সেকালের ঈদ একালের ঈদ
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৪
কেমন ছিল চারশ’ বছর আগে ঢাকার ঈদ উদযাপন? ইতিহাসবিদরা নানা তথ্য দেন এ প্রসঙ্গে। চারশ’ বছর আগে ঢাকায় নির্মিত হয়েছিল ধানমন্ডি ঈদগাহ। কালের সাক্ষী হয়ে সেই ঈদগাহ এখনো প্রতি বছর সরগরম হয়ে ওঠে দুই ঈদে। শহরের কলেবর ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এখানে ঈদগাহ’র সংখ্যা বেড়েছে। নির্মিত হয়েছে জাতীয় ঈদগাহ। কিন্তু সবকিছুই সেই চারশ’ বছর আগের ঈদ উদযাপনের ধারাবাহিকতা।
এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদরা বলেন, গত ৪০০ বছরে ক্রমে ঈদের জৌলুস বেড়েছে। মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে ঈদ তেমন জমজমাট ছিল না। দেশভাগের পর তা একটি অবয়ব পায়। এখনতো ঈদকে ঘিরে একটি অর্থনীতি তৈরি হয়েছে।
ইতিহাসবিদরা বলেন, আমাদের জনসংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে সম্পদ, যোগাযোগ ও প্রযুক্তির ব্যবহার। ফলে পাল্টে গেছে ঈদ উদযাপনের চিত্র।
ঈদকে উত্সবে পরিণত করার সামর্থ্য
অধিকাংশ মুসলমানের ছিল না...
ইংরেজ শাসনামলে এ অঞ্চলে সবচেয়ে ধুমধামে উদযাপিত হতো ক্রিসমাস বা বড় দিন। এরপর দুর্গাপূজা। এই দুটি উত্সবের জন্য ছুটি বরাদ্দও ছিল বেশি। তখন মুসলমান চাকরিজীবীরা ঈদের ছুটি বাড়ানোর আবেদন করলেও কাজ হয়নি। ইংরেজ শাসকরা গুরুত্ব দেয়নি মুসলমানদের দিকে। মুনতাসির মামুন তার ‘ঢাকা সমগ্র-১’ গ্রন্থে লিখেছেন, সেই সময় ঈদকে উত্সবে পরিণত করার মতো সামর্থ্যও গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মুসলমানের ছিল না। এছাড়া বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাও একটি কারণ ছিল।
ঈদের সবচেয়ে পুরনো বর্ণনা পাওয়া যায় মির্জা নাথানের লেখায়। মির্জা নাথান ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতিনিধি সুবেদার ইসলাম খাঁর সেনাপতি। সুবেদার ইসলাম খাঁ ১৬১০ সালে ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। রমজান সম্পর্কে নাথান তার ‘বাহারস্থান ই-গায়বী’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সন্ধ্যায় মোমবাতির আলোয় যখন নতুন চাঁদ দেখা গেল তখন শিবিরে বেজে উঠল শাহী তুর্য এবং একের পর এক গোলন্দাজ বাহিনী ছুঁড়তে থাকে গুলি, যেন তা আতশবাজি। সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত চলে এ আতশবাজি।’
আহসান মঞ্জিলকে ঘিরে নগরবাসী চাঁদ দেখা উত্সব পালন করত...
উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে ঢাকার আহসান মঞ্জিলের নবাবগণও জাঁকজমকপূর্ণভাবে ঈদ উদযাপন করতেন। এমন তথ্যই জানা গেছে, ‘যুগে যুগে ঢাকায় ঈদ মিছিল’- গ্রন্থে উল্লেখিত নবাব আহসানউল্লাহর ডায়েরি থেকে। তখন আহসান মঞ্জিলকে ঘিরে নগরবাসী চাঁদ দেখা উত্সব পালন করত। আহসান মঞ্জিলের ছাদে বসে নবাববাড়ির সদস্যরা প্রথম চাঁদ দেখে কামান দাগিয়ে কিংবা আতশবাজি পুড়িয়ে তা জনগণকে জানাত। এ আওয়াজ শুনে তারা নিশ্চিত হতেন ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। এরপর শুরু হতো কুশল বিনিময়। জানা যায়, নবাব স্যার খাজা আব্দুল গনির (১৮১৩-১৮৯৬ খ্রি.) সময় থেকে চাঁদ দেখা, ঈদ উত্সব পালন ও ঈদ মিছিল শুরু হয়। এরপর নবাব আহসান উল্লাহ (১৮৪৬-১৯০১ খ্রি.) ও নবাব সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫ খ্রি.) প্রমুখ ঢাকার চাঁদ দেখা ও ঈদ মিছিল পালন করেছেন।
তোড়াবন্দি খাবার ছিল বিখ্যাত...
ঈদে আকর্ষণের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে খাবার। পুরনো রমজান ও ঈদের এই খাবার নিয়ে আছে অন্যরকম দুর্বলতা। রমজানে ঘরে অনেক রকম ইফতারি থাকলেও সবাই একবার চকে ছুটে যেতেন। চকের ইফতারির বিভিন্ন পদের মধ্যে ছিল বাকরখানি, চাপাতি, নানরুটি, কুলিচা, নানখাতাই, শিক কাবাব, হান্ডি কাবাব, মাছ ও মাংসের কোপ্তা, শামী ও টিকা কাবাব, পরটা, বোগদাদি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবত ও নানারকম ফল। চক এখনো খাবারের এ ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।
এছাড়া ঈদে ‘তোড়াবন্দি’ খাবার ছিল বিখ্যাত। এই খাবারে থাকত চার রকমের রুটি, চার রকমের পোলাও, চার রকমের কাবাব, পনির, বোরহানি, চাটনি- অর্থাত্ প্রত্যেক পদের চার রকমের খাবার দিয়ে সাজানো হতো। এছাড়া কমপক্ষে ২৪টি পদ থাকতো।
১৬৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত ধানমন্ডি ঈদগাহ মাঠে এখনো ঈদের জামাত হয়
ঢাকার প্রথম পরিকল্পিত ঈদগাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ১৬৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত সাত মসজিদ রোডের ধানমন্ডি ঈদগাহকে। আ. ম. ম. শরফুদ্দীন অনূদিত মুনশী রহমান আলী তায়শের ‘তাওয়ারিখে ঢাকা’ গ্রন্থের বরাত দিয়ে ‘ঢাকা সমগ্র ১’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বাংলার সুবেদার শাহ সুজার আমলে তার আমাত্য মীর আবুল কাসেম এই ঈদগাহ নির্মাণ করেছিলেন।
তবে প্রাচীনত্ব বিবেচনায় এগিয়ে আছে ১৪৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নারিন্দার বিনত বিবির মসজিদ। এটি ঢাকার প্রথম মসজিদ। এখানে ঈদের জামাত হতো বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। বাংলার সুলতান ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে ১৪৮০ সালে মিরপুরে নির্মিত হয়েছিল একটি মসজিদ। যেখানে গড়ে উঠেছে হজরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.)-এর মাজার। এখানেও কয়েকশ’ বছর ধরে বড় আকারের ঈদের জামাত হয়ে আসছে। বর্তমানে ঢাকা শহরে ঈদের নামাজের সবচেয়ে বড় জামাত হয় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত জাতীয় ঈদগাহে। এছাড়া জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম ছাড়াও রাজধানীর ৩৬২টি ঈদগাহে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
ঈদ মিছিল ছিল প্রধান আকর্ষণ
দেড়-দুইশ বছর আগে ঢাকার ঈদ উত্সবে প্রধান আকর্ষণ ছিল ঈদ মিছিল। খুব সম্ভবত: অষ্টাদশ শতকে নায়েবে নাজিমদের নিমতলি প্রাসাদে এসে বসবাস শুরু করার সময় থেকে এ মিছিল শুরু হয়। তবে ঈদ মিছিল বন্ধ হয়ে যায় ১৯৫৪ সালে। আবার শুরু হয় নব্বই দশকের শুরুতে।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে আলম মুসাওয়ার নামে এক শিল্পী ঢাকার ঈদ ও মুহররম মিছিলের ৩৯টি ছবি এঁকেছিলেন। বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে এই চিত্রকর্মগুলো সংরক্ষিত আছে। এ চিত্রমালা দেখলে নবাবী আমলের ঢাকার মুহররম ও ঈদ মিছিলের বর্ণাঢ্য রূপ ও ব্যাপকতা বোঝা যায়। মিছিল নায়েবে নাজিমদের বাসস্থান নিমতলি প্রসাদের ফটক থেকে বিভিন্ন পথ ঘুরে, চকবাজার, হুসেনি দালান হয়ে মিছিল মূল জায়গায় এসে শেষ হতো। মিছিলে থাকত নানা সাজে সজ্জিত হাতি, উট, পালকি ইত্যাদি। মিছিলের সামনের সারিতে নায়েবে নাজিম নুসরাত জং হাতির পিঠে বসতেন। বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ছিল কাড়ানাকাড়া শিঙা। রঙ-বেরঙের নিশান মিছিলের রূপ যেন খুলে দিত। দর্শকরা সারি বেঁঁধে থাকতেন রাস্তার দু’পাশের ছাদে।
এছাড়া ঈদের মেলা হতো চকবাজারে এবং রমনা ময়দানে। আশরাফ-উজ-জামান তার আত্মজীবনীমূলক এক নিবন্ধে এই মেলার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মেলায় কাঠের খেলনা, ময়দা এবং ছানার খাবারের দোকান বসতো সুন্দর করে সাজিয়ে। কাবলীর নাচ হতো বিকেল বেলা।
খোলা জায়গার অভাবে এখন ভিক্টোরিয়া পার্কের কলতাবাজারসংলগ্ন এলাকা, নয়াবাজারের পার্কসংলগ্ন এলাকা, শাহজাহানপুর কলোনির মাঠ, শ্যামপুর, ধুপখোলা মাঠসহ বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ঈদমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
একালের ঈদ
যান্ত্রিকতার কারণে এখন অনেকটাই বদলে গেছে ঈদ উত্সব। শুধু তাই নয়, ঈদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বড় অর্থনীতি।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ইত্তেফাককে বলেন, আজ আমরা যে ঈদের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করি বা যে ঈদকে দেখি আমাদের একটি বড় উত্সব হিসেবে, তা চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের ঐতিহ্য মাত্র। এই সময়ে আমাদের জনসংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে সম্পদ, যোগাযোগ ও প্রযুক্তির ব্যবহার। ফলে পাল্টে গেছে ঈদ উত্সবের চিত্র।
ওয়ারীর প্রবীণ বাসিন্দা (৮২) আকবর হোসেন বলেন, ৫০/৬০ বছর আগে ঈদ আজকের মতো এত জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। আমরা কেনাকাটা করতাম চাঁদরাতে সদরঘাট গিয়ে। এত মার্কেটও ছিল না তখন। এখনতো মানুষ বিদেশে গিয়েও কেনাকাটা করে। সেইসাথে বদলে গেছে ঈদ উদযাপনের ধরনও। মধ্যবিত্তশ্রেণী ব্যস্ত টেলিভিশনে ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান দেখতে। আর উচ্চবিত্তশ্রেণীর একটি অংশ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে বেড়াতে যাচ্ছেন বিদেশে। পেছনে পড়ে থাকছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা রীতিনীতি, সংস্কৃতি।