ইরাকে দর্জিদের ‘পৌষমাস’
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৬
কথায় বলে, কারো পৌষমাস কারো সর্বনাশ। অর্থাত্ একজনের জন্য যা শুভ সময় অন্যদের জন্য তা হতে পারে অশুভ। একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ইরাকে। সেখানে সুন্নি জঙ্গিদের হামলায় যখন রক্তস্নান করছে একের পর এক নগরী তখন সেখানকার দর্জিদের ব্যবসা চলছে রমরমা! ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়ও আমরা এতোটা ব্যস্ত ছিলাম না। বলছিলেন বাগদাদের ৬০ বছর বয়স্ক দর্জি আবু মোহাম্মদ। ৪৫ বছর ধরে সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম বানান তিনি। সাধারণত দিনে তিন-চারটি ইউনিফর্ম তৈরি করেন তিনি। সে জায়গায় এখন বানান পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশটি। পেশার আসল কাজ (গ্রাহকের দিয়ে যাওয়া কাপড় দিয়ে মাপ অনুযায়ী পোশাক তৈরি) বাদ দিয়ে তৈরি ইউনিফর্ম বিক্রি করছেন তিনি। গত ১০ জুলাই সুন্নি যোদ্ধাদের ইসলামিক স্টেট গ্রুপ (আগে পরিচিত ছিল আইএসআইএল নামে) উত্তরাঞ্চলীয় শহর মসুল দখলের পর থেকে আবু মোহাম্মদ সেনাবাহিনী ও পুলিশের ইউনিফর্ম প্রদর্শনীর জন্য রাখার সুযোগই পাচ্ছেন না। তার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার ফ্যাক্টরিটি অবস্থিত বাগদাদের জারামলি মার্কেটে। এখানকার একটি ফ্লোরে এমন বেশ কিছু ফ্যাক্টরি রয়েছে।
ইরাকের সর্বজ্যেষ্ঠ শিয়া নেতা আয়াতোল্লা আলি আল-সিসতানি সকল সমর্থ ইরাকিকে ইসলামিক স্টেট গ্রুপের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার আহবান জানানোর পর থেকেই আবু মোহাম্মদের বিক্রি বাড়ছে রকেটের গতিতে। হাজার হাজার লোক, বিশেষত শিয়া তরুণরা জাতীয় সেনাবাহিনী ও অনুগত মিলিশিয়াদের নিয়োগ কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবার জন্য নাম লেখাতে থাকায় দম ফেলারই যেনো ফুরসত পাচ্ছেন না আবু মোহাম্মদ। এদের সবারই ইউনিফর্ম প্রয়োজন। বর্তমান কর্মযজ্ঞকে শুধুমাত্র ব্যবসা মানতে নারাজ তিনি, ‘আমি এক অর্থে সিসতানির নির্দেশ পালন করছি। আমরা ইউনিফর্ম তৈরি করে না দিলে তরুণরা ইউনিফর্ম পাবে কোথায়।’ তবে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ছে। আগে একটি ইউনিফর্ম বিক্রি হতো ৪০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ দিনারে। এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে ৬০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ইরাকি মুদ্রায়। মোহাম্মদের কারখানার প্রতিদিনের দৈনিক আয় এখন সর্বোচ্চ ৯০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ইরাকি মুদ্রা।
ছয়জন কর্মচারীকে খাটানো আবু মোহাম্মদ জানান, তিনি তাঁর মজুরি মোটেও বাড়াননি। ইউনিফর্মের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে কাপড় ব্যবসায়ীরা। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে তারা কাপড়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ মজুদও করছে। উদাহরণস্বরূপ আগে যে প্রতি বর্গমিটার খাকি কাপড় বিক্রি হতো ৪ ডলারে, তার দাম এখন ১২ ডলার। আবু মোহাম্মদের আয় অনেক অনেক বেড়ে গেছে; কিন্তু কিছু সমস্যাও আছে। কিছু সশস্ত্র লোক কয়েকদিন আগে তাদের মার্কেটের ভেতরে বোমা পেতে রেখে গিয়েছিল দর্জির দোকানগুলো বন্ধ করে দিতে। তবে এসবকে দর্জিরা পাত্তা না দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে দিনরাত। বিভিন্ন সশস্ত্রবাহিনীর জন্য ইউনিফর্ম তৈরি করছে তারা— সেনাবাহিনীর জন্য মরুখাকি, পুলিশের জন্য নীল এবং বিশেষ ফোর্সের জন্য কালো। আবু মোহাম্মদ জানিয়েছেন, অফিসারদের কাছে পোশাক বিক্রির আগে তিনি তার পরিচয় ও পদবী জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু অন্যদের বেলায় তা করেন না। এ ব্যাপারে তিনি বলছিলেন, ‘আমরা জানি, এসব পোশাক মিলিশিয়াদের কাছে চলে যেতে পারে। আমরা সবাইকে তাদের বিস্তারিত জিজ্ঞেস করি না, এটি মিথ্যা নয়। তবে এটি ঠিকই জেনে নেই যে, সে কোন ইউনিটের, তার সাথে অন্য বিষয়গুলোও বোঝার চেষ্টা করি।’
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে নিরাপত্তা বিশ্লেষকের কাজ করা আদনান নামাহ সালমান নাম-পরিচয় না জেনে এভাবে বিভিন্ন বাহিনীর ইউনিফর্ম বিক্রি করাকে খুবই বিপজ্জনক মনে করছেন। ইরাকের স্পেশাল ফোর্সের সৈনিক হামজা আহমেদ ইউনিফর্মের ডেলিভারি নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন আবু মোহাম্মদের কারখানায়। তিনি জানান, হাজার হাজার নতুন রিক্রুট সেনাবাহিনীর মনোবল বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। ইউনিফর্ম কেনার বিষয়ে নতুনদের যারা তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছেন, সবাইকে তিনি আবু মোহাম্মদের কারখানার কথাই বলেছেন। তবে হামজা আহমেদ একটি বিস্ময়কর তথ্য জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছায় নাম লেখাতে এসেছেন, তারা প্রচণ্ড খাদ্য সমস্যায় ভুগছেন। কেউ কেউ কেবলমাত্র একটি রুটি খেয়ে সারাদিন বন্দুক চালানো শিখছেন। এভাবে তারা কতদিন চালিয়ে যেতে পারবে সে ব্যাপারে তিনি সন্দিহান। তাঁর ধারণা, অন্যদের মনোবল চাঙ্গা করতে এসে তাদের মনোবলই হয়তো একসময় ভেঙে যাবে।
আদনান নামাহ সালমানের তথ্যানুসারে, সাম্প্রতিক বোমা ও বন্দুক হামলাগুলোর বেশিরভাগই ঘটিয়েছে ইরাকি সেনাসদস্যের পোশাক পরা লোকজন। অবাধে ইউনিফর্ম বিক্রি হওয়াতে হয়তো সামনের দিনগুলোতে আল-কায়েদা ও মিলিশিয়াদের হামলার মাত্রা বেড়ে যাবে। এভাবে সেনাবাহিনীর পোশাক বিক্রি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তিনি। কেননা পোশাক পরা থাকলে কে আসল আর কে নকল তা বোঝা খুবই কঠিন। আবু মোহাম্মদের ব্যবসা রমরমা হলেও আরেক দর্জি হাজিম আল-শুয়াইলির দিনকাল মোটেই ভাল যাচ্ছে না। তিনি পতাকা বানিয়ে বিক্রি করেন। ইসলামিক স্টেট গ্রুপ মসুলের দিকে অগ্রসর হতে থাকার পরপরই বাগদাদে ইরাকের জাতীয় পতাকা বিক্রি কমে গেছে। শেষে পতাকাই না আবার কাল হয়ে দাঁড়ায়, এ ভয়ে অনেকেই বাড়িতে ইরাকের জাতীয় পতাকা টানাতে চাইছে না। বাগদাদে শিয়া ও সুন্নিরা বসবাস করলেও একপক্ষের উপর অন্যপক্ষ বিশ্বাস রাখতে পারছে না। অথচ কিছুদিন আগেও বিশাল বিশাল সব পতাকা কিনে নিয়ে যেত লোকজন। অনেকে মনে করছেন, বাগদাদের দিকেও বিরোধীরা অগ্রসর হতে পারে। কাজেই আগে থেকেই সতর্ক থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে খবর পাওয়া গেছে ইসলামিক স্টেটস গ্রুপ ও কুর্দিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে তাদের পতাকা বিক্রির পরিমাণ বেড়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পতাকা টানিয়ে রাখাটাকে তারা গৌরবের মনে করছে।