নৌপথে ঢাকা ছাড়বে ৩০ লাখ মানুষ
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৪
এবার ঈদে নৌপথে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ঘরে ফিরবে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআইডব্লিউটিএ। তাই টিকিট নিয়ে মহাসংকট সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চের টিকিটের জন্য ঘরমুখো হাজারো মানুষ এখন ভিড় করছেন সদরঘাট টার্মিনালে। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে লঞ্চের অগ্রিম টিকেট গত রবিবার থেকে বিক্রি শুরু হলেও সংকট কাটছে না, বরং তা ঘনীভূত হচ্ছে।
প্রতিদিন শত শত মানুষ সদরঘাটে লঞ্চের অগ্রিম টিকিটের জন্য ভিড় জমাচ্ছেন। প্রথম দিনেই অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হতে না হতেই তা শেষ হয়ে যায়। বিশেষ করে কোন ভাবেই লঞ্চের কেবিনের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে টিকিট প্রত্যাশীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। টিকিটের জন্য রীতিমতো হাহাকারের সৃষ্টি হয়। চড়া দামেও মিলছে না টিকিট। গত মঙ্গলবার সদরঘাট টার্মিনাল ঘুরে এই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।
অবৈধ ট্রাভেল সিন্ডিকেট আর একশ্রেণীর কালোবাজারিদের হাতে টিকেট চলে গেছে বলে দক্ষিণাঞ্চলের নদী পথে চলাচলকারী যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। আর নৌমন্ত্রী শাজাহান খান অতিরিক্ত যাত্রীর ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন করলে লঞ্চ মালিকদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে যাত্রী সংকট নিরসনে আজ বৃহস্পতিবার থেকে ঈদের বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু হচ্ছে। এই সার্ভিসে ১৮টি লঞ্চ যুক্ত হয়েছে । সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ ট্রাভেল সিন্ডিকেটের সদস্যরা ইতিমধ্যে লঞ্চের টিকিটের বড় একটি অংশ কিনে নিয়েছেন। ওই সব টিকেট তারা অতিরিক্ত অর্থে বিক্রি করছেন। এরপর যা টিকিট রয়েছে, তা মূলত সরকারি কর্মকর্তা ও ভিআইপিদের আত্মীয়-স্বজনদের জন্য রেখে দেয়া হয়েছে। এ কারণে সাধারণ যাত্রীরা লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে ঘুরেও কোনো টিকিট পাচ্ছেন না। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ঈদে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষ। সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, লঞ্চের অগ্রিম টিকিট দেয়ার ঘোষণা হলেও ওই টিকিট সাধারণ যাত্রীরা পায় না। আগে থেকে নিজস্ব ও পরিচিতদের নামে বরাদ্দ দিয়ে রাখে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। সেখান থেকে কালোবাজারে চলে যায় টিকিট।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল সূত্র জানায়, দক্ষিণাঞ্চলভিত্তিক ঢাকা-বরিশাল রুটের সৌরভী, পারাবত, কীর্তনখোলা, অগ্রদূত প্লাসের কেবিনের অগ্রিম টিকিট ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। একই কথা জানান, বরিশাল, ভোলা, ভান্ডারিয়া, শিকারপুর, চৌধুরীরহাট, মিরেরহাট, বানারীপাড়া, ইন্দ্রেরহাট, কাউখালী, হুলারহাট, পিরোজপুর ও চাঁদপুরগামী লঞ্চ এমভি তরীকা, সুন্দরবন, আগরপুর নেভিগেশন কোং, রাজদূত, সুরভি, টিপু, পূবালী ও ময়ুরী লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।
টিকিট প্রত্যাশী মো.আবুল কাশেম ইত্তেফাককে জানান, তিনি ২৬ ও ২৭ জুলাইয়ের টিকিট নেয়ার জন্য লঞ্চের বুকিং অফিসে ঘুরেছেন কিন্তু পাননি। টিকিট নেই । এমন সব তথ্য দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। একই অভিযোগ করেন মো. জাকির হোসেন, নূরুল ইসলাম, শোয়েব রহমানসহ অনেকে।
বিলাস বহুল সুরভী লঞ্চের মালিকদের একজন মো. রিয়াজউল কবির বলেন, লঞ্চের অগ্রিম টিকিটের জন্য স্লিপ নেয়া হয়েছে। স্লিপ নেয়া টিকিট ২০ জুলাই থেকে দেয়া শুরু হয়েছে।
কীর্তনখোলা লঞ্চের সুপারভাইজার মো. শমসের হোসেন বলেন, তাদের লঞ্চের অগ্রিম টিকিট মালিক পক্ষ দিয়েছে।
সুন্দরবন লঞ্চের কাউন্টার থেকে দেবাশীষ জানান, আগে থেকেই স্লিপ নেয়া শুরু হয়েছে। স্লিপের বাইরে ঈদের অগ্রিম টিকিট দেয়ার সুযোগ নেই।
সুন্দরবন লঞ্চের মালিক বরিশাল শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি সাইদুর রহমান জানান, সাধারণ সময় ছয়টি লঞ্চ চললেও ঈদে যাত্রী চাপ সামাল দিতে ১৩টি লঞ্চ দিনে দুবার ট্রিপ দেবে।
বিআইডব্লিউএ চেয়ারম্যান মাহবুব উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ঈদের এক সপ্তাহ আগে লঞ্চের টিকিট বিক্রি শুরু হবার কথা, সে মোতাবেক গত রবিবার থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। টিকিট বিক্রি শেষ হয়ে গেছে এমন তথ্য আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
বিআইডব্লিউটিএ’র ভাইস-চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন মিলন বলেন, লঞ্চের কেবিন টিকিটের চাহিদা ১০ হাজার। কিন্তু এর বিপরীতে কেবিন টিকিট রয়েছে মাত্র আড়াই হাজার। ফলে এটি মেইনটেন করা খুবই কঠিন। তাছাড়া অধিকাংশ কেবিন অন্তত দুই মাস আগেই বুক হয়ে গেছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম-পরিচালক সাইফুল হক খান বলেন, টিকিট বিক্রির বিষয়টি লঞ্চের মালিকদের উপর নির্ভর করে। কারণ তাদের সঙ্গে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়েই ২০ জুলাই থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ৪৪টি নৌপথে ১৮০ টি লঞ্চ যাতায়াত করছে। প্রতিটি লঞ্চের ধারণক্ষমতা কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ হাজার। কেবিন সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বরিশাল ও পটুয়াখালীর যাত্রীদের জন্য এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তবে টার্মিনালের সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে তিনি জানান।
সদরঘাট পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তা এসআই শামসুল আলম বলেন, সদরঘাট টার্মিনালের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। টার্মিনালে সার্বক্ষণিক র্যাব মোতায়েন আছে। কোন ধরনের অঘটনের খবর পাওয়া যায়নি। যদি কোনো ধরনের অভিযোগ পাই তবে ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ড. শামছুদ্দোহা খন্দকার ইত্তেফাককে বলেন, বিআইডব্লিউটিএ ঈদের পাঁচ দিন আগ থেকে ১০ দিনের জন্য স্পেশাল লঞ্চ সার্ভিস চালু করছে। এবার অন্তত ৩০ লাখ যাত্রী লঞ্চের মাধ্যমে রাজধানী ছেড়ে যাবে। আর ১৮০টি লঞ্চ এসব ঘরমুখো মানুষদের বহন করবে। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আজ থেকে ঈদের বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু হবে। এ সার্ভিসে এ বছর ১৮টি নতুন লঞ্চ যুক্ত হচ্ছে। যে কোন ধরনের দুর্ঘটনারোধে উদ্ধারকারী যানও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাত্রী নিরাপত্তা ও কালোবাজারে টিকিট বিক্রি বন্ধে টার্মিনালগুলোতে আনসারের পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা নিয়োজিত আছে।
অতিরিক্ত যাত্রীর ব্যাপারে নৌমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি
নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন করলে লঞ্চ মালিকদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বেঙ্গল শিপিং কোম্পানির এমভি মিতালি-৪ উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, লঞ্চ মালিকরা যাতে ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী বহন না করতে পারে তা তদারকি করতে ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট থাকবে। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড স্পিডবোটের মাধ্যমে নদীপথে টহল দেবে। তিনি বলেন, নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরতে চাইলে আপনারা অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে উঠবেন না।
লঞ্চে কেবিন স্বল্পতার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে অনেক মানুষ নদীপথে চলাচল করে। ওদের চাহিদার তুলনায় কেবিন অপ্রতুল। এ কারণেই কেবিন দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তিনি লঞ্চ মালিকদের কেবিন বাড়ানোর জন্যও আহ্বান জানান।