ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা :বাতিল হচ্ছে পাঁচ সচিবের সনদ

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত ৫ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ জাল অভিযোগে বাতিল হতে পারে। আর এটি হলে এসব সচিব চাকরি হারাবেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে চাকরিকালে যে বাড়তি সুবিধা নিয়েছেন তা-ও তাদের সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে। একইসঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন তারা। এদিকে গতকাল উপ-সচিবসহ ৩৫ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, সচিবদের মধ্যে পাঁচ জনের সনদ যে জাল সে সম্পর্কে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হাইকমাণ্ডের সিদ্ধান্ত পেলেই ওই পাঁচ সচিবের সনদ বাতিল করা হবে। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের শত শত অভিযোগ রয়েছে। এর সবই জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এবং জেলা প্রশাসন তদন্ত করছে। সচিবদের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে। মন্ত্রী বলেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে সনদ যাচাই-বাছাই করার জন্য মন্ত্রণালয়ে অনুরোধপত্র আসে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দেয়া হয়। এভাবে অন্তত ১১৬ জনের সনদ সঠিক নয় বলে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল সোমবার বাতিল করা হয়েছে ৩৫ জনের সনদ। জাতীয় গোয়েন্দা পরিদফতর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৩০ জন ও জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুই জনের সনদ বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া দু’জনের বয়স উপযুক্ত না হওয়ায় ও একজনের একসঙ্গে দু’টি সনদ থাকায় সনদ বাতিল করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, মক্তিযোদ্ধা সনদ বিতরণে বরাবরই নানা অভিযোগ থাকলেও বিষয়টি রাজনৈতিক কারণে তেমন গুরুত্ব পায়নি। ২০০১ সালে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা যেখানে ১ লাখ ৫৬ হাজারের মতো ছিল, সেখানে চলতি বছরের গত জুন পর্যন্ত তা এসে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯ হাজারে। মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত নাম, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টে সংরক্ষিত ভারতে প্রশিক্ষণগ্রহণকারীদের নামের তালিকা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সই করা সনদ- মূলত এই তিনটি বিষয়কে মানদণ্ড ধরে এখন মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাই-বাছাই চলছে বলে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. সলিমুল্লাহ জানান। যে ৩৫ জনের সনদ বাতিল: গতকাল যাদের সনদ বাতিল করা হয়েছে, তারা হলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) উপসচিব শেখ আলাউদ্দিন, মোহাম্মদ আলী, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান সহকারী মো. শফিয়ার রহমান, মো. আব্দুল ওয়ারেছ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন টাঙ্গাইলের মো. আব্দুল হালিম, বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের সর্দার আজহার আলী খান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন টাঙ্গাইল জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কপিস্ট কাম বেঞ্চ সহকারী আ ন ম বজলুর রশীদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক এটিএম শাজাহান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এমএলএসএস মো. দানেশ মিয়া, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সিরাজগঞ্জের কৃষি সমপ্রসারণ কর্মকর্তা মো. আব্বাস আলী খান, পিআরএল ভোগরত ঢাকা উত্তরের কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের রাজস্ব কর্মকর্তা শেখ মাহবুবুল আলম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান শিক্ষক রনজিত্ কুমার রায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন অডিটর মো. শফিকুল হক, ফরিদপুরের গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. রওশন আলম, মো. আবু হোসেন মিয়া, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নওগাঁ পৌরসভার কর আদায়কারী একেএম জালাল উদ্দীন, একই পৌরসভার স্বাস্থ্য সহকারী মো. হাসেম আলী, ময়মনসিংহ ঘুঘুরার চালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান, বড় জয়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক একেএম হাবিবুল্লাহ, চলতি দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) মো. সোলায়মান চৌধুরী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বীজ বিভাগের উপ-পরিচালক আবদুর রশিদ হাওলাদার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মী মো. জয়নাল আবেদীন, কে এ নিজাহার উদ্দীন, কর অঞ্চল-২ এর কর পরিদর্শক মো. দেলোয়ার হোসেন, চাঁদপুরের টিএসআই মো. নুরুন্নবী পাটোয়ারী, যমুনা ওয়েল কোম্পানির সাবেক ম্যানেজার মো. গোলাম রব মোল্লা, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা শিক্ষা অফিসের মো. আবুল হোসেন, সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার এটিএম আব্দুল হাই খান ও পুলিশের বেতার বিভাগের মো. সোলায়মান বিশ্বাস। এছাড়া জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. হারুন অর রশীদ খান ও মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী মো. শাহযাদ আযীমের সনদ বাতিল করা হয়েছে। দু’টি সনদ থাকায় এমএ মজিদের সনদ বাতিল হয়েছে। বয়স উপযুক্ত না হওয়ায় মো. বেলাল হোসেন আকন্দ ও মো. আব্দুল মালেকের সনদ বাতিল করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল গঠন: প্রায় ৮ মাস পর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক পদাধিকার বলে এর চেয়ারম্যান। সদস্যরা হলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এমপি, মোতাহের হোসেন এমপি, সাবেক সচিব রশিদুল আলম, সাধন মজুমদার এমপি ও মেজর (অব.) ওয়াকারুজ্জামান। সদস্যদের মেয়াদ তিন বছর। দুদকে যাননি পিএসসি সচিব:এদিকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ জালিয়াতির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) গতকাল সোমবার দুদক কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাতের কথা থাকলেও সাক্ষাত্ করেননি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সচিব একেএম আমির হোসেন। তিনি আগামী ২৩ জুলাই হাজির হয়ে দুদকে লিখিত বক্তব্য জমা দিবেন বলে আবেদন করেছেন। উল্লেখ্য, সচিব একেএম আমির হোসেনের সার্টিফিকেটের জন্ম তারিখ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। এতো অল্প বয়সে কিভাবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে গেলেন? আর যদি গিয়েই থাকেন তাহলে কেনই বা চাকরি জীবনের শুরুতে উল্লেখ করলেন না? এ ব্যাপারে জানতেই দুদক তাকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। দুদকের একটি সূত্র জানায়, আমির হোসেন ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল কাসেম তালুকদার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সচিব কেএইচ মাসুদ সিদ্দিকী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ও বর্তমান বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, স্বাস্থ্য সচিব নিয়াজউদ্দিন মিঞা এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। গত ১৫ ও ১৬ জুলাই এ ছয় জনের মধ্যে পাঁচ জনের বক্তব্য নেয় দুদকের উপ-পরিচালক জুলফিকার আলী। অভিযোগ রয়েছে, চাকরির শেষ সময়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সনদ গ্রহণ করেন সরকারের এই শীর্ষ পর্যায়ের আমলারা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও অতিরিক্ত এক বছর চাকরি করার উদ্দেশ্যে তারা এ সনদ সংগ্রহ করেন। অথচ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে বলা আছে, কেউ মুক্তিযোদ্ধা হলে চাকরিতে যোগদানের সময়ই এ বিষয়ে তাকে ঘোষণা দিতে হবে। পরে বললে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হবে না।