টুকরো কাঁচের কারিগর
মো. আমিরুজ্জামান, সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৪, ২১:৪১
প্রতিভা থাকলে তার বিচ্ছুরণ ঘটবেই। সৈয়দপুরের এমনি এক প্রতিভা শিশির (১৭)। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান শিশিরের নেই চারুকলার উপর প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা। শুধু মেধা খাটিয়ে ভাঙা কাঁচের টুকরো দিয়ে সে তৈরি করে চলেছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সব ইমারত, স্মৃতিসৌধ ও ঘরের শোভা বর্ধনকারী সামগ্রী। সূক্ষ্ম নির্মাণ শৈলীতে সমৃদ্ধ তার এই সুন্দর কাঁচের সামগ্রীগুলোর দামও খুব কম। এ কারণে মানুষের কাছে দিন দিনই এসবের কদর বাড়ছে। আর তাই নিজের ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে এ শিল্পেই স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখছেন সৈয়দপুরের এ যুবক।
জানা যায়, দিনাজপুর সরকারি কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের (অনার্স) ছাত্র শিশিরের বাবা শেখ রহমত আলী পেশায় একজন কাঁচ ব্যবসায়ী ছিলেন। বিভিন্ন কারণে লোকসানের কবলে পড়ে বছর দশেক আগে এ ব্যবসা বাদ দেন তিনি। তবে কাঁচের দোকান থাকা অবস্থায় তার ৩য় সন্তান জহির রায়হান শিশির ছোটবেলা থেকেই ভাঙা কাঁচের টুকরো বাড়িতে এনে মনের কল্পনার মিশেলে তৈরি করতো নানা সামগ্রী। এভাবে গত বারো বছরে কাঁচের টুকরোর শৈল্পিক এই নির্মাণ কাজে নিজের দক্ষতাকে শাণিত করে এ যুবক। সৈয়দপুর শহরের নতুন বাবুপাড়া এলাকায় নিজ ঘরে বসে সে সপ্তাশ্চর্যের নিদর্শন, ঐতিহাসিক বহুতল ভবন, স্মৃতিসৌধ, বিদেশি বাড়ি, ফুলদানি, বিভিন্ন ফ্রেমসহ ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী তৈরি করে। আর এগুলো স্থানীয় মেলার স্টলে বিক্রির মাধ্যমে শুরু হয় এ শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসার। ছেলের তৈরি সামগ্রীর গ্রহণযোগ্যতা দেখে পিতাও তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। ঈদ, পূজা, মেলার বাজার ছাড়াও পর্যটন কেন্দ্রে ও বিভিন্ন পিকনিক স্পটে টুকরো কাঁচ দিয়ে তৈরি সামগ্রী নিয়ে যায় শিশির। এভাবেই দিন দিন তার পণ্যের চাহিদা বাড়ে। তবে আর্থিক সংকটের কারণে বেশিদূর এগুতে পারেনি সে। বাড়াতে পারেনি উত্পাদন ও সরবরাহের পরিমাণ। থমকে যায় তার স্বপ্ন। ফলে ক্ষুদ্র পরিসরেই পড়ে রয়েছে তার ব্যবসা। তারপরও দমে যায়নি এ যুবক। শিশির জানায়, উত্পাদন ও সরবরাহ ঠিক রাখতে তাকে ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে। সে আরো জানায়, এ ভাঙা কাঁচের সামগ্রী তৈরিতে কাঁচা কাটা কলম, স্কেল, পেন্সিল, আঠা এবং সর্বোপরি টুকরো কাঁচের প্রয়োজন।
শেখ রহমত আলী জানান, তার ছেলে লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়িতে চালিয়ে যাচ্ছে নিজের শিল্পকর্ম। একটি ছোট ফুলদানি তৈরি করতে ৫০ টাকা ও বড়টি ৮০ টাকা, শহীদ মিনার ১০০ টাকা, ফটোসহ বিভিন্ন ফ্রেম প্রতিটি ৪০ টাকা, প্যাসিফিক টাওয়ার ১৫০ টাকা, তাজমহল ছোট ১০০ টাকা ও বড় ১২০ টাকা, চীনা ঘর ১২০ টাকা, জাপানি ঘর ১২০ টাকা, টুইন টাওয়ার ২৫০ টাকা, কুতুবমিনার তৈরিতে ২৫০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। বিক্রি করা হচ্ছে সামান্য লাভে। দিন দিন এসব পণ্যের চাহিদা বেড়েই চলেছে। রাজধানী ছাড়াও বিভিন্ন এলাকার অভিজাত দোকানের মালিকরা অর্ডার দিচ্ছে। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের অর্ডারের মালামাল পাঠানো হয়। শিশিরের মা জাহানারা বেগম জানান, ভারত ও পাকিস্তানের ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত এসে অর্ডার দিচ্ছে। কিন্তু এতসব তৈরির টাকা আমরা পাব কোথায়। তবে হতাশ নয় শিশির। এগিয়ে চলেছে সে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।