প্রশ্নপত্র ফাঁসের কালো বেড়াল সামলান
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৯
যাক অবশেষে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী বেশ কঠোর হলেন। কিন্তু তিনি কঠোর হলেন কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের প্রতি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার হয়েই তিনি ঘোষণা দিলেন ছুটির দিন ছাড়া একনাগাড়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দিকে তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করতেই চাননি। পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো ঢাকার বাইরে ফরিদপুরে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে। ঢাকার ভেতরে দুষ্টু কুশীলবদের শিরোমণিরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মন্ত্রী জনগণকে তথ্য প্রমাণসহ অভিযোগ করতে বলেছেন। যে কাজটা সরকারের করা উচিত সেটি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সকাল-বিকাল পরীক্ষা দিয়েছি। এখন তিনদিন গ্যাপ না দিয়ে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন।’ গেলো সাড়ে ৫ বছরে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ওঠেনি দাবি করে মন্ত্রীমহোদয় আরো বলেন, ‘এবারই এইচএসসিতে প্রথম প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে’। তাহলে সঙ্গত কারণেই আমাদের প্রশ্ন— হঠাত্ প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা অবশ্যই পরীক্ষা গ্রহণের কৌশলগত পরিবর্তনের জন্য হয়নি? এটি হয়েছে সরকারের কতিপয় অর্থলোলুপ লোকের জন্য। রাষ্ট্রকাঠামোতে এদের লালনপালন করে প্রতি বছর শুধু কৌশলগত পরিবর্তন আনতে চাইলে বিষয়টি বজ্র আঁটুনি ফসকা গেড়োর মতো হবে এবং সেটি কখনোই টেকসই হবে না। নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারের পরপরই দেখা গেলো প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে রাতারাতি বদলি হয়েছে। খাদ্যে ফরমালিন মেশানো নিয়ে সরকার কঠোর হয়ে অপরাধীর যাবজ্জীবন জেলের আইন করেছে। এই রকম শক্ত কেন হতে পারছেন না আমাদের শিক্ষামন্ত্রী? প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে কারা জড়িত এটি বের করা কোনো কঠিন কাজ নয়। আমার প্রিয় কবিতা আশরাফ সিদ্দিকীর ‘তালেব মাস্টার’ কবিতার তালসোনাপুরের তালেব মাস্টাররা কিন্তু এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য জড়িত নন। আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষক, প্রধানশিক্ষক, অধ্যক্ষরা এখনো অনেক আদর্শ লালন করে চলেন। শিক্ষক বলতে আমি এখনো তাঁদেরই বুঝি।
একদিনে দুটি বা প্রতিদিন পরীক্ষা নিলে ছাত্ররা ভালো পরীক্ষা দিতে পারবে না এবং তাদের গড় ফলাফল খারাপ হলে এই সরকার অনায়াসেই তখন বলতে পারবে কোনো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষাবোর্ডের অসাধু কর্মকর্তারা তাদের খাদ্যাভ্যাসের মেনু পরিবর্তন করতে পারবেন কি? তারা কি শুধু সরকারি বেতনভাতা দিয়ে ডালভাত খেয়ে জীবন যাপন করতে পারবেন? শিক্ষা সনদে বানান ভুলের কারণে বোর্ডের দ্বারস্ত হতে হলে ছাত্রছাত্রীরা বুঝে যায় ঐসব কীর্তিমান অফিসার আসলেই কেমন। আমাদের অনেক থানা শিক্ষা কর্মকর্তাই সরকারি চেয়ারে বসে ভিক্ষে করে আর শিক্ষাবোর্ডের অসাধু কর্তাব্যক্তিরা করে ডাকাতি। এই ভিক্ষে আর ডাকাতি এখন রাষ্ট্রীয় বৈধতা পাবে এহেন পরীক্ষানীতির প্রেসক্রিপশনে। শিক্ষাক্ষেত্রের বিভিন্ন জায়গাই আজ কলুষিত। একে নিষ্কলুষ করতে হবে। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড আর সেই শিক্ষাকে রক্ষা করতে না পারলে জাতি একদিন বিকলাঙ্গ হয়ে পড়বে।
মুখস্ত করে ভালো পরীক্ষা দেওয়া নিয়ে আমাদের শিক্ষকগণকে একটি প্রবাদ বলতে শুনেছি— ‘অমিট টুু দ্য মেমোরি অ্যান্ড ভমিট টু দ্য পেপার’। প্রবাদের বিষয়টা সত্য। পরীক্ষার আগে একটু বাড়তি সময় পেয়ে পড়া মুখস্ত করে ভালো পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাওয়াতেই সম্প্রতি ভালো ফলাফল হয়েছে এটা সবাই বিশ্বাস করবে। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে ভালো ফলাফল হয়েছে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। মানুষ আজ অনেক সচেতন। মা-বাবা সমানভাবে আজ আয় করছেন। নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে, শিক্ষা এগিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। পরীক্ষার মধ্যবর্তী ছুটি ছাত্ররা প্রশ্ন ফাঁসের জন্য ব্যয় করে না। তারা পড়াশোনা করে। তাই কোমলমতিদের ওপর আর বেশি ভার না চাপিয়ে বরঞ্চ ভারসাম্যের নীতি অবলম্বন করুন এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুষ্টু কালো বেড়াল সামলানোর ব্যবস্থা করুন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়