নিজেকে নিয়ে সন্দিহান নিজেও!

লর্ডস টেস্টের শেষ দিনে ইশান্ত শর্মার কাছে ইংল্যান্ডের অসহায় আত্মসমর্পনে অ্যালিস্টার কুকের অধিনায়কত্ব নিয়ে আরেকবার প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। এবার কুক নিজেও জানালেন, চোখের সামনে ইংলিশ ব্যাটিং অর্ডারকে এমন তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়তে দেখে নিজের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তার নিজের মনেও! সিরিজের বাকি তিন টেস্টে ব্যক্তিগত এবং দলীয় পারফরম্যান্সের উন্নতি ঘটাতে না পারলে, অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোরও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজের ২০১০-১১ আসরে অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে ক্যারিয়ারের শুরুতেই হৈচৈ ফেলে দেয়া। এরপর সময় যত গড়িয়েছে ততই নিজেকে মেলে ধরেছেন কুক। নিতান্ত প্রতিশ্রুতিশীল এক খেলোয়াড় থেকে কুক নিজেকে তুলে এনেছেন ইংল্যান্ডের সর্বকালের সফলদের তালিকায়। প্রথম প্রথম এটা কুককে নিয়ে ইংলিশ গণমাধ্যমের বাড়াবাড়ি বলে অনেকে উড়িয়ে দিতে চাইলেও দুর্দান্ত ধারাবাহিকতায় সেই সব সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেন কুক। অথচ, সেই কুকই এখন কিনা বলেছেন, নিজের সামর্থ্য নিয়ে তিনি নিজেই নিশ্চিত নন! নিশ্চিত হবেনই বা কি করে! সর্বশেষ কবে রানের মুখ দেখেছেন কুকের পক্ষে সেটা ভুলে যাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়! শচীন টেন্ডুলকারের পর ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসাবে পাঁচ হাজার টেস্ট রানের মাইলফলক পেরোনো কুক সর্বশেষ সেঞ্চুরি পেয়েছেন এক বছরেরও বেশি সময় আগে! ইনিংসের বিচারে সেঞ্চুরিবিহীন আছেন ২৭টি ইনিংস ধরে। আর ২০১৪ সালে এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের গড় মাত্র ১৪.৩৩। অথচ এই তিনিই কিনা বছর দুয়েক আগে গড়েছিলেন সবচেয়ে কম বয়সে সাত হাজার রানের মাইলফলক পেরোনোর রেকর্ড! ফর্মহীনতার পাশাপাশি কুকের সমালোচকদের হাওয়া যোগাচ্ছে ইংলিশদের দলগত পারফরম্যান্সও। সর্বশেষ নয়টি টেস্টের সাতটিতেই হেরেছে ইংলিশরা। আর তাদের সর্বশেষ জয়টি এসেছে ১০ টেস্ট আগে। তাই ব্যাটসম্যান কুকের চাইতে অধিনায়ক কুকের বিরুদ্ধেও সমালোচকদের অভিযোগ কম নয়। টানা ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় গত বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে তাকে নেতৃত্বচ্যূত করার আলোচনা। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে গত মাসে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ হারের পর থেকে আরো জোড়ালো হয়ে ওঠে আলোচনাটা। তবে ইসিবি প্রধান এবং নতুন কোচ পিটার মুরস বারবারই কথা বলেন কুকের পক্ষেই। তবে এবার ভারতের বিরুদ্ধেও যদি ইংলিশদের একই ফল বরণ করতে হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই তার অবস্থাটা তেমন থাকছে না। ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন কুক নিজেও। যেই অটল আত্মবিশ্বাসের কারণে অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের জায়গায় তাকে অধিনায়ক করা হয়েছিল, কুক জানালেন সেই অভিজ্ঞতায় চীড় ধরেছে তার। ১০৬ টেস্টে আট হাজারের বেশি রান করা এই বাহাতি বলেন, ‘আমি সবসময়ই বলে এসেছি যতক্ষণ পর্যন্ত আমি এই দায়িত্ব বইতে পারবো, ততক্ষণ পর্যন্তই এটা বইবো আমি। যদি (এই সিরিজের) বাকি তিন টেস্টে নিজে রান না পাই এবং দলও ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে যাবে সন্দেহ নেই। ধরে নিতে হবে আমি পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য উপযুক্ত লোক নই।’ তবে একজন খেলোয়াড়কে প্রতিনিয়তই এমন লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয় বলেও জানান তিনি, ‘সবার মনেই সন্দেহ থাকে। আপনি যখন ভাল খেলতে পারবেন না, তখন এটা নিয়ে আপনার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হবেই। নিজের সামর্থ্য নিয়ে আপনি সন্দিহান থাকবেন। তবে আমার বিশ্বাস কঠিন এই সময়ে ইংল্যান্ড দলের আমাকে প্রয়োজন। তবে যদি সিরিজের শেষ পর্যন্তও আমি রান করতে না পারি তাহলে পরিস্থিতি তেমনটা থাকবে না। তাছাড়া সিরিজ চলাকালীন দায়িত্ব ছেড়ে দেয়াটা মোটেই যুক্তিসংগত নয়। তাই আমি সেটা করবো না।’ নটিংহ্যামে প্রথম টেস্ট ড্র হবার পর লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে ইংলিশদের প্রায় একাই হারিয়ে দেন শর্মা। পেস আর বাউন্সের অসাধারণ এক যুগলবন্দিতে ইংলিশদের দ্বিতীয় ইনিংস ধসিয়ে দেন তিনি একাই। এই পেসারের সাত উইকেটে ভারত ৯৫ রানের জয় পায়। লর্ডসে গত আট দশকের মধ্যে এটা ছিল ভারতের মাত্র দ্বিতীয় জয়। আর দেশের বাইরে গত তিন বছরে প্রথম। ৩১৯ রানের জয়ের লক্ষ্যে চতুর্থ দিনের শেষভাগে ব্যাটিংয়ে নামা ইংল্যান্ড দিন শুরু করেছিল চার উইকেটে ১০৫ রান নিয়ে। উইকেটে থাকা দুই ব্যাটসম্যান অ্যালিস্টার কুক এবং মইন আলীকে বেশ স্বচ্ছন্দ মনে হচ্ছিল উইকেটে। ভারতীয় বোলারদের দক্ষহাতে সামলে দিনের প্রথম সেশনটা কোন উইকেট না হারিয়ে প্রায় কাটিয়ে ফেলেছিলেন তারা। সেশনের একেবারে শেষ মুহূর্তে আঘাত হানেন শর্মা। মধ্য বিরতির ঠিক আগের বলে মইনকে ফেরান তিনি। বিরতি পরপরই তুলে নেন ম্যাট প্রিয়রকেও। এরপর মাত্র ছয় বলের ব্যবধানে শর্মা বেন স্টোকস ও জো রুটকেও তুলে নেয় ম্যাচ মূলত সেখানেই হেরে বসে ইংল্যান্ড। খানিক বাদে নবম ব্যাটসম্যান স্টুয়ার্ট ব্রডকেও ফেরান এই দীর্ঘদেহী ডানহাতি পেসারই। আর শেষ ব্যাটসম্যান অ্যান্ডারসনকে রান আউট করে সেই ২০১১ সালের পর বিদেশের মাটিতে ভারতকে প্রথম জয় এনে দেন রবীন্দ্র জাদেজা। নয় ওভারের ঐ স্পেলে সবমিলে নয় ওভারে ৪১ রানের বিনিময়ে পাঁচ উইকেট নেন শর্মা। আর আগের দিনের দুই উইকেট মিলে শর্মার বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ৭৪ রানে সাত উইকেট। যা তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিংও বটে।