সাক্ষাত্কার গ্রহণ :ড. মিল্টন বিশ্বাস
মিল্টন বিশ্বাস :জন্ম ও বেড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে আপনার কবি হওয়া এবং আজকের এই প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের ইতিহাস কিভাবে জড়িত? কবিতা লেখার শুরুটা কিভাবে হলো? ষাটের দশকের মাঝামাঝি লেখার সূচনা করে কবে থেকে নিয়মিত লিখতে শুরু করলেন?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী :জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে আমার পরিপ্রেক্ষিতটি অন্যরকম ছিল। আমার জন্ম মাতুলালয়ে। ফরিদপুর শহর থেকে বার মাইল দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি অজপাড়া গাঁয়ে। গাঁটির নাম রসুলপুর। এখানে মূলত তিন ঘর বাসিন্দা। তিন ঘর বাসিন্দার সঙ্গে আমরা আরেক ঘরকে যুক্ত করি। কারা বাসিন্দা ছিলেন? তাদের সম্পর্কে বললে আমার বেড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে সহজ হবে। পূর্ব দিকের ঘরবাড়িগুলো ছিল মীরদের। মাঝখানে পাড়াটি কাজীদের। আর পশ্চিমের অংশটুকু খন্দকারদের। এর সঙ্গে যুক্ত আর একটি পাড়া আছে, সেটি হলো সৈয়দদের। এখন আপনি বুঝতে পারেন একটি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামে তিন ঘর এবং আর একটি ঘর, মোট চার ঘর—সেখানে আশরাফ শ্রেণির বসবাস। আমি আশরাফ ও আতরাফ প্রসঙ্গটি এই কারণে বলছি, তখনকার মুসলিম সমাজে চল্লিশের দশকের শেষ দিকে আমার জন্ম। সেসময় আশরাফ ও আতরাফের ব্যাপারটি প্রকট ছিল। এর পাশাপাশি প্রেক্ষাপটটিও বলতে হয়। অঞ্চলটি একটি ইউনিয়নের অধীনে। ইউনিয়নের নাম ‘গট্টি’। এই অঞ্চলটির প্রাতিষ্ঠানিক নাম রাহুতপাড়া। ‘রাহুতপাড়া’ একটি সম্পন্ন বসতিপূর্ণ এলাকা। এ এলাকায় একটি বাজার আছে। বাজারে একটি দাতব্য চিকিত্সালয় আছে; একটি পোস্ট অফিস আছে। একটি প্রাইমারি আর একটি ফি প্রাইমারি স্কুল আছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে চিকিত্সালয়ও আছে। ময়রার দোকান, কামারের দোকান ও স্বর্ণকারের দোকান আছে। সোলার কাজ করে মালাকার তারও দোকান আছে। এক অর্থে বেনেদের দোকানপাট একটি সাধারণ দৃশ্য। অর্থাত্ সার্বিকভাবে একটি গ্রাম বা পাড়া হওয়ার জন্য যে সমস্ত উপাদান দরকার, তার সবকিছু এখানে আছে। হিন্দুু ও মুসলমান মিলে একটি পাড়া। সে পাড়ার একটি ক্ষুদ্র অংশের কথা আগেই বলেছি। এর একটি অংশে আমার বসতি। এখানে অস্তিত্বের প্রশ্ন ছিল একটি নদী। সে নদীটির নাম ‘কুমার’। ‘কুমার’ পাড়ার গা ঘেঁষে ফরিদপুর শহর থেকে একেবারে মাদারীপুর পর্যন্ত গেছে। নদীটির উত্পত্তি পদ্মার কাছ থেকে আর শেষে গিয়ে মিলেছে মধুমতীতে। আমার বাল্যকালে এই কুমারের প্রভাব প্রবল—খেয়া নৌকা থেকে শুরু করে নদীর বালি, পলি, ফসল, জীবজগত্ এবং পাশাপাশি মানুষ। আমি যেভাবে বড় হয়েছি, আমার কাছে বাল্যকালে—মুরগির ঝোলেরও দু’টি ফারাক ছিল—আশরাফ বাড়ির মুরগির ঝোল এবং আতরাফ বাড়ির মুরগির ঝোল। এই কথাগুলো দীর্ঘভাবে বলতে হয়, তাহলে এভাবে বলতে হয় যে, মসলার ব্যবহার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবহারসহ সবকিছুই আমার বেড়ে ওঠার সঙ্গে কাজ করেছে। আর এই বেড়ে ওঠার পাশাপাশি নদীটি আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে।
দীর্ঘ সাক্ষাত্কারের পুরোটা ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়