টিকিটের জন্য হাহাকার

বাস, ট্রেন ও লঞ্চের টিকিট নিয়ে এখন সর্বত্র হাহাকার শুরু হয়েছে। ঈদে স্বজনের কাছে ফেরার আকাঙ্ক্ষায় টিকিটের জন্য প্রতিদিনই লাখ লাখ মানুষ ছুটে বেড়াচ্ছেন দূরপাল্লার বাস কাউন্টার, রেলস্টেশন ও লঞ্চ ঘাটে। কিন্তু স্টেশনগুলোতে ঘরমুখো মানুষের জনসে াত বাড়লেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত টিকিট। ক্রমশ বাড়ছে টিকিট প্রত্যাশীদের ভোগান্তি। শুধু একটি টিকিটের জন্য স্টেশনগুলোতে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে যাত্রীদের। তাই বাধ্য হয়ে বিকল্প পরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই। এদিকে বৃহস্পতিবার ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রির শেষ দিন। এদিন থেকে অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীদের যাত্রা শুরু হবে। আগামীকাল থেকে পুরোদমে বাস-ট্রেন-লঞ্চে ঘরে ফেরা শুরু হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা ইত্তেফাককে বলছেন, ঈদকে সামনে রেখে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকা ছাড়বেন আগামী ২৬, ২৭ ও ২৮ জুলাই। এই তিন দিনই রাজধানী প্রায় ফাঁকা হয়ে যাবে। মহাসড়কে দুরবস্থার কারণে ঈদের আগে মারাত্মক যানজটেরও আশংকা করছেন অনেকে। গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এবারো আশংকা করা হচ্ছে যানজটের। বাস মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানী থেকে সব মিলিয়ে যত মানুষ মফস্বলে যায়, তার অর্ধেকেরও বেশি যাতায়াত করেন সড়কপথে। বাকিরা যাতায়াত করেন বিমান, নৌপথ ও ট্রেনে। ঈদ মৌসুমে বিশেষ ব্যবস্থায় ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী থেকে দূরপাল্লার বাসে এখন প্রতিদিন ৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন। এই সংখ্যা দু’-একদিনের মধ্যে আরো বাড়বে। বৃহস্পতিবার থেকেই পুরোদমে শুরু হবে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা। ইতোমধ্যে ট্রেনের ২৪, ২৫ ও ২৬ জুলাইয়ের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার তৃতীয়দিনেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট পাননি অনেকেই। লঞ্চের টিকিট অনেক আগেই উধাও। বাসের টিকিটতো পাওয়াই যাচ্ছে না। কাল শেষ হচ্ছে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি আগামীকাল বৃহস্পতিবার ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রির শেষ দিন। আজ বুধবার ২৭ জুলাইয়ের অগ্রিম টিকিট বিক্রয় হবে। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত ২০ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই ৪ দিনব্যাপী অগ্রিম টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ২০, ২১ ও ২২ জুলাই যথাক্রমে ২৪, ২৫, ও ২৬ জুলাইয়ের টিকিট বিক্রয় হয়। গত তিনদিন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও যারা টিকিট পাননি তাদের আজ ও আগামীকাল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টিকিট কাটতে হবে। কৌশল কিংবা ধর্য ধরে লাইনের সামনের ভাগে যারা দাঁড়াতে পারবেন তাদের ভাগ্যেই মিলবে টিকিট। বাকিদের নিরাশ হয়েই স্টেশন ত্যাগ করতে হবে। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছেন, গত ৫ দিন যারা লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট কাটতে পারেননি তাদের জন্য শুধুমাত্র যাত্রার দিন (যাত্রীদের অনুরোধের বিপরীতে) ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ আসনবিহীন টিকিট বিক্রয় করবেন। ২৪ জুলাই থেকে অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীরা স্ব স্ব ট্রেন যাত্রা শুরু করা হবে। মঙ্গলবার ২৬ জুলাইয়ের অগ্রিম টিকিট বিক্রয় হয় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে। বেলা ১১টার দিকে কাউন্টার থেকে সূবর্ণা, তুর্ণা-নিশীতাসহ অধিকাংশ আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রয় শেষ হয়ে যায় বলে মাইকে ঘোষণা হয়। ওই সময় লাইনে দাঁড়ানো শত শত যাত্রী চিত্কার শুরু করেন। টিকিট না পাওয়া যাত্রীরা উত্তেজিত হয়ে কাউন্টার ভাংচুর করার চেষ্টা করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বাধায় যাত্রীরা সড়ে যেতে বাধ্য হয়। দুপুর ২টার দিকে ২৭ জুলাইয়ের অগ্রিম টিকিট কাটার জন্য হুড়হুড় করে লাইনে দাঁড়ান শত শত যাত্রী। চট্টগ্রামগামী যাত্রী সেলিম ভুঁইয়া, হিরন খান, সিরাজুল ইসলাম ও আরমান জানান, তারা সোমবার বিকালে ৪ নম্বর কাউন্টারের সামনে সূর্বণা ও তুর্ণা-নিশিতা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ান। প্রায় দেড়’শ যাত্রীর পেছনে ছিল তাদের অবস্থান। সকাল ১১টার দিকেই মাইকে ঘোষণা হয় সূর্বণা ও তুর্ণা-নিশিতা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট শেষ। ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাদের সারিতে দাঁড়ানো সামনের প্রায় ৩০/৪০ জন যাত্রীও টিকিট পাননি। বাধ্য হয়েই লাইন না ছেড়ে আগামীকালের (আজ) জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে রইলেন। এ বিষয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার খায়রুল বশির ইত্তেফাককে জানান, চট্টগ্রামগামী সূর্বণা ও তুর্ণা-নিশিতা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ভিআইপি ও রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ই-টিকিট বরাদ্দকৃত ৩৫ শতাংশ ছাড়া বাকি টিকিটগুলো কাউন্টার থেকেই দেয়া হচ্ছে। সীমিত টিকিট থাকায় লাইনে দাঁড়ানো সবাইকে টিকিট দেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ে বাণিজ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, লাইনে দাঁড়ানো সবাই টিকিট পাবে না এটাই স্বাভাবিক। প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেনে যথাক্রমে সব শ্রেণীর মিলে ৫শ’ থেকে ৭২০ সিট থাকছে। তার মধ্যে ৬০ শতাংশ টিকিট কাউন্টার থেকে ছাড়া হচ্ছে। ফলে কাউন্টার থেকে সূর্বণা, তুর্ণানিশিতা এক্সপ্রেসসহ প্রায় সব কয়টি আন্তঃনগর ট্রেনের যথাক্রমে ৩শ’ থেকে ৪শ’ টিকিট দেয়া হচ্ছে। সেই তুলনায় লাইনে দাঁড়ানো ৮০ থেকে ৯০ জন যাত্রী কাউন্টারের সামনে যেতে না যেতেই টিকিট শেষ হয়ে যাচ্ছে। লাইনে দাঁড়ানো শতকরা ৯৫ শতাংশ যাত্রীই ৪টি করে টিকিট কাটছেন বলেও তিনি জানান। ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি মো. আব্দুল মজিদ ও রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনীর ইন্সপেক্টর মো. শহিদুল্লাহ জানান, প্রতি লাইনে যাত্রীদের ভিডিও করায় এবার কোনো টিকিট কালোবাজারির সদস্য লাইনে দাঁড়াতে পারেনি। ঈদ উপলক্ষে বিনাটিকিটে যাত্রী বিভিন্ন ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিন ও দরজায় ঝুলে যাত্রা করেন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবারের মতো এবার যাত্রীদের ট্রেনের ছাদ ও ইঞ্জিনে চড়া নিষেধ করা হয়েছে। বাস কাউন্টার আছে টিকিট নেই রাজধানীর মতিঝিল, গাবতলী, কল্যাণপুর ও শ্যামলীর বিভিন্ন বাস কাউন্টারে টিকিটের জন্য যাত্রীরা ছোটাছুটি করছেন। কিন্তু কোন কাউন্টারেই টিকিট নেই। প্রথম দিন থেকেই বাসের সব টিকিট উধাও। টিকিটের জন্য শত শত মানুষের ভিড় প্রতিটি দূরপাল্লার পরিবহনের কাউন্টারে। দূরপাল্লার বাসগুলোর কোনো কাউন্টারেই মিলছে না ঘরে ফেরার টিকিট। বেশি টাকা দিতে চেয়েও টিকিটের দেখা পাননি অনেকেই। ঈদে উপলক্ষে বাসের আগাম টিকিট নেই বলা হলেও বাড়তি মূল্য দিলেই কাউন্টার থেকে এখনো মিলছে টিকিট। টিকিট প্রতি একশ থেকে ২শ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। যা টিকিট আছে তা আবার কালোবাজারিদের হাতে। অতিরিক্ত মূল্যে সেই টিকিট বিক্রি করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। বেসরকারি পরিবহন হানিফ, সোহাগ, নাবিল, একে ট্রাভেলস, টিআর ট্রাভেলস, এসআর ট্রাভেলস, টিআর, হানিফ, ইয়েলো লাইন, শ্যামলী, সায়রা, এসপি গোল্ডেন লাইন, এম আর, সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস, কে লাইন, বলাকা, এসআর, বাবলু, ঈগল, এসএ পরিবহন ও রোজিনা পরিবহন সার্ভিসের কাউন্টার ঘুরে দেখা গেছে কোন টিকিট নেই। আগামী ২৭ জুলাই সকালে সাতক্ষীরার গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য ৬৭০ টাকা দিয়ে একে ট্রাভেলসের টিকিট সংগ্রহ করেছেন কোচিং ব্যবসায়ী আবজাল হোসেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, প্রায় ৪ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এই টিকিট সংগ্রহ করেছি। আগে এই টিকিটের মূল্য ছিল সাড়ে ৫শ’ টাকা। তবে বাস মালিকরা কৃত্রিমভাবে টিকিটের সংকট তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। কাউন্টারে গিয়ে টিকিট না পাওয়াতেই বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না রুহুল আমিন ও খাদিজা দম্পতির। তারা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, টিকিটের খোঁজে কল্যাণপুরের বেশ কয়েকটি কাউন্টারে এলেও টিকিট তাদের ভাগ্যে মেলেনি। তাই এবারের ঈদে তাদের বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। কল্যাণপুরে এসপি গোল্ডেন লাইনের এক টিকিট বিক্রেতা জানান, গত ১৪ জুলাই থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়। ২/৩ দিনের মধ্যেই সব টিকিট বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। এখন কেবলমাত্র কোনো যাত্রী টিকিট ফেরত দিয়ে গেলেই সেটা অন্য যাত্রীকে দেয়া সম্ভব। তাছাড়া টিকিটের আর কোনো ব্যবস্থা নেই। গাবতলী বাস টার্মিনালে যাত্রীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, পরিবহন মালিকরা শেষ মুহূর্তে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে এখন পরিকল্পিতভাবে টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। তবে এখন অনেক কাউন্টারে অতিরিক্ত মূল্যে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের (বিবিটিএও) নেতা মো. সালাউদ্দিন ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, গত ১৪ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাসের ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়েছে। সে কারণে ইতিমধ্যেই অধিকাংশ রুটের টিকিট শেষ হয়ে গেছে। তবে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের বেশি ভাড়া আদায় করার কথা অবশ্য স্বীকার করতে চাননি এই পরিবহন নেতা। উধাও লঞ্চের টিকিট ঈদকে সামনে রেখে লঞ্চের অগ্রিম টিকিট উধাও হয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে অবৈধ ট্রাভেল সিন্ডিকেট চক্রের সদস্যরা ইতোমধ্যে লঞ্চের টিকিটের বড় অংশ কিনে নিয়েছেন। ওই সব টিকিট তারা অতিরিক্ত অর্থে বিক্রি করছেন। বেসরকারি লঞ্চ মালিকেরা ২৪ জুলাই থেকে স্পেশাল সার্ভিস চালু করবেন। ইতিমধ্যে অগ্রিম টিকিটের জন্য স্লিপ নেয়া শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে অগ্রিম টিকিটের সুবিধা পাচ্ছেন না সাধারণ যাত্রীরা। বিকল্প পরিবহনের খোঁজে যাত্রীরা বাস-ট্রেন-লঞ্চের টিকিট সোনার হরিণে পরিণত হওয়াতেই ঘরমুখো শত শত মানুষ এখন বিপাকে পড়েছেন। কীভাবে বাড়ি যাবেন এই দুশ্চিন্তায় লাখ লাখ মানুষ। শেষ মুহূর্তে টিকিটের জন্য কাউন্টারে প্রতিনিয়ত ভীড় জমায়েত বাড়ছেই। তবে ঈদে যানজট এবং টিকিটের ঝামেলা এড়াতে আগেভাগেই ঢাকা ছাড়ছেন অনেকে। মঙ্গলবার রাজধানীর কল্যাণপুর বাস কাউন্টারে কথা হয় আজগার আলী কাঞ্চন ও সোনিয়া কাঞ্চন ইতি দম্পতির সঙ্গে। তারা গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় যাওয়ার জন্য গত তিনদিন ধরে বাসের টিকিটের জন্য ধরনা দিয়েও কোন টিকিট পাননি। টিকিট না পেলেও গ্রামের আত্মীয়-স্বজনরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের জন্য। যেকোন ভাবেই হোক বাড়ি যেতে হবে তাদের। তাই বাধ্য হয়ে ২৫ জুলাই সকালে ১২ হাজার টাকায় ভাড়া করেছেন মাইক্রোবাস। অনুরূপ রংপুরের শালবনে যাওয়ার জন্য গত কয়েকদিন ধরে টিকিটের সন্ধান করেও পাননি ব্যাংকার শামস ফেরদৌস। তার ইচ্ছা স্ত্রী মাসুমা আক্তার, সন্তান তাজুয়াল ফেরদৌসসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ঈদ করার। কিন্তু বাস-ট্রেনের কোন টিকিট না পাওয়াতেই একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করেছেন শামস। আজগর-সোনিয়া/শামস-মাসুমা দম্পতির মতো অসংখ্য ঘরমুখো মানুষ বাস-ট্রেনের টিকিট না পেয়ে বিকল্প পরিবহনের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছেন।