পূর্ণিমার জোয়ারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৪, ২৩:০৯
সাম্প্রতিক পূর্ণিমার জোয়ারে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভেড়িবাঁধে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, চিংড়ি ঘের বিনষ্ট হয়েছে। অসহায় সাধারণ মানুষের অতি সামান্য সহায়-সম্বল বলতে যা ছিল তা-ও ভেসে গেছে। তাদের পাশে দাঁড়ায়নি, সরকার বা বেসরকারি কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান।
আসাদুজ্জামান, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদীর ভেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কিছু কিছু স্থান সংস্কার করার চেষ্টা করা হলেও আতঙ্ক কাটছে না চার ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের। সংস্কার না করা হলে ভরা বর্ষা মৌসুমে বাধ ভেঙ্গে ভেসে যেতে পারে খাজরা, আনুলিয়া, প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়নের ৩০ হাজার পরিবার। তলিয়ে যেতে পারে কয়েক হাজার হেক্টর চিংড়ি ঘের ও ফসলী জমি।
সরেজমিনে দেখা যায়, আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছট, নয়াখালি, মনিপুর, নাংলা, পাইকপাড়া, একসরা, কাকবাশিয়া এলাকায় খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদীর মোট ২০ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ রয়েছে। যার অধিকাংশ ভেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া প্রতাপনগর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের ১৭টি গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামের মধ্যে নাকনা, হরিশখালি, কুড়িকাউনিয়া, সনাতনকাটি, চাকলা, রুইয়ারবিল, সুভদ্রকাটি, প্রতাপনগর, হিজলা, কোলা, শ্রীপুর, কল্যাণপুর, গফুর নগর ও শিরশা গ্রাম ঘেসে প্রায় ৩০ কিলোমিটার খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদীর ভেড়িবাঁধ রয়েছে। এসব ভেড়িবাঁধে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও আবার নদীগর্ভে চলে গেছে বাঁধের অর্থেক রাস্তা।
আনুলিয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জিয়ারুল ইসলাম ও বিছট গ্রামের নজরুল ইসলাম মোড়ল জানান, বাঁধভাঙ্গা পানিতে যেকোন সময় তলিয়ে যেতে পারে তাদের বসতবাড়িসহ ফসলী ক্ষেত, পুকুর আর চিংড়ি ঘের। এ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বিধ্বস্ত ভেড়িবাঁধ সংলগ্ন চারটি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের মধ্যে। রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি না। যে কোন সময় বাঁধ ভেঙ্গে যেতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলে অভিযোগ করেন তারা। আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর আলম লিটন জানান, এ ইউনিয়ন সংলগ্ন প্রায় ২০ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। যার মধ্যে বিছট, নয়াখালি, মনিপুর, নাংলা, পাইকপাড়া, একশরা ও কাকবাশিয়া এলাকার ভেড়িবাঁধ বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যে কোন সময় এই ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে আনুলিয়া খাজরা, বড়দল, শ্রীউলা ও প্রতাপনগর এই ইউনিয়েনগুলো প্লাবিত হতে পারে। এসব ইউনিয়নবাসীর রাত কাটছে আতঙ্কে।
তিনি বলেন, সমপ্রতি ভেড়িবাঁধের অবস্থা খারাপ দেখে প্রতিদিন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক কাজ করছে। সবে বর্ষা শুরু হয়েছে, গোন শুরু হলে হয়ত এসব ভেড়িবাঁধ ধরে রাখা যাবে না। যে কোন সময়ে ভেঙ্গে এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে যাবে এমনটি আশঙ্কা করছি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দুই মাস আগে খোলপেটুয়া নদীর হিজলা, কোলা, সুভদ্রকাটি ও চাকলা ভেড়িবাঁধে ভাঙ্গন দেখা দেয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে ভাঙ্গন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রাথমিকভাবে যখন ভেড়িবাঁধ ভাঙ্গন শুরু হয়, সে সময় দ্রুত ব্যবস্থা নিলে বাঁধ এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতো না- এমন অনুযোগ এলাকাবাসীর। গত এক সপ্তাহ বর্ষায় নদীতে জোয়ার বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবল স্রোত ও সে সঙ্গে বাতাসে ঢেউ বইছে। ফলে ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করছে। ৩টি স্থানে কমপক্ষে ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এদিকে শ্রীউলা ইউপি চেয়ারম্যান আবু হেনা শাকিল বলেন, আমার ইউনিয়নে হাজরাখালী এলাকায় ভেড়িবাঁধগুলো ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বার বার বলা হলেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাছাড়া ঘোলা এলাকাটি আমার মধ্যে না হলেও সেখানে ভাঙ্গলে আমার ইউনিয়ন প্লাবিত হবে। তাই সে স্থানেও আমি দেখাশুনা করছি। প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে যখন খোলপেটুয়া নদীর ওই ৩টি স্থানে ভাঙ্গন দেখা দেয় সেই সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ না আসার অজুহাত দেখিয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
রফিক উদ্দিন বাবুল, উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা, গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণে সীমান্তের নাফ নদীর ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে উখিয়ার অর্ধশতাধিক চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়ে ১০ কোটি টাকার উপরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাদৃকাটা এলাকায় নির্মাণাধীন ব্রিজের ডায়ভারশন সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম মাহফুজুর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সড়ক উন্নয়নের কাজ শুরু করলেও উভয় পার্শ্বে শত শত যানবাহন আটক পড়তে দেখা গেছে। কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে প্রায় অর্ধ-শতাধিক ঝুপড়ি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ায় ওই সব রোহিঙ্গারা আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। উপজেলার নিম্নাঞ্চলসমূহের প্রায় ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার মানুষকে পানিবন্দি হয়ে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ বিপর্যস্ত হওয়ার কারণে মানুষ ঘর ছেড়ে বের হতে পারছে না।
কোটবাজার সাদৃকাটা এলাকায় নির্মাণাধীন ব্রিজের ডাইভারশন সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রবল বৃষ্টিপাতে শ’ শ’ যাত্রীকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূরে-ই আলম জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অব্যাহত ভারি বর্ষণ ও জোয়ারের পানিবৃদ্ধি পেয়ে উপকূলীয় এলাকার মনখালী, চোয়াংখালী, ছেপটখালী, মাদারবনিয়া, চৌধুরীপাড়া, ক্লাশপাড়া, সাবেক রুমখা, সাদৃকাটা, রাজাপালং ভালুকিয়া, খেওয়াছড়িসহ ১৫টির মত গ্রাম প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাহাড়ী ঢলের পানির স্রোতে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের তালিকা করা হচ্ছে।
চরফ্যাশনের দুর্গতদের অর্থ সহায়তা প্রদান
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, চরফ্যাশনে জোয়ারে দুর্গত ৬শ’ পরিবারের মধ্যে এক হাজার টাকা করে ৬ লাখ টাকা বিতরণ করেছেন পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সহধর্মিনী নিলীমা জ্যাকব। গত রবি ও সোমবার মাদ্রাজ, আসলামপুর, হাজারীগঞ্জ এবং জাহানপুরের দুর্গত মানুষের মধ্যে উপমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এসব টাকা বিতরণ করেন তিনি। সরকারি ত্রাণ থেকে দুর্গতদের জন্য বরাদ্দকৃত ৪০ টন চাল গতকাল সোমবার চর মাদ্রাজ এবং হাজারীগঞ্জের দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে।