বৈরী আবহাওয়ায় নৌপথ

ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেই

ঈদে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বাড়ি ফিরতে প্রধান ভরসা নৌপথ। এবার ঈদ হচ্ছে বর্ষা মৌসুমে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নদী থাকবে উত্তাল, ঝড়ো হাওয়া বইতে পারে যেকোনো সময়। ঈদ ও বর্ষা এক সঙ্গে আগমনের ফলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদে ঘরে ফেরা নিয়ে দেখা দিয়েছে আশঙ্কা। তাছাড়া ডুবো চরও আতংকের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাই নৌপথে যাত্রী পরিবহনে বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে এই উদ্বেগের কোনো ছাপ দেখা যায়নি। লঞ্চে যাত্রীদের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগের ঘোষণা আছে মুখে মুখে কিন্তু এর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রতিটি লঞ্চে যাত্রীপিছু একটি করে বয়া থাকার কথা থাকলেও আছে নামমাত্র। লঞ্চের পাশে বা ছাদে কিছু বয়া বাঁধা থাকে। এ নিয়ে নির্বিকার লঞ্চের চালক ও শ্রমিকরা। আবার এসব বয়া এত শক্ত করে বাঁধা যে, দুর্ঘটনা হলে সেগুলো খোলাই কঠিন হয়ে পড়বে যাত্রীদের জন্য। পটুয়াখালীর একজন যাত্রী মন্তব্য করেন, ‘ভাই কি কমু, এইগুলা সরহারকে দেহার জন্য রাখছে, আমাগো জন্য না, এইডা আমরা বুঝি। আসলে এইগুলা লোক দেহানো। আমাদের লঞ্চ যাত্রীদের জন্য আল্লাই একমাত্র ভরসা।’ নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের একটি পরিসংখ্যানে জানা যায়, লঞ্চগুলোর মধ্যে ৫০ শতাংশেরই কোনো নিবন্ধন নেই। বুড়িগঙ্গা দিয়ে চলা সাড়ে চার হাজার নৌযানের মধ্যে ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ৭৮২টির। এছাড়া গত ৩০ বছরে ৭২৭টি নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১০ হাজার মানুষ। বেসরকারি অন্য একটি হিসাবে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। আহত হয়েছে ১৭ হাজার ৬২১ জন। তবে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা অনেক কম। নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ৬৬ বছরে দেশে ২ হাজার ১২২টি নৌ-দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাবে ৬ হাজার আরোহী নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় ২০ হাজার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৪১টি। বাকি ১৯ হাজার ৯৫৯টি মামলার কোনো হদিস নেই। তাছাড়াও যেসব মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে তার কোনো শাস্তি হয়নি। রং করে দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা : ঈদ এলেই ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলতে দেয়া হবে না—এমন সরকারি ঘোষণা থাকে বরাবর। এবারও নৌমন্ত্রী শাজাহান খান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা হলে তাত্ক্ষণিক লঞ্চ মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে লঞ্চ মালিকরাও নিয়েছেন পুরনো কৌশল। সামান্য কিছু মেরামত আর রং করে পুরনো লঞ্চকে নতুনের মতো করে দেখানোর চেষ্টা শেষ হয়েছে। আর সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এসব লঞ্চ ঈদের আগেই যাত্রী পরিবহনে নামানো হয়েছে। নতুন রঙ্গে সাজিয়ে তোলার পাশাপাশি আসন সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ার কথা মাথায় রেখেই কাজ করছেন তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডকইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক ইত্তেফাককে বলেন, ঈদের আগে লঞ্চের মেরামতের কাজ বেড়ে যায়। ডক ভাড়া নেয়ার জন্য আগে থেকেই লঞ্চ মালিকরা যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ডকে নিজস্ব লঞ্চ মেরামত করা হয়। তবে এমভি শুভরাজ-২ লঞ্চের শ্রমিক জানে আলম জানান, লঞ্চের তেমন কোনো সমস্যা নেই। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা লঞ্চকে মেরামত করছি। লঞ্চের কাঠামোর এখানে সেখানে ভাঙ্গা থাকলেও চালকদের দাবি, নৌযানগুলো পুরোপুরি নিরাপদ যাত্রীদের জন্য। একজন চালক বলেন, ‘এইগুলা তো চলে সারা বছর। কিছু হয় না। এইবারও কিছু হইবো না ইনশাআল্লাহ্।’ জল পরিবেশ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভিড় থাকে অনেক বেশি। তাই রং করে লঞ্চ নামানো হলে তাদের টাকা উঠে যেতে পারে এই আশাই তারা লঞ্চ নামায়। ইনামুল হক বলেন, এই খাতটি (নৌ-পরিবহন) অরক্ষিত হয়ে আছে, দেখার লোকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আর লোকবল অভাবের কারণে ঘরে বসেই সনদ দেয়া হয়। বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক (ট্রাফিক) সাইফুল হক খান বলেন, ঈদে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচলের কোন সুযোগ নেই। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী যেন লঞ্চ মালিকরা না উঠান এবং যাত্রীরাও যেন ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ না করে সে আহ্বান জানান তিনি। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের দাবি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফিটনেস সার্ভে করে তবেই ছাড়পত্র দেয়া হয়। অধিদপ্তরের মুখ্য সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান বলেন, লঞ্চগুলো চলার উপযোগী হলেই কেবল আমরা ছাড়পত্র দেই। অতিরিক্ত যাত্রী ঠেকাবে কে : যাত্রীর চাপ বাড়ার পাশাপাশি লঞ্চ মালিকরা। এক সঙ্গে সব লঞ্চ না চালিয়ে রোটেশন পদ্ধতিতে লঞ্চ চালায় তারা। আর নৌযান না পেয়ে যাত্রীরা একটি লঞ্চেই চাপতে বাধ্য হন। কখনো কখনো যাত্রীদের চাপ লঞ্চের ছাদে গিয়ে উঠে। বৃষ্টির মৌসুমে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে বহু গুণ। কারণ বৃষ্টি এলে হুড়োহুড়ির কারণে লঞ্চে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। ২০০৯ সালে ঈদ মৌসুমে ভোলায় কোকো-৪ লঞ্চ ডুবে যায় অতিরিক্ত যাত্রীদের হুড়োহুড়ির কারণে। এই দুর্ঘটনায় তখন মারা যায় ৮৪ জন। বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ড. শাসছুদ্দোহা খন্দকার ঈদে রোটেশন পদ্ধতি ঠেকানোর আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে না উঠতে সচেতন হতে হবে যাত্রীদেরই। ঈদে মানুষের চাপ এত বেশি থাকে যে, তাদের ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। সম্ভব হলে পরিবারের কিছু সদস্যকে আগেভাগেই বাড়ি পাঠিয়ে দেয়ার অনুরোধও করেছেন তিনি। ঈদে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। বিশিষ্ট পানি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত ইত্তেফাককে বলেন, বর্ষায় নৌপথ অরক্ষিত হয়ে পড়ে ,তাই নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ ও অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ঠেকাতে সরকারকেই সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে যাত্রী সচেতনতাও বাধ্যতামূলক। ডুবোচরের হুমকি : বর্ষার স্রোতের তোড়ে পলি ও বালু জমে দৌলতদিয়া চ্যানেল ভরাট ও সরু হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক ফেরি চলাচল বিঘ্ন হয়ে ভেস্তে যেতে পারে ঘাট কর্তৃপক্ষের ঈদ প্রস্তুতি। এমন আশংকা করেছেন অনেকেই। পাশাপাশি দৌলতদিয়া চ্যানেলের মুখে পলি জমে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় এরইমধ্যে ফেরি আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সংশ্লি¬ষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার আগে সৃষ্টি হওয়া ডুবোচরগুলো পানির গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। ফেরি চলার জন্য দেয়া বয়া বাতি বা মার্কা ঠিকমত না থাকায় ফেরি চলাচলের সময় এসব ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে নৌযান। বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) শফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, চ্যানেলে পলি জমে ডুবোচরের বিষয়টি আমলে নিয়ে দৌলতদিয়ায় বিকল্প চ্যানেল তৈরির কাজ শুরু করেছে বিআইডব্লি¬উটিএ।