‘সাঙ্গার সঙ্গে আমার প্রতিযোগিতা ছিল’

গত বৃহস্পতিবার ক্যারিয়ারের ৩৪তম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। তিনি বলেছেন, আজ আমি দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করেছি। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ শেষেই টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন আগেই তিনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের শেষ ম্যাচে ভেন্যু পরিবর্তন না হলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চলমান টেস্টই সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবে নিজের শেষ ম্যাচ হয়ে যেত মাহেলার। মাহেলার বিদায়টাকে স্মরণীয় করতেই পাকিস্তান ক্রিকেটের সঙ্গে আলোচনা করে তার বিদায়ী টেস্ট ম্যাচটা অন্যত্র সরিয়ে এনেছে শ্রীলংকান ক্রিকেট বোর্ড। অর্থাত্ নিজের ঘরের মাঠ সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবেই নিজের বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মাহেলা। আগামী ১৪-১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে খেলাটি। ১৯৯৭ সালে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হওয়ার পর ১৮ বছরে ক্যারিয়ারে অনেক মাইল ফলক স্পর্শ করেছেন ৩৭ বছর বয়সী এ তারকা ক্রিকেটার। ডেইলি মিরর পত্রিকায় দেয়া এক একান্ত সাক্ষাত্কারে নিজের ক্যারিয়ার, অবসর, বন্ধু কুমার সাঙ্গাকারা, শ্রীলংকায় ক্রিকেটের ভবিষ্যত এবং অবসরের পর নিজের ভাবনা বিষয়ে কথা বলেছেন মাহেলা। তার সাক্ষাত্কারটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো। প্রশ্ন: সব ভাল কিছুরই শেষ আছে। কিন্তু আপনার অবসর মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে (ওয়ানডেতে) ফর্ম না থাকাটা কি আপনার এমন সিদ্ধান্তের পিছনে ভূমিকা রেখেছে? মাহেলা: আদৌ না। আমার টেস্ট ফর্ম ভালই আছে। গত ছয় টেস্টে আমি ৭০০ রান করেছি এবং জয়ী হওয়া অধিকাংশ ম্যাচেই অবদান রেখেছে। এর সঙ্গে আমার অবসরের সিদ্ধান্তের কোন সম্পর্ক নেই। ইংল্যান্ড, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে রান করেছি। অবশ্যই ওয়ানডে ক্রিকেটে আমার ফর্মটা ভাল যাচ্ছে না এবং আমি আরো ধারাবাহিক হতে চাই। অনেক বড় ম্যাচে আমি অবদান রেখেছি। কিন্তু ধারাবাহিক নয়। আমার মনে হয়েছে আজ আমি ক্যারিয়ারে যেখানে এসেছি, আমি যা করেছি এবং যে মানদন্ড সৃষ্টি করেছি সব কিছুই ভবিষ্যতের জন্য। আমার মনে হয়েছে এখন নতুন প্রজন্ম আসছে। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ এখন অনেক বেশি পরিপক্ক এবং ভাল কিছু তরুণ খেলোয়াড় দলে এসেছে সুযোগ দেয়ার সময়। সুতরাং আমার দায়িত্ব শেষ। প্রশ্ন: সিদ্ধান্তটা কতটা কঠিন ছিল? মাহেলা: সিদ্ধান্তটা খুবই কঠিন ছিল। তবে আমি জানতাম অবসর নেয়ার সিদ্ধান্তটা পুরোপুরিই আমার এবং অন্য কারো নয়। অবশ্যই আমি কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। বিষয়টা এমন নয় যে তারা আমাকে কনভিন্স করেছে। তবে আমি তাদেরকে আমার অবস্থা সম্পর্কে বলেছি এবং তাদের মতামত জানতে চেয়েছি। কিন্তু সিদ্ধান্তটা ছিল আমার নিজের। প্রশ্ন: প্রথমে কার সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং তার পরামর্শ কি ছিল? মাহেলা : এটা ছিল আমার স্ত্রী এবং আমার মা-বাবা, যারা দীর্ঘদিন যাবত আমার পাশে রয়েছেন। এটা তাদেরকে রাজি করানোর বিষয় ছিল না। তবে তাদেরকে আমি আমার মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করেছি। আমি জানতাম সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রশ্ন: একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে আপনার টেস্ট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কি ছিল? মাহেলা: আমি মনে করি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আছে। বেশ কিছু ভাল খেলোয়াড়সহ গত কয়েক বছরে আমাদের ভাল কয়েকটি অর্জন ছিল। সনাত্ জয়সুরিয়া অধিনায়ক থাকাকালীন আমরা এক নাগারে ১১ ম্যাচে জয় পেয়েছি। তারপর ২০০৫-২০০৮ পর্যন্ত আমাদের বেশ ভাল সময় গেছে। পরিবর্তনের জন্য এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমরা ক্রিকেট সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলাম, আমিও যার অংশ ছিলাম। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে আমরা তাদেরকে, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে এবং ইংল্যান্ডের মাটিতে কয়েকটি ম্যাচে পরাজিত করেছি। সেখানে ব্যক্তিগত কিছু ছিল না, পুরোটাই দলীয় সাফল্য। ব্যক্তিগত অর্জন বলতে গেলে লর্ডসে আমি সেঞ্চুরি পেয়েছি। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আমি ৩৭৪ রান করেছি। সম্ভবত এগুলোই ছিল আমার উলেল্লখযোগ্য বিষয়। প্রশ্ন: উল্লে¬খ করার মত সবচেয়ে খারাপ স্মৃতি? মাহেলা: অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলক একটি ম্যাচে জয়ী হতে পারা। প্রতিবারই আমরা সেখানে গিয়ে জয়ের কাছাকাছি এসেছি কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। আমার টেস্ট ক্যারিয়ারে অন্যতম হতাশা এটি। প্রশ্ন: এই দীর্ঘ সময় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকতে কিভাবে আপনি নিজকে ধরে রেখেছেন? মাহেলা: আমি মনে করছি এটা ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রাণিত হবার চেয়ে আপনি আপনার দেশের হয়ে খেলছেন— সেটা জানাটাই যথেষ্ট। আমার দেশের হয়ে খেলার জন্য সব কিছু করছি—আমি মনে করি এটাই সবচেয়ে সম্মানের বিষয়। এটাকেই সারাজীবন প্রাধান্য দিয়েছি আমি আর এটাই নির্দিষ্ট মান বজায়ে রাখতে আমাকে উত্সাহিত করেছে। প্রশ্ন: ব্যাট হাতে শেষ কয়েক বছর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে পারলে আপনিই টেস্ট ক্রিকেটে শ্রীলংকার সর্বোচ্চ রানের মালিক হতে পারতেন। বন্ধু সাঙ্গাকারার কাছে সেটা হারিয়ে আপনার কোন আক্ষেপ আছে? মাহেলা: আদৌ না। গত ৭/৮ বছরে সে যা অর্জন করেছেন সেটা বিস্ময়কর। তিনি এবং অরবিন্দ ডি সিলভা, সনাত্ জয়সুরিয়া, মুত্তিয়া মুরলিধরন, চামিন্দা ভাস এবং এই প্রজন্মে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের মত কিছু ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলাটাই ছিল অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। সাঙ্গার কিছু অর্জন দেখাটাই ছিল দারুণ আনন্দের। সে যা অর্জন করেছেন তা স্বপ্নের মত। মূলত আমরা এক অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতাম। দু’জনের মধ্যে বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো এবং এটা দলের সাফল্যে অবদান রাখত। আপনি তার রানের দিকে লক্ষ্য করলে দেখবেন তিনি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। তার অর্জনে আমি খুশি। প্রশ্ন: ২০০৯ সালে আপনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়েছেন, অধিনায়কত্ব ছেড়ে একজন সাধারণ খেলোয়াড় হওয়াটা কতটা কঠিন ছিল? মাহেলা: এটা কঠিন কিছু ছিল না। আমি সব সময়ই বিশ্বাস করেছি আপনাকে প্রথমে খেলোয়াড় হতে হবে। কেননা অধিনায়কের চেয়ে সব সময়ই একজন খেলোয়াড় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং অধিনায়কত্ব ছাড়াটা আমার কাছে খুবই সহজ ব্যাপার ছিল। পরিবর্তনের সময়টা ছিল খুবই মসৃন এবং সেখানে সমস্যা হয়নি। প্রশ্ন: শ্রীলংকার একজন ক্রিকেটার হিসেবে আপনার সব চেয়ে বড় সন্তুষ্টি কি? মাহেলা: ভক্তরা। আমরা সম্ভবত বিশ্বের সেরা ভক্ত পেয়েছি। তারা খেলা বুঝে, খুবই ধৈর্য্যশীল এবং তাদের সমর্থন পেতে কোন কিছুর বিচ্যুতি ঘটেনি। আমার দেশের জন্য খেলাটা আমি উপভোগ করেছি। প্রশ্ন: আপনি একজন বিতর্কহীন খেলোয়াড় এবং অধিনায়ক ছিলেন যাকে বিশ্বের সবাই শ্রদ্ধা করত। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে আপনার মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা গেছে । আপনি আগ্রাসী এবং বিতর্কিত হয়ে পড়লেন। এটা কিভাবে ঘটল? মাহেলা: আদৌ না। এমনকি আমি যখন তরণ ক্রিকেটার ছিলাম তখনও আমি খুবই আক্রমাত্মক ছিলাম। হতে পারে জনগণ আমার এ দিকটা দেখতে পায়নি। প্রতিপক্ষ কিছু বললে সব সময়ই আমি তাদের কিছু ফিরিয়ে দেব। সব সময়ই আমি মাঠে কেউ কথা বললে তাকে পাল্টা উত্তর দিয়ে এসেছি। এমনকি সংবাদ সম্মেলনেও আমি উচ্চস্বরে কথা বলতাম। টিম মিটিংয়েও নির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্তে আমি আক্রমণাত্মক ছিলাম। আমার খেলোয়াড়ি জীবনের প্রথম দিকে যখন খেলোয়াড়দের অধিকার এবং ইমেজ স্বত্ব এলো তখনও গণমাধ্যমের সঙ্গে আমার অনেক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। সেটা করতে পেরে আমি খুশি। যখন দরকার ছিল তখন এমন ধরনের আবেগ আমার মধ্যে ছিল। তবে অন্য সময়ে আমি ধৈর্য্যশীল এবং সমন্বয়ে বিশ্বাসী। আমি মনে করি ঐ আগ্রাসনটা আমার দরকার ছিল। প্রশ্ন: পিছনের দিকে তাকালে আপনার কি মনে হয় যে একজন অধিনায়ক আপনাকে কোন কিছুতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে? মাহেলা: মোটেই না। জয় এবং পরাজয় থেকে আমি অনেক কিছুই শিখেছি। যে কারণে বছর বছর আমার নিজের এবং দলের উন্নতি হয়েছে। ভাল ক্রিকেটার হতে সব কিছুই আমাদের সাহায্য করেছে। উত্থান-পতন, খারাপ-ভাল সময়, জয়-পরাজয় পুরো ক্যারিয়ারেই আমার বিশেষ কিছু অর্জন ছিল । সব কিছুই আজ আমাকে এখানে আসতে সাহায্য করেছে। প্রশ্ন: স্কুল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত খেলোয়াড়দের পরিবর্তনকালীন সময়টা আরো ভাল করার জন্য শ্রীলংকার করা উচিত-এমন কিছু আপনার দৃষ্টিতে আছে কিনা? মাহেলা: বছর বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানের উন্নতি হচ্ছে। আমি ১৮ বছর যাবত খেলছি এবং অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। মানসিকতা এবং ফিটনেসের স্তরে পরিবর্তন এসেছে। সুতরাং অসাধারণ মেধা না থাকলে একজন স্কুল ছাত্রের জন্য এটা সহজ নয়। আমাদের চেষ্টা করতে হবে পরিবর্তনের। বিশেষ করে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে। আমি সব সময়ই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছি। আমি মনে করি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মান আরো বাড়ানো উচিত। সংখ্যার চেয়ে খেলোয়াড়দের মানের দিকে আমাদের নজর দেয়া উচিত যাতে পরিবর্তনটা মসৃনভাবে হয়। এ ক্ষেত্রে সকলের নজর দেয়া উচিত।