বিএনপি জোটে অবিশ্বাস শরিক দলে বিভক্তি
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৪, ২৩:০১
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোটের কয়েকটি শরিক দলকে নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস চলছে। গত কয়েক মাসে এই দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের গতিবিধি ‘রহস্যজনক’ মনে হচ্ছে বিএনপির কাছে। এই সন্দেহ থেকে দু’একটি শরিক দলের অভ্যন্তরেও দেখা দিয়েছে অন্তঃকলহ। শরিক দলের অভ্যন্তরীণ সংকট ও পারস্পরিক সন্দেহের কারণে ইতিমধ্যে জোটের একাধিক পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিও বাতিল হয়েছে।
কয়েকটি শরিক দলের বেশ ক’জন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করার পর উদ্ভূত সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জোটটির বেশিরভাগ শরিকে হতাশা ভর করেছে। জোটের আগে এসব দল এখন নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে। পুরনো এই হিসাব এবং ভবিষ্যত্ ভাবনার সংযোজনে নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এই শরিকদের কেউ কেউ। এর অংশ হিসেবে প্রকাশ্যে তারা ১৯ দলে থাকলেও গোপনে যোগাযোগ করছেন বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের শক্তিগুলোর সঙ্গেও। যারা এই যোগাযোগে ব্যর্থ হচ্ছেন, অদূর ভবিষ্যতের ‘সম্ভাব্য পরিণতির’ কথা আগাম মাথায় রেখে তারা নিজ থেকেই জোটের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন।
বিএনপি জোটের দ্বিতীয় প্রধান শরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় জামায়াতকে। আর সবচেয়ে বেশি সন্দেহ-অবিশ্বাসও এই জামায়াতকে নিয়েই। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দলটির সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তা, জোট রাজনীতিতে অনাগ্রহ, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজে হঠাত্ ধীরগতি, বিশেষ করে দলটির আমির মতিউর রহমান নিজামীর মামলার রায় হচ্ছে-হবে করেও বারবার সময়ক্ষেপণের কারণে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপিসহ অন্য শরিকদের মধ্যে সংশয় বিরাজ করছে। এ বিষয়ে বিএনপি বা জোটের কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি না হলেও অপ্রকাশ্যে তারা বলছেন ‘সরকারের সঙ্গে জামায়াত সম্ভবত এক ধরনের সমঝোতায় রয়েছে। তবে এই সমঝোতা সরকারের সঙ্গে সাংগঠনিক পর্যায়ে নয়, দলের কিছু শীর্ষ নেতার সঙ্গে। শীর্ষ নেতাদের সমঝোতার প্রভাব আঁচ করা যাচ্ছে দলটির তৃণমূল পর্যন্ত।’
জামায়াতের অন্যতম শীর্ষ নেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কয়েকদিন আগে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপকালে বলেন ‘সরকারের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হওয়ার জায়গাটা কোথায়? এখনও প্রতিদিন গড়ে আমাদের একশজন নেতা-কর্মী গ্রেফতার হচ্ছেন, নির্বাচনপূর্ব আন্দোলনে পাঁচশজন শহীদ হয়েছেন, আর লক্ষাধিক নেতা-কর্মী জেলে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সঙ্গে আমাদের সমঝোতার কোনো সুযোগ আছে বলেও আমি মনে করি না।’ পাল্টা প্রশ্ন রেখে ডা. তাহের বলেন, সমঝোতা করতে হলে আমাদের শীর্ষ নেতাদের সবাইকে ছেড়ে দিতে হবে, বর্তমান সরকার কী তা করতে পারবে? যেহেতু এই সরকারের পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়, সে কারণে তাদের সঙ্গে সমঝোতাও হতে পারে না।
মাস খানেক আগে জোটের বৈঠকে উপস্থিত থাকা জামায়াত নেতাদের কাছেও সরকারের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তখনও জামায়াতের পক্ষে তাকে জানানো হয়েছিল, এটি অপপ্রচার। নির্বাচনের আগে দীর্ঘ কর্মসূচিতে দলের বহু নেতা-কর্মী হতাহত এবং অনেকে কারাগারে থাকায় দলটি এখন নিজেদের গুছানোর কাজ করছে। সামনে সরকার বিরোধী আন্দোলনে তারা সক্রিয় হবেন।
আরেক শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) ভুগছে নিজেদের কলহে। দলটির চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু বহিষ্কার করেছেন দলের মহাসচিব ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে। এই ঘটনার পর ১৯ জুলাই দলের জরুরি প্রেসিডিয়াম সভা ডেকে নিলুকে পাল্টা বহিষ্কার করেছেন ফরহাদ ও তার অনুসারীরা। ওই সভায় ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে দলের চেয়ারম্যান ও মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে মহাসচিব ঘোষণা করা হয়েছে।
এই বিষয়ে ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ইত্তেফাককে বলেন, শেখ শওকত হোসেন নিলু সম্ভবত সরকারের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় গেছেন। যার কারণে তিনি কিছুদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে খালেদা জিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়া ভুল ছিল, পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি দিয়ে আন্দোলনে সফলতা আসবে না- ইত্যাদি মন্তব্যও করেন নিলু। এছাড়া জোটের নৈতিক অবস্থান ভঙ্গ করে তিনি গত ১৭ জুলাই গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইফতার পার্টিতে যোগ দেন। পাশাপাশি দলের ভেতরে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রেসিডিয়ামের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য সভা ডেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
অন্যদিকে, শেখ শওকত হোসেন নিলু ইত্তেফাককে বলেন- ‘আমি অবশ্যই মনে করি পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আমি সত্য কথা বলায় বিএনপিরই কিছু লোক আমার মহাসচিবকে দিয়ে আমার দল ভাঙছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি একজন রাজনীতিক, প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ইফতারে যেতে পারব না কেন? জানা গেছে, আরও কয়েকটি শরিক দলেও এনপিপি’র মত সংকট দেখা দিয়েছে।
এনপিপি’র এই সংকটের কারণে সোমবার ১৯ দলের মহাসচিব পর্যায়ের একটি ইফতার পার্টিও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। জানা গেছে, ওমরা পালনে সৌদিআরব যাওয়ার আগে বিএনপি চেয়ারপারসন এই বিষয়ে মির্জা ফখরুলকে নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, রোজার ঈদের পর জোটের শরিকদের নিয়ে বসে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
বিএনপির এই জোট থেকে কিছুদিন আগে বের হয়ে যায় শেখ আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ-ভাসানী। গত ১০ জুলাই দলটি জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করে, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন শেখ শওকত হোসেন নিলু। শরিক ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সাইফুদ্দিন মনি ইত্তেফাককে বলেন ‘জোটের কয়েকটি ছোট ছোট শরিক এদিক-ওদিক দৌড়ঝাঁপ করছে। যতটুকু জেনেছি-এই দলগুলোসহ আরও কিছু দল বিএনপি জোটের বিপরীতে একটি পৃথক জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে।’ সূত্র মতে, শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের রেখে যাওয়া ইসলামী ঐক্যজোট ও মাসিক মদীনা’র সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দিনের মেয়ের জামাতা এডভোকেট নূরুল ইসলামও সম্ভাব্য এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
জানা গেছে, ১৯ দল শরিক ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তুজাসহ আরও কয়েকটি ছোট দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়েও জোটে সন্দেহ বিরাজ করছে। গোলাম মোর্তুজা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘দেশটা ছোট, এখানে সবার সঙ্গেই সবার যোগাযোগ আছে। তাই বলে জোট ভেঙ্গে যাচ্ছে- এরকম কথা বলে বরং একটি মহল নিজেরাই সুবিধা নিতে চাচ্ছে।’