জাল নোট
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৯
ঈদ এলেই দেশে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা আশংকাজনক হারে বাড়ে। এবারও দেশ জুড়ে তাই ঘটছে। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও দুর্গাপূজায় এ অপরাধপ্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। উত্সবে বিশেষ আনন্দ জোগায় নতুন টাকার নোট। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক আনন্দ ভাগাভাগি করতে নতুন নোট ছেপে বাজারে ছাড়ে। বিভিন্ন মূল্যমানের মুদ্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নতুন নোট এখন বাজারে। আর এর মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে নোট জালকারী চক্র। চরম লজ্জাকর একটি খবর হলো— গোটা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মুদ্রা জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশে। পুলিশের হাতে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাল টাকার কারবারি ধরা পড়লেও থেমে নেই জাল টাকার ব্যবসা।
প্রচলিত নোটগুলোর মধ্যে ৫০০ ও ১০০০ টাকার মূল্যমানের নোটই বেশি জাল হচ্ছে। উচ্চমানের মুদ্রা বলে এসব নোট জাল করে বেশি মুনাফা পাওয়া যায়। জাল নোটসহ গ্রেফতারকৃত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ থাকলেও এক্ষেত্রে জোরালো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সাক্ষীর দুর্বলতাকে দায়ী করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ফলে জাল নোটের ব্যাপারে দায়ের করা মামলাগুলোর নিষ্পত্তির হার খুবই কম। গত ১৫ বছরে ৬৯ হাজার ৯৫৭ টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৮৫টি। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে জালিয়াতি চক্রটি গড়ে উঠলেও সারা দেশে বিসতৃত তাদের নেটওয়ার্ক। তাদের সঙ্গে বিদেশি একটি চক্রও এই জাল টাকার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। পাড়া-মহল্লার বাজার, মুদি দোকান, নামি শপিং মল এমনকি ব্যাংকের কাউন্টার, এটিএম বুথেও মিলছে জাল টাকা। এক শ্রেণির অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তাও জালিয়াত চক্রের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আজকাল জড়িয়ে পড়েছে বলে রিপোর্টে দেখা গেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার এবং ভল্টেও জাল নোট পাওয়া যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এই ধরনের দুই-একটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারে জাল নোট পাওয়া গেলে তা পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও এটিএম মেশিনে জাল নোট পাওয়া গেলে তা পরিবর্তন করা যাচ্ছে না। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ রয়েছে এটিএম মেশিনে জাল নোট পাওয়া গেলে তা গ্রাহকদের বদলে দিতে। কিন্তু ব্যাংকগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দিচ্ছে না যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে।
ডলারসহ অন্যান্য বৈদেশিক কাগজিমুদ্রাও জাল হচ্ছে দেদার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্দেহ করছে সীমান্তের ওপার থেকে পাচারকারীদের একটি চক্র জাল নোটের বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত। আমাদের এখানে জাল নোট সনাক্তকরণের যন্ত্র বা মেশিন এতটাই অপ্রতুল যে এর সুযোগ নিচ্ছে ওই অপকর্মকারীরা। যদিও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে জাল নোট চেনার সহজ উপায় সম্বলিত বাহারি পোস্টার টাঙিয়েই দায় সারা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে সবাই এখনও সুশিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে সহজবোধ্য ভাষায় জাল টাকা চেনার উপায় বর্ণনা করা কিংবা হাতে কলমে দেখিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এক্ষেত্রে কিছুটা ফল পাওয়া যেতে পারে।
জাল টাকার বিস্তার ঘটলে একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে চলে যায়, অন্যদিকে এর ভয়াবহতায় জনজীবনে নেমে আসে চরম ভোগান্তি। অনেকেই জাল টাকা চিনতে না পারায় প্রতারণার শিকার হন। যাঁরা ইতিমধ্যে জাল নোটের প্রতারণার শিকার হয়েছেন তাঁরা নগদ লেনদেনের চেয়ে অন্যভাবে আর্থিক লেনদেনে আগ্রহী হচ্ছেন। যেমন চেক কিংবা ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন করছেন। তবে বাংলাদেশে এখনও নগদ লেনদেনের প্রচলনটাই বেশি। চেকের মাধ্যমে কিংবা ডেবিটকার্ড, ক্রেডিটকার্ডের সাহায্যে কেনাকাটা করা অথবা অন্যান্য ব্যয় পরিশোধের শক্তিশালী পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারেনি আমাদের ব্যাংকগুলো।
আমাদের দেশে নগদ আর্থিক লেনদেন সবচেয়ে বেশি হয় বলেই জাল নোটের প্রচলনও পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি। জাল নোট এবং আসল নোট চেনার অনেক উপায় রয়েছে। নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যগুলো দেখার জন্য এখন ম্যাগনিফাইং গ্লাস সর্বত্র পাওয়া যায়। এর দামও খুব বেশি নয়। এছাড়া ফেক নোট ডিটেক্টর মেশিন সব ব্যাংক কাউন্টারে, বড় বড় শপিং মলের দোকানে রাখা দরকার।
জাল টাকার কারবারিদের সমূলে উত্পাটন করতে সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জাল নোট বিস্তারকারী চক্রের লোকজনদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারলে হয়তো এ প্রবণতা অনেকটা রোধ করা যেতো। জাল নোটের কারবারিদের মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো উদাহরণ নেই।
আইন মোতাবেক জাল নোট বহনকারী অপরাধী। তাই যে কোনো সময় একজন সাধারণ গৃহবধূ কিংবা নিরপরাধ শিশু-কিশোরের বেলায় এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য প্রয়োজন আইনের সংস্কার। জাল টাকায় কেউ যেন বিড়ম্বনার শিকার না হন, আমাদের প্রাত্যহিক স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা