জার্মানিকে বিদায় বললেন লাম
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৪, ২১:৪০
একজন ফুটবলার হিসাবে আর কি বা অর্জনের থাকতে পারে? ক্লাবের হয়ে জিতেছেন সম্ভাব্য সবগুলো দলীয় শিরোপা, নেতৃত্ব দিয়েছেন স্মরণকালের অন্যতম সেরা একটি ক্লাব একাদশকে। জার্মানির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী অধিনায়ক হিসাবে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্বকাপে। এবার তার হাত ধরেই জার্মানরা দুই যুগ পর পেল তাদের বহু আরাধ্য চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা। এতসব অর্জনের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে আর কিছু দেয়ার নেই বলেই মনে করছেন জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক ফিলিপ লাম। হ্যাঁ, গতকাল জার্মান ফুটবল ফেডারেশনকে (ডিএফবি) দেয়া এক চিঠিতে লাম জানিয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ ফাইনালটাই ছিল জার্মানির পক্ষে তার শেষ ম্যাচ। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গন থেকে অবসর নিলেও বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ক্লাব ক্যারিয়ার চালিয়ে যাবেন তিনি। বায়ার্নের সঙ্গে তার চুক্তি রয়েছে ২০১৮ সাল পর্যন্ত।
ডিএফবিকে দেয়া চিঠিতে জার্মানির জার্সি গায়ে ১১৩ ম্যাচ খেলা লাম বলেন, ‘এটা অবসর নেয়ার সঠিক সময়। গত মৌসুমেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ব্রাজিল বিশ্বকাপই আমার শেষ আসর হবে। গত সোমবার নাস্তার টেবিলে আমি কোচ জোয়াকিম লোয়ের সাথেও আমার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আলাপ করি। আমার বিশ্বাস শেষটা এর চেয়ে ভাল সম্ভব ছিল না। ব্রাজিলের মাটিতে দেশকে বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয়ার মাধ্যমে ক্যারিয়ারের ইতি টানতে পেরে আমি যারপরনাই আনন্দিত।’ ক্যারিয়ারের দৈর্ঘটা নিতান্ত কম না হলেও সমসাময়িক অন্যদের বিবেচনায় লামের বয়স খানিকটা কম বলেই মনে হতে পারে অনেকের কাছে। এ পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপ খেলে ফেললেও বায়ার্ন অধিনায়কের বয়স মাত্র ৩০। পারফরম্যান্স বিচারে হয়তো নিশ্চিতভাবেই খেলতে পারতেন আরেকটা বিশ্বকাপ। অবসরের সিদ্ধান্তটা কি বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে গেল না? লামের বিশ্বাস, না। খুব ভেবে-চিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জানিয়ে তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুলব্যাকটি জানান, ‘গত তিনটি দিন আমি পরিপূর্ণ বিশ্রামের মধ্য দিয়ে কাটিয়েছি এবং সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার যথেষ্ট সময় পেয়েছি। সবকিছু ভেবে-চিন্তেই জানিয়েছি আমি। অসাধারণ একটা সময় কাটিয়েছি আমি। আমাকে সাহায্য করার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।’
তবে ডিএফবি প্রধান উলফগ্যাং নেইর্চব্যাকের কাছে সিদ্ধান্তটা ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। যদিও শেষ পর্যন্ত লামের সিদ্ধান্তকেই শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন তিনি, ‘ফিলিপ আজ সকালেই আমাকে ফোন করে সিদ্ধান্তটা জানায়। আলোচনা শুরু হবার পরপরই আমি বুঝতে পারি তাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বলাটা অর্থহীন। জাতীয় দলের হয়ে গত দশ বছর ধরে সে অসাধারণ পারফরম্যান্সই শুধু দেখায়নি। তার ভূমিকাটা ছিল একেবারে নিখুঁত একজন নেতার মতো। প্রকৃত রোলমডেল বলা যায় তাকে। সে যা করেছে তার জন্য ডিএফবি’র পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ।’
২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির নেতৃত্বে থাকা লাম জার্মানির চতুর্থ অধিনায়ক, যিনি বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন দেশকে। তার আগে ১৯৫৪ সালে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন ফ্রিটজ ওয়াটলার। এরপর ১৯৭৪ সালে বিশ্ব শিরোপা হাতে নেন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। তারপরে কাপ ওঠে ১৯৯০ সালে লোথার ম্যাথুজের হাতে। আর এবারের কাপ নিয়ে দেশে ফেরেন লাম।
ডিফেন্ডার থেকে মিডফিল্ডার সব জায়গা জুড়ে মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো লাম বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেছেন ৩৭৬টি ম্যাচ। যার মধ্যে বায়ার্নের হয়েই মাঠে নেমেছেন ২৬০টি ম্যাচে। বর্তমান বায়ার্নে অধিনায়কের দায়িত্বও তার হাতে।
লামকে ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুল ব্যাক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ২০০৬ এবং ২০১০ বিশ্বকাপের অল-স্টার দলে জায়গা পেয়েছিলেন। ২০০৮ এবং ২০১২ ইউরোতেও তিনি প্রতিযোগিতার সেরা দলে জায়গা পান। এছাড়া তিনি ২০০৬, ২০০৮ এবং ২০১২ সালে উয়েফা বর্ষসেরা দলেও জায়গা পান।
আর জার্মানির হয়ে খেলা তার ১১৩টি ম্যাচ তাকে দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের তালিকায় জায়গা করে দিচ্ছে চতুর্থ স্থানে। কেবল লোথার ম্যাথুস, মিরোস্লাভ ক্লোসা এবং লুকাস পোডলস্কিই খেলেছেন তার চেয়ে বেশি ম্যাচ।
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেয়ার আগে লাম খেলেছেন জার্মানির প্রতিটি বয়স ভিত্তিক দলেও। অনূর্ধ্ব ১৭, ১৮,১৯, ২০ এবং ২১’র প্রতিটি দলে অন্তত একটি করে ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এরপর ২০০৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক। অচিরেই জায়গা করে রুডি ভোলারের ২০০৪ ইউরো দলেও।
মাঝে কিছুদিনের বিরতি শেষে লাম জায়গা করে নেন জার্মানির নতুন কোচ জার্গেন ক্লিন্সম্যানের ২০০৬ বিশ্বকাপ দলেও। যদিও, চোটের কারণে তিনি খেলতে পারবেন কিনা শঙ্কা ছিল সে নিয়ে। তবে, ক্লিন্সম্যান চোটাক্রান্ত লামকেই লেফট ব্যাক পজিশনে তার এক নম্বর পছন্দ হিসাবে ঘোষণা করেন এবং টুর্নামেন্টে দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরম্যান্সটি পাওয়া যায় তার কাছ থেকেই।
মাইকেল বালাকের চোটের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১০ বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে পেয়ে যান অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। বিশ্বকাপের পর কোচ জোয়াকিম লো জানিয়ে দেন, বালাক নন এরপর থেকে লামই পালন করবেন নিয়মিত অধিনায়কের ভূমিকা। অবশেষে, লামের হাত ধরেই আসলো গত দুই দশকে জার্মানির সেরা সাফল্য। দেশকে বিশ্বসেরার মুকুট পড়ালেন যিনি, তার বিদায়ে শুভ কামনা জানিয়েছেন জার্মান প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলা মারকেলও, ‘জাতীয় দলের হয়ে তার যে অর্জন, তার প্রতি আমার অশেষ শ্রদ্ধা।’
জন্ম : ১১ নভেম্বর, ১৯৮৩। মিউনিখ,জার্মানি।
ইয়ুথ ক্যারিয়ার : ১৯৮৫ থেকে শুরু, বায়ার্ন মিউনিখ।
সিনিয়র ক্যারিয়ার : ২০০১, বায়ার্ন মিউনিখ (দ্বিতীয় দল)। বায়ার্ন মিউনিখ মূল দল (২০০২)
জাতীয় দল : অনূর্ধ্ব ১৭, ১৯৯৯।
জার্মানি (মূল দল) : ২০০৪-২০১৪।
লামের ৫ তথ্য:
১. অসাধারণ ড্রিবলিং, অবিশ্বাস্য গতি, পাসিং দক্ষতা আর নিখুঁত ট্যাকলিং ক্ষমতার জন্য লামকে মানা হয় গত দশকের তো বটেই সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুল ব্যাক হিসাবে।
২. মূল কাজ রক্ষণ হলেও আক্রমণে সহায়তা করতেও দারুণ দক্ষ লাম। প্রথাগত লেফট ব্যাক পজিশনের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করলেও লাম খেলেছেন অনেকগুলো পজিশনেই। দলের প্রয়োজনে সেন্টার ব্যাক, রাইট ব্যাক এমনটি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসাবেও খেলেছেন তিনি। এই বিশ্বকাপেই যেমন জেরোম বোয়েটাংকে মূল ডিফেন্ডার হিসাবে খেলিয়ে লামকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ডান উইং থেকে আক্রমণে সহায়তা করার। বলাই বাহুল্য সেই কাজটি অসাধারণভাবেই পালন করেছেন তিনি।
১১৩ ম্যাচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পাঁচটি গোলও করেন লাম। তার দৃষ্টিতে যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইউরোর ২০০৮ আসরের সেমিফাইনালে তুরস্কের বিরুদ্ধে করা গোলটি।
৩. বায়ার্নের ইয়ুথ দলে মাত্র এগার বছর বয়সে সুযোগ পাওয়া লাম মূল দলে সুযোগ পান এক বছর পরে। তবে দলে ঐ সময়ের সেরা কিছু ডিফেন্ডার থাকায় বায়ার্ন তাকে স্টুটগার্টে ধার হিসাবে পাঠায় কয়েক বছরের জন্য।
৪. ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকবারই বড় ধরনের চোটের শিকার হতে হয় লামকে। ২০০৫ সালে স্টুটগার্ট থেকে ফিরে আসার পর প্রায় ছয় মাস তাকে চোটের কারণে বাইরে থাকতে হয়। এবারের বিশ্বকাপের আগেও বড় ধরনের চোট সমস্যায় ভুগতে হয় তাকে। তবে প্রতিবারই আগের চাইতে উজ্জ্বলভাবে মাঠে ফেরেন তিনি।
৫. ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকবার শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে শাস্তিও পেতে হয় তাকে। ২০০৯ সালে বায়ার্নের ট্রান্সফার নীতিমালা নিয়ে একটি সাক্ষাত্কারে প্রকাশ্য সমালোচনা করায় বায়ার্ন তাকে বড় মাপের শাস্তি দেয়। দিতে হয় ২৫ হাজার ইউরো অর্থদণ্ডও। যা সে সময় পর্যন্ত ক্লাবের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শাস্তির ঘটনা ছিল।