নিজস্ব শেকড়

আমাদের প্রিয় দাদা কেশব গুপ্তের জীবনাবসানের খবর পাই মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখী ঝড়ে বিদ্যুত্ চলে যাওয়া নিবিড় অন্ধকারে। মোবাইল ফোনে মৃত্যুর কথা জানায় জুবায়ের। ক’বছর হলো ঢাকার বাস তুলে কেশবদা ফিরে যান তাঁর নিজস্ব পৈতৃকভিটে ফেনীর পাড়াগাঁয়ে। অশক্ত শরীরের বয়সী দাদার আটপৌরে নিঃসঙ্গ দিনযাপন চলছিল পুরনো বিবর্ণ দেয়াল-ছাদের দুই খোপের ভাড়া বাসায়। বহু বছর হলো তাঁর স্বজনদের স্থায়ীবাস ওপার বাংলায়। এলাকার প্রাচীন বংশের এই তিনি হারিয়ে-ফুরিয়ে অসচ্ছল অবস্থায় থেকে গেছেন স্বভূমিতে। গুণগ্রাহী স্নেহাস্পদ কেউ কেউ সময় খরচের উদ্দেশ্যে কখনো কাকরাইলের পাইওনিয়র রোডে কেশবদার সঙ্গে আড্ডা দিতে আসেন। তাঁদের সঙ্গে থাকে মুখরোচক খানাপিনা। মলিন আলোর মধ্যে এক রাতের ঘটনাময় আড্ডার স্মৃতি সহসা আমার মধ্যে উত্থিত হয়।

রঙ-জ্বলা ক্ষয়াটে কাঠের সিঁড়ি; আর মরচেধরা সরু রডের খরখরে রেলিং নিচ থেকে দোতলায় উঠেছে। দোতলা মানে সেকেলে আমলের চুন-সুরকির বাড়ি—সিলিং থেকে হঠাত্ পলেস্তারার চাক খসে জমিয়ে রেখেছে রুমের অসুস্থতা। ঢাকার ঝকঝকে পালিশময় পাইওনিয়র রোডের সামনে-পাশে আকাশে ঘাড় তোলা বিশাল সরকারি দপ্তর, মোড় ফিরলেই নতুন অ্যাপার্টমেন্ট, কংক্রিট-ইট-কাঠ-টাইলসের জৌলুশের পাশে পুরনো এই বাড়িটা বেমানান, দেখতেও বাজে। শ্রীহীন বাড়ির পেছনের অংশের দোতলার ছোট্ট দু রুমে দাদার একাকী বহু বছরের দিনক্ষয়ী জীবন। বাইরের আলো জামরুল, আমগাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে বারান্দার কাছাকাছি এসে থমকে যায়, ভেতর অব্দি পৌঁছানোর সুযোগ নেই। রুমে সার্বক্ষণিক টিমটিমে বাল্ব জ্বলে; ফ্যাকাসে ওই আলোয় দাদার চেহারার ছায়া দূর হয়েছে কি না বোঝা দুষ্কর। বিছানার ওপর গোটা চারেক বিড়াল আশি-ঊর্ধ্ব নিঃসঙ্গ দাদাকে ঘেরাও করে শুয়ে থাকে, যেন বুড়োর জন্য পাহারার দায়িত্ব নিয়েছে। পায়ে পায়ে ঘোরা বিড়ালগুলো খাওয়ার সময় দাদার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। নিজে প্লেট থেকে খুটে খুটে যা খান, তার চেয়ে বেশি দাদা বিড়ালদের দেন। দুপুরে গুমোটভর্তি রান্নার রুমে হাঁসফাঁস শ্বাস ছড়িয়ে ছুটা কাজের বুয়া রান্না করে—কিসের রান্না, লবণজলের সিদ্ধই বলা যায়। কোনো দুপুরে কোনো রাতে ফাও খাওয়া নিজাম বা সিরাজ এজিবি অফিসের ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার থেকে দাদার টাকায় মাছ-তরকারি কিনে আনে। বাসি তরকারির দাম কম। এমন তরকারি, মলা-ঢেলা-পুঁটি-ট্যাংরা ছোট ছোট মাছ এই বাসায় রোজ ঢুকছে। সিরাজ বা নিজামের বাসার বাজারের ব্যাপারে আগ্রহ খুব। দাদা নির্বিকার। তাঁর পেটভর্তি হলেই ব্যস, অল্পেই খুশি তিনি। নিত্য আয়ু যাপনে বাড়তি কোনো চাওয়া বা সাধপূরণের ইচ্ছা তাঁর নেই। শুধু বনেদি বংশের ফতুর হয়ে যাওয়া এই মানুষটি সেই কবেকার নাছোড় অভ্যাসে সপ্তাহের কোনো কোনো রাতে কয়েক পেগ বিভোর উপযুক্ত রস পেলে মহাখুশি। তাঁর বুড়ো হাড্ডির মোড়ে মোড়ে সামর্থ্য বুঝি চালু হয়। তার তেজে খণ্ড খণ্ড ঘুম জোড়া লেগে মাখো মাখো এক আরাম এনে দেয়। কদমে কদমে এলোমেলো ভাব নেই, হাঁটাচলা বেশ উচিত রকমেরই মনে হয়। নিজেকে তখন আসল দাদাই তিনি ভাবেন। বাড়িওয়ালা জীবত্কালে মান্যিগণ্যি করে তাঁকে দাদা ডেকেছে, তাঁর দু ছেলেরও এখন দাদা তিনি, নিচের অফিসের পিয়ন-দারোয়ান-কেরানি সবার দাদা, দেয়ালের ওধারের ছাউনির বাচ্চাকাচ্চাদের দাদা, সামনে ফুটপাথের টং দোকানদারদের দাদা—সর্বজনের আন্তরিক দাদা সম্বোধনের আড়ালে আসল নাম তাঁর চাপা পড়েছে। সমবয়সী কোনো পুরনো সখা হঠাত্ দেখাসাক্ষাতে এলে কাঠের সিঁড়ির মাথায় চাহনি টেনে নিচে কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করে, ‘কেশব বাবু কি আছেন?’ নিজস্ব চৌখুপিতে নিঃশব্দ আউল এই মানুষটি বেশিরভাগ সময় লোকের চোখের বাইরে থাকলেও ইদানীং তিনি কাহিল শরীর টেনে হলেও গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করছেন। ঘটনা কী? পরিষ্কার কিছু জানা না গেলেও কেউ বলে গাছ, কেউ ধান, কেউ বলে জমি বেচতে তিনি বাড়ি গেছেন। হতে পারে হাতের পাঁচ ফুরিয়েছে। ঢাকায় বসবাসের খরচ আছে না।

পুরো গল্প ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়