গাজায় ইসরাইলের ট্যাংক হামলা শুরু

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ট্যাংক হামলা শুরু করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর পদাতিক বাহিনী, গোলবারুদ, যুদ্ধ প্রকৌশলীসহ গোয়েন্দা ইউনিট পাঠিয়েছে ইসরাইল। গাজায় ১৮ হাজার সেনা পাঠানোর অনুমিত দিয়েছে ইসরাইল। গত ৮ জুলাই হামলা শুরুর পর গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত নিহত হয়েছে ২৭১ জন। গাজায় স্থল অভিযানের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সেনাবাহিনী গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে আরো বড় ধরনের অভিযানের জন্য প্রস্তুত এবং সেটা যে কোনো সময় আরো বাড়তে পারে। এদিকে হামাস জানিয়েছে, হামলা করে শিশুদের হত্যার করার জন্য ইসরাইলকে চরম মূল্য দিতে হবে। বিশ্বজুড়ে নিন্দা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের সংখ্যা এড়িয়ে চলতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন। খবর বিবিসি ও সিএনএন’র। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গতকাল শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদের এক বিশেষ বৈঠকে জানিয়েছেন, ইসরাইলি সেনাদের প্রধান লক্ষ্য গাজায় হামাসের ব্যবহূত সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস করা এবং তাদের অস্ত্রসস্ত্র পাঁচার বন্ধ করা। আকাশ থেকে বিমান হামলা চালিয়ে এই সুড়ঙ্গপথ ধ্বংস করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী অভিযানের ধরন সম্পর্কে কিছু বলেননি। তিনি বলেছেন, নিজ নাগরিকদের রক্ষা করতে ইসরাইলের এই অভিযানের কেনো বিকল্প নেই। বরং অভিযানে না গেলে আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে। গতকাল বেহত হানাউনে শুক্রবার কামান থেকে হামলা চালানো হয়। সেখানে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা এবং অস্ত্রসজ্জিত গাড়ি ক্রমেই বাড়ছে। গাজার দিকে যাওয়া রাস্তাগুলোতে সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখা গেছে। গাজার উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণে হামলা আগের চেয়ে বাড়িয়েছে ইসরাইল। গত বৃহস্পতিবার আরো ১৮ হাজার সেনা গাজায় পাঠানোর বিষয়ে অনুমোদন দেয় ইসরাইল। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গত ৮ জুলাই থেকে গাজায় হামলা শুরুর পর এ পর্যন্ত ১৯৬০ এর বেশি হামলা চালানো হয়েছে। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, উত্তরে ট্যাংকের হামলায় তিন শিশু নিহত হয়েছে। ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সারারাত ইসরাইলি সেনারা ভারী অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গাজার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং কিসুফিম নামের একটি রাস্তায় হামাসসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ইসরাইলি সেনারা যদি গাজা থেকে ভূমধ্যসাগরের দিকে যায় তাহলে তারা গাজাকে বিভক্ত করে ফেলবে যেটা তারা ২০০৯ সালে করেছিল। হামাসের অন্যতম মুখপাত্র ফৌজি বারহাম ইসরাইলের স্থল অভিযানের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে ইসরাইল একটি ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে গেল। এজন্য তাদের চরম মূল্য দিতে হবে। তিনি বলেন, হামাস এখন আর ২০০৯ এবং ২০১২ সালের মতো অবস্থায় নেই। আমরা আরো শক্তিশালী হয়েছি। আমরা ইসরাইলি সেনাদের আটক করে ইসরাইলি কারাগারে আটক ৫ হাজার ফিলিস্তিনির মুক্তির জন্য ব্যবহার করতে প্রস্তুত। অন্য এক মুখপাত্র সামি আবু জুহরি বলেন, ইসরাইল আমাদের শিশুদের হত্যা করেছে। এর জন্য তাদের কড়া মূল্য দিতে হবে। তারা স্থল অভিযান করে আমাদের দমন করতে কিংবা ভীত করতে পারবে না। গাজার মাটিতেই তাদের কবর রচিত হবে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী গতকাল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষে নিজেদের এক সেনা নিহত হয়েছে। আর বিপরীত পক্ষের ১৭ জন নিহত এবং ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে। টানা ১১ দিনের অভিযানে নিহতের সংখ্যা ২৭১ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে দুই সহস্রাধিক। স্থল অভিযানেই নিহত হয়েছে ২৪ জন। জাতিসংঘ জানিয়েছে, নিহতদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় ১শত স্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে ইসারাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এদিকে ইসরাইলি সেনাদের অভিযানে গাজায় মানবিক বিপর্যয় বাড়ছে। স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, ইসরাইলি সেনারা আমাদের নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলছেন। কিন্তু আমরা যাবো কোথায়? আল মধৌন নামের এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের হয় গাজার শেরাটন হোটেলে যেতে হবে না হয় তো জঙ্গলে যেতে হবে। এছাড়া আর কোনো পথ নেই। এরপরও জীবন বাঁচাতে অনেকেই নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। গাজায় ইসরাইলের হামলার পর তা থামানোর অনেক চেষ্টা হলেও কোনো কাজে আসেনি। মিসরের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব হামাস প্রত্যাখান করার পর ইসরাইল অভিযানের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গতকাল ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। তিনি ইসরাইলের আত্মরক্ষার প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। তবে বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের বিষয়টিতে নজর দেওয়ার আহাবান জানিয়েছেন ওবামা। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে বলেছেন, সুড়ঙ্গে হামলা যেন সংক্ষিপ্ত হয়। কেরি অভিযান আর না বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, বেসামরিক নাগরিকদের বাঁচাতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে হবে। ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের ত্রাণ বিষয়ক সংস্থার মুখপাত্র ক্রিস গুননেস যুদ্ধবিরতির আহবান জানিয়েছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রায় ৪০ হাজার নাগরিকের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। সংস্থাটি ৩৪ টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রোথ বলেছেন, ইসরাইলি সেনারা ওয়াফা হাসপাতালে হামলা চালিয়েছিল। এর অভ্যন্তরে এখনো চারজন রোগী রয়েছেন। বাকি ১৭ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তুরস্কে ইসরাইলি দূতাবাসের সামনে হাজার হাজার লোক গাজায় ইসরাইলি হামলা বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। জর্ডান দ্রুত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বেঠকে বসার আহবান জানিয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুদ্ধ বন্ধে মিসর, জর্ডান এবং ইসরা্ইলে কূটনৈতিক সফর করছেন। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজায় স্থল অভিযান বন্ধ করতে হবে। না হলে রক্তপাত আরো বাড়বে। সহিংসতা বন্ধের চেষ্টা কঠিন হবে। গত বৃহস্পতিবার মিসরের রাজধানী কায়রোতে সে দেশের বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় আব্বাস স্থল অভিযান বন্ধের আহ্বান জানান। বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আরব লীগ মহাসচিব নাবিল আল-আরবির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ইসরাইলি একটি প্রতিনিধি দলও ছিল। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। এছাড়া মাহমুদ আব্বাস গাজার একটি ছোট ইসলামপন্থী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও ্বৈঠক করেছেন। বৈঠকে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছে বলে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।