অনন্ত প্রেমের অণুগল্প
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০১৪, ১৯:৫৫
থাইল্যান্ডের পাতায়াতে শুটিং চলছে অনন্ত জলিল পরিচালিত ‘মোস্ট ওয়েলকাম টু’-এর। টানা দেড় মাসের শুটিং বিশাল শুটিং ইউনিটের বহর। পাতায়া শহরের দুটো হোটেলে প্রায় ৭০ জনের ইউনিটে ঢাকাবাসীর মতো এক শহর গড়ে উঠেছে। আমি চলচ্চিত্রটির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে একটি শুটিং দৃশ্যে কাজ করবো বলে এসেছি। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতায় পুরো ইউনিট দু সপ্তাহ আগে গেলেও আমি পৌঁছলাম তারপরে। থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছলাম তখন রাত তিনটা। ইউনিটের গাড়ি আমাদের রিসিভ করলো। পরদিন সকাল থেকে পাতায়া বিচের দক্ষিণ কর্নারে শুটিং চলবে। শুটিং কল সকাল আটটা। অর্থাত্ ঘুমানোর সময়ও নেই। রয়েল ব্লু পাঁচতারা হোটেলে আয়েশী ঘুমটা শুরু হতে না হতেই ইউনিটের কল। আমি নায়ক প্রযোজক অনন্তর গাড়িতে যাবো। হোটেল থেকে নেমে দেখলাম ওটা ঠিক গাড়ি নয়। একেবারে চলমান বাড়ি। কাভার্ড ভ্যান বলে। স্বদেশ ছবিতে শাহরুখ খান যে গাড়িতে চড়ে পুরো ছবির শুটিং করেছিলেন এটা ঠিক সেই গাড়িটিই। ভেতরে অনন্ত মেকআপ নিচ্ছেন। মেকআপ আর্টিস্ট দুইজন। একজন বাংলাদেশের মনির অন্যজন মুম্বাইয়ের গৌতম। এখন মেকআপ দিচ্ছেন গৌতম। সামান্য টাচ আপ শেষ করে শুভ সকালের বিনিময়।
‘কেমন লাগে অনন্ত ভাই এই হিরোইজম?’
‘অনেক কষ্টের ভাই। আপনি তো ছিলেন না। গত ৮ দিন রাত দেড়টা পর্যন্ত শুটিং শেষ করে সব হিসেব গুছিয়ে দিয়ে আমার ভোর ৬টায় উঠতে হয়েছে। এত কষ্ট করার পরও পান থেকে চুন খসলে পাবলিক কত কথা বলবে। একারনে পারফেকশন আনতেই এই কাজ। এই যে কাভার্ড ভ্যানে আমরা বসে আছি, এখানে মাত্র দুই মাস আগে অক্ষয় কুমার ব্যবহার করেছে। পুরা ইউনিটে থাইল্যান্ডের যে অ্যাকশন টিম ওরা সকলেই প্রায় শতাধিক বলিউডের চলচ্চিত্রে কাজ করেছে। এখনও সালমানের একটা টিম আছে ব্যাংককে। আমাদের সাথে দেখা হয়েছিল তিনদিন আগে। আমরা যে পার্কে শুটিং করছিলাম, সেই একই পার্কে আরেক সাইডে ওরা করছি। আমাদের অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখে সালমানের ছবির ডিওপি (ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি) চমকে উঠলো। বললো, এটা কিভাবে বাংলাদেশের ইউনিট হয়! তোমরা এত বাজেটের ছবি বানাও। এই বলে আমার সাথে হাত মিলিয়ে ওর ভিজিটিং কার্ড দিল। যাতে আমি পরবর্তী ছবিতে ওকে কল দিই। আমার এই ছবিতেও ক্যামেরার কাজ করছেন সেও কিন্তু ‘রাউডি রাঠোর’-এর ক্যামেরাম্যান।
এইরকম মহাযজ্ঞের কথা চলছিল তখন আমি চলমান সেই বাড়িটির সোফায় বসে জানতে চাইলাম, অনন্ত-বর্ষার এই অনস্ক্রিন রসায়নের গল্পটা বলবেন।
একগাল হেসে বললেন, ‘এ রসায়ন দর্শকদেরই তৈরি। আমার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ ছবিটি দেখে অনেকেই প্রশ্ন করেছে, ছবিটি আমার জীবন থেকে নেয়া কী না? আমি বলেছি, দেখুন গল্প, উপন্যাস, সিনেমা এগুলো কোনোটাই জীবনের বাইরে নয়। এই যে অবাস্তব এনিমেশন, বা মারদাঙ্গা ফাইটিং এসবকিছুও মানুষের স্বপ্নের ভেতরে বাস করে বলেই ওরা ভাবতে চায়। দেখে আনন্দ পায়। বর্ষাকে যখন আমি প্রথম দেখি, অতি সাধারণ এক মেয়ে হিসেবেই ভালো লাগে। ভালোবাসি ওর সারল্যকে। এ কারণেই আমাদের ভালোবাসা নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলার পরও অটুট থেকেছে।’
গাড়ি প্রায় শুটিং স্পটের সামনে চলে এসেছে। আগেই পৌঁছে গেছেন নায়িকা বর্ষা। আর কিছুক্ষণ পরই শুটিং শুরু হবে। অ্যাকশন দৃশ্যের কাজ। প্রায় ৩০ জন ট্রুপস যুদ্ধসাজে রেডি। এর ভেতরে অনন্তর প্রায় পিঠে সামান্য দড়ি বেঁধে অনন্ত-বর্ষা দুজনই একটি অ্যাকশন দৃশ্যে শট দিলেন। মাত্র দুই টেকেই ওকে হয়ে গেল।
শুটিং-এর অবসরে পরবর্তী সিকোয়েন্স রেডি হচ্ছে। এর ভেতরে টেক নিতে গিয়ে জখম হলেন মূল ক্যামেরাম্যান। তাকে ঠিক করার জন্য চলে গেল ফাস্ট এইড বক্স সমেত ইউনিট কর্মী।
দুজনের সাথে ইত্তেফাকের হয়ে একাধিক ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছে আগে বেশ কয়েকবার। কিন্তু এখানে এই বেশে তারাও টানা একমাস থেকে যেন ক্লান্ত। বর্ষা বললেন, ‘দেশে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে আছি। পরিচালক অনন্ত খুব কড়া মেজাজী। অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তবে দেখবেন এই ছবিটি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।’
আমি মূলত সিনেমার গল্প শোনার জন্য নয়, দুজনার ভালোবাসার অণুগল্প লিখতেই বসেছিলাম। তাই প্রেমিক অনন্তর কথা জানতে চাইলে বর্ষা বললেন, ‘এখনও তো মার্কেটেই যেতে পারলাম না। শুটিং প্যাক আর নিজেকে রেডি হতে হতেই সময় শেষ। মাঝে দুই দিনের বিরতি আছে। তখন হয়তো যাবো। তবে শুটিং-এর বাইরে স্বামী অনন্ত দারুণ কেয়ারফুল। আমার জীবনটাকে সেলুলয়েডে ভেবেছিলাম। স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু এতটা পাবো তা ভাবিনি। এসবই অনন্তর কল্যাণ। প্রথম দেখাতে মুগ্ধতা, এরপর কমিটমেন্ট সকল কমিটমেন্ট আমরা রেখেছি বলেই কোনোকিছু রটেনি। টুকটাক মান-অভিমানগুলো একবার বড় করে ধরা দিয়েছে কিন্তু তাতে ভালোবাসার কমতি ছিল না। এভাবেই যেন বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারি সেই দোয়ায় করবেন।’ প্রেমের বন্দনা কখনও অণুগল্পের সমাপ্তিতে শেষ হয় না। এখানেও শেষ হলো না তাই। দেশি বিদেশি শুটিং ইউনিটের কারসাজি দেখলাম সারাবেলা। এর ভেতর অনন্ত-বর্ষা দুজন দুজনার খুনসুটি, দুষ্টুমি, হাসাহাসি তো চলছেই। রিল লাইফ আর রিয়েল লাইফের এই রসায়নে স্বামী-স্ত্রীর জীবন সুখী হওয়ার ঘটনা খুব কম। তারা দুজন হয়তো সেই বিরল সুখ সমীকরণ বাস্তবায়নের পথেই হাঁটছেন।