রবীন্দ্রনাথের নাটকে দ্বন্দ্ব এবং সত্য

নাটকে প্রাণ থাকে দ্বন্দ্বে, রবীন্দ্রনাথের নাটকেও সেই দ্বন্দ্বটা আছে, এবং তা প্রধানত মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বন্ধনের বাস্তবতার, যেন অচলায়তনের সঙ্গে মুক্তধারার। ওই দুটি তাঁর নাটকের নাম; এবং অচলায়তনে (১৯২২) যেমন মুক্তধারাতেও (১৯২২) তেমনি বন্ধন আছে, আর আছে সেই বন্ধন থেকে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা। শেষ পর্যন্ত মুক্তির আকাঙ্ক্ষাটাই জয়ী হয়। রবীন্দ্রনাটকের পরিণতি বিয়োগান্ত নয়, মিলনান্ত; যদিও যন্ত্রণা, দুঃখ, মৃত্যু, আত্মাহুতি অনেক বেদনাদায়ক ঘটনা নাটকের ভেতর ঘটে। জীবনের দুর্ভোগকে রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই জানতেন, এবং মানতেনও, কিন্তু জীবনকে ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখতে সম্মত ছিলেন না।

বন্ধন মানুষ নিজেই তৈরি করে, নিজের জন্য কখনো কখনো, অপরের জন্যই অধিকাংশ সময়েই। কাজটা শত্রুতামূলক; কিন্তু এটা অনিবার্য হয়ে ওঠে স্বার্থঘটিত কারণে। রবীন্দ্রনাথ সর্বত্রই মুক্তির পক্ষে, এবং বন্ধনের বিপক্ষে। তাঁর নাটকে দেখি মুক্তির জন্য মানুষ কাজ করছে, চঞ্চল, অস্থির হয়ে উঠছে, কিন্তু বন্ধনটা তো বাস্তবতা, তাকে ভাঙা সহজ নয়। তবু ভাঙতে হয়। আর ওই ভাঙার চেষ্টার ভেতর দিয়ে বন্ধনের যে চরিত্র—সেটা পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। পাখি মুক্তি চায়। কিন্তু তার মুক্তির প্রসঙ্গে খাঁচার কথা এসে যায়।  ‘কিন্তু পাখির বেদনাকে সত্য করিয়া দেখাইতে হইলে খাঁচার বদ্ধতা ও কঠিনতাকে পরস্ফুিট করাইতেই হয়।’ কথাটা রবীন্দ্রনাথের নিজেরই, অচলায়তনের প্রসঙ্গে লিখেছেন।

নাটক রবীন্দ্রনাথ কম লেখেননি। হিসেব করলে দেখা যাবে সংখ্যার দিক থেকে কবিতার পরেই তাঁর নাটকের স্থান; কিন্তু কবিতা ও কথাসাহিত্যের তুলনায় তাঁর নাটকের পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তাটা খাটো। তার কারণ আছে। নাটক যদিও তিনি মানুষের জীবন ও তার মনুষ্যত্বের সঙ্কট নিয়েই লিখেছেন, তবু তাতে তত্ত্ব আছে, রয়েছে দার্শনিকতা, যে জন্য সংকেত ও রূপকের ব্যবহার এসে গেছে, অর্থটা সরল হয়ে ওঠেনি; সূক্ষ্মতা এসে সরল সমীকরণের পথে অন্তরায়ের সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া অধিকাংশ নাটকেই রয়েছে গানের ব্যবহার। গান অবশ্যই কাব্যময়তা নিয়ে আসে, তবে নাটকের ভেতরের লড়াইটাকে খানিকটা বুঝিবা স্তিমিতও করে দেয়। লড়াইটা অবশ্য ভীষণ রক্তপাতের নয়। তাতে রোমহর্ষকতার অভাব রয়েছে; সেই রণক্ষেত্রে গানের সুর ও ছন্দ যে অশোভন এমন বলা যাবে না।

 

দুই

রবীন্দ্রনাথের লেখা নাটকের মধ্যে সবচেয়ে অধিক পরিচিত, আলোচিত ও তাত্পর্যপূর্ণ হচ্ছে রক্তকরবী (১৯২৬)। এ নাটকের নান্দনিক সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু অন্তর্গত দার্শনিক বিষয়টি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রক্তকরবীর মূল দ্বন্দ্বটাকে একাধিক নামে চিহ্নিত করা সম্ভব এবং তা করা হয়েছেও বৈকি। একদিকে আছে মানুষের সর্বগ্রাসী রাক্ষুসে লালসা, অন্যদিকে প্রকৃতির স্বাভাবিক ও প্রবহমান জীবন। লড়াইটাকে যন্ত্রের সঙ্গে মনুষ্যত্বের বিরোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করাও অযৌক্তিক নয়। দ্বন্দ্বটির ভেতর একটি সময়োত্তীর্ণতা রয়েছে। এটি আগের কালেও সত্য ছিল। কিন্তু একালে বিশেষরূপে প্রকট হয়ে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন,  কৃষিজীবী ও আকর্ষণজীবী এই দুই জাতীয় সভ্যতার মধ্যে একটা বিষম দ্বন্দ্ব আছে, এ সম্বন্ধে বন্ধুমহলে আমি প্রায়ই আলাপ করে থাকি। কৃষিকাজ থেকে হরণের কাজে মানুষকে টেনে নিয়ে কলিযুগ কৃষিপল্লিকে কেবলই উজাড় করে দিচ্ছে। তাছাড়া শোষণজীবী সভ্যতার ক্ষুধা-তৃষ্ণা, দ্বেষ-হিংসা বিলাসবিভ্রম সুশিক্ষিত রাক্ষসের মতোই। আমার মুখের এই বচনটি কবি তাঁর রূপকের ঝুলিতে আত্মসাত্ করেছেন, সেটি প্রণিধান করলেই বোঝা যায়।

সুশিক্ষিত রাক্ষসের যে শোষণজীবী চরিত্রের কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—তার নামটি তিনি উল্লেখ করেননি; করলে হয়তো ব্যাপারটা স্থূল হয়ে পড়ত, অথবা হতে পারে কবির যে নিজস্ব সংস্কৃতি তার সঙ্গে ওই নামকরণ খাপ খেত না, কিন্তু আমাদের পক্ষে এটা কোনো অযৌক্তিক কাজ হবে না যদি চিরকালের ওই ব্যাধিটাকে একালের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করি। বরঞ্চ তাতে করে ব্যাপারটিকে বুঝতে সুবিধাই হবার কথা। রক্তকরবী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ হবার পরে লেখা, যে যুদ্ধটা ছিল বিশ্বের পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর ভেতর আধিপত্য নিয়ে লড়াই। যুদ্ধটা ওইখানেই শেষ হয়ে যায়নি, নাটকটি রচনার একযুগ পরে পুঁজিবাদীরা আরেকটি যুদ্ধ বাধায়, রবীন্দ্রনাথ যেটি দেখে গেছেন, যদিও তার ধ্বংসকার্যের সবচেয়ে নির্মম ছবিগুলো তাঁকে সহ্য করতে হয়নি, সেটি ঘটার আগেই তিনি চলে গেছেন।

নাটকটির নাম প্রথমে ছিল যক্ষপুরী, পরে বদল করে রেখেছিলেন নন্দিনী, এবং শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় রক্তকরবী। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, রক্তকরবীর সমস্ত পালাটি নন্দিনী বলে একটি মানবীর ছবি। চারিদিকের পীড়নের ভিতর দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ। ফোয়ারা যেমন সঙ্কীর্ণতার পীড়নে হাসিতে অশ্রুতে কলধ্বনিতে ঊর্ধ্বে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তেমনি তিনি আরো লিখেছেন, ‘নাটকের মধ্যেই কবি আভাস দিয়েছেন যে, মাটি খুঁড়ে যে পাতালে ধন খোঁজা হয় নন্দিনী সেখানকার নয়, মাটির ওপর তলে যেখানে প্রাণের, যেখানে রূপের, যেখানে প্রেমের লীলা নন্দিনী সেই সহজ সুখের, সেই সহজ সৌন্দর্যের’ নন্দিনী এবং রক্তকরবী আসলে একই, তারা স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত।

মকররাজের এই যক্ষপুরীতে মানুষের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। এখানকার লোকেরা উত্পাটিত, পরস্পরবিচ্ছিন্ন, যান্ত্রিক। তারা আত্মপরিচয় হারিয়েছে। স্বর্ণখোদাইকারকেরা নিজের নামে পরিচিত নয়, তারা পরিণত হয়েছে একেকটি সংখ্যায়। বেচারা অধ্যাপক এখনো পুরোপুরি যন্ত্রে পরিণত হননি, নবাগত পুরাণবাগিশকে তিনি বোঝাচ্ছেন, ‘পৃথিবীর প্রাণভরা খুশিখানা নির্জের সর্বাঙ্গে টেনে নিয়েছে ওই আমাদের নন্দিনী।

পুরো প্রবন্ধ ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়