আজি হতে শতবর্ষ আগে..

১৯১৪ সালের ২৮ জুন। বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো শহরে গুলিতে নিহত হলেন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী সোফিয়া। তত্কালীন এক বসনীয় নাগরিকের গুলিতে ফার্দিনান্দের নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হলো বিশ্ব ইতিহাসের এক নৃশংসতম অধ্যায়ের। এই গুলোই ছিলো বিশ্বের ভয়াবহতম এক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের উত্সও। যা চলে টানা চার বছর। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে সংঘটিত হয় এই সংঘাত ইতিহাসে স্থান পেয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে। অস্ট্রিয়া এ হত্যাকাণ্ডের জন্য তত্কালীন সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধে দুই দেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে সূচনা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের। তবে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ হত্যাকাণ্ডই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল না। উনিশ শতকে শিল্প বিপ্লবের কারণে সহজে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতা আর আগের দ্বন্দ্ব-সংঘাতও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ ছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একপক্ষে ছিল অস্ট্রিয়া, জার্মানি, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া। যাদের বলা হতো কেন্দ্রীয় শক্তি। আর অপরপক্ষে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেনে, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি ও আমেরিকা। যাদের বলা হতো মিত্রশক্তি। অস্ট্রিয়ার হামলার মধ্য দিয়ে ঐ বছরের ২৮ জুলাই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত হয়। শেষ হয় তারও চার বছর পর ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর। সেই হিসাবে এই ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের শতবর্ষ পূর্তি হবে আগামী সপ্তাহের ২৮ জুলাই। বিশ্বের অনেক দেশ শতবর্ষ পূর্তি পালনের পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জার্মান, রাশিয়ান, অটোমান এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে নতুন কয়েকটি দেশের জন্ম হয়। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এ যুদ্ধকে ইউরোপের যুদ্ধ বলা হতো। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজারের মতো সেনার মৃত্যু হয়েছিলো। সব মিলিয়ে ৯০ লাখের বেশি যোদ্ধা নিহত হয়েছিলো ঐ যুদ্ধে। বেসামরিক মানুষ ধরলে এতে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ লোক মারা গিয়েছিলো। আহত হয়েছিলো আরো ২ কোটি ১০ লাখ লোক। যে কারণে ইতিহাসের অন্যতম হত্যাযঞ্জের যুদ্ধও বলা হয় একে। এই যুদ্ধে বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিগুলো দুটি জোটে বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯১৭ সালের ৪ নভেম্বরে অস্টো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়। পরে জার্মানিও সম্মত হলে মিত্র শক্তির জয় হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধের পর এ ধরনের সংঘাত এড়াতে লীগ অব নেশনস গঠিত হয়। যদিও ঐ উদ্যোগ ব্যর্থ হয় আর বিশ্ব দেখে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। কেন আমরা একশো বছর পর এই যুদ্ধের কথা মনে করবো? কারণ এই যুদ্ধ ইউরোপ আমেরিকা তথা সারা বিশ্বের মানুষকে প্রভাবিত করেছিলো। প্রায় প্রতিটি মানুষের জীবনকে এই যুদ্ধ ছুঁয়ে গিয়েছিলো। ইউরোপের অনেক শিশুরা বেড়ে উঠেছিলো যুদ্ধের ছায়ায়। যেখানে তাদের বাবা হয় হারিয়ে গিয়েছিলো নয়তো চলে গিয়েছিলো না ফেরার দেশে। বিশ্বকে বিভীষিকাময় করে তোলা যুদ্ধের সমাপ্তির পর গত একশো বছরে ইউরোপে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সংঘাত বিভেদ ভুলে সম্প্রীতির পথে এগিয়েছে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের মাধ্যমে তারা সম্প্রীতির নজির স্থাপন করেছে। সারায়েভোর যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আততায়ী অস্ট্রিয়ার যুবরাজকে খুন করেছিলো সেই জায়গাটিকে বলা হয় ‘গাভরিলোস ফুটপ্রিন্ট’। জায়গাটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্পট এখন। এই জায়গা থেকে ঐদিন গাভরিলো প্রিনচিপ গুলি চালিয়েছিলেন। ঐ যুবককে অনেকে বলে থাকেন জাতীয়তাবাদী আবার অনেকে বলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী। যে কিনা নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনগণের স্বাধীনতার দাবি তুলেছিলেন। যুগোস্লাভিয়ার ইতিহাসের বইতে বলা হয়ে থাকে বসনিয়ার এই যুবক বিপ্লবী সংগঠনের সদস্য ছিলেন। যে কিনা বিদেশি দখলদারিত্ব থেকে দেশকে স্বাধীন করার পক্ষে ছিলেন। উল্লেখ্য, ১৮৭৮ সালে বার্লিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বসনিয়া অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তাই গাভরিলোকে তারা দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে মনে করে। তবে এখন অনেকেই মনে করে গাভরিলো সহিংসতার এক ক্ষমাহীন কাজ করেছিলেন। সারায়েভোর ঘটনা একজনকে সন্ত্রাসী যেমন বলে তেমনি স্বাধীনতার যোদ্ধাও বলে। মূলত এটা নির্ভর করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক দোষীসাব্যস্তকরণের উপর। একশো বছর পর বিশ্ব আবার স্মরণ করতে যাচ্ছে সেই বিভীষিকাময় যুদ্ধকে। গাভরিলো কে ছিলেন সেটা এখন আর বিবেচ্য নয়। তবে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থের কারণে ঐ যুদ্ধ হয়েছিলো তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সাম্রাজ্যবাদ আর সম্প্রসারণবাদ যতদিন থাকছে ততদিন বিশ্ব কি আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের সম্ভবনা থেকে মুক্ত?