গাজা যখন পুড়ছিল

গত আট জুলাই। গোটা দুনিয়ায় তখন বিশ্বকাপ উন্মাদনা। সেমিফাইনালে ডাচদের মুখোমুখি ফেভারিট আর্জেন্টিনা। গাজার সমুদ্র সৈকতের এক ক্যাফেতে একই প্লাস্টিক চেয়ারে বসে সেই খেলা দেখার অপেক্ষায় বেশ কয়েকজন। ঠিক তখনই বিকট বিস্ফোরণ। চারদিক কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে দিয়ে মুহূর্তেই উধাও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী ইসরাইলী জঙ্গি বিমান। এরপরই ফায়ার সার্ভিস, ত্রাণকর্মী আর স্বজনদের ছুটোছুটি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ভূমধ্যসাগরের বালুকাবেলা। ছিন্ন ভিন্ন দেহ, আহতদের আর্তনাদ, আহাজারি। সেদরতের পাহাড়ে তখন ইহুদীদের অপেক্ষার পরিসমাপ্তি, সবাই আনন্দে আত্মহারা। হইহই কলরব। হাততালি। যেন নেদারল্যান্ডের জালে জড়িয়েছে আর্জেন্টাইন বল। ইসরাইলী বিমানের ঐ হামলায় ঘটনাস্থলেই মারা যায় প্রতিবেশী আট ফিলিস্তিনী। গাজার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে পপকর্ন খেতে খেতে হর্ষধ্বনি করে ওঠার সেই ছবি পরদিন প্রকাশ করা হয় ডেনিশ পত্রিকায়। গাজা এখন এক মৃত্যু উপত্যকার নাম। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ঐ এলাকায় এই মুহূর্তে একই সাথে চলছে বিমান, ট্যাঙ্ক ও স্থল অভিযান। মৃত্যু ছাড়া পালাবার আর কোনো রাস্তা নেই। এটাই ফিলিস্তিনীদের শেষ পরিণতি। বিশ্ব বিবেক সেখানে স্তব্ধ। জাতিসংঘের গলা নিচু। কারণ এটা দখলদার ইসরাইলের আত্মরক্ষার লড়াই। আত্মরক্ষার্থেই তারা শত্রুকে নির্বংশ করছে। গাজায় রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে আনন্দিত ইহুদীরা। তাই তো ইসরাইলের সেদরত এলাকার উঁচু পাহাড়ে রক্তের সেই হোলি আনন্দ উদযাপন করতে দেখা যায় তাদের। অসহায় জনগোষ্ঠীর উপর বোমা আর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দৃশ্য উপভোগ করতে প্লাস্টিক চেয়ার আর সোফাও পাহাড়ে টেনে তুলেছেন কেউ কেউ। সেখানে আরাম করে বসে আইফোনে গাজার ধ্বংসযজ্ঞের ‘আনন্দঘন’ মুহূর্তের ছবি তারা পোস্ট করছেন টুইটার বা ফেসবুকে। সেদরতের জন্ম মাত্র ছয় দশক আগে। আগে সেটা ছিল ফিলিস্তিনীদের নাজদ্ গ্রাম। ১৯৪৮ সালে সেটা দখল করে যাযাবর ইহুদীরা। এরপর ফিলিস্তিনীদের বাড়ি ঘর তছনছ করে বর্বর রক্তপাত ঘটিয়ে সেখান থেকে তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয় গাজায়। সেখানে স্থায়ীভাবে গড়ে তোলা ইহুদী জনবসতি। এই নগরী এখন দক্ষিণ ইসরাইলের অংশ। সেদরতে রয়েছে বেশ কয়েকটি উঁচু পাহাড়। সেখান থেকে দেখা যায় তাড়া খেয়ে আশ্রয় নেয়া ফিলিস্তিনীদের গাজা উপত্যকা। গাজায় বিমান হামলা চালানো হবে, এই খবরে যারা মত্ত, তারা সবাই গিয়ে ওঠে সেই পাহাড়ে। এ যেন অসাধারণ নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে ভিড় করছেন দূরদেশি পর্যটকরা। কখন দেখা যাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সেই প্রতীক্ষিত দৃশ্য, বিমান হামলায় কখন আগুনের গোলায় জ্বলে উঠবে সুবিশাল এক একটা ভবন। কাছে থাকা মোবাইল ফোনে ধারণ করবে সেসব দৃশ্য। শেয়ার করবে ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। কেউ প্লাস্টিক চেয়ারে, কেউ সোফায়, কেউ অস্থির পায়চারি করে, কেউ বা গোশগল্পের মাধ্যমে অপেক্ষা করছে ঐ দৃশ্য দেখার। অপেক্ষার সময় তো পার হতে চায় না। তাই সাথে পপকর্ন কিংবা চিপস থাকলে মন্দ কী! মুচুর মুচুর শব্দে চিবানো যাবে আর বোমাবৃষ্টির দৃশ্য উপভোগ করা যাবে! গাজার গোটা জনগোষ্ঠীই যেন ইসরাইলের শত্রু। যেখান থেকে হামাস অসংখ্য রকেট ছোঁড়ে, কিন্তু দু’একটি ছাড়া বাকিগুলো ইহুদীদের টিকি পর্যন্ত পৌঁছায় না। ইসরাইলের অত্যাধুনিক আইরন ডোম প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র সেগুলোকে আকাশেই খতম করে দেয়। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে নিখোঁজ তিন ইহুদী কিশোরের লাশ পাওয়ার পর থেকেই যুদ্ধ বাধানোর উস্কানি দেয়া শুরু করে ইসরাইলের ডানপন্থি গ্রুপগুলো। বহু বছর ধরে যেসব সাংবাদিক ঐ অঞ্চল কাভার করে আসছেন, তাদের মতে, ইহুদী ডানপন্থি গ্রুপগুলো যে হারে এবার উস্কানি দিয়েছে, এককথায় তা নজীরবিহীন। কিভাবে যুদ্ধ বাধাতে হয়, যুদ্ধবাজরা তা ভাল করেই জানে। তাই পশ্চিম তীর নয়, হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার এক ফিলিস্তিনী কিশোরকে ধরে নিয়ে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। আর হামাস তার গতানুগতিক ভাষায় রকেট ছুঁড়ে এর প্রতিবাদ জানায়। অঙ্গিকার করে কিশোর হত্যার প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু সেই রকেটে কেউ হতাহত না হলেও যুদ্ধ শুরুর জন্য সেই ম্যাচের শলাই-ই যথেষ্ট আর ডানপন্থি ইহুদীদের কাম্য ছিল। ডেনমার্কের ক্রিস্টলিত্ বাগব্লাদ পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি অ্যালান সোরেনসেন টুইটারে যে ছবি পোস্ট করেন, তার নিচে তিনি লেখেন, ‘সেদরত সিনেমা’। এর আগে ২০০৯ সালে গাজায় বিমান হামলা দেখে ইহুদীদের হাততালি আর হইহল্লার ভিডিও প্রতিবেদন দেখানো হয়েছিল ডেনমার্কের টিভি-টুতে। গত ১২ জুলাই এএফপি যে ছবি প্রকাশ করে তাতেও দেখা যায়, পাহাড় থেকে সেদরতের কয়েকজন বাসিন্দা উপভোগ করছেন বিমান হামলার তৃতীয় দিনের দৃশ্য। একই দিনে এপির ছবিতে এক সিনিয়র ইসরাইলীকে দেখা যায়, যিনি পায়ের উপর পা তুলে বিমান হামলা দেখার অপেক্ষায় আছে।