কুতুবদিয়ায় জোয়ারে ভেসে গেছে অসহায় মানুষের শেষ সম্বল

‘পাঁচদিন আগে পূর্ণিমার জোয়ারের পানি সব শেষ করে দিয়ে গেছে। ঘরে এক মুঠো চালও নেই, নেই চুলাও। এখন স্ত্রী, চার ছেলে মেয়ে নিয়ে অনাহারে কাটাচ্ছি। মাথা গোঁজার যে ঘরটি ছিল তাও পানিতে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এখন ঘরের ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই নেই’। কথাগুলো বললেন কুতুবদিয়ার ধুরুং এলাকার আব্দুল জব্বার নামের এক দিনমজুর। শুধু জব্বার নন, তারই মত কুতুবদিয়া উপজেলার শুধু উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের পূর্ব চরপাড়া, নয়াকাটা, পশ্চিম চর ধুরুং, মনসুর আলী হাজিরপাড়া, কায়সার পাড়াসহ দশ গ্রামের অন্তত পাঁচশ বসতঘর জোয়ারের পানিতে সম্পূর্ণ মাটিতে মিশে গেছে। মাটির তৈরি এসব ঘরের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ঘরের বাসিন্দারা এখন বসবাস করছে খোলা আকাশের নিচে। এছাড়া আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো প্রায় এক হাজার পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ, চরম মানবিক বিপর্যয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খোলা আকাশের নিচে পাঁচদিন ধরে অনাহারে কষ্ট পেলেও পাশের এক চেয়ারম্যানের দেয়া তিনশ টাকা ছাড়া আর কোনো ধরনের সহায়তা মেলেনি। সরকারের পক্ষ থেকেও একমুঠো চাল পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে সাগরের পানি অস্বাভাবিকভাবে জোয়ারে পরিণত হওয়ায় কুতুবদিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে উত্তর ধুরুং, আলী আকবর ডেইল, কৈয়ার বিল, লেমশী খালী ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। এসব গ্রামের অন্তত দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানি নেমে গেলেও এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে চলছে কোনরকমে বেঁচে থাকার যুদ্ধ। সাগরের জোয়ারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের বাসিন্দারা। এ ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই চলছে হাহাকার, চলছে মানবিক বিপর্যয়। ঘরবাড়ি প্রায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হওয়ায় বেশিরভাগ মানুষ ভিটেবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে নেমেছে জীবনযুদ্ধে। এক গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর শুক্কুর জানান, জোয়ারে সম্পূর্ণ ধসে গেছে তার বাড়িও। এখন ক্ষতিগ্রস্ত ঘরটিকে জোড়াতালি দিয়ে কোনরকমে বসবাসের উপযুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। চারদিন ধরে অনাহারে আছেন জানিয়ে আব্দুর শুক্কুর বলেন, কোনো টাকা পয়সা হাতে নেই। তাই সকলেই অনাহারে আছি। কিন্তু অন্তত রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থাতো করতে হবে। একই গ্রামের নেছারুল ইসলাম বললেন, বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে হঠাত্ পানি ঢুকে যাওয়ায় ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারেননি তিনি। ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোনরকমে প্রাণে বাঁচলেও চারদিন ধরে মুখে খাবার নেই। কিন্তু যাব কোথায়? অন্তত বৃষ্টি থেকে একটু যাতে রক্ষা পাই এই জন্য ছাউনি দিচ্ছি। কুতুবদিয়া বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আসম শাহরিয়ার চৌধুরী ও উপকূলীয় উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আকবর খান জানান, গত কয়েকদিন আগের জোয়ারে দ্বীপের মোট ৩৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ১০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ এবং আট কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া উত্তর ধুরুং ইউনিয়নে ১৩ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে সাত কিলোমিটার বাঁধ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের নয়াকাটা থেকে আকবরবলীর ঘাট পর্যন্ত তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হলেও ঠিকাদারের কাজের ধীরগতির কারণে যথাসময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় এ বিপর্যয় নেমেছে। এছাড়াও নিম্নমানের কাজের কারণে যা হয়েছে তাও পানিতে ভেসে গেছে বলে তারা অভিযোগ করেন। কুতুবদিয়ায় বেশিরভাগই মাটির তৈরি ঘর। জোয়ারের উচ্চতা অন্যান্যবারের চেয়ে এবার বেশি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে বেশি। কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক পরিবারকে দশ কেজি করে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে। যাদের বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে, এরকম ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।