হারিয়ে খুঁজি

প্রিয়তম বন্ধুকে হারিয়েছি অসময়ে

মস্ত বড় আকাশটা দুপুর পর্যন্ত ছিল ঠিকঠাক। বিকেল গড়াতেই, কে যেন ইয়া বড় একটা আলপিনের খোঁচা দিয়ে ঐ আকাশকে ফুটো করে দিয়েছে। সেই থেকে টিপটিপ-ঝুমঝুম, বৃষ্টিধারা ঝরছে তো ঝরছেই! আকাশের সাথে পাল্লা দিয়ে কাঁদছে মনটাও। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আমার খুব প্রিয়। গ্রীষ্মের ছুটিতে, সেদিন আমি বাড়িতে, একা। দরজা-জানালা সবক’টা খুলে দিয়ে, আনমনে, বৃষ্টি দেখছি। ভিজব, নাকি ভিজব না? আমার প্রিয়তম বন্ধু থাকলে হয়তো আজ ভিজতে দিত না। হয়তো বলতো, ‘ঠাণ্ডা লেগে যাবে! ভিজলেও মাথাটা ঠিকভাবে মুছে ফেল।’ নিশ্চয়ই নিজেই তোয়ালে নিয়ে এসে আদর করে মুছে দিতেন আমার চুলগুলো! মনে পড়ে—যখন ঢাকা থেকে ফিরতাম, রাস্তার মোড়ে আমার কাঁধের ভারী ব্যাগটি বহন করার জন্য প্রিয়তম মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকতেন! টানাটানির সংসারেও না চাইতেই মিলত সব। ‘প্রিয়তম বন্ধু, যেদিন তোমার হার্টে ব্লক ধরা পড়ল, সারা জীবনের সত্পথের সীমিত উপার্জনটাও নিজের জন্য খরচ না করে রেখে দিলে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য! মুখে তুমি আমায় বললে—তুই ভালো কোথাও চান্স পেলে আমি সাথে সাথেই গিয়ে হার্টে রিং পরে আসব; দেখিস, আমার কিচ্ছু হবে না। তোমার অভয়বাণী মিথ্যে প্রমাণ করতে সব কর্মের কর্তার যেন খুব জেদ চেপেছিল সেদিন! ভর্তি পরীক্ষার দেড় মাস আগেই হঠাত্ অজানা ঝড়ে শেষ হয়ে গেল সব! সাজানো ঘর, কতশত স্বপ্ন, ছেলের ভবিষ্যত্, সহধর্মিণীর সিঁথির সিঁদুর কেউ একজন যেন রাবার দিয়ে ঘষে মুছে ফেলে দিল! কীভাবে এতসব হয়ে গেলো? কিচ্ছু জানা গেলো না। মৃত্যুর কারণটাও রইল অজানা। শুধু দেখা গেল, সারা জীবন পরের কল্যাণে কাজ করে যাওয়া নির্ভেজাল ভালো মানুষটি, অসামপ্রদায়িক চেতনার কবি—তোমার নিথর দেহটি পড়ে আছে মেঝেতে! বড় অসময়ে চলে গেছ তুমি, প্রিয়তম! তুমি ছাড়া এমন পৃথিবী আমি চাইনি। প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ে তোমার হাসিমাখা মুখ, তোমার হাস্যরস, বুকে জড়িয়ে অভয় দেয়া। খেতে বসে মিস করি তোমার হাতের রান্না, সুন্দর পরিবেশন। কতদিন তুমি নতুন কোনো কবিতা-উপন্যাস লেখো না। কতদিন তোমার আবৃত্তি শুনি না! তুমি চলে গেছ বলে, আমার দুনিয়াটাই যে পাল্টে গেল! ‘কলেজের হোস্টেলে তোমাকে ছাড়া একটা দিন থাকতেই যে আমি কেঁদে অস্থির হয়ে পড়তাম, সেই তোমাকে ছাড়া আজ আমার ছয়-ছয়টা বছর! এখন আর কেউ বারণ করবার নেই, আদর করিবারও কেউ নেই। এখন আমি যখন খুশি, যেভাবে খুশি বৃষ্টিতে ভিজি। যখন খুশি হারিয়ে যাই, ফিরতে হয় তাই আবার ফিরে আসি। আমার জীবনে এখন আর কোনো রুটিন নেই। জানো, মায়ের মুখের দিকে আমি তাকাতে পারি না। হাজারো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে তোমার হাতে গড়া ঐ ঘরে রাতের পর রাত মা কীভাবে একা থাকে, আমি জানি না। আমি কীভাবে টিকে আছি সেটাও জানি না। শুধু জানি, কেউ যখন তোমার নামটি শুনে ছলছল চোখ নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বড় ভালো মানুষ ছিল’, আর কাঁধে হাত রেখে বলে ‘তুমি পারবে’, গর্বে আমার বুকটা ভরে ওঠে; আমি ভাবি, আমাকে তো পারতেই হবে। তবেই না আমি তোমার যোগ্য সন্তান! ‘মনের সবটা জুড়ে আছো তুমি। আমার জীবনের আদর্শ, সবচেয়ে প্রিয় স্বজন, প্রিয়তম বন্ধু, আমার সবকিছু—আমার বাবা, তোমাকে অসময়ে হারিয়েছি আমি যে শূন্য! ‘যেখানেই থাকো, ভালো থেকো বাবা!’ লেখক :সাংবাদিক