তাপ-তাপমাত্রা
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৪, ২০:০০
পর্ব— ১৪
গত রাতে ছাদে বসে ঠাণ্ডা হাওয়ায় গান গেয়ে রেখার গলা বসে গেছে। একটু একটু কাশি হচ্ছে, গা ও গরম মনে হচ্ছে। কমলা রেখার কপালে হাত দিয়ে বললেন জ্বর এসেছে। নীলকান্তবাবুকে বললেন, থার্মোমিটার দিয়ে দেখো তো, তাপ কত?
নীলকান্তবাবু প্রথমে রেখার কপালে হাত রাখলেন, এর পর গলায়। ড্রয়ার থেকে থার্মোমিটার নিয়ে রেখার জিহ্বার নিচে দিলেন। এক মিনিট পর বের করে বললেন, বেশি না একশ ডিগ্রি। কমলাকে বললেন তাপ নয়, তাপমাত্রা।
ঐ এক কথাই, বললেন কমলা।
না, এক কথা নয়।
আকাশ, চন্দ্রা, অণু পাশের ঘরে ছিলো, তারা রেখার জ্বর শুনে দেখতে এলো। অণু বললো, এক নয় কীভাবে বাবা?
নীলকান্তবাবু বললেন, তাপ হলো শক্তি, আর তাপমাত্রা হলো এর পরিমাপ।
আকাশ বললো— একটা রাশিকে পরিমাপ করে আবার অন্য নাম দিই নাকি?
হ্যাঁ, অন্য নাম দিই।
বুঝিয়ে বলো, বললেন কমলা।
যেমন ধরো তুমি দুটো চুলায় একসাথে দুটো পানির মগ বসালে। একটা বড়, অন্যটি ছোট। পাঁচ মিনিট পর কোনটি বেশি গরম হবে?
কমলা বললেন- এটা তো সবাই জানে, ছোট মগটা বেশি গরম হবে।
কেন বেশি গরম হবে?
এটাতে পানি কম ছিলো ।
তাহলে দেখো- বললেন নীলকান্তবাবু, তাপ কিন্তু সমান দিলাম। দুটোতেই পাঁচ মিনিট করে। কিন্তু বেশি গরম হলো ছোট মগটা। ছোট মগের পানির তাপমাত্রা বেশি হলো। তাপ সমান দিলেও তাপমাত্রা ভিন্ন হলো। আবার মনে করো ছোট মগের পানির তাপমাত্রা আশি ডিগ্রি। বড় মগের পানির তাপমাত্রা ষাট ডিগ্রি। এখন যদি দুটোর তাপমাত্রা আশি ডিগ্রি করতে হয়, তাহলে বড় মগে আরো বেশি তাপ দিতে হবে।
তা তো হবেই, বললেন কমলা।
তাহলে, দুটো মগের পানির তাপমাত্রা সমান, কিন্তু তাপ এখন বড় মগটাতে বেশি দিতে হয়েছে।
রেখা বললো- একটা প্যারাসিটামল খাবো। অণু একটা প্যারাসিটামল এনে দিলো। রেখা খেয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করলো। ঘুম তো আসে না। মাথাব্যাথাও আছে, একটু একটু কাশিও আছে।
কমলা বললেন একটু পানি গরম করে দিই, খেয়ে নে। বলে তিনি ছোট মগ দিয়ে পানি গরম করে আনলেন, আর বড় মগে করে স্বাভাবিক পানি নিয়ে এলেন। একটা গ্লাসে প্রথমে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে এর ওপর ছোট মগ থেকে গরম পানি ঢাললেন। হাত দিয়ে গ্লাস ধরে দেখলেন সয়নীয় পরিমাণ গরম আছে কিনা। এরপর রেখাকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলেন— খেয়ে নে।
নীলকান্তবাবু বললেন— তুমি যে গরম পানির সাথে ঠাণ্ডা পানি মিশালে, এতে কী ঘটনা ঘটলো?
কমলা বললেন— কী ঘটনা আবার, ঠাণ্ডা পানি গরম হয়ে গেলো।
তাহলে গরম পানি তাপ বর্জন করলো বা হারালো, আর ঠাণ্ডা পানি তাপ গ্রহণ করলো। যে পর্যন্ত ঠাণ্ডা পানি আর গরম পানি উভয়ের তাপমাত্রা সমান হবে না, সেই পর্যন্ত তাপের এই আদান-প্রদান চলতে থাকবে।
আর সমান হলে পরে? বললো আকাশ।
সমান হলে পরে আদান-প্রদান বন্ধ হবে। এরপর মিশ্রণ থেকেই তাপ বর্জিত হতে থাকবে, আর তাপমাত্রা কমতে থাকবে। কত সময় পরে এসে দেখবি গ্লাসের পানি একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
রেখা উঠলো বালিশ ছেড়ে, বললো পানি খাবো। অণু গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। রেখা গ্লাস হাতে নিয়ে বললো- ঠাণ্ডা। একটু গরম করে দাও। অণু গেলো কিচেনে, পানি গরম করতে।
আকাশ বললো- তাপ হলো হিট, আর তাপমাত্রা হলো টেম্পারেচার। তাই না মামা ?
হ্যাঁ, তাপ হলো শক্তি আর তাপমাত্রা হলো এর পরিমাপ। অন্যভাবেও বলতে পারিস। তাপমাত্রা হলো বস্তুর তাপীয় অবস্থা। এই অবস্থা বস্তুটি অন্য বস্তুর সংস্পর্শে এলে তাপ দেবে না নেবে, তা বুঝায়।
এটি কী রকম ? বললো কণিকা।
ধর, একটা বস্তুর তাপমাত্রা ষাট ডিগ্রি। এটি একটি চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রার বস্তুর কাছে আনলে তাপ বর্জন করবে, আর চল্লিশ ডিগ্রির বস্তুটা তাপ গ্রহণ করবে। কিন্তু যদি ষাট ডিগ্রির বস্তুটাকে আশি ডিগ্রি তাপমাত্রার বস্তুর সংস্পর্শে আনা হয় তখন ষাট ডিগ্রির বস্তুটি তাপ গ্রহণ করবে।
অর্থাত্, ষাট ডিগ্রিটা চল্লিশ ডিগ্রির সংস্পর্শে বর্জন, আর আশি ডিগ্রির সংস্পর্শে তাপ গ্রহণ করবে। তাই না? বললো আকাশ।
ঠিক তাই —বললেন নীলকান্তবাবু।
তাহলে তাপের একক আর তাপমাত্রার এককও এক নয়? প্রশ্ন করলো অণু।
হ্যাঁ, তাপের একক জুল, আর তাপমাত্রার একক ডিগ্রি।
রেখা বললো— বাবা দেখো তো জ্বর কমেছে কিনা।
নীলকান্তবাবু থার্মোমিটার দিয়ে দেখলেন জ্বর নিরানব্বই ডিগ্রি ফারেনহাইট। বললেন কিছুটা কমেছে, তুই ঘুমিয়ে পড়, কমে যাবে।
আকাশ বললো— কিন্তু তুমি তো সেদিন বললে কাজের একক জুল। আজকে বলছো তাপের একক জুল।
হ্যাঁ, তাপের একক আর কাজের একক একই। দুটোরই একক জুল।
তাপ কী দিয়ে মাপা হয় বাবা ? অণু বললো।
তাপ মাপি ক্যালরিমিটার দিয়ে, আর তাপমাত্রা থার্মোমিটার দিয়ে, বলে তিনি থার্মোমিটারটা দেখালেন।
তুমি তো বললে ছোট মগে আর বড় মগে পাঁচ মিনিট করে তাপ দিলে। তাপের একক কি মিনিট?
না না, তাপের একক মিনিট নয়। আমি শুধু একটা আইডিয়া দিতে চেষ্টা করেছি। যত সময় তাপ দেয়া হবে, তাপমাত্রা তত বেশি হবে। কম সময় তাপ দিলে তাপমাত্রা কম হবে।
রেখা বললো- ভাল্লাগছে না বাবা, তোমরা কানের কাছে এসে বকবক শুরু করেছো, আমি অসুস্থ মানুষ।
নীলকান্তবাবু বললেন— তাই তো, চল আমরা এখান থেকে চলে যাই। রেখাকে বললেন, তুই ঘুমিয়ে পড়।