উইলিয়াম কেরী পণ্ডিত, ভাষাতাত্ত্বিক, মিশনারি
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৪, ২০:৩৩
কেরী, উইলিয়ম (১৭৬১-১৮৩৪) পণ্ডিত, ভাষাতাত্ত্বিক, মিশনারি। তাঁর জন্ম উত্তর ইংল্যান্ডের একটি দরিদ্র পরিবারে। তাঁর ছিল অফুরন্ত জ্ঞানের তৃষ্ণা। ইংরেজি, ল্যাটিন এবং হিব্রুসহ তিনি বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষা শিখেছিলেন, তাছাড়া শিখেছিলেন উদ্ভিদিবদ্যা, উদ্যানবিদ্যা, জীববিজ্ঞান এবং ভূগোল। জুতো তৈরি এবং পড়ানোর কাজ ছেড়ে দিয়ে ১৭৮৯ সালে তিনি ব্যাপটিস্ট মিশনারির কাজ শুরু করেন। তিনি যখন ‘পুতুল পূজারী’দের কথা জানতে পারলেন, তখন তাঁদের কীভাবে নরকের অনন্ত অগ্নি থেকে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে বিচলিত হলেন। পরে ১৭৯৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি নিজের পরিবার নিয়ে জন টমাস নামে আরেকজন ব্যাপটিস্ট মিশনারির সঙ্গে কলকাতায় আসেন। জন টমাস ইতোমধ্যে দু-বছর বঙ্গদেশে ছিলেন।
কলকাতায় এসেই তিনি রামরাম বসুর কাছে বাংলা শিখতে আরম্ভ করেন, এবং অল্পকাল পরেই তাঁর সাহায্য নিয়ে বাংলা ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করা শুরু করেন। তিনি তখন ছিলেন ভীষণ অর্থকষ্টে। তাই উত্তর বঙ্গে এক নীলের ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিতে বাধ্য হন।
১৭৯৯ সালের শেষ দিকে যশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়ম ওয়ার্ড নামে অন্য দুজন ব্যাপটিস্ট মিশনারি কলকাতায় আসেন ধর্মপ্রচার করতে। কিন্তু তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে দিতো না। মার্শম্যান এবং ওয়ার্ড কোম্পানিকে ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশে একটি মার্কিন জাহাজে এসেছিলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁদের আসল উদ্দেশ্যের খবর পেয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করতে যায়। সেজন্যে তাঁরা কলকাতার অদূরে ডেনিশ মিশন শ্রীরামপুরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ১৮০০ সালের ১০ জানুয়ারি কেরী এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন এবং শ্রীরামপুর মিশন গড়ে তোলেন, তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেখানে একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন, পরবর্তীতে যা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাপাখানা হিসেবে খ্যাত হয়। এ ছাপাখানা থেকে ওই বছরের মাঝামাঝি তিনি ম্যাথিউ-প্রণীত গসপেলের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন।
একই বছর গভর্নর-জেনারেল ওয়েলেসলি ইংল্যান্ড থেকে আগত কোম্পানির তরুণ সিভিলিয়ানদের দেশীয় ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূগোল ইত্যাদি শেখানোর উদ্দেশে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ স্থাপন করেন। কিন্তু তখন কলকাতায় বাংলা ভাষার একমাত্র সাহেব-পণ্ডিত-হেনরি পিটস ফরস্টার-তাঁকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করতেন বলে বাংলা বিভাগ খুলতে পারেননি। কেরীকে বাংলা বিভাগের উপযুক্ত শিক্ষক বিবেচনা করে ১৮০১ সালের মে মাসে তিনি বাংলা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। তখন অ্যাংলিকান খ্রিস্টান ছাড়া কেউ এ কলেজে চাকরি পেতেন না। কেরীকে তাই অধ্যাপক না করে অর্ধেক বেতনে শিক্ষকের পদ দেওয়া হয়। তাছাড়া, ব্যাপটিস্ট মিশনারিদের কলকাতায় আসা-যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কেরীর অধীনে কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিত এবং মুনশিও নিযুক্ত হন।
এদেশীয় পণ্ডিতদের নিয়ে কেরী শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করার মতো কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করেন। রামরাম বসু এবং মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রথম দু বছরে তিনটি গ্রন্থ এবং কেরী একটি বাংলা ব্যাকরণ ও আদর্শ সংলাপের একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। পরে তিনি একটি বাংলা-ইংরেজি অভিধান এবং ১৮১২ সালে ইতিহাসমালা নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন।
তাঁর নির্দেশনায় তাঁর সহকর্মীরা যে-পাঠ্যপুস্তকগুলি রচনা এবং প্রকাশ করেন, সেগুলি বাংলা গদ্যের আদর্শ গঠন করে দেয়। পরে যাঁরা বাংলা ভাষায় লেখেন, তাঁরা অনেকেই এ রীতি গ্রহণ করেন। সে অর্থে কেরী বাংলা গদ্যরীতিকে একটি বিশিষ্ট ধারায় রূপ দেন। কেরী সংস্কৃতসহ আরও একাধিক ভারতীয় ভাষা শিখেছিলেন এবং তার ব্যাকরণ রচনা করেন। এমনকি, সেসব ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেন। এ ছাড়া, তিনি তেরোটি ভারতীয় ভাষার একটি বহুভাষিক অভিধান রচনা করেন। তা থেকে ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর পাণ্ডিত্যের খানিকটা অনুমান করা যায়। এই অভিধানটি ছাপার সময়ে শ্রীরামপুর প্রেসে আগুন লেগে যায়, ফলে হাজার হাজার বই পুড়ে যায়।
ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ-এ তাঁর কাজ ছাড়াও তিনি বঙ্গদেশের কৃষি এবং উদ্যান উন্নয়নের জন্য কাজ করেন। তিনি বঙ্গদেশের কৃষি-উদ্যান সমিতি গড়ে তোলেন এবং উইলিয়াম রক্সবার্গের বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ সমপাদনা ও প্রকাশ করেন। এই দুটি গ্রন্থ হলো Hortus Bengalensis (১৮১৪) এবং Flora Indica (১৮৩২)। এছাড়া, তিনি টেক্সটবুক সোসাইটির কাজে অংশগ্রহণ করেন এবং শিশুবিসর্জন ও সতীদাহ প্রথা নিবারণের জন্যে সরকারের কাছে অনুরোধ জানান। লন্ডনের রয়্যাল এগ্রিকালকাচারাল সোসাইটি এবং রয়্যাল জিওলজিকাল সোসাইটি তাঁকে সম্মাননা দেয়।