শিশুর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় মায়ের ভূমিকা

দেবাশীষ হালদার সহযোগী অধ্যাপক (বাংলা) সরকারি বি.এম কলেজ, বরিশাল “শিশুরা বড়দের ক্ষুদ্রতর সংস্করণ মাত্র।”— অতীত গ্রিক ও রোমান সমাজে শিশু সম্পর্কে এটিই ছিল প্রচলিত ভাবধারা। শিশুদের কঠোর শাসনের মধ্যে রাখা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে এ ধারণা পাল্টাতে শুরু করে। শিশুমন সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক ‘সাদা কাগজের মতো’ বলে সহজেই পরিবেশের ছাপ পড়তে থাকে। আর সেভাবেই শিশুর ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। একজন প্রখ্যাত শিশু মনোবিজ্ঞানীর অভিমত— শিশুকে জানা, শিশুমনকে জানা এবং শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর কাছে মা তার আনন্দের উত্স। মাতৃক্রোড় শিশুর নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করে। অতি শৈশবকাল হতেই মায়ের মমতা শিশুমনে গভীর প্রত্যয় তৈরি করে। শৈশবে মায়ের অনুপস্থিতি অবহেলা শিশুর মানসিক বিকাশকে ব্যাহত করে। শিশু আত্মবিশ্বাস হারাতে থাকে। তাই মা-কে শিশুর প্রতি শৈশব থেকেই যত্নশীল হতে হবে। শিশুর প্রথম পাঠ শুরু হয় পরিবারে এবং তা মায়ের কাছে। মা যদি স্বশিক্ষিত হন তাহলে শিশু আদর্শ সন্তানরূপে গড়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। শিশুর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মাকে যেসব দায়িত্ব নিতে হবে, তা হলো— * শিশুর দেহ-মনের পূর্ণ বিকাশের জন্য আনন্দ, ভালোবাসা ও সমঝোতাপূর্ণ পরিবেশে তাকে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। * পরিবারে ধর্মীয় রীতিনীতি, নৈতিকতা, সততা এসব বিষয় শেখাতে হবে, সাথে সাথে পরিবারের সকলকেই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। * শিশুকে অবশ্যই জীবনের সম্ভাব্য সর্বোত্তম চাহিদা পূরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। * শিশুর সফলতার প্রশংসা করতে হবে।এতে তার মধ্যে ইতিবাচক আত্মবোধের সূচনা হবে। * অন্যদিকে শিশুর অকৃতকার্যতার বিষয়গুলো বড় করে তুলে ধরলে শিশু হীনমন্যতায় ভুগবে। তাই মাকে পিছিয়ে পড়া শিশুর সাথে অধিক ঘনিষ্ট হতে হবে। তাকে আশ্বাস দিয়ে সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। * পরিবারে ছোটরা বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ছোটদের প্রতি বড়রা আন্তরিক হলে — তা থেকেই শিশুরা এসব গুণাবলি অর্জন করবে। মাকে এ বিষয়ে সজাগ হতে হবে। * মা হবেন সহনশীল, সত্ ও নীতিনিষ্ঠ। মায়ের এই আচরণের প্রভাব পড়বে শিশুর ওপর । * শিশুর আগ্রহ, মেধা ও ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত না হয়ে শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। আবার মা-বাবার প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হলে শিশুকে অনেক সময় গালমন্দ বা তিরস্কার করা হয়। এতে শিশুমনে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। “তোমার দ্বারা কিছু হবে না” এমন নেতিবাচক বাক্যও শিশুর জন্য ক্ষতিকর। * শিশুর মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য উপদেশমূলক ও শিক্ষামূলক গল্প -ছড়া শোনানো যেতে পারে। ছড়া- গান প্রভৃতির মধ্য দিয়ে মা-ই পারেন শিশুর কোমলমনে ইতিহাস-ঐতিহ্যের লালন ঘটাতে। এক কথায় মা শিশুর অন্তরঙ্গ বন্ধু বলেই মা-ই পারেন শিশুর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে। মা হচ্ছেন সন্তানের পারিবারিক প্রথম শিক্ষক। প্রাক-প্রাথমিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক যেকোনো শিক্ষার ক্ষেত্রে মায়ের অগ্রণী ভূমিকা অনস্বীকার্য।