আজও আছেন আমাদের হূদয়ে

বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি শুধু বাংলাদেশে নয়, উপমহাদেশের অনেক লেখকদের চেয়ে জনপ্রিয়। নাটক, গান ও বাংলা চলচ্চিত্রে তার অবদান ভোলার নয়। গত ১৯ জুলাই ছিল এই সৃষ্টিশীল মানুষটির দ্বিতীয় মৃত্যুবাষির্কী। তিনি না থাকলেও তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই আমাদের মাঝে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল। তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী কথাশিল্পী ও নন্দিত নাট্য এবং চলচ্চিত্র নির্মাতার নাম হুমায়ূন আহমেদ। একের পর এক সৃষ্টি করেছেন চমত্কার সব গল্প-সাহিত্য-নাটক-চলচ্চিত্র। শুধু লেখালেখিতেই নয়, নাটক-চলচ্চিত্র-ছবি আঁকা—হুমায়ূন আহমেদ যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যেসব চলচ্চিত্র দেখেছে, তার মাঝে নিঃসন্দেহে প্রথম দিকে থাকবে হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ এবং ‘শ্যামল ছায়া’। ‘আগুনের পরশমণি’ চলচ্চিত্রটি প্রথমবার দেখার পর যেভাবে দেশপ্রেম গভীরভাবে অনুভূত হয়েছিল, আজ প্রায় দশ বছর পরও তা দেখার পর সেই চিরচেনা অনুভূতি নাড়া দিয়ে যায় সবাইকে। তাইতো আজও বাংলাদেশের প্রতিটি বিশেষ বিশেষ দিবসে কোনো না কোনো চ্যানেলে প্রদর্শিত হয় তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রসমূহ। ঈদের সময় হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখার জন্য বাসার মানুষজন উদ্বেল হয়ে থাকবেন না, এ যেন হতেই পারে না! ঈদের দিন হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখার জন্য সবাই সবধরনের কাজ নির্দ্বিধায় ফেলে রেখে ছুটে যায় টিভিপর্দার সামনে। টেলিভিশনের জন্য একের পর এক দর্শক-নন্দিত নাটক রচনার পর হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। তার পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। ২০০০ সালে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ও ‘দুই দুয়ারী’ চলচ্চিত্র দুটি প্রথম শ্রেণীর দর্শকদের কাছে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা পায়। ২০০৩-এ নির্মাণ করেন ‘চন্দ্রকথা’ নামে একটি চলচ্চিত্র। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেন ‘শ্যামল ছায়া’ চলচ্চিত্রটি। এটি ২০০৬ সালে ‘সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগে একাডেমি পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ২০০৮-এ ‘আমার আছে জল’ চলচ্চিত্রটি তিনি পরিচালনা করেন। ২০১২ সালে তার পরিচালনার সর্বশেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। এছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। ২০০৭-এ শাহ আলম কিরণ পরিচালিত ‘সাজঘর’ এবং তৌকীর আহমেদ নির্মাণ করেন বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘দারুচিনি দ্বীপ’। ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য নাটক রচনা শুরু করেন তিনি। এটি তাকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে। তার অন্যতম ধারাবাহিক নাটকগুলো হলো— ‘একদিন হঠাত্’, ‘এবং আইনস্টাইন’, ‘আজ জরির বিয়ে’, ধারাবাহিক ‘আজ রবিবার’, ‘একটি অলৌকিক ভ্রমণ কাহিনী’, ‘এই বৈশাখে’, ‘এই বর্ষায়’, ধারাবাহিক ‘এইসব দিনরাত্রি’, সিক্যুয়েল ‘আমরা তিন জন’, ধারাবাহিক ‘অয়োময়’, ‘পদ্ম’, ‘পুষ্পকথা’, ধারাবাহিক ‘রুমালী’, ‘রূপকথা’, ‘রূপার ঘণ্টা’, ধারাবাহিক ‘রূপালি রাত্রি’, ‘সবাই গেছে বনে’, ‘শওকত সাহেবের গাড়ি কেনা’, ‘রুবিক্স কিউব’, ধারাবাহিক রুপালি নক্ষত্র’, ‘স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গ’, ‘সুরি’ ইত্যাদি। হুমায়ূন আহমদের গান বলতে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ রচিত গান বোঝানো হয়ে থাকে। হুমায়ূন আহমেদ মূলত গান রচয়িতা বা গীতিকার নন। কেবল নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে তিনি গান রচনা করে থাকেন। তার অনেকগুলো গান বেশ জনপ্রিয়। এসবের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। কেবল সাহিত্যেই নন, সংগীতেরও পরশপাথর ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তা যেমন তার লেখা গানের জনপ্রিয়তায় স্পষ্ট, তেমনি তার গানের শিল্পীদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতেও। হুমায়ূন আহমেদের লেখা জনপ্রিয় কয়েকটি গান হলো—‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’, ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’, ‘বরষার প্রথম দিনে’, ‘আইজ আমরার কুসুম রানির বিবাহ হইব’, ‘চাঁদনী পসর রাইতে কে আমারে স্মরণ করে’, ‘যদি মন কাঁদে চলে এসো এক বরষায়’ প্রভৃতি। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক (১৯৯৪), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮১), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) ইত্যাদি পেয়েছেন। এই গুণী মানুষটি আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও নিজের সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি কোটি কোটি পাঠকের হূদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।