রোজা রাখলে ডায়াবেটিস হূদরোগ ও বাত রোগে সরাসরি উপকার মেলে

ব্যাধি কমায় রোজা। রোজা রাখলে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় করেন অনেকে কিন্তু প্রকৃত পক্ষে রোজায় কারও স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গেছে বা রোজা রেখে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কারও মৃত্যু হয়েছে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। রোজার মাসে পেপটিক আলসারের রোগীরা কিভাবে খালি পেটে থাকবেন, ডায়াবেটিস রোগীরা কিভাবে রোজা রেখে ইনসুলিন নেবেন, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা কিভাবে দু’বেলা বা তিন বেলা ওষুধ সেবন করবেন এসব চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েন। অসুস্থ ব্যক্তিতো আছেনই, এমনকি সুস্থ ব্যক্তিরাও দুর্বলতা এবং নানা রকম দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনার কারণে ঠিকমতো রোজা রাখতে পারেন না। রোজা রাখলে ওজন আস্তে আস্তে কমে। ফলে শরীরে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না। ডায়াবেটিক, হূদরোগী, কোমর ও হাঁটুর ব্যথার রোগীরাও সরাসরি উপকার পান। রোজা শুধু আত্মশুদ্ধির মাসই নয়, এ মাস আত্মনিয়ন্ত্রণেরও মাস। নিজেকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালিত করার মাধ্যমে শরীরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। রমজানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার বিষয়টি শরীরে যে প্রভাব ফেলে, তা কাটিয়ে উঠতে এ সময় শরীরকে ২০ পৃষ্ঠার পর চালাতে হবে ভিন্ন নিয়মে। বিশেষ করে এ সময় খাবার-দাবারে আনতে হবে বিশেষ পরিবর্তন। রোজায় শরীরের প্রোটিন, ফ্যাট ও শর্করা স্বয়ং পাচিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলো পুষ্টি পায়। এ পদ্ধতিকে ‘অ্যান্টারোলাইসিস’ বলা হয়। ফলে শরীরে উত্পন্ন উেসচকগুলো বিভিন্ন কোষে ছড়িয়ে পড়ে। এটি হচ্ছে শরীর বিক্রিয়ার এক স্বাভাবিক পদ্ধতি। রোজা এ পদ্ধতিকে সহজ, সাবলীল ও গতিময় করে। রোজায় শরীরের ক্ষতিকারক বিষ বা টক্সিনের মাত্রা কমে। পাকস্থলিতে এক ধরনের উপকারী জীবাণু খাদ্য হজমে সাহায্য করে। বছরের ১১ মাস এসব জীবাণু অনবরত খাদ্য হজমের কাজে লিপ্ত থাকার ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ একমাস রোজার ফলে এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য জীবাণুগুলো বিশ্রাম পায়। বিশ্রামের ফলে এরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে বাকি ১১ মাস আবার খাদ্য হজমে ভালোভাবে সাহায্য করতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে আমরা সেহির ও ইফতারে যে সব খাবার গ্রহণ করি সেগুলোর সবই যে যথাযথ তা কিন্তু নয়। এ সব খাবারের মধ্যে কিছু খাবার রয়েছে যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। আবার কিছু খাবার আছে যেগুলো স্বাস্থ্যসম্মত কিংবা পুষ্টিকর খাবার হলেও সময়োচিত নয়। রোজায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোজাদাররা অসুস্থ হয়ে পড়েন যথাযথ খাবার গ্রহণ না করার কারণে। বিশেষ করে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের কারণেই এ অসুস্থতা দেখা দিয়ে থাকে। রোজায় এ শারীরিক বিপত্তি এড়ানো খুবই সহজ। তাই এ ধরনের বিপত্তি এড়াতে গবেষকদের প্রথম উপদেশ হচ্ছে ঃ আমরা সবাই জানি, উচ্চ অম্লত্ব (এসিডিটি) থেকে সৃষ্টি হয় পেপটিক আলসার বা পাকস্থলির ক্ষত। যেহেতু রোজা রাখার জন্য এসিডিটি স্বাভাবিকভাবে কমে যায়, সেহেতু রোজা পেপটিক আলসার কমাতে সাহায্য করে। রোজা রাখার পর সারাদিনের খাবার একসঙ্গে খেতে হবে, এরকম মানসিকতা থেকেই এ বিপত্তি দেখা দেয়। একথা ভুলে গেলে চলবে না, পাকস্থলির একটা নির্দিষ্ট আয়তন ও খাবার ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। শুধু একদিন কেন, তিনদিন না খেয়ে থাকার পরও পাকস্থলি তার ধারণ ক্ষমতার বেশি খাবার গ্রহণ করতে পারে না। সুতরাং বেশি খেলে বিপত্তি ঘটবেই। দ্বিতীয়ত শরীর নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি স্বনিয়ন্ত্রিতভাবে রোজার সময় বিপাক ক্রিয়ার হার কমিয়ে দেয় এবং শরীরে জমাকৃত চর্বি ক্ষুধা নিবারণে ব্যবহূত হয়। রোজার সময় খাবারের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ রুচিকর খাবার গ্রহণের দিকে বেশি মনযোগী থাকে কিন্তু সুষম খাবার বা ব্যালান্স ডায়েটের কথা মনে রাখে না। রোজায় সুস্থ থাকার জন্য সব ধরনের খাবার মিলিয়ে খাদ্য তালিকা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে আটা বা চাল, দুধ ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার, মাছ, মাংস এবং ডিম, শস্যদানা, শাক-সবজি এবং সর্বোপরি ফল জাতীয় খাবার রাখা উচিত। গবেষকরা বলেছেন, রোজার খাবার যত সাধারণ হবে ততই ভালো। রোজা হচ্ছে বাড়তি ওজন সম্পন্ন লোকদের জন্য ওজন কমানোর উপায়। কিন্তু অতিভোজনের কারণে সে উদ্দেশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সেহেরি ও ইফতারে অতিভোজন পরিহার করতে হবে। রোজায় দীর্ঘ সময় উপবাস থাকতে হয় বলে সেহিরতে কার্বোহাড্রেট বা জটিল শর্করা গ্রহণ করা উচিত। এ জটিল শর্করা ধীরগতিতে হজম হয় এবং হজম হতে প্রায় ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে দিনের বেলায় ক্ষুধা কম অনুভূত হয়। জটিল শর্করা জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে শস্যদানা বা বীজ জাতীয় খাবার, অপরিশোধিত বা ননিরফাইনড আটা, ময়দা এবং ঢেঁকিছাঁটা চাল। অন্যদিকে পরিশোধিত শর্করা দ্রুত হজম হয়ে রক্তে দ্রুত গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে শরীরকে চাঙ্গা করে তোলে। যাদের মুখে খাওয়ার ট্যাবলেটের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে, রমজান তাদের জন্য সুফল বয়ে আনে। এদের অনেকের আগের চেয়ে কম ডোজের ওষুধ লাগতে পারে। যারা নিয়মিত ইনসুলিন নেন, তারা অনেকেই জানেন না যে, রোজা রেখেও ইনসুলিন নেয়া যায়। তবে ডায়াবেটিক রোগীদের কতটা ইনসুলিন নিতে হবে, কি কি খেতে হবে সে বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া দরকার। রোজা রাখলে লিভারে রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয়, ফলে ত্বকের নিচের চর্বি, পেশির প্রোটিন, গ্রন্থি এবং লিভারে কোষগুলো আন্দোলিত হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ দেহযন্ত্রগুলোর সংরক্ষণ এবং হূিপণ্ডের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেহাংশগুলোর বিক্রিয়া বন্ধ রাখে। এছাড়া খাদ্যাভ্যাসের ফলে মানুষের শরীরের যে ক্ষতি হয়, রোজা তা পূরণ করে দেয়। যারা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে ভোগেন রোজা তাদের জন্য খুবই উপকারী। রাতে তিনবার আহার, প্রচুর শরবত পান এবং যথেষ্ট আঁশযুক্ত খাবার দিয়ে ইফতার করায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যায়। রোজা রেখে বিভিন্ন অসুখে চিকিত্সা চালিয়ে যেতে কিন্তু বাধা নেই। রোজা অবস্থায় চোখ, নাক ও কানের ড্রপ, স্প্রে, ইনহেলার ব্যবহার করা যাবে। ইনসুলিন ব্যবহার করা যাবে। চিকিত্সার প্রয়োজনে ক্রিম, অয়েন্টমেন্ট, ব্যান্ডেজ, প্লাস্টার ইত্যাদি ব্যবহার করলে সমস্যা হবে না। রোজা রেখে রক্ত পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে এবং কাউকে রক্তদানেও কোনো বাধা নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য অ্যান্ডোসকপি বা গ্যাস্ট্রোসকপি করালেও রোজা নষ্ট হয় না। রোজা রাখা অবস্থায় না গিলে মাউথ ওয়াশ, মুখের স্প্রে ব্যবহার করা যাবে এবং গড়গড়া করা যাবে। আসলে রোজা কিন্তু শুধু উপবাস নয়, এটি হলো প্রার্থনা, যা মনের কালিমা দূর করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রোগ, জরা আর ক্লান্তিও হয় বিলীন। তাই খুব অসুস্থ না হলে রোজা রাখা যায়।