হবিগঞ্জ জেলার চিত্র

অনিয়মে বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যসেবা

দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও জনবল সংকটে হবিগঞ্জ জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সাসেবা কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে। ২২ লাখ মানুষের এ জেলায় আধুনিক হাসপাতাল, সদর উপজেলা হাসপাতাল ছাড়াও ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫২টি ইউনিয়ন সাব সেন্টার ও ২০৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সরকারিভাবে এতসব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও চিকিত্সাসেবা পেতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জেলাবাসী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারিভাবে মঞ্জুরিকৃত চিকিত্সকের পদ ১৮৮টি হলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৯৯ জন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। ৭৯টি পদের মধ্যে নার্সের ৩২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অপারেশন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অপারেশন হয় না। প্রতিটি হাসপাতালে দালাল ছাড়া রোগীরা চিকিত্সককে দেখাতে পারেন না। দালাল ও বহিরাগত লোকজন রোগীদের টানা-হ্যাঁচড়া করে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যায়। অনেক হাসপাতালে তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীরা রোগী ভাগিয়ে নেয়ার বাণিজ্য করছে প্রকাশ্যে। তাদের দাপটে কোন কর্মকর্তা কিছু বলার সাহস পর্যন্ত পান না। এদিকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, টিএ-ডিএ’র নামে হাসপাতালগুলোতে লাখ লাখ টাকা লোপাট করা হচ্ছে। ভবন সংস্কারের নামেও টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে। হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতাল:১৯৯৫ সালে চালু হওয়া এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১০০। হাসপাতালে ডাক্তারের ৩৭টি পদের মধ্যে গাইনী বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট, এনেসথেসিয়ার জুনিয়র কনসালট্যান্ট, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার, মেডিক্যাল অফিসার, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, ইএমওসহ ১১টি পদই শূন্য। ৩টি এম্বুলেন্সের মধ্যে ২টি এবং ৪টি এক্সরে মেশিনের মধ্যে ১টি অচল। হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ রোগী আসে। ভর্তি হতে গিয়ে অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিভিন্ন বিভাগে আয়া ও বয়দের দৌরাত্ম্যে সাধারণ রোগীরা তটস্থ থাকেন। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। কেবিনগুলোর অবস্থা শোচনীয়। সরবরাহকৃত খাবারও খুব নিম্নমানের। এ ব্যাপারে হাসপাতালের আরএমও ডা. মহসিন করিম জানান, প্রতিদিন গড়ে তিনগুণ বেশি রোগী এবং তাদের স্বজনরা হাসপাতালে অবস্থান করায় অনেক সময় তারা ওয়ার্ড এবং হাসপাতাল প্রাঙ্গণ নোংরা করে ফেলেন। হাসপাতালের প্রধান গেটের পাশে বেশকিছু বেআইনি দোকান-পাট গড়ে উঠেছে। এছাড়া হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রয়েছে ফেরিওয়ালাদের দাপট। ইদানিং বেদে সমপ্রদায়ের কিছু নারীকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে তন্ত্র-মন্ত্র ফুঁকে মানুষদের প্রতারিত করতে দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পদটি শূন্য থাকায় সিভিল সার্জন এ দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার লক্ষ্যে নতুন ভবন নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান। বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স:৩১ শয্যার এই উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও এর অধীন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ডাক্তারের ২০টি পদের মধ্যে ১৩টি বর্তমানে শূন্য। কর্মরত ডাক্তারদের মধ্যে ১জন প্রশিক্ষণে এবং অপরজন অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। নার্সের ৯টি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য। ২টি এম্বুলেন্সের মধ্যে ১টি এবং ২টি এক্সরে মেশিনের মধ্যে ১টি অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩১ শয্যার এই হাসপাতালে ডাক্তারের ১৪টি পদের মধ্যে ৬টি পদ শূন্য। এছাড়া আজমিরীগঞ্জ ও কাকাইলছেও উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ২জন চিকিত্সক অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। নার্সের ১১টি পদের মধ্যে ৭টি পদ শূন্য। বৃহত্তর সিলেটের ভাটি অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসাবে খ্যাত আজমিরীগঞ্জ হাসপাতালে নিকটবর্তী জেলাগুলো থেকেও প্রচুর রোগী আসে। কিন্তু যথাযথ চিকিত্সা সেবা না পেয়ে তাদেরকে ফিরে যেতে হয়। নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: বিপুল সংখ্যক প্রবাসী অধ্যুষিত নবীগঞ্জ হাসপাতালে ডাক্তারের ২২টি পদের মধ্যে ১২টি শূন্য। নার্সের ১০টি পদের মধ্যে ৩টি শূন্য। হাসপাতালে আশানুরূপ চিকিত্সা না পেয়ে রোগীদের একটি বড় অংশ মৌলভীবাজার কিংবা সিলেটে যেতে বাধ্য হন। লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: লাখাই হাসপাতালে ডাক্তারের ১৫টি পদের মধ্যে ৭টি শূন্য। কর্মরতদের মধ্যে ১জন ডাক্তার প্রশিক্ষণের জন্য অন্যত্র অবস্থান করছেন। নার্সের ১১টি পদের মধ্যে ৫টি শূন্য। কর্মরতদের মধ্যেও ২জন প্রেষণে অন্যত্র অবস্থান করছেন। হাসপাতালের একমাত্র এম্বুলেন্স ও এক্সরে মেশিনটি মেরামতের অযোগ্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৫০ শয্যা এই হাসপাতালে ডাক্তারের ৩২টি পদের মধ্যে ১৭টি শূন্য। মনতলা, জগদীশপুর, ছাতিয়াইন, বাগাসুরা, বুল্লা ও চৌমুহনী ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোন ডাক্তার নেই। নার্সের ১৫টি পদের মধ্যে ৮টি শূন্য। কর্মরতদের মধ্যে ১জন অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। ২টি এম্বুলেন্সের মধ্যে ১টি মেরামতের অযোগ্য। এ উপজেলার বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিত্সা সুবিধা নিতে পাশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় কিংবা ঢাকায় চলে যান। চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স:৫০ শয্যার এই হাসপাতালেও ডাক্তারের ১৯টি পদের মধ্যে ১০টি শূন্য। রাজারবাজার, আহমদাবাদ, পাইকপাড়া, শানখলা, উবাহাটা, সাটিয়াজুরী ও গাজীপুর উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোন ডাক্তার নেই। কর্মরতদের মধ্যে জুনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনী সাময়িকভাবে বরখাস্ত ও রাণীগাঁও উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তার অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। নার্সের ১১টি পদের মধ্যে ১টি পদ শূন্য রয়েছে। আর ২টি এম্বুলেন্সের মধ্যে ১টি সচল রয়েছে। বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: বাহুবল হাসপাতালে ৫০ শয্যা থাকলেও ডাক্তারের ১২টি পদের মধ্যে ৭টি শূন্য। লামাতাশী উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোন চিকিত্সক নেই। নার্সের ১১টি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য। কর্মরতদের মধ্যে ১জন প্রেষণে ঢাকায় কর্মরত। ২টি এম্বুলেন্সের মধ্যে ১টি সচল। হবিগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: সদর উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তারের ১৩টি পদের মধ্যে রাজিউড়া, লস্করপুর ও লুকড়া উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডাক্তারের ৩টি পদ শূন্য। এছাড়া কর্মরতদের মধ্যে ১জন ডাক্তার দীর্ঘদিন যাবত কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। সিভিল সার্জন অফিস: জেলা সিভিল সার্জন অফিসে ডাক্তারের ৪টি পদের মধ্যে ১টি পদ শূন্য। এছাড়া ১জন ডাক্তার অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এসব ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দিন ভূইয়া জানান, চিকিত্সা ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য হাসপাতালগুলোর তুলনায় হবিগঞ্জ ভাল অবস্থানে রয়েছে। গর্ভবতী মা ও শিশুদের চিকিত্সার ক্ষেত্রে হবিগঞ্জ পুরষকৃতও হয়েছে। হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে বড়-ছোট অস্ত্রোপচার হচ্ছে। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন শতাধিক রোগীর চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। জেলার সব সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করার জন্য তিনি তত্পর রয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলায় ক্লিনিক ব্যবসা অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তারপরও তাদের চিকিত্সা সেবার মান যাতে ভাল থাকে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।