মেধাবী মুখ

আমার ইচ্ছা পূরণ হলো

১ জানুয়ারি, ১৯৯৯। আমি Assembly of God Charch (এজি চার্চ) এ কেজি ওয়ান এ ভর্তি হই। স্কুলের নিবন্ধন খাতায় আমার নাম লেখা হলো অম্লান সিংহ। কিন্তু আমার বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন সকলেই আমাকে অন্তু্তু বলে ডাকে। দু্ অক্ষরের এ নামটিই মধ্যেই আমি আমার অবয়ব পরিবর্তন করতে থাকি। এ স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে অমি আমার মায়ের কাছে থেকে বাংলা ও ইংরেজি বর্নমালাগুলোর সাথে বেশ কিছু বাংলা ও ইংরেজি ছড়া শিখেছিলাম। Twinkle, twinkle, little star, How I wonder what you are.- এ ছড়াটি আজও মনে পরে। ১ জুন, ২০০৩ এ সান্নিডেল (Sunnydale) স্কুলে ক্লাস টু এ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে এজি চার্চ স্কুুলে আর পড়া হলো না। কিছুদিনের মধ্যেই বেশ কয়েক জন বন্ধু পেয়ে যাই। আমার বন্ধুদের মধ্যে দেবপ্রিয় বিশ্বাস, ফয়সাল, রাশিক, ইমরান রাশিক অন্যতম। শুরু হলো নতুন আর একটি স্কুল জীবন। ক্লাসে বসে কথা বলার সুযোগ না থাকলেও মোবাইল ফোনের বিলটা মা ই পরিশোধ করে দিত। বাবা (অরুন কুমার সিংহ) বিভিন্ন স্থানে সরকারী দায়িত্ব পালনের কারনে। মা-ই ছিল আমার একমাত্র বন্ধু। পড়াশুনার বাইরে স্নেহ, ভালোবাসা, রাগ, অভিমান যা কিছু ছিল সবকিছুই মায়ের উপর। সান্নিডেলে ক্লাস টু থেকে কিভাবে যে “ও” লোভেল ক্লাস পর্যন্ত এস গেলাম একেবারেই বুঝতে পারলাম না। শুধু ক্লাস আর ক্লাস, পড়া আর পড়া — এই নিয়েই দিন চলে যেত, সপ্তাহ চলে যেত, মাস চলে যেত, বছর আসত। প্রতিটি ক্লাসেই রেকর্ড পরিমাণ নম্বর অর্জন আমার জীবনে একটি নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ নেশার স্বাদ যেন ভিন্ন, অমৃত সুধার জন্য ছুটাছুটি। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আমার কাছে একটা একটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা। আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে উঠি, তখন আমার হোয়াইট বোর্ডে লিখে রেখে ছিলাম- এবারের যাত্রা হার্বাড বিশ্ববিদ্যালয়ে। জীবনের লক্ষ্য -এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। উত্সাহ ও উদ্দীপনার মোটেই কমতি নেই। সূর্যমামা উঠে, বিকেলে অস্ত যায়, সে দিকে আমার ভ্রুক্ষেপ নেই। এ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে “ও” লেভেল পরীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত কখনো বা প্রথম, কখনো বা দ্বিতীয় এই দুয়ের মধ্যেই আমাকে খুশি থাকতে হতো। এ ভাবেই কেটে গেল জুন ২০১২ পর্যন্ত। “ও” লেভেল পরীক্ষা দিলাম, পরীক্ষার ফলাফল বেড় হলে। সকল বিষয়েই স্টার পেয়ে বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করি। আমার আনন্দ আর ধরে না, এ যেন সুদীর্ঘ ১৩টি বছরের পুঞ্জিভূত কষ্ট, আনন্দ ও উল্লাস। এ দিনটি ছিল জন্য আনন্দমুখরিত একটি দিন। শুরু হলো আর একটি নতুন শ্রেণি -এস লেবেল। এ শ্রেণির প্রথম বছরের চারটি বিষয়ের মধ্যে চারটিতে স্টার অর্জন করি। দ্বিতীয় বছরের পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র। আমার এ সাফল্যের পিছনে ছিল, যত কষ্টই না হোক প্রতিদেনের পড়া প্রতিদিন শেখা, টিউটরদের উপদেশ সর্বদা মেনে চলা, নিয়মিত ক্লাস অনুসরণ করা এবং বাড়ির কাজগুলো শেষ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। এ ছাড়াও সময়ের সঠিক ব্যবহার, একাগ্রতা, আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য্য, অধ্যবাসায়, প্রচেষ্টা ও আমার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম যোগ করেছিল আমার এ ধরনের সাফল্য অর্জনে আরেকটি নতুন মাত্রা। বন্ধুদের সাথে নিজের জন্মদিনটি পালনও কখনো কখনো আমার কাছে সময় নষ্ট বলে মনে হত। প্রতিটি বিষয়ের কারণ অনুসন্ধান ছিল আমার পড়াশুনার একটি মৌলিক বিষয়। যে কারণে স্মৃতিপটে অধ্যায়গুলো আজও অম্লান হয়ে আছে। দ্বিতীয়টি ছিল আমার প্রচেষ্টা, যেখানে সময় ব্যবস্থাপনাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছিল। তৃতীয়টি ছিল পৃথিবীর এ অফুরন্ত তথ্য ভান্ডারে নিজকে সংশ্লিষ্ট করার ক্ষেত্রে সময়ের স্বল্পতা- এ বিষয়টি অনুধাবন করা। “ও” লেবেল অতিবাহিত করার পরপরই ইন্টারনটের মাধ্যমে যুুক্তরাস্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ খুঁজতে ছিলাম। এটাও ছিল আমার পরিকল্পনার একটি অংশ। কলোনেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (Cornell University ) আন্ডার গ্রাজুয়েট কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করলাম। সেদিন থেকে ঘুম আর আসে না। ইন্টারনেট খুলে হঠাত্ একদিন আমার নামটা দেখে চিত্কার দিয়ে বলি- বাবা ও মা তোমরা দেখে যাও “ আমার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে, আমার বিদেশে পড়াশুনার জন্য তোমাদের আর অর্থ ব্যয় করতে হবে না। আমেরিকার কলোনেল বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে পরিপূর্ণ বৃত্তি প্রদান করে পড়াশুনা করার সমস্ত সুযোগ দিয়েছে। আমার রুটি বানানো ও রান্ন করা শেখা স্বার্থক হয়েছে”। তোমরা আমাকে আর্শিবাদ করো, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো আমি যেন আমার ইচ্ছা পূরণই করে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে তোমাদের কাছে ফিরে আসতে পারি।