বজ্র ড্রাগনের দেশে সিকি শতাব্দী আগে

ডেটলাইন : ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩।পারো, ভুটান।

চারদিকে পাহাড়ঘেরা ছোট্ট বিমানবন্দরের রানওয়ে ছুঁল ড্রুক এয়ারের বিমানটি। ড্রুক এয়ার ভুটানের জাতীয় বিমান সংস্থা। অন্যরকম এক আনন্দ উত্তেজনায় ফুটছি আমি। আমার বন্ধুরাও। ছোট্ট বিমানটি রানওয়েতে স্থির হতেই ওভারহেড লকার থেকে হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। ভেতরে উত্তেজনা—এই প্রথম নিজের দেশ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো দেশ দেখব নিজের চোখে। ছবিতে নয়। দু চারজন বন্ধুকে পেছনে ফেলে একটু দ্রুতই দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। সিঁড়ি লেগেছে দরজার মুখে। এক এক করে বেরিয়ে যাচ্ছেন যাত্রীরা। আমি এসে দাঁড়ালাম দরজায়। মুহূর্তেই ভয়ঙ্কর শীতল ঝোড়ো হাওয়া শরীরের অনাবৃত অংশে বিঁধছিল অজস্র তিরের ফলার মতো। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। হাওয়া যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে আমাকে। নিজেকে ধাতস্থ করে নেমে এলাম মাটিতে। না-শীত না-গরমের ঢাকা থেকে হিমশীতল পারোতে। আধুনিক এক জনপদ থেকে প্রায় প্রাগৈতিহাসিক ভূখণ্ডে। প্রাগৈতিহাসিক বলছি এজন্য যে, দেশে আমরা তখন বিটিভির মাধ্যমে সিএনএন-এর সম্প্রচার দেখছি। অথচ ভুটানে তখনো কোনো দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক পত্রিকা নেই। নেই কোনো রেডিও বা টিভি স্টেশন। ওদের সমাজটা মাতৃতান্ত্রিক আর মানুষগুলো ভীষণ সরল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্স শেষ বর্ষের ২৪ জন ছাত্র-ছাত্রী ও ৬ জন শিক্ষকসহ আমরা এসেছি শিক্ষা সফরে। ভুটান থেকে নেপাল হয়ে দার্জিলিং যাব। সেখান থেকে কলকাতায় তিন রাত থেকে ঢাকা ফিরব। সতেরো দিনের এ সফর।

ঢাকা থেকে যাত্রার ত্রিশ-চল্লিশ মিনিটের মাথায় বিমানের জানালা দিয়ে লক্ষ করলাম সাদা পেঁজা মেঘ তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। আরো কিছুক্ষণ পর মনে হলো শুভ্র বরফের ওপর দিয়ে চলেছে আমাদের বায়ুযান। দিগন্ত বিস্তৃত এই বরফের চাদর। জানতে পারলাম আমরা হিমালয়ের রাজত্বে এসে পড়েছি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভুটান হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাংশে অবস্থিত। দেশটির উত্তরে চীনের তিব্বত অঞ্চল এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারত। ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের পুরো দেশটাই পাহাড় দিয়ে ঘেরা। বিমান যখন পারোর আকাশে উড়ছিল, জানালা দিয়ে দেখলাম নিচে পাহাড়ের সারি, মাথায় তুষারের শুভ্রমুকুট। কোথাও কোথাও শুধু পাহাড়চূড়া নয়, পুরো পাহাড়ই গায়ে দিয়েছে তুষারের চাদর।

রানওয়েতে নেমেই শিহরণ বয়ে গেল শরীরজুড়ে। যেদিকে তাকাই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। তীব্র শীত আর ঝোড়ো হাওয়া উপেক্ষা করে আমরা মেতে উঠলাম ছবি তোলায়। বন্ধুদের অনেকেই সঙ্গে করে ক্যামেরা এনেছে। প্রত্যেকের সংগ্রহে কয়েক রোল ফিল্ম আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়ানো গেল না রানওয়েতে। দ্রুত হেঁটে আমরা টার্মিনাল ভবনে ঢুকে গেলাম।

এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ভবন দেখে খুবই হতাশ হলাম। মাঝারি আকারের তিন-চারটা কক্ষ নিয়ে ছোট্ট টার্মিনাল ভবন। প্রবেশপথের দরজা রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। সম্ভবত দরজার লক নষ্ট। ভুটানে পোর্ট এন্ট্রি ভিসা। সবাই পাসপোর্ট বের করে ভিসা ফর্ম পূরণ করতে ব্যস্ত। ভিসার ফরমালিটিজ শেষ করে বাইরে এসে দেখি মিশুক (আশফাক মুনীর) স্যার একটা বাস ঠিক করেছেন থিম্পু যাওয়ার জন্য।

পুরো ভ্রমণ ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়