ফিরে দেখা

ব্রজেন দাসের ইংলিশ চ্যানেল বিজয়

সারা পাকিস্তানে তাঁর সমকক্ষ কোনো সাঁতারু না থাকলেও ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আয়োজিত অলিম্পিক গেমসে পাকিস্তান থেকে যে সাঁতারু দল পাঠানো হয় সেখানে ব্রজেন দাসের নাম অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি। এই ক্ষোভে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেবার স্বপ্ন তাঁর ভেতর উদয় হয়।  দূরপাল্লার সাঁতারে সহ্য শক্তির পরীক্ষা দিতে ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে ঢাকার সুইমিং পুলে একটানা ৫০ ঘণ্টা সাঁতার কাটেন। কিন্তু উত্তাল ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে হলে তাঁকে আরো কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে, এ কারণে ১৯৫৮ সালের ২৭ মার্চ তিনি নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা থেকে  মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী, পদ্মা ও মেঘনা নদী হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত ৪৫ মাইল সাঁতারে পাড়ি দেন; সে সময়কার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল প্রায় অসম্ভব ও দুঃসাহসিক এক  প্রচেষ্টা।

১৯৫৮ সালের ১৯ মে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ব্রজেন দাস ঢাকা ত্যাগ করেন; সেখানে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার আগে নিজেকে আরো ভালোভাবে যাচাই করা জন্য ‘নেপলস টু ক্যাপ্রি আইল্যান্ড’ দূরপাল্লার সাঁতারে অংশ নেন। এরপর বহু কাঙ্ক্ষিত ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া। ১৯৫৮ সালের ২৩ আগস্ট ব্র্রজেন দাস ফ্রান্স উপকূল থেকে শুরু করে ১৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট সাঁতার কাটার পর বেলা চারটা ২ মিনিটে ইংল্যান্ডের ডোভার বন্দরের পূর্ব প্রান্তের ভূমি স্পর্শ করেন। প্রথম হন ড্যানিশ বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নারী সাঁতারু গ্রিটা অ্যান্ডারসন। উপকূলের কাছে ব্রজেন দাস আকস্মিকভাবে এক তীব্র স্রোতের সম্মুখীন হলে গ্রিটা তাঁর চেয়ে প্রায় চার ঘণ্টা আগে ভূমি স্পর্শ করেন। ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে পুরুষদের মধ্যে প্রথম এবং সকল  প্রতিযোগীর মধ্যে হন দ্বিতীয়। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া এশিয়ানদের ভেতর তিনিই প্রথম। ইংল্যান্ড ও পুরো বিশ্বে ঘটনাটি দারুণ হৈচৈ ফেলে। চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় ব্রজেন দাসের সাফল্যের জন্য পুরো পাকিস্তানে সকল সরকারি অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করা হয়।

১৯৫৯ সালের ২৭ আগস্ট দ্বিতীয়বার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন  ব্রজেন দাস। ভীষণ ঝড়ো হাওয়া বইছিল সেদিন। তাই হাওয়ার বিপরীতে সাঁতার কাটতে হয় তাঁকে। বিক্ষুব্ধ চ্যানেলে সাঁতার কাটতে তিনি সময় নেন ১৩ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট। ১৯৫৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তৃতীয়বার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন ব্রজেন দাস। এবার পাড়ি দেন ইংল্যান্ডের কেন্ট কাউন্টির ডোভার থেকে ফ্রান্সের ক্যালাইস পর্যন্ত ৩৩ দশমিক ১ কিলোমিটার, এ একবারই তিনি ইংল্যান্ড থেকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। এক মাসের মধ্যে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয়বার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম। অভিজ্ঞতা ভিন্ন থাকা সত্ত্বেও সময় নেন ১৩ ঘণ্টা ২৬ মিনিট। ১৯৬০ সালের ২৭ আগস্ট চতুর্থবার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন তিনি। ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড পাড়ি দিতে সময় নেন ১৪ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট। তাঁর আগে কেউ চারবার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে পারেননি। ১৯৬১ সালে ১৪ দিনের মধ্যে কৃতিত্বের সঙ্গে দুবার পাড়ি দিয়ে ইংলিশ চ্যানেল ক্রসিং-এর ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েন। ১৯৬১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পঞ্চমবার পাড়ি দিতে সময় নেন ১১ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট। ২১ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠবার পাড়ি দিতে সময় নেন ১০ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট। এটি ছিল তাঁর শেষ অভিযান। এবার নিজেকেই শুধু ছাড়িয়ে যাননি, ১৯৫০ সালের ২২ আগস্ট মিশরের হাসান আবদেল রেহিমের গড়া ১০ ঘণ্টা ৫০ মিনিটের রেকর্ড ভাঙেন তিনি।

ইংলিশ চ্যানেল দুভাবে অতিক্রম করা যায়। ইংল্যান্ডের ডোভার থেকে ফ্রান্স উপকূল কিংবা ফ্রান্স উপকূল থেকে ইংল্যান্ডের ডোভার। ব্রজেন দাস পাঁচবার ফ্রান্স উপকূল থেকে এবং ইংল্যান্ডের ডোভার থেকে একবার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। সে সময় ৬ বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে বিশ্ব রেকর্ডও গড়েন তিনি। একইসঙ্গে তাঁর নাম ওঠে ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ। ছয়বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেবার কারণে ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ এক অনুষ্ঠানে তাঁকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন, ‘আপনি তো ইংলিশ চ্যানেলকে আপনার বাথটাবে পরিণত করেছেন।’