ভেজাল প্যারাসিটামল :তিনজনের কারাদণ্ড
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৪, ২৩:০০
মামলা দায়েরের ২১ বছর পর ভেজাল প্যারাসিটামল ঔষুধ উত্পাদন ও বিপণনের অভিযোগে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড-এর পরিচালক ডা. হেলেন পাশাসহ তিনজনকে দশ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান এবং প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেছে আদালত। জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাসের দণ্ড দেয়া হয়েছে আসামিদের।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ ও ড্রাগ আদালতের বিচারক মো. আবদুর রশিদ জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দু’জন হলেন, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মিজানুর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত উত্পাদন কর্মকর্তা নৃগেন্দ নাথ বালা। আসামিদের বিরুদ্ধে ১৯৮২ সালের ঔষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৬ সি ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদেরকে এ দণ্ড দেয়া হয়। রায়ের পর্যালোচনায় বিচারক বলেন, ভেজাল প্যারাসিটামল ঔষুধ তৈরি করা সমাজ ও মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। তাই আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দেয়া উচিত। মামলার অপর দুই আসামি প্রতিষ্ঠনটির পরিচালকের ছেলে আজফার পাশা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মোঃ নোমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দিয়েছে আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে নৃগেন্দ নাথ বালা পলাতক। হেলেন পাশা ও মিজানুর রহমান জামিনে ছিলেন। রায়ের দিন গতকাল তারা আদালতে হাজির হন। রায় ঘোষণার পর সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাদেরকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। খালাসপ্রাপ্ত দুই আসামি মামলার শুরু থেকেই পলাতক। তবে ওই ঔষুধ কোম্পানিটির অংশীদার ডা. আনোয়ার পাশা, জাহিদ ইফতেখার পাশা ও ইসরাত পাশাকে এ মামলার আসামি করা হলেও তারা মারা যাওয়ায় আগেই তাদেরকে মামলার কার্যক্রম থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানান ড্রাগ আদালতের বিশেষ পিপি শাহিন আহমেদ খান। তিনি বলেন, এ রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে উপায় নেই। যদিও আইনে বেঁধে দেয়া সর্বোচ্চ শাস্তি আসামিরা পেয়েছে। তবে ওই শাস্তি অপরাধের তুলনায় অপ্রতুল। যে ঘটনাটির প্রেক্ষিতে এ মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল তা অত্যন্ত হূদয়বিদারক। আমরা ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেউ-ই চাই না। তবে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা উচিত।
মামলা দায়েরের ২১ বছর পর এ রায় ঘোষণা করা হলো। যদিও এ মামলাটি ১৯৯৩ সালের ৭ জুলাই থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত ছিল। পরে বিচার চালু হলে চারজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।
১৯৯৩ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকার ড্রাগ আদালতে মামলাটি করেছিলেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক আবুল খায়ের চৌধুরী। মামলায় বলা হয়, অ্যাডফ্লেমের প্যারাসিটামলে বিষাক্ত উপাদান থাকায় বহু শিশু কিডনি সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে অন্তত ৭৬ জনের মৃত্যু হয়। যদিও ওইসময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কিডনি অকেজো হয়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ শিশুর মৃত্যু ঘটে।
এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষি ঢাকা শিশু হাসপাতালের তত্কালীন প্রফেসর মো: হানিফ তার জবানবন্দিতে বলেন, “আমাদের হাসপাতালে ১৯৯২ সালের আগে থেকেই কিছু শিশু কিডনিজনিত সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়। কিছু শিশু কিডনি ছাড়া অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আসে। আমরা দেখতে পাই যে, কিছু শিশু হাসপাতালে আসার পর কিডনি বিকল হয়। কিডনি বিকলের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করি। তদন্ত কমিটি জানতে পারে যে, অনেক শিশু কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করছে অথচ তাদের এ কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। এই বিষয়ে আমরা ঔষধ প্রশাসন এবং পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টকে চিঠির মাধ্যমে জানাই। প্যারাসিটামল সিরাপের নমুনা পাঠাই। যে সকল শিশুদেরকে হাসপাতালে শুধু প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়ানো হয় তাদের ক্ষেত্রে কিডনি ফেইলিউর হওয়ার ঘটনায় আমাদের সন্দেহ হয় যে, ব্যবহূত সিরাপে কোন সমস্যা আছে। পরবর্তীতে আমাদের পাঠানো প্যারাসিটামল সিরাপের স্যাম্পল ঔষধ প্রশাসন এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন কর্তৃক পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা শেষে ওই সিরাপে ‘প্র্রোপাইলিন গ্লাইকল’ এর পরিবর্তে ‘ডাইডিহাইলিন গ্লাইকন’ পাওয়া যায় যা ক্ষতিকারক এবং বিষাক্ত। আর এটাই শিশু মৃত্যুর কারণ।”
এ মামলার বাদী আদালতে দেয়া তার সাক্ষ্যে বলেন, ১৯৯১ সালের ৩ জুলাই আমি ঔষুধ প্রশাসকের নির্দেশে হাসপাতালে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব:) মকবল হোসেন চৌধুরীর কাছ থেকে তিন বোতল ‘ফ্লামোডল সিরাপ’ সংগ্রহ করি। সাক্ষীদের সামনে ওই তিন বোতলের মধ্যে দুই বোতল আমি নিয়া আসি এবং অন্য বোতলটি শিশু হাসপাতালের পরিচালককে দিয়ে আসি। ওই বোতল দুইটির মধ্যে একটি বোতল ৭ জুলাই ঔষধ প্রশাসনের স্মারকমূলে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরীতে পাঠিয়ে দিই। ওই স্যাম্পল এর রুটিন টেস্ট করা হয়েছিল। রুটিন টেস্টে শুধু কার্যকরি উপাদান টেস্ট করা হয়। এর পরে খবরের কাগজে অবগত হয়েছিলাম যে শিশু হাসপাতালে প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে অনেক শিশু মারা গেছে। পরে শিশু হাসপাতালে যেয়ে বিভিন্ন কোম্পানির প্যারাসিটামল সিরাপ সংগ্রহ করি। ওই সব স্যাম্পলের সাথে ফ্লামোডল প্যারাসিটামলের বিষক্রিয়া পরীক্ষার জন্য পাঠাই। ড্রাগ অফিসের স্মারকমূলে ১৯৯২ সালের ২৫ নভেম্বর মহাখালী ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরীতে তা পাঠানোর পর এসনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানির গ্যাস লিকুইড ও সেটোগ্রাফী মেশিনের সাহায্যে ঐ সকল ঔষধের বিষক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়। ওই ল্যাবরেটরীর প্রধান ডাঃ আবদুল মালেক ওই প্যারাসিটামল পরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। ওই প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ফ্লামোডল প্যারাসিটামলে ডাই ইথিলিন গ্লাইকল রয়েছে যা একটি বিষাক্ত দ্রবণ যা মানুষের জন্য ব্যবহারের কোন ঔষধ তৈরিতে ব্যবহার হয় না। ফ্লামোডল সিরাপে ডাই ইথিলিন গ্লাইকল ব্যবহারের কোন অনুমতি ছিল না। ওই রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা নিশ্চিত হলাম যে এ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড অননুমোদিত ও বেআইনীভাবে ফ্লামোডল প্যারাসিটামল সিরাপে বিষাক্ত উপাদান মিশ্রিত প্যারাসিটামল উত্পাদন ও বাজারজাত করে আসছে যা মান বহির্ভূত, ভেজাল ও ক্ষতিকর। পরে আমি আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করি।
উল্লেখ্য, ওই সিরাপ খেয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় হলে আসামিদের বিরুদ্ধে এ মামলাটি দায়ের করা হলেও কোন হত্যা মামলা দায়ের করা হয়নি।