আসল ঈদ

ফুলির মা আজও কাজে আসেনি। ফুলির খুব জ্বর। রাগে গজ গজ করতে করতে নিজেই ঘরের কাজে হাত লাগিয়ে সমানে বক বক করতে থাকে জিনিয়া হাসান। একমাত্র মেয়ে টুনি; মায়ের মেজাজে চুপসে গেছে। মাকে খুব ভয় পায় সে। ভয়ে ভয়ে পড়তে বসে যায়। যদিও সাধারণত এই সময়ে  কখনো পড়ে না। বাবা আবিদ হাসান ফিরে আসবে সন্ধ্যায়, বাবা না আসা পর্যন্ত মায়ের বকাবকি থামবে না।

টুনি ফুলিকে দেখেছে কয়েকবার। আগে ওর মা ওকে নিয়ে আসত। কিন্তু টুনির মা এ নিয়ে একদিন খুব রাগারাগি করেছে। তারপর আর কখনো ফুলিকে দেখেনি টুনি। তবে একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দূর থেকে ফুলিকে রোদের মধ্যে কাগজ কুড়াতে দেখেছিল। খুব মন খারাপ হয়েছিল সেদিন। ওদের এত কষ্ট কেন? নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছিল টুনি। কিন্তু তার উত্তর সে আজও পায়নি।

বাবা ফিরে এল সন্ধ্যার পর। ঈদের বাজার করে ফিরতে দেরি হয়েছে। কতকিছু যে কিনে এনেছে বাবা! মায়ের শাড়ি, টুনির জন্যে ঝলমলে পরিদের মতো একটা ড্রেস, আরো কত কী। তবু মন খারাপ টুনির। বাবার চোখে তাকিয়ে বলে—

‘ফুলিদের জন্যে কিছু আনোনি বাবা?’

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের দিকে তাকায়। মা উত্তর দেয়—

‘মাসে মাসে অতগুলো টাকা গুনছি। তিনবেলা খাচ্ছে, নিয়ে যাচ্ছে, এই তো অনেক। কাজ তো করে ওইটুকু। তা-ও একদিন আসে, দুই দিন আসে না।’

মা-র ওপর খুব রাগ হয় টুনির। বাবার ওপরেও অভিমান বাড়ে। কারোর সঙ্গে কথা না বলে সোজা রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে। মা আবার চেঁচামেচি শুরু করে দেয়—

‘অতটুকু মেয়ের অত তেজ কেন শুনি? এইসব হয়েছে বাবার আস্কারা পেয়ে। আর পারিনে বাপু! যত যন্ত্রণা সব আমার!...’

 

ঈদের দিন সকাল থেকেই টুনি নিখোঁজ। সম্ভাব্য সব জায়গাতে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোথাও নেই মেয়েটা। অতটুকু মেয়ে একলা কোথায় যাবে?

খবর পেয়ে দাদুভাই ছুটে এসেছে। অন্যরাও ব্যতিব্যস্ত। খুঁজতে খুঁজতে কেটে গেল সমস্ত দুপুর। বিকেলে টুনিকে পাওয়া গেল পুরনো ব্রিজের ওপর। সঙ্গে ফুলি। ফুলির গায়ে টুনির ঝলমলে সেই ঈদের জামা। আর টুনি পরেছে তার অনেক পুরনো ছেঁড়া একটা ড্রেস। মেয়েকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে বাবা-মা। টুনি বলে—

‘দ্যাখো বাবা, ফুলিকে কত সুন্দর দেখাচ্ছে! আর ঈদের দিনে এই পুরনো ছেঁড়া জামায় আমাকে দেখে কষ্ট হচ্ছে?’

‘হ্যাঁরে মা, খুব কষ্ট হচ্ছে, তুই এই ড্রেস পরেছিস কেন?’

‘তোমাদের বোঝাতে বাবা। ওদেরও এরকম কষ্ট। হয়তো ওরা তা প্রকাশ করে না।’

বাবা-মা তাদের ভুল বুঝতে পেরে অপরাধীর মতো চুপ করে থাকে। দাদুভাই চশমা খুলে চোখ মোছেন। বলেন—

‘দ্যাখো, এই হচ্ছে সত্যিকারের ঈদ। যা ওই ছোট্ট মেয়েটা চোখে আঙুল দিয়ে শেখালো। সত্যি আজ আমি গর্বিত। আমরা কি সত্যি ওর মতো করে ভাবতে পারি না? আমাদের সব বোধ, বিবেক, মানবিকতা কি শেষ হয়ে গেছে?’