ছেলে-মেয়ে ছাড়াই ঈদ
সুখ এখন পরবাসী
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৪, ২০:৩৭
মোস্তাফিজুর রহমান। বয়স ৫৮ বছর। পেশায় সরকারি চাকরিজীবী। স্ত্রী সেলিমা রহমান একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিন সন্তান রানা, অনিক ও চাঁদনী। এরা সবাই পড়াশুনার জন্য বিদেশে থাকেন। বড় ছেলে রানা চারবছর আগে আমেরিকায় গিয়েছে। অনিক এবং চাঁদনী ইংল্যান্ডে গিয়েছে দু’বছর হলো। দেশে আপনজন বলতে কেউ নেই এই দম্পতির। সন্তান দূরে থাকার কষ্ট হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি বললেন মোস্তাফিজুর রহমান। মা সেলিমা রহমান বলেন, ছেলে-মেয়েদের সব সময়ই মিস করি কিন্তু বেশি মিস করি রমজান ও ঈদের সময়। সন্তানদের কথা মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন তারা। মা সেলিমা রহমান অবচেতন মনেই বলা শুরু করলেন স্মৃতির পাতায় লেখা পেছনের সুখের দিনগুলোর কথা। পরিবারের সকলে মিলে একসঙ্গে ইফতারি তৈরি করতাম। তারপর ইফতার আর আড্ডা জমে উঠত সমানতালে। আর এখন ইফতার করতে ভালই লাগে না। সমস্ত ফ্ল্যাট জুড়ে মাত্র দুটি প্রাণী। ফ্ল্যাটটা কেমন জানি খাঁ খাঁ করে। বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছেলে-মেয়েরা যখন ছিল তখন প্রায়ই বাসার বাইরে যেতাম সবাই মিলে ইফতারি করার জন্য টি.এস.সি, গুলশান লেক. ধানমন্ডি লেক, বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ঘুরে ঘুরে ইফতার করতাম। একমাত্র মেয়ে চাঁদনীর ঝোঁক ছিল পুরোনো ঢাকার ইফতারের প্রতি। তার অনুরোধে প্রায়ই পুরোনো ঢাকার চকবাজারে গিয়ে ইফতার কিনে আনতাম। এখন তারা (সন্তানেরা) কাছে নেই। তাই আর বাইরেও ইফতারি করতে যাওয়া হয় না। দু’জনে মিলে কোনরকম ইফতারি করি।
সামনে আসছে ঈদ। জানতে চাইলাম কিভাবে কাটাবেন এবারের ঈদ? প্রশ্ন শুনে দু’জনেই নির্বাক। দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। চোখ মুছে সেলিমা রহমান বলেন, সন্তানদের ছাড়া ঈদ যেই ঈদই মনে হয় না। বাসায় শুয়ে-বসে ঈদ কাটে। ঈদের দিন তেমন একটা বাইরে যান না বাবা মোস্তাফিজুর রহমানও।
পেছনের ঈদের দিনগুলো ছিল খুবই রঙিন। ঈদের পূর্বে কেনাকাটা নিয়ে চলত তুমুল কাণ্ড। পুরো এক সপ্তাহজুড়ে চলত কেনাকাটা। এখন আর তেমন করে মার্কেটে যাওয়া হয় না। সেলিমা রহমান বলেন, ঈদের দিন সকালে টেবিল সাজাতাম সন্তানদের পছন্দের খাবারে। মেয়ে চাঁদনীর রান্নার হাত খুবই কাঁচা। কখনো সাহস করে একটা ডিম ভাজতে পারত না। কিন্তু ঈদের দিন সকালে একহালি রেসিপির বই নিয়ে বসত রান্নাঘরে। মা এটা রান্না করো, ওটা রান্না করো। মেয়েটা বই দেখে নতুন রেসিপি বলত আর রান্নার কাজটা আমিই করতাম। অন্যদিকে বাবা দুই ছেলেকে নিয়ে বাইরে যেত ঈদের নামাজ পড়তে, নামাজ শেষে বাসায় ফিরে শুরু হত খাবার প্রতিযোগিতা। ঈদের পরের ছুটিটা ঘুরে ঘুরে কাটাতেন মোস্তাফিজুর রহমান। ছেলে-মেয়েরা চলে যাবার পর থেকে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি এই দম্পতির। এবারও ঘরে বসেই ঈদ কাটাবেন তারা। কষ্টে থাকলেও সন্তানদের জন্য শুভ কামনা সবসময়ই ছিল, আগামীতেও থাকবে।
ছবি: রেজা চৌধুরী। কৃতজ্ঞতা: মোহাম্মদ হাবীব উল্লাহ্ ও রেহানা বেগম