিয়াউল আহসানকে জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান আলী মোল্লা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বলেন, নারায়ণ-গঞ্জের ৭ খুনের ঘটনায় তিন র্যাব কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়েছেন। এ কারণে এই বাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে (র্যাবের অপারেশন হেড হিসেবে) ডাকা হয়েছে, তারা এ ঘটনার ব্যাপারে কতটুকু জানেন তা জানতে। আমরা তার (কর্নেল জিয়াউল আহসান) বক্তব্য রেকর্ড করেছি। বক্তব্য পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। সাত খুনের ঘটনায় কর্নেল জিয়াউল আহসানের কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে পরে জানতে পারবেন। কর্নেল জিয়াউল আহসানকে ব্যক্তিগতভাবে নয়, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসাবে ডাকা হয়েছে। সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বা মামলার আসামি নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন কিনা—এমন প্রশ্নে জবাবে অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান আলী মোল্লা বলেন, সেটি সময় মত জানা যাবে। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কমিটি প্রধান বলেন, এ পর্যন্ত সাড়ে তিনশ মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আর কাকে কাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তা ঠিক করবে তদন্ত কমিটি। সূত্র জানায়, কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে কর্নেল জিয়াউল আহসান জানান, তিনি বিষয়টি আগে থেকে জানতেন না। তবে র্যাব জড়িত বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই তিনি সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন ও ক্লোজ করেন অভিযুক্ত র্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তাকে। নূর হোসেনকে কেন গ্রেফতার করা হলো না - তদন্ত কমিটির এমন প্রশ্নের ব্যাপারে জিয়াউল আহসান জানান, ঘটনার পর নূর হোসেনকে আসামি করে মামলা হয়। কিন্তু নূর হোসেন এলাকায় অবস্থান করছিল। এমনকি বিভিন্ন লোকের সঙ্গে দেখাও করেছে। অথচ পুলিশ গ্রেফতারের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। নূর হোসেন বিদেশে পালিয়ে গেছে, কীভাবে নিশ্চিত হলেন- এ প্রশ্নের জবাবে শীর্ষ এ র্যাব কর্মকর্তা জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই নিশ্চিত হয়েছিলাম। জিয়াউল আহসান তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বলেন, ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে র্যাব-১১ এর কর্মকর্তারা ৭ জনকে অপহরণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হন। রাত তিনটায় মেজর আরিফকে র্যাব হেডকোয়ার্টারে ডেকে আনা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হলে প্রথমে সে অস্বীকার করে। পরে চাপের মুখে মেজর আরিফ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। এরপর বিষয়টি র্যাবের ডিজি ও শীর্ষ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। র্যাব-১১ এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল সাঈদ তারেক ও মেজর আরিফের সঙ্গে অপহরণের ঘটনার পর থেকে টেলিফোনে কথোপকথনসহ পুরো বিষয়ে ভিডিও চিত্র কর্নেল জিয়া তদন্ত কমিটির কর্মকর্তাদের দেখান। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায় কর্নেল জিয়াউল আহসান কমিটিতে জানান, নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর র্যাবের অভিযান কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। আগে র্যাবের অভিযানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার করা সম্ভব হতো বিপুলসংখ্যক অস্ত্র, মাদক দ্রব্য। কিন্তু বর্তমানে উদ্ধারের সংখ্যা খুবই নগণ্য। গত ২৭ এপ্রিল অপহূত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলার নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়ি চালক জাহাঙ্গীর আলম। ঘটনা দেখে ফেলায় একই সময় অপহূত হন আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালক ইব্রাহীম। এদের মধ্যে ৩০ এপ্রিল ৬ জনের লাশ ভেসে ওঠে শীতলক্ষ্যা নদীতে। পরের দিন ওঠে একজনের। ঘটনার পর কাউন্সিলার নজরুল ইসলামের স্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলার নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। পাশাপাশি নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন নূর হোসেন র্যাবকে ৬ কোটি টাকা দিয়ে সাতজনকে অপহরণ করে হত্যা করেছে। এ দিকে নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহিদুল ইসলামের অভিযোগের পর কর্নেল জিয়াউল হাসান গত ১২ মে একটি জাতীয় দৈনিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে নজরুলের শ্বশুর শহিদুল কোনোভাবে সাত খুনের সাথে জড়িত কিনা, তাও খতিয়ে দেখার কথা বলেছিলেন। বিষয়টি বিচারকের নজরে আসে। এ নিয়ে উস্মা প্রকাশ করেছিল হাইকোর্ট। সাত খুনের ঘটনায় এ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ তিন র্যাব কর্মকর্তাসহ ২৯ জনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে তিন র্যাব কর্মকর্তাসহ ১৪ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে হত্যা মামলায়। আর ১৫ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয় ৫৪ ধারায়। হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন র্যাব-১১ সাবেক কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানা। সাত খুনের কয়েকদিন পর লোকচক্ষুর আড়ালে ভারতে পালিয়ে যান নূর হোসেন। গত ১৪ জুন নূর হোসেন তার দুই সহযোগীসহ গ্রেফতার হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।