আইন-শৃংখলা নিয়ে শঙ্কায় চট্টগ্রামবাসী

পবিত্র রমজান মাসে চট্টগ্রামে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর অবস্থানে থাকার অঙ্গীকার করেছিল পুলিশ। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি নজরদারী বাড়াতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালুসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন মার্কেটের সামনে ২৪ ঘন্টা পুলিশ মোতায়েন, মার্কেটের ভেতরে সাদা পোশাকের পুলিশ ও মোবাইল টিমের টহল জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। তবে পুলিশের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনতি হয়েছে। ঈদের আগে গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামে হত্যা, ছিনতাই, মার্কেটে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা বেড়েছে। জেলার রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীতে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করেছে যুবলীগ নেতা ও ইউপি সদস্যকে। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে ৫ ডাকাত। র্যাবের হাতে অস্ত্রসহ ধরা পড়েছেন যুবলীগ নেতা। নগরীর গোলপাহাড় এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এক পুলিশ কর্মকর্তার ছেলের হাতের কব্জি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। সার্বিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আসন্ন ঈদে চট্টগ্রামে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম এ দাবি জানান। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) বনজ কুমার মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, রমজান মাসে অপরাধ প্রবণতা কিছুটা বাড়ে। তবে সেটা উদ্বেগজনক নয়। নগরীর গোলপাহাড় এলাকায় ছিনতাইকারীর কোপে পুলিশ কর্মকর্তার ছেলের কব্জি হারানোর ঘটনা তিনি জানেন না বলে জানান। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, খুনের ঘটনা কিছুটা বাড়লেও আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি খুব খারাপ তা বলা যাবে না। রাঙ্গুনিয়ায় খুনের ঘটনা ঘটেছে দলীয় কোন্দলের জন্য। প্রতিবছর ঈদের আগে ছিনতাই, ডাকাতির ঘটনা বাড়ে। সে তুলনায় আমার জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। নগরীর শেরশাহ এলাকায় যুবলীগের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে নিরীহ এক রিকশাচালক। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় আরো ৩ জন। এছাড়া নগরীর দুটি মার্কেটে মাঝরাতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকায় স্যানমার ওশান সিটি মার্কেটে হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে। এছাড়া চলতি রমজান মাসে নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে উত্তর জেলা বিএনপির ইফতার মাহফিল চলার সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। জেলার মিরেরসরাইতেও বিএনপির ইফতার মাহফিলে হামলার ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়। ছাত্রলীগ এই হামলা চালায় বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন। গত বুধবার রাতে নগরীর বায়েজীদ থানাধীন শেরশাহ কলোনী ঢেবারপাড় এলাকায় যুবলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মিরাজ উদ্দিন নামে এক রিকশা চালক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরো ৩ জন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানায়। গত মঙ্গলবার নগরীর গোলপাহাড় এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আতিক নামে এক কিশোরের হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত আতিক বান্দরবান থানার ওসি (তদন্ত) আনোয়ার হোসেনের ছেলে। একইদিন রাত সাড়ে ১১টায় নগরীর পূর্ব নাসিরাবাদ স্যানমার ওশান সিটি মার্কেটে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা থানায় মামলা দিতে সাহস পাননি বলে পুলিশ সূত্র জানায়। গত শনিবার পাঁচলাইশ থানাধীন আফমি প্লাজা মার্কেটের একটি দোকানে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এসময় দুর্বৃত্তরা দোকানের ক্যাশ বাক্স লুট করে নিয়ে যায় বলে দোকান মালিক অভিযোগ করেন। গত ১৭ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়ম নগর চৌমুহনী এলাকায় বোরখা পরিহিত বন্দুকধারীরা গুলি করে উপজেলা যুবলীগ কমিটির সদস্য মোহাম্মদ হোসেনকে হত্যা করে। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় আরো দুই যুবলীগ সদস্য। গত রবিবার গভীর রাতে রাউজানের নোয়াজিশপুরের ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন জসিমকে (৪২) গুলি করে হত্যা করা হয়। হাটহাজারী উপজেলার লাঙ্গলমোড়া ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন মাঠে তাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রায় একই সময়ে নিহত আনোয়ার হোসেন জসিমের ভাই গিয়াস উদ্দিন একে ৪৭ রাইফেল, গোলাবারুদ ও এক সহযোগীসহ র্যাবের হাতে আটক হন। তাকে হাটহাজারীর ইছাপুর ফয়জিয়া বাজারের কাশেম সেন্টারের সামনে থেকে আটক করা হয়। একই সময়ে এক ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু এবং আরেক ভাইয়ের অস্ত্রসহ গ্রেফতারের ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এর আগে গত বুধবার পটিয়া উপজেলায় ছুরিকাঘাত করে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা ছিনতাই করা হয়। গত সোমবার গভীর রাতে হাটহাজারী উপজেলার মেখল ইউপি’র চেয়ারম্যান মো. গিয়াস উদ্দিনকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাকে নগরীর একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সীতাকুণ্ড পৌর সদর এলাকায় অভিযান চালিয়ে পিস্তল ও ম্যাগজিনসহ দুই যুবলীগ নেতাকে আটক করে র্যাব। আটক ব্যক্তিরা হলেন পৌর যুবলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আমজাদ ও মো. জাহিদুল ইসলাম। জানা গেছে, আটক সাঈদ আমজাদের পিতা বদিউল আলম পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি।