ইন্দিরার বিদেশী প্রেমিক
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০১৪, ২০:৩২
জার্মানভাষী ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফ আর পার্সি যুবক ফিরোজ গান্ধী। প্রায় একই সময়ে দুজনেই প্রণয়ের প্রস্তাব পেশ করলেন ষোড়শী ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনীকে। উনি তখন (১৯৩৪) শান্তিনিকেতনের ছাত্রী, ফ্র্যাঙ্ক ফরাসি ভাষার শিক্ষক। আর কমলা নেহরুর বিশেষ অনুগত, এলাহাবাদের পার্সি পরিবারের সন্তান ফিরোজ ইন্দুর প্রায় বাল্যসঙ্গী। দুজনকেই সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন নেহরু কন্যা, পরে পার্সি যুবককেই রটনা
আর কটূক্তি উপেক্ষা করে জীবন-সখার আসনে বসালেন। ওঁর ঔরসেই জন্ম তাঁর দুই সন্তান রাজীব আর সঞ্জয়ের। কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক পরিত্যক্ত প্রেমিক হয়েও কি আমৃত্যু জেগে রইলেন ইন্দিরার হূদয়ে?
ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফের খোঁজে
ইন্দু-ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী জওহরলাল আর কমলা নেহরুর একমাত্র সন্তান। তাঁর হয়ে ওঠা-অখণ্ড ভারতে, ইউরোপের বিদ্যাঙ্গনে দিনযাপন, নানা ধরনের টানাপড়েন- শোক-অসুখ, বিষণ্নতা-এবং দাম্পত্য। এবং রাজনীতি। এবং লৌহ কঠিন ব্যক্তিত্ব আর দুঃসাহস নিয়ে দেশি-বিদেশিদের লেখা ইন্দিরার জীবনালেখ্যে ছড়িয়ে আছে রঞ্জিত, অতিরঞ্জিত এবং সত্যপায়ী কত গল্প। কিন্তু তাঁর বয়োঃসন্ধিক্ষণের এক সজল প্রেমকথা-যার শুরু রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে আর সমাপ্তি সুইজারল্যান্ডে- তা আমাদের অনেকেরই জানার প্রায় বাইরেই থেকে গেল। এটা কি শুধু তথ্যের অভাবে। না নেহরু পরিবার অথবা কবিগুরুর পাঠ্যভবনের পরোক্ষ, অব্যক্ত অনুশাসনের ইঙ্গিতে?
দৃঢ়চেতা ইন্দিরার আড়ালে স্নিগ্ধ, আত্মস্থ, শোকসহিষ্ণু, প্রয়োজনে কঠোর এবং প্রবল আত্মরক্ষক যে ব্যক্তিত্বকে খুঁজে পাই আমরা-তাঁর উত্তরণে শান্তিনিকেতনের অবদান অসামান্য। এখানে পড়তে এসেই ঘটে যায় ইন্দুর এক ধরনের আত্মআবিষ্কার।এখানেই নিজের উন্মোচনের বহুমুখী উপকরণের সন্ধান পেয়ে যান তিনি।
যৌবনে, পরিণত বয়সে, মৃত্যুর আগেও একথা বারবার বলেছেন। আর এই উন্মুক্ত শিক্ষাঙ্গনের চৌহদ্দিতে, নিবিড় ছায়ায়, ক্যাম্পাসের বাইরেও ফুটে উঠল তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতিমালার প্রথম স্পর্শ- যা আকার ইঙ্গিতে একাধিক আলাপে ব্যক্ত করেছেন চিঠিতে। আবার সংশয়ে আচ্ছন্ন হয়ে উড়িয়েও দিয়েছেন কখনো। কখনো বা রাতে, একান্তে-বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিঃশব্দ কান্নায় ভাসিয়ে দিয়েছেন নিজেকে। সে এক অনুপম, অন্তত দু’দশকের প্রেম ছোঁয়া বন্ধুত্বের দীর্ঘস্থায়ী মহিমা। যার আভাস আছে, নেই বিশেষ বিস্তার অথবা ফলপ্রসূ পরিণতি।
ইন্দিরার বিশাল আমির আবরণে ঢাকা, কী এই বেদনাসিক্ত বৃত্তান্ত, তাঁর মৃত্যুর ৩০ বছর পর যা নিয়ে লিখতে হচ্ছে এবং যে বিষয়টাকে ঘিরে এক দশক জুড়ে আমি আমার মতোই তথ্যের পর তথ্য ঘেঁটে যাচ্ছি।
বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই, দেশ-বিদেশে এই অসাধারণ মহিলার ঘটনাবহুল নির্মাণে বহুপুরুষের সামান্য, অসামান্য অবদান, অনুপ্রেরণা, সঙ্গ লাভকে ঘিরে আমার একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রকাশিত বইয়ের খসড়া ইতিমধ্যে (মেন বিহাইন্ড দ্য ফেস) প্রস্তুত হয়ে আছে। বইটির গোড়ায় যে বাস্তব, অকল্পিত, ঐতিহাসিক চরিত্র প্রাণিত করেছে আমাকে, তাকে ঘিরে ইন্দিরার প্রতি, তাঁর একপেশে প্রেম ও দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের কথা বিশদভাবে বলা আজ জরুরি।
কীভাবে হঠাত্ একদিন শ্রীমতী গান্ধীর মৃত্যুর ১৮ বছর পর, ওই ইতিহাস-পুরুষেরও দেহাবসানের বহুদিন বাদে, প্রায় অকথিত এই প্রেম বৃত্তান্তের হদিস পেলাম, তা না জানালে সংযত, বিলম্বিত পরিক্রমার এবং তথ্য উদ্ধারের মূল উত্সটিকে অস্বীকার করা হবে। এ এক ঘোরতর অন্যায়। কেননা আমি নিখুঁত, স্বনির্ভর শৃঙ্খলাবদ্ধ গবেষক নই। আবার রগরগে কাহিনীর নির্মাতা হতেও আগ্রহ নেই। ঘটনাকে, ঘটনার অবিকৃত সত্যকে পেশ করাটাই অর্জিত ধর্ম।
২০০৪। দরিয়াগঞ্জ থেকে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিদেশিনী বন্ধু ক্যারিনাকে নিয়ে পুরোনো দিল্লির দিকে এগোচ্ছি। একটুখানি পরেই নেমে আসবে মনোহর, রোমান্টিক শীতের সন্ধ্যা। বন্ধুত্বের সৌরভ ছড়াচ্ছে মৃদু হাওয়া। চারপাশে ঝলমলে, তুলতুলে রোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেহের সঙ্গে দেহের, হূদয়ের সঙ্গে হূদয়ের এ যে এক স্পর্শাতীত খেলা। অধরা মাধুর্যের কাঙ্ক্ষিত রহস্যময়তা, যা অনুভব করতে করতে আমরা পাশাপাশি হাঁটছি। নিভৃতে ছায়ার মতো, অনালোকিত আকর্ষণের শুভ্রতার মতো একজনের হাত আরেকজনের দখলে। মোহ নয়, তথাকথিত প্রেম নয়, সম্পর্কের সূক্ষ্মতাই এখানে পরম প্রাপ্তি। এটাই আবৃত তৃপ্তির, অক্লান্ত পথ চলার, হঠাত্ স্পর্শেরও জোগাড়ে শক্তি।
হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাতে সাজিয়ে রাখা সারি সারি বই নজরে পড়ছে। ছুঁয়ে, মলাট দেখেই চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছি। এভাবে এক থেকে দেড় কিলোমিটার চলা শেষে চোখে পড়ল, একটি দোকানে ঝকঝকে মলাটে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন বিষণ্ন ইন্দিরা। দু’চোখ বন্ধ। কুঞ্চিত কপাল। অধোমুখে উন্নত নাসিকা। গলায় রুদ্রাক্ষ। পরনে ঈষত্ সাদাটে, মায়াবি, মানানসই কালো পাড়ের শাড়ি। এটি কি অলোকচিত্র, না দক্ষ কোনো শিল্পীর আঁকা নিখুঁত প্রতিকৃতি। বইটি হাতে নিতেই গা ঘেঁষে ঝুঁকে পড়লেন বিদেশিনী বন্ধু-হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ। সি ইজ ইন্দিরা, দি গ্রেট লেডি। বলেই সটান কেড়ে নিয়ে পাতার পর পাতা উল্টাতে লাগলেন। ওঁর বিস্ময়, ওঁর ইন্দিরাময়তায় মুগ্ধ আমি।... পাতায় পাতায় জগত্ বিখ্যাত রঘু রাই-এর ক্যামেরায় উদ্ভাসিত শ্রীমতি গান্ধী। শৈশব থেকে শ্মশানের ছবি-অফুরন্ত। ভাবলাম, ব্যাপক দাম হবে। দামী কাগজে মূল্যবান অ্যালবাম। পকেটে হাত বোলাচ্ছি। তখনই সব দ্বিধা, সঙ্কোচের অবসান ঘটিয়ে বই দোকানের মালিকের বিনম্র ঘোষণা, মত্ ঘাবড়াইয়ে সাহেব, অনলি ওয়ান থাউজেন্ড। অবাক মূল্যে সাবক দুজন। টু বুকস-বলেই বন্ধুটি উজাড় করে দিলেন তাঁর পাস।
ভারি বই দুটি হাতে তুলে নিতে গিয়েই মাটিতে ছিটকে পড়লেন ভিন্নতর মলাটের আরেক ইন্দিরা। অল্প বয়সের ছবি। কানে ছোট্ট দুল, পরনে ভিন্ন রঙের শাড়ি। মুখচ্ছবিতে বিষাদচিহ্ন। হাজার টাকায় দু’কপি। এবার আমার পালা। মানিব্যাগ খুলতেই হলো।
সন্ধ্যা নামছে। যমুনার ওপারে, আনন্দ বিহারে গেস্ট হাউসে ফিরতে হবে। চেনা, পরিচিত হলেও দিল্লির সব রাস্তাঘাট জানা নেই। বাহাদুরি দেখিয়ে ঘণ্টা দুয়েক আগে ড্রাইভারসহ গাড়িটি ছেড়ে দিয়েছি। কেন? শহরের জনারণ্যে নির্জনতার আগুনকে স্পর্শ করতে?
ভাড়াহীন গেস্ট হাউসে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা।
পাশাপাশি দুটি রুম। একটিতে আমি। আরেকটিতে উনি। নৈশভোজ সেরেই দু’জনের দরজা বন্ধ। রাতে বই না হলে আমার ঘুম আসে না। কিছুক্ষণ রঘু রাই-এর অ্যালবাম দেখে নিয়ে সরিয়ে রাখলাম। এবার হাতে ক্যাথারিন ফ্র্যাঙ্কের ‘ইন্দিরা’। ৫৬৭ পৃষ্ঠার বই। পড়ছি তো পড়ছি। ৯৭ পাতায় এসে চমকে উঠলাম-
ইন্দিরা, মিনহোয়াইল, ওয়াজ নিগোশিয়েটিং অ্যা ভেরি ডিফারেন্ট শর্ট অফ ইমোশনাল স্টুর্ম অফ হার ওন অ্যটি শান্তিনিকেতন। ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফ, অ্যা জার্মান, হু টট, ফ্রেঞ্চ অ্যটি দ্যা স্কুল, হ্যাড ডিকলেয়ারড হিমাসেলফ ইন লাভ উইথ হার অ্যান্ড ইন্দিরা ফাউন্ড হারসেলফ ফল দ্য ফার্স্ট টাইম স্ট্রংলি অ্যাট্র্যাক টু অ্যা ম্যান। দিস ওয়াজ নো অ্যাডোলেসেন্ট ক্লাস। ইন্দিরা ওয়াজ অ্যা ম্যাচিওর অ্যান্ড সিরিয়াস সেভেনটিন...।
সম্পূর্ণ নতুন তথ্য। আমি বিস্মিত। সংশয়াচ্ছন্ন। নেহরু, কমলা, ফিরোজ গান্ধী, ইন্দিরাকে নিয়ে এরকম কত কেচ্ছাই তো চোখে পড়ে। ভিত্তিহীন। এটাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। কিন্তু ছুঁয়ে আছে আমাকে। ঘরে এসি চলছে। আমার মতো নেশাখোরদের আজব অভ্যাস, সুখে, উদ্বেগে চিন্তার উদিগরনে ধূমপান তাদের নিবিড় ভরসা। অনেকটা পরকিয়া প্রেমের মতো। আস্তে দরজা খুলে প্রশস্ত ডাইনিং স্পেসে বসে সিগারেট ধরিয়ে ভাবছি, ইন্দিরাকে নিয়ে লেখা এ পর্যন্ত কোনো বইয়েই এই প্রেম কাহিনীর উল্লেখ নেই কেন?
খেয়াল হল পাশের ঘরেও আলো জ্বলছে। তার মানে, ক্যারিনা বুয়েকম্যানও রাত জাগছে। সাংবাদিক। দেশবিদেশ ঘুরে বেড়ায়। আফগান মুলুকে তালিবানদের ডেরায় বসে বহু এক্সক্লুসিভ খবর করেছে। বেপরোয়া তরুণী। বিস্তর পড়াশুনো করে। ভারত সম্পর্কে ব্যাপক তার কৌতূহল। ওই মাঝরাতে নিঃশব্দ নয় তার কামরা। মৃদুস্বরে মিউজিক বাজছে। একবার ভাবলাম, ওকে ডেকে নিই, জিজ্ঞেস করি, জার্মান কোনো শিক্ষকের সঙ্গে শ্রীমতী গান্ধীর অ্যাফেয়ার্স-এর তথ্য তার জানা আছে? কিন্তু এত রাতে তাকে ঘরের বাইরে ডেকে এনে কথা বলা ভালো দেখায় না, রুচি বিরুদ্ধ ভেবেই সিগারেট শেষ করে নিজের কামরায় ঢুকে আবার বইটি পড়া শুরু। সুলিখিত, চমত্কার মার্কিন ইংরেজি। বাক্যগঠনে ফরাসি গদ্যের স্রোত। তথ্য আর কেচ্ছায় ঠাসা। রাত জেগে পড়া শেষ। কিন্তু, শান্তিনিকেতনে ইন্দিরা প্রেমে আসক্ত জার্মান শিক্ষকের নাম (ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফ), আদিবাড়ি, ভ্রাম্যমাণ স্বভাবের বাইরে ইন্দুর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রমাণ সাপেক্ষ, বিশদ তথ্যের হদিস প্রায় উহ্য। বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলল।
পরদিন সকালে ব্রেফাস্টের মুহূর্তে ক্যারিনাও বলল রাতে ঘুমোইনি। ক্যাথারিন ফ্র্যাঙ্কের ‘ইন্দিরা’ পড়তে পড়তে রাত কাবার। গুড বুক, বাট উইদাউট সাফিসিয়েন্ট প্রাইমারি সোর্সেস। এই যেমন একজন শিক্ষকের কথা বলছেন, ইন্দিরার প্রতি আসক্ত, যিনি তাঁকে নিয়মিত চিঠিতে প্রেম নিবেদন করতেন, তার ভিত্তি কী, সে সব চিঠির উল্লেখ নেই কেন? বইটি নিয়ে এরকম নানা প্রশ্ন উঠতেই পারে। দ্বিতীয়ত, ফিরোজ আর কমলাকে ঘিরে এত গুলগল্প, রটনার বাড়াবাড়ির কারণ কী? ক্যারিনার সঙ্গে একমত আমিও। ভাবছি, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। খুঁজতে হবে তথ্য। সেদিনই কর্নাটপ্লেসে বেরিয়ে, ইন্দিরাকে নিয়ে বহুজনের লেখা বেশ কয়েকটি বই জোগাড় হয়ে গেল। না, কোথাও তেমন কোনো নির্ভুল নির্ভরযোগ্য রসদ নেই। ক্যাথারিন-এর ‘ইন্দিরা’য়-প্রেমাসক্ত অধ্যাপকের নামধামই সার। এর বাইরে বাড়তি তথ্য নেই।
নাই থাক, তবু, আমার প্রশ্ন আর কৌতূহল অশেষ। ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, প্রাথমিক, দ্বিতীয়, তৃতীয় সূত্রের যথাসম্ভব খোঁজ করে গভীরে, আরো ভেতরে প্রবেশ করা জরুরি। যদি নিছক কেচ্ছা হয়, এড়িয়ে যাব। আর যদি প্রেমের ঘটনা দ্বিপাক্ষিক বা একপেশেও হয়, হাল ছাড়ব না। এই ধরনের কাজে আমার জীবনসঙ্গীর উত্সাহের ঘাটতি নেই। গালে একটি সুন্দর এঁকে দিয়ে উসকে দিলেন। ক্যারিনাও তাঁর দেশে ফেরার আগে বলে গেল, থেমে যেয়ো না। পাশে আছি। জার্মানিতে ফিরে গিয়ে ওবারডর্ফের খোঁজ করব। উনি বেঁচে থাকলে কথা বলে জানাব। ক্যাথারিন-এর বইটি পড়ে এইটুকু তো জানা গেল, একজন আরেকজনকে চিঠি লিখতেন। এসবের সন্ধান পেলে ফটোকপি পাঠিয়ে দেব।
আমিও কলকাতায় ফেরার আগে দিল্লিতে ইন্দিরা ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে বিশদ কথা বলে জানতে পারলাম, কল্পিত গল্প নয়, এরকম এক সম্পর্কের আভাস জীবদ্দশায় ইন্দিরা দিয়ে গেছেন। নানাজনকে লেখা তাঁর চিঠিপত্র ও জীবন সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে দেখলাম, ওবারডর্ফ গরহাজির।
কলকাতায় ফিরেই শান্তিনিকেতন ছুটতে হল। ইন্দিরার সমসাময়িক আশ্রমিকদের অনেকেই জীবিত। বললেন, হ্যাঁ পাঠভবনে ফরাসি শেখাতেন একজন জার্মান। ইন্দিরা আর তাঁকে নিয়ে এখনো পরস্পর বিরোধী বহু রটনা ছড়িয়ে আছে। কী এসব রটনা— বলতে গিয়েও রুচি তাদের আটকে দেয়। মহামুস্কিল। তাহলে নির্ভুল নথি কোথায় খুঁজব? বিশ্বভারতীর রেকর্ড দেখার এক্তিয়ার নেই, চেষ্টা করেও অনুমতি মিলল না। ভাবলাম, রবীন্দ্রভবন সন্ধান দিতে পারে। কিন্তু এখানে যা কিছু সবই রবীন্দ্রময়, সবটাই তাঁর স্মৃতির নিদর্শন। পাঠভবনের দস্তাবেজে ওবারডর্ফ-এর নাম আছে। বিশ্বভারতীতে ইন্দিরার পড়াতে আসা, হঠাত্ একদিন চলে যাওয়ার সন-তারিখ অমিল নয়, নেই শুধু ফ্র্যাঙ্ক আর তাঁর বন্ধুত্বের দিনযাপনের তথ্যপঞ্জি।
রুচিরা মুখোপাধ্যায় আমার অন্যতম বন্ধু। সহকর্মীও। তার বাবা সুজিত মুখোপাধ্যায় বৌদ্ধ দর্শনের সুপন্ডিত। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানের সাড়া দিয়ে বিশ্বভারতীতে দর্শন পড়াতেন। নির্মল মানুষ। চিত্রকর বিনোদ বিহারীর অন্যতম ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। রুচিরাদির জন্ম শান্তি নিকেতনে। ওখানকারই ছাত্রী। দুঃসাহসী মহিলা। বিয়ে করেননি। লিভ টুগেদার করেছেন। রুচিরাদি শান্তি নিকেতনে, দিল্লীতে অন্ধ পিতৃবন্ধু বিনোদ বিহারীকে উজাড় করা সেবা, উষ্ণতা, স্পর্শ উপহার দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। গুণী মহিলা। ছবির সমঝদার। সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। বিনোদ বিহারী তাঁর প্রাণসখা, বোধির আশ্রয়— একথাও নিঃসঙ্কোচে একসময় লিখেছেন পরিচয় পত্রিকায়। লেখাটি পড়ে অভিভূত হয়ে তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সত্যজিত্ রায়। আমরাও বিস্মিতবোধ করেছি। এই রুচিরাদিও একদিন জানালেন, তাঁর ছোটবেলায় ইন্দিরা আর ওবারডর্ফ-এর ‘প্রেম’ নিয়ে বহু গল্প আর রটনা শুনেছেন। দু’জন নাকি অবাধে ঘুরে বেড়াতেন ক্লাসের বাইরে, যেখানে সেখানে। খবরটি রবীন্দ্রনাথেরও কানে পৌঁছায়। কবিগুরু প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। ইন্দিরাকেও ডেকে পাঠাননি। ওবারডর্ফকেও বকাবকি করেননি। কিন্তু ইন্দুর আচরণ নাকি তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এ তো জনশ্রুতি। রুচিরার শোনা গল্প। বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তবু নেহরু কন্যার সঙ্গে ওবারডর্ফের মেলামেশা, সময় যাপন, একান্তে, নির্জনে ওঠা-বসার, প্রেম প্রেম বন্ধুত্বের কিসসার হদিস খানিকটা তো পাওয়া গেল।
প্রকৃত সূত্রে জানতে তখনো আমি বিরামহীন। পেশাগত কাজের চাপ বাড়ছে, বাড়ছে বিভিন্ন সূত্র ছুঁয়ে ইন্দিরার ভেতরের ইন্দিরাকে খুঁজে দেখার আগ্রহ। বই পড়ছি। নথি ঘাঁটছি। ইতিমধ্যে জার্মান থেকে ক্যারিনার চিঠি— ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফের সন্ধান সে পেয়েছে। মারা গেছেন। বেঁচে আছেন তাঁর নিকটাত্মীয় ইরমা ওবারডর্ফ। ইন্দিরাকে লেখা ফ্র্যাঙ্কের, ফ্র্যাঙ্কের লেখা ইন্দিরার চিঠিও সে দেখেছে। আমি যদি চাই অবশ্যই ফটোকপি পাঠাবে। ক্যারিনাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাতে হল, কয়েকটি চিঠির বয়ান পড়ার সৌভাগ্য আমার ঘটে গেছে, ইন্দিরার একান্ত বান্ধবী পুপুল জয়াকারের সূত্রে। এসব চিঠি পড়তেই বোঝা যাচ্ছে, দ্বিপাক্ষিক প্রণয় নয়, প্রেম বলতে যা বোঝায়, তাও নয়, হ্যাঁ ওবারডর্ফের দিক থেকে নিষ্ঠা আর আত্মনিবেদনে বিলকুল খামতি দেখা যায়নি, সংশয় ছিল ইন্দিরার। যদিও সঙ্গোপনের স্মৃতিকে, ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে তাঁর নিবিড় বন্ধুত্বকে, বন্ধুত্বের অবলম্বনকে অস্বীকার করতে বিলকুল দ্বিধাবোধ করেননি।
ক্যারিনা আমার সঙ্গে একমত কি না জানা যায়নি, আফগানিস্তান, লাদেন, ইরাকে হিংসা— এরকম ঘটনার পর ঘটনার খবরের খোঁজে জড়িয়ে পড়ল সে। প্রায় ৮ বছর হতে চলল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আমিও আমার ধর্মে ব্যস্ত, ব্যস্ততার মধ্যেও খুঁজে বেড়াচ্ছি ফ্র্যাঙ্ক-ইন্দিরার প্রণয়ের সত্যকে। সত্যের সন্ধান যে মেলেনি, তা নয়, কিন্তু অপর্যাপ্ত, অর্ধপূর্ণ। খুঁজতে হবে আরো। খতিয়ে দেখতে হবে শান্তি নিকেতনে ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনীর পড়তে আসা, হঠাত্ চলে যাওয়া, মৃত্যুর দিন কয়েক আগে পুপুল জয়াকারের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতায় ভেসে ওঠা ঐ জার্মান অধ্যাপকের প্রেম প্রসঙ্গ এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বহু ঘটনা প্রবাহ, দাম্পত্যের টানাপোড়েন ইত্যাদি। আপাতত শান্তি নিকেতনে তাঁর আগমন, অবস্থান ও বিদ্যাচর্চার ভেতর দিয়েই শুরু হবে ঐ বিদেশির অশ্রুসিক্ত, ব্যর্থ প্রেমকথা।
পাঠভবনে ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে দেখা
জুলাই, ১৯৩৪। ষোড়শী। আত্মসচেতন। আয়তনেত্রের ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনীকে শান্তি নিকেতনে পড়তে পাঠালেন নেহরু দম্পতি। ভরতি হলেন শিক্ষাভবনে। লেখাপড়ার বিষয় ইংরেজি, ইতিহাস, রসায়ন, হিন্দি, সমাজবিদ্যা আর ফরাসি। পাঠভবনে তখন স্থায়ী শিক্ষক মাত্র দু’জন। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী লামা গোবিন্দ (এরনেস্ট হফম্যান) আর ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফ। পরে আমরা দেখতে পাব, ফ্র্যাঙ্ক কীভাবে শ্রেণীকক্ষের বাইরে একান্ত বন্ধু হয়ে উঠছেন ইন্দিরার, বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘনের প্রয়াস লক্ষ্য করে নেহরু কন্যা দ্রুত সরিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে, গুরুত্ব দিচ্ছেন বন্ধুত্বের শুভ্রতাকে। কখনো বা আত্মনিবেদনে উন্মুখ শিক্ষকের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখে তাকে নিজের সুখ-দুঃখ, মায়ের অসুস্থতা, বিষাদগ্রস্ততার কথাও বলছেন। ফ্র্যাঙ্ক পুরোপুরি অন্যরকম। নাছোড়বান্দা, একরোখা। বার বার আকার ইঙ্গিতে, কখনো সরাসরি, কখনো একাধিক চিঠিতে নিবিড় বন্ধনের প্রস্তাব পেশ করে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন। কিংবা ইন্দিরা শান্তি নিকেতন ছেড়ে ইউরোপে চলে যাওয়ার পরেও তাঁকে, বছরের পর বছর অনুসরণ করছেন। এ এক অসাধারণ, একপেশে এবং বেদনাময় বৃত্তান্ত। বন্ধুত্বের আবরণে যার সূচনা আর সমাপ্তি চূড়ান্ত তিক্ততা আর হতাশায়। এই দুর্বোধ্য, অকথিত কাহিনীতে বার বার বিশদভাবে ফিরে আসবে ইন্দিরার হতাশা, বিড়ম্বনা, দাম্পত্য, রাজনীতি এবং কঠোর স্বভাবের আড়ালে ঢেকে থাকা কোমলতার বিস্তীর্ণ উত্তরণ, এমনকি তাঁর স্ববিরোধী আচরণও।
ইন্দিরাকে ফরাসি শেখাতেন ফ্র্যাঙ্ক। হিন্দি পড়াতেন হাজারি প্রসাদ দ্বিবেদি। এঁদের বাইরেও ছিলেন আরো কয়েকজন অভিজ্ঞ ইউরোপীয়, যাঁরা ভ্রাম্যমাণ, অস্থায়ী শিক্ষক। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বন্ধনহীন পরিবেশে ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যাদান করতে এখানে এসে তাঁরা জড়ো হয়েছেন। শিল্পের ইতিহাস পড়াতেন হাঙ্গেরিয়ান ফাবরি। কৃতী ঐতিহাসিক। নগ্ন পায়ে হাঁটাচলায় অনভ্যস্ত। প্রাচীন ভারতের বিদ্যাদাতাদের এই অভ্যাসে আস্থা নেই তাঁর। শ্রেণীকক্ষে ঢুকে পড়তেন জুতো পায়ে। প্রায় গোড়াতেই, ফাবরির এই বেমানান অহমিকা আর নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন ইন্দিরা। তাঁর নেতৃত্বে ক্লাস বয়কট করে বসল ছাত্ররা। পরে বিষয়টি মিটমাট হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে খালিপায়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ মেনে নিলেন ফাবরি।
তখনো সরাসরি কবিগুরুর সঙ্গে ইন্দিরার দেখা হয়নি। কিন্তু ষোড়শী যে এসে গেছে, ক্লাস করছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে অবাধে এ খবর কবিগুরুর অজানা নয়। ইন্দুর উপস্থিতি আশ্রমিকরাও জেনে গেছেন। ছাত্রছাত্রীরাও অবগত সে একটু আলাদা। জওহরলালের কন্যা, মতিলাল নেহরুর নাতনি। স্বাতন্ত্র্য নিয়ে সে সবার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, রক্তে তাঁর দ্রোহ। তাই গোড়াতেই ফাবরির পশ্চিমি অহং নিয়ে প্রশ্ন তুলল, প্রতিবাদ জানাল সরাসরি। ফাবরির সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য আর জুতো পায়ে শ্রেণীকক্ষে ঢোকার খবর কি জানতেন না রবীন্দ্রনাথ? আলবত জানতেন। জেনেও কি চুপ ছিলেন? মনে হয় না। অতিথি অধ্যাপককে বিশেষ সম্মান করতেন, আপনজন ভাবতেন। কিন্তু শান্তি নিকেতনের নিয়মভঙ্গে তাঁর অনুমোদন ছিল না বলেই ছাত্রদের সরব প্রতিবাদকে মেনে নিয়েছেন সহজাত নৈঃশব্দে। ইন্দুকেও এ ব্যাপারে কিছু বলেননি।
৭ জুলাই, হোস্টেলে হাজির হয়ে সেদিন রাতেই পণ্ডিত নেহরুকে চিঠি লিখেছেন ইন্দু— শেষ পর্যন্ত শান্তি নিকেতন। চমত্কার। এখানকার সবকিছুই শিল্পিত। অকৃত্রিম, ভারি সুন্দর।
উন্মুক্ত চত্বর গভীরভাবে স্পর্শ করল তাঁকে। মনে হল, সব দিক থেকে তাঁর শান্তির আলয় আর আশ্রয় হয়ে উঠবে এই শিক্ষাঙ্গন। এই ধরনের পরিবেশে ইন্দুর লেখাপড়ার অথবা বসবাস করার সুযোগ মেলেনি এর আগে। পুণের পিপলস ওন স্কুলেও পড়েছেন। ওখান থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন পাস। ঐ স্কুল চালাতেন গান্ধীজীর অনুগামী জাহাঙ্গীর ওয়াকিল আর তাঁর স্ত্রী কুনবারভাই। জাহাঙ্গীর সমাজবাদী। অক্সফোর্ডের প্রাক্তন ছাত্র, নেহরুর মতোই অজ্ঞেয়বাদী। কুনবারভাই গায়িকা আর বাটিক শিল্পী। একসময় দু’জনেই শান্তি নিকেতনে পড়িয়েছেন। ওখান থেকে ফিরে পুণেতে রবীন্দ্রনাথের ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কিন্ডার গার্টেন জুনিয়র স্কুল চালু করলেন। ছাত্রছাত্রীরা কংগ্রেস পরিবারের সন্তান। সকলেরই পরিধেয় খাদির পোশাক। ইন্দিরাকেও পরতে হত। পঠনপাঠন হত ঘরের বাইরে, বাগানে, গাছের নীচে। ঐ পরিবেশ আর সব সময় রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান-সন্তুতিদের সান্নিধ্য সম্ভবত ভালো লাগত না ইন্দিরার, শৃঙ্খলার যান্ত্রিকতায় হাঁপিয়ে উঠতেন। শান্তি নিকেতনে এসে ভিন্ন রুচি, পঠন-পাঠনের ভিন্ন রেওয়াজ খুঁজে পেলেন। এ ব্যাপারে পুপুল জয়াকারকে নিজেই বলেছেন—
এই প্রথম রাজনীতির হইচই থেকে দূরে সরে থাকার অবকাশ মিলল আমার। এ যেন বন্ধন আর অবাঞ্ছিত ভিড় থেকে মুক্তি। বাড়িতে অথবা অন্যত্র শৃৃঙ্খলের বাড়াবাড়ি নিজের ভেতরে তিক্ততাকে তীব্রতর করে তুলছিল। শান্তি নিকেতনের নিসর্গ, ওখানকার মানুষ সব গ্লানি, সব ক্ষোভ মুছে দিল। ঘটে গেল অন্য এক উন্মোচন, রুদ্ধ দুয়ার এবার উন্মুক্ত।
শান্তি নিকেতনে পড়তে আসার প্রাক্কালে, তাঁর পূর্ব পুরুষের আদিভূমি কাশ্মীর সফরে গিয়েও একইভাবে আপ্লুত, অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন ইন্দিরা। বলেছেন—
বাবা ভালোবাসেন নদনদী। আমি তাঁরই মেয়ে, ওখানকার পাহাড়-পর্বতের, অরণ্যের কন্যা। নিসর্গের সুর আমার প্রাণে।
শান্তি নিকেতনে অবাধ প্রান্তর, গাছগাছালি আর ঋতু পরিবর্তনের মেজাজেও একই সুরের ব্যঞ্জনা এবং আত্ম উন্মোচনের বিস্তর রসদের সন্ধান পেয়ে যান ইন্দিরা। এ ব্যাপারেও নিঃসঙ্কোচে একান্ত এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন—
বাইরের অবাঞ্ছিত হট্টগোল থেকে দূরে কীভাবে নিজের কাজে, নিজের ভেতরে ডুবে থাকতে হয়, তা আমাকে শান্তি নিকেতনই শিখিয়েছে, বরাবর যুগিয়েছে খোরাক।
ব্যবহারিক রাজনীতি— দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী এবং কৌশলপ্রিয় ইন্দিরার আড়ালে স্নিগ্ধ, সূক্ষ্মতাময়, নির্জনতামগ্ন, বিষণ্ন, শোকসহিষ্ণু আর প্রয়োজনে কঠোর এবং আত্মরক্ষক যে আরেক ইন্দিরাকে খুঁজে পাই আমরা, তাঁর নির্মাণে, উত্তরণে শান্তি নিকেতনের অবদান যে অসামান্য— শুধু নিজেই নন— তা স্বীকার করছেন যেমন তাঁর অনুরাগীরা, তেমনি বিরুদ্ধ সমালোচকরাও। কাশ্মীর, আগ্রা, দিল্লী আর এলাহাবাদের মিশ্র সংস্কৃতি স্তরে স্তরে তৈরি করেছে নেহরু পরিবারের ঐতিহ্য। ঠিক একইভাবে নেহরুর বৈদগ্ধ্য, গান্ধীজির বাকসংযম আর রবীন্দ্রনাথের সমন্বয়ধর্মী চিন্তায় ঋদ্ধ ইন্দিরার ভাবাবেগ। যা তাঁর রাজনীতি, রাজনীতির বাইরের বলিষ্ঠ জীবনবোধকেও প্রভাবিত করেছিল।
১৯৮৪, মৃত্যুর মাসকয়েক আগের কথা। ভারত নানাদিক থেকে অবরুদ্ধ। গভীর ষড়যন্ত্র, এমনকি তাঁর প্রাণনাশের হুমকিও আঁচ করছেন। ভয়শূন্য ইন্দিরা বাইরের কাউকে তা জানতে দেননি। একান্ত বন্ধু পুপুল জয়াকারকে মাঝে মাঝে উদবেগের কথা জানাতেন। তাঁর চাপে, তাঁকে দিয়েই অথোরাইজড বায়োগ্রাফি লেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
১৩ আর ১৫ অক্টোবর। পুপুলের সঙ্গে দুবার মন খুলে আলাপ করলেন, একান্তে। টেপরেকর্ডার নিয়ে গিয়েছিলেন পুপুল, ইন্দিরা তাঁর শৈশব, তাঁর একাকিত্ব, তাঁর হয়ে ওঠা, তাঁর দাম্পত্য, তাঁর প্রতি কোনো কোনো পুরুষের অনুরাগের কথা অকপটে জানিয়ে দিলেন।
বন্ধুকে নিয়ে পুপুলের গর্ব আর তাঁর জীবনের অজানা বৃত্তান্ত জানার আগ্রহ অশেষ। ১৫ অক্টোবর সকালে, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে বসে এই প্রশ্ন করেই ইন্দিরার সঙ্গে পুপুলের কথা বলা শুরু—
তোমার বয়স যখন ১৬ অথবা ১৭, তখন কি ইচ্ছে হত না কেউ তোমার বিশেষ অনুরাগী হয়ে উঠুক, প্রশংসা করুক ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যের, রূপের?
প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিলেন ইন্দিরা—
নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল আমার চেহারা দীপ্তিহীন, প্রশংসা করার মতো কিছুই নেই। হ্যাঁ, শান্তি নিকেতনে থাকাকালীন একজন আমার প্রতি তাঁর গভীর আসক্তি চেপে রাখতে পারেননি। জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রকাশ্যে, খোলাখুলি। ঐ অধ্যাপক, ওখানে (শান্তি নিকেতনে) পড়াতেন। তিনি আমারও শিক্ষক। তাঁর প্রশংসা আমি মেনে নিতে পারিনি, খেপে যাই, মনে মনে ভেবেছি, উনি আমাকে বিদ্রূপ করছেন।
এইটুকু বলেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে জানালেন—
যৌন আবেদন বলতে যা বোঝায়— তা আমার কখনো ছিল না, ফিরোজ এই জিনিসটাই চাইত; ওকে আমি তা দিতে পারিনি। বার বার বোঝাবার চেষ্টা করি, আমি চাই সন্তান আর তাঁর সঙ্গলাভের শুদ্ধতা। হ্যাঁ, ফিরোজ আমাকে চাইত, ভালোবাসত, মন থেকে কখনো সরাতে পারেনি, আমিও ফিরোজ ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে কখনো অবলম্বন ভাবতে পারিনি।
২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৬০। হঠাত্ হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে ফিরোজের মৃত্যুর দিনকয়েক পরে তাঁর আরেক একান্ত বন্ধু, মার্কিন মুলুকের বাসিন্দা ডরথি নরম্যানকে ভারাক্রান্ত হূদয়ে চিঠি লিখলেন—
শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি এখনো। দুঃখবোধ ভারী হয়ে উঠছে ক্রকশ। আমার বয়স যখন ১৩, ফিরোজের ১৮, তখনই আমাদের প্রথম দেখা। তিনবছর পর আমি যখন ষোড়শী সে আমাকে প্রস্তাব দেয়। এরপর থেকে প্রায় প্রতিটি বিষয়ে আমরা ঝগড়া করেছি, মতান্তর তৈরি হয়েছে অথচ সম্পর্কের যে শক্ত বন্ধন উভয়ের মধ্যে গড়ে উঠে, আস্তে আস্তে, তা কখনো শিথিল হয়নি। আমরা বড়ো হয়েছি একসঙ্গে, যা কিছু অর্জন করেছি, তাও একে অন্যের সমর্থনে। আমার মা যখন মারা গেলেন, সে পাশে দাঁড়িয়ে সব চাপ, সমস্যা লঘু করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, ঐ সঙ্কটময় মুহূর্তে সাতসমুদ্র পেরিয়ে ছুটে গেছে বিদেশে। ওকে হারিয়ে হঠাত্ মনে হচ্ছে, আমি বড্ডো নিঃসঙ্গ, সীমাহীন বালুর আবর্জনায় দাঁড়িয়ে আছি একা। তবু জীবন থেমে থাকে না, এগিয়ে চলে সামনে।
কখনো অন্য কোনো পুরুষকে নিয়ে এরকম সজল, গাঢ় উচ্চারণ করতে দেখা যায়নি ইন্দিরাকে। ফিরোজের সঙ্গে তাঁর প্রেম, প্রেমের দ্বিচারিতা, কলহময় দাম্পত্য, দাম্পত্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি নিয়ে অসংখ্য রটনা শুনেছি অনেকেই। কিন্তু এসব গুলগল্প আর ইন্দিরা ফিরোজের পারস্পরিক বিশ্বাসের বাস্তবতার দূরত্ব কোথায়? ব্যক্তি জীবনের ছিদ্র খুঁজতে যারা অভ্যস্ত, তাদের রচিত মুখরোচক কাহিনী ও ফিরোজের সঙ্গে ইন্দিরার মতান্তরের গল্প সর্বজনবিদিত। বিশেষ কোনো সম্পর্ককে ঘিরে দু’জনের মনান্তর হয়েছে কখনো?
ইতিহাসের উপেক্ষিত, বিতর্কিত এই বিষয়টিতে আমরা পরে আসব। জানার চেষ্টা করব, কে ঐ লক্ষ্লৌর অভিজাত পরিবারের মুসলিম মহিলা, যার সঙ্গে ফিরোজের গাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠে? তাঁকে নিয়েই কি ইন্দুর ফিরোজ আর ফিরোজের ইন্দুর মধ্যে ফাটল তৈরি হতে শুরু করে? রগরগে কাহিনীটিকে কতটা আমল দিয়েছিলেন নেহরু অথবা ইন্দিরা? অনেক তথ্য ঘেটেও এ বিষয়ে বাবা মেয়ের প্রতিক্রিয়ার খোঁজ মেলেনি। ঘটনাটি সত্য হলেও নেহরু অথবা ইন্দিরা কেউই অন্যের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ নিয়ে মাথা ঘামাতেন বলে মনে হয় না। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে আমৃত্যু অটুট ছিল তাদের আস্থা।
১৯৮৪-এর ১৫ অক্টোবর সকালে, একান্ত আলাপচারিতায় পুপুলকে ইন্দিরা শান্তি নিকেতনে তার ছাত্র জমানার বিশেষ বন্ধু, প্রায় অন্ধ অনুরাগী অধ্যাপকের নাম বলেননি। অন্য কাউকে বলেছেন—এই তথ্যও জানা যায় না। ভদ্রলোকের সঙ্গে প্রবল তিক্ততা তৈরি হওয়ার পরও, তাকে নিয়ে কখনো কটূক্তিও করেননি। সম্ভবত ঐ অধ্যায় ভুলে থাকতে চেয়েছেন, ঢেকে রেখেছেন নির্ভুল সতর্কতার আবরণে। আমরা অবশ্য লেখার শুরুতেই ইন্দিরা আসক্ত ফ্র্যাঙ্কের কথা বলে রেখেছি, পরে ইন্দিরার প্রতি তাঁর প্রশ্নহীন অনুরাগ আর ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নেহরু কন্যার সঙ্গে তাঁর দেখা, একসঙ্গে পথচলা বা ইন্দুর খোঁজে অধ্যাপকের ঘুরে বেড়ানোর কথাও খানিকটা বলার চেষ্টা করব। এবার তাঁর পরিচয় এবং ইন্দিরাকে তাঁর প্রেম নিবেদনের ভাষা ব্যাখ্যা করা দরকার। এটাও ইতিহাসের রসদ সঞ্চয়ের, ইন্দিরার ব্যক্তিত্বের দ্যুতি খোঁজার একটি রাস্তা।
আগেই বলা হয়েছে, শান্তি নিকেতনের শিক্ষাভবনে ফরাসি পড়াতেন ফ্র্যাঙ্ক ওবারফর্ড। নবাগত ইন্দিরা তথন ষোড়শী, ফ্র্যাঙ্কের পা মধ্যতিরিশে (৩৪)। নির্মেদ। দীর্ঘাঙ্গ। বুদ্ধিদীপ্ত জার্মান। ১৯২২ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। এই সূত্রেই কবিগুরুর আহ্বানে ১৯৩৩ সালে শান্তি নিকেতনে পড়াতে আসেন তিনি। স্বভাবে খানিকটা ভবঘুরে, প্রাণচঞ্চল আর অগাধ তাঁর পান্ডিত্য। রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজি আর নেহরুভক্ত। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় সংস্কৃতিরও নিষ্ঠাবান অনুরাগী। এসব কারণে ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে ইন্দিরার সঙ্গে তাঁর দ্রুত হূদ্যতা গড়ে ওঠে। একেক সময় বিকেলে ভুবনডাঙা পেরিয়ে তাঁরা হাঁটতে হাঁটতে চলে যান ফাঁকা প্রান্তরে, ফিরে আসেন সন্ধ্যার আগে। পরদিন হয়তো দেখা যাবে রাস্তা বদলে গেছে, ছুটছেন শ্রীনিকেতনের লোকালয়ে কিংবা গোপাল বাটির সাঁওতাল বস্তিতে। বাদ যায় না খোয়াই নদীর চরাচরও। পাড়ে কিংবা বালুচরে বসে এরকম হাঁটাহাঁটি, দুই হূদয়ের আড্ডায় শূন্যতা পূরণের প্রয়াসের বিশেষ উল্লেখ।
নেই ইন্দিরার বহুমুখী কোনো জীবনী গ্রন্থে। সচিত্র প্রমাণও মেলেনি। কিন্তু জনশ্রুতির মতো, পুরনো দিনের স্মৃতিচারণের মতো কারো কারো মুখে চালু আছে এসব গল্প। কিন্তু দুজন যে একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন—গল্প করতেন, একে অন্যকে শুনতেন—এসব খবরের সত্যতা অপ্রমাণিত নয়। পরস্পরকে পরস্পরের লেখা চিঠিতেই ছড়িয়ে আছে মেলামেশার নানা চিহ্ন। তাঁদের চিঠি পড়লেই জানা যায়, শীতের পাতা ঝরা বিকেলে কিংবা ক্লাস ছুটির পর গাছতলার স্কুলের প্রাঙ্গণে কিংবা দূরে কোথাও আলাপরত শিক্ষক আর ছাত্রী ক্রমশ লক্ষ্যহীন, রূপরেখাহীন বন্ধনে জড়িয়ে পড়লেও সম্পর্কের শুভ্রতাকে আগলে রাখছে ইন্দিরার আভিজাত্য। এদিক থেকে ফ্র্যাঙ্ক খানিকটা আবেগপ্রবণ। ইন্দিরা চাপা স্বভাবের কিশোরী। তাঁর চিত্তে বাড়তি আবেগের প্রশ্রয় নেই, উদবেগ আর আশঙ্কা তাঁকে ঘেরাও করে রাখে।
জওহরলাল তখন দেরাদুন জেলে বন্দি। মা কমলা নেহরু অসুস্থ, অবসাদগ্রস্ত। নিঃসঙ্গতাবোধ ক্রমশ বাড়ছে, এলাহাবাদের আনন্দ ভবনে তাঁর দিন কাটে নিরানন্দে। মায়ের প্রতি ওখানে পারিবারিক উপেক্ষার খবর চাপা থাকে না, তাঁর ক্রমবর্ধমান মানসিক অবসাদও বাড়িয়ে তোলে ইন্দিরার উদবেগ।
শান্তি নিকেতনে আপনজনের অভাব। শান্ত, নিবিড়, শিল্পিত হলেও অচেনা পরিবেশ। এরকম পরিবেশেই ফ্র্যাঙ্কের বন্ধুত্বে সহজ, শুদ্ধ অবলম্বন খুঁজে পেলেন ইন্দিরা। ফ্র্যাঙ্কও একাকিত্বের শিকার। দেশ ছেড়ে বিদেশে স্বজনহীন। সরলরেখার মতো সোজা জীবনযাপনে অভ্যস্ত। নেশা বইপড়া এবং পড়ানো। এটাই তাঁর বাইরের পরিচয়। একসময় ফ্র্যাঙ্কের ভেতরের ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ইন্দিরার। কখনো কখনো কথাবার্তা আর নির্জনতাঘেঁষা সান্নিধ্য রহস্যময় ঠেকে। তবু অনড় বন্ধুত্বের ধর্ম মেনে তরুণ শিক্ষকের সঙ্গে মিশতে থাকেন। কথা বলেন একান্তে। দিনকয়েকের মধ্যেই ঐ ঐকান্তিকতা ও সম্পর্কের নিষ্ঠার সুযোগ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন প্রেমাসক্ত ফ্র্যাঙ্ক। নির্মেদ, নির্মোহ ইন্দিরার ভেতরে, আরো গভীরে প্রবেশ করতে চাইলেন। বললেন—
তুমি ভারি সুন্দর। অন্যদের থেকে আলাদা।
এই ‘লঘু’ প্রশস্তিতে ইন্দিরা অপ্রস্তুত। প্রথমে নিছক বিদ্রূপ ভেবে উড়িয়ে দিলেন। তবু চিঠি লেখেন ফ্র্যাঙ্ক, পেশ করেন সরাসরি প্রস্তাব। ইন্দিরা নিরুত্তর। নিরুত্তাপ। কিন্তু ভেতরে জ্বলে ওঠে তাঁর ক্রোধ, মাথা তোলে নারী সত্তা। ফ্র্যাঙ্কের স্পর্ধা তাঁকে ক্ষেপিয়ে দেয়, সরাসরি জানিয়ে দেন—
অসম্ভব। এমন কোনো আবেগকে প্রশ্রয় দেয়ার ইচ্ছে নেই। বন্ধুত্ব মানেই তো প্রেম নয়। সম্পর্কের বিন্যাস মানেই কি হূদয় নিয়ে ছেলেখেলা।
সরাসরি, চিঠিতে এভাবে উড়িয়ে দেন ফ্র্যাঙ্কের প্রস্তাব। জার্মান শিক্ষক ইন্দিরার প্রত্যাখ্যানে বিব্রত, উদ্বিগ্ন, তবু তার মন মানে না, নিয়মিত দেখা করতে থাকেন, একান্তে আলাপ করতে চান, প্রশ্রয় দেন ইন্দিরাও।
নাকচ ফিরোজের প্রস্তাব
আশৈশব বাবার ছত্রচ্ছায়ায়, তাঁর শিক্ষায়, চিঠিপত্রে বর্ণিত আদর্শে প্রাণিত ইন্দিরা কখনো নিজেকে নিছক মেয়ে ভাবতে শেখেননি। নারী-পুরুষের সম্পর্কের রহস্যময়তাও তাঁকে স্পর্শ করার সুযোগ পায়নি। একবছর আগে বাল্যবন্ধু ফিরোজও তাঁকে চিঠিতে অথবা অন্যভাবে অনুরূপ প্রস্তাব দিয়ে বসেন। ফিরোজকেও আমল দেননি ইন্দু। ফিরোজের দুর্বলতার খবর জানতেন কমলা। মেয়ে নিছক কিশোরী বলেই ফিরোজকে থামিয়ে দেন নেহরুপত্নী। ফিরোজ আশা ছাড়েননি। নেহরু পরিবারের হিতাকাঙ্ক্ষীর সীমানায় নিজেকে আটকে রেখে, সংযমের আড়ালে আবেগকে চাপা দিয়ে অপেক্ষায় বসে থাকলেন। ইন্দিরা শান্তিনিকেতনে পড়তে আসার পর চিঠি লিখছেন-
আমরা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারি না?
ইন্দিরা নিরুত্তর। বাড়ি ফিরলে তাঁর সঙ্গে ফিরোজের বার বার দেখা হয়। কিন্তু কখনও বাড়াবাড়ি করেন না। ইন্দিরার নির্মীয়মাণ ব্যক্তিত্ব, তাঁর উদীয়মান নারীত্ব সরাসরি জানিয়ে দেয়,
আমরা একে অন্যের বন্ধু মাত্র, স্বাধীনতার জন্যই লড়ছি। ফিরোজও ইন্দিরার হূদয়ের ভাষা বুঝতে পেরে থেমে যান, ভাবতে থাকেন আমরা সহযোদ্ধা, একই পথের পথিক।
ফ্র্যাঙ্কের এরকম কোনো আদর্শ, লক্ষ্য নেই, নেই হাতে হাত রেখে লড়াইয়ের অবিচল সঙ্কল্প। জন্ম জার্মানিতে। বড়ো হয়েছেন ওখানে। দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
ইউরোপ প্রেমের সূক্ষ্মতা বোঝে না, বিশ্বাস করে না গোপনীয়তায়। যা বলার প্রকাশ্যে বলে। আকার-ইঙ্গিতে নয়, ঘোষণা করে সদর্পে, সমস্ত আবরণ নাকচ করে দিয়ে। আবেগ জোয়ার হয়ে আসে, ভাসিয়ে নিয়ে হয়ে ওঠে তরঙ্গ। এহেন তরঙ্গের সঙ্গে পরিচয় নেই প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মিলিত ঘরানায় হয়ে-উঠতে থাকা ইন্দিরার মনন আর স্বভাবের। তাঁর ধ্যানে পুরুষ নেই। আছে মানুষ। তাঁর সাধনা ব্যক্তিগত প্রেমের নয়, সমষ্টির সুখ-দুঃখের সমাধান আর চূড়ান্ত স্বাধীনতার। বন্ধুত্ব তাঁর কাছে কেবল অর্জন নয়, গভীর অবলম্বন। ব্যক্তিস্বার্থের ইচ্ছা অথবা বৈবাহিক সম্পর্কের দাসত্ব থেকে তার দূরত্ব অশেষ। বয়ঃসন্ধি পেরোনোর মুহূর্তেই পারিবারিক শিক্ষা তাঁকে এরকম সচেতন করে তোলে। তাই গোড়াতেই ফ্র্যাঙ্কের প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়ে চিঠিতে জানালেন-
আমরা একে অন্যের বন্ধু, সুখ-অসুখের সঙ্গী হবো। এটাই তো যথেষ্ট। এর চেয়ে বিশুদ্ধ আত্মীয়তা আর কী হতে পারে!
ইন্দিরার প্রত্যাখ্যানকে আমল দেন না ফ্র্যাঙ্ক। তিনি আরও জেদি, আরও মরিয়া, আরও একনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন, বারবার একই কথা
তোমার দৃষ্টি, তোমার ব্যক্তিত্বে আমি মোহিত। আলোড়িত। আমার চাই গভীরতম স্পর্শ, অনড় বন্ধন।
ইন্দিরা বরাবর দৃঢ়চেতা। তাঁর ভাবাবেগে সংশয় নেই। ফ্র্যাঙ্কের চাপ, একতরফা আত্মনিবেদন তাঁকে ক্রমশ খেপিয়ে দেয়। বন্ধুত্বের ভেতরে ঢুকে পড়ে অবিশ্বাসের ঘুণপোকা। ক্ষোভে, ক্রোধে একসময় ভেঙ্গে পড়লেন। অশ্রুসজল বিনিদ্র রাত। তবু এরপরও দু’জনের দেখা হয় ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে। থেমে থাকে না একান্ত আলাপ। স্বাভাবিক বন্ধুত্বের বিনাশ দেখার অভ্যাস নেই ইন্দিরার। ফ্র্যাঙ্ককে বোঝাতে থাকেন। কিন্তু ওঁর বিরামহীন দাবি- বন্ধু ইন্দিরার নয়- ষোড়শীর যৌবনের একচ্ছত্র আলিঙ্গন চায় তাঁর আকাঙ্ক্ষা। পুরুষের সহজাত অভ্যাস তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বারবার বলতে থাকেন-
এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের, এই মাধুর্যের অতলকে স্পর্শ করে বৈবাহিক বন্ধনই আমার লক্ষ্য।
ফ্র্যাঙ্কের সরাসরি প্রস্তাবে আঁঁতকে উঠলেন ইন্দিরা। শেষ পর্যন্ত সীমা ছাড়াল বিরক্তি। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়ে বললেন-
আমার কোনো বিশেষত্ব নেই। অন্য মেয়েরা যেমন, আমিও তেমনি।
ফ্র্যাঙ্ককে লেখা এক বা একাধিক চিঠিতে একথা বলতেও দ্বিধা নেই তাঁর-
I say, this is true except for my birth, being the daughter of an extraordinary man and an exceptional woman.
আমি বলছি, আমি জানি, আমার কোনো স্বাতন্ত্র্য নেই। হ্যাঁ এটা সত্য যে, আমি একজন অসাধারণ পুরুষ এবং বিরল মহিলার মেয়ে।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ইন্দিরা যখন শান্তিনিকেতনে ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, নিভৃতে মেলামেশা করছেন। এসব খবর কি ফিরোজের কাছে পৌঁছে যায়? ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে তখন, কিংবা পরে কখনো তাঁর আলাপ হয়নি। তবু ফ্র্যাঙ্কের অস্তিত্ব সম্পর্কে একেবারেই কি ওয়াকিবহাল ছিলেন না? যদি তাই হয়, তাহলে প্রায় একই সময়ে কেন উনিও প্রণয়ের প্রস্তাব পাঠালেন ইন্দুকে? আমাদের অনুমান, অন্য কারো সূত্রে ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে ইন্দিরার মেলামেশার খবর তাঁর কাছে পৌঁছে যায়। তাই প্রতিদ্বন্দ্বীকে রুখতে, যথাসম্ভব দ্রুত ইন্দিরাকে প্রণয়ের প্রস্তাব পেশ করলেন চিঠিতে। চিঠি পেয়ে জ্বলে উঠলেন ইন্দু। নীরবতা অবলম্বন করে- বসে থাকলেন। ক্ষুব্ধ, বিষণ্ন তাঁর চিত্ত। পরে ঠাণ্ডা মাথায় পত্রোত্তরে জানিয়ে দিলেন-
এরকম কোনো পরিকল্পনা নেই আমার, আমরা একে-অন্যের বন্ধু, স্বাধীনতা সংগ্রামের সহযোদ্ধা মাত্র।
১৯৩২। ইন্দিরা পুনের পিপল্স ওন স্কুলের ছাত্রী। আর এই শহরে ইয়েরাব্দা জেলে বন্দি মহাত্মা গান্ধী। নেহরুসহ অন্য কংগ্রেস নেতারাও বিভিন্ন কারাগারে আটক। দেশ উত্তাল। ব্রিটিশের ওপর চাপ বাড়িয়ে তুলছে কংগ্রেস। ব্রিটিশ সরকার শঙ্কিত। জাতীয় ঐক্য ভাঙ্গতে বিভাজন নীতির আশ্রয় নিচ্ছে। আচমকা হরিজনদের জন্য আলাদা নির্বাচনী ব্যবস্থা ঘোষণা করল। মহাত্মা তাঁর সহজাত, শান্ত ভঙ্গিতে অনড় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আমরণ অনশনে বসলেন। এই খবরে গোটা জাতি উত্তেজিত। হরিজনদের জন্য মন্দিরের দরজা এবার উন্মুক্ত। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সভা, মিছিল শুরু হয়ে গেল উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিমে। ভারত ইতিপূর্বে এই দৃশ্য দেখেনি। মহাত্মার অনশনে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ। তিনি তখন প্রায় প্রতিদিন ছুটে যাচ্ছেন তাঁর কাছে। ২৭ সেপ্টেম্বর, সারাদিন অনশনরত বাপুর সান্নিধ্যে কাটালেন ইন্দিরা, সেদিন ওখানে উপস্থিত রবীন্দ্রনাথকে এই প্রথম সরাসরি, কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলেন। সেদিন রাতেই নেহরুকে চিঠি-
বিকেল প্রায় ৫টা পর্যন্ত একবিন্দু জলও মুখে দিলেন না বাপু। ড. টেগোর আর জেল কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ করলেন, ড. টেগোর বাংলা গান গাইলেন, আশ্রমের লোকেরাও সমস্বরে বাপুর প্রিয় ভজন বৈষ্ণবজন গেয়ে উঠলেন, বাপু এবার শরবত খেয়ে অনশন ভঙ্গ করলেন।
ইন্দিরা তাঁর চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে কেন ড. টেগোর সম্বোধন করলেন? জানা যায় না। নাম জানতেন না তা নয়। পণ্ডিত নেহরু রবীন্দ্রনাথের প্রবল অনুরাগী। কবিগুরু কমলারও অশেষ শ্রদ্ধার পাত্র। পুনেতে রবীন্দ্রনাথকে খানিকটা দূর থেকে দেখার একবছর পর কলকাতা থেকে ট্রেনে সস্ত্রীক শান্তিনিকেতনে হাজির হন নেহরু। তখনই কবি অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর দেখা। প্রথম আলাপ। শান্তিনিকেতনের পরিবেশ দেখে তখনই নেহরু দম্পতি সিদ্ধান্ত নেন, ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে এখানেই শুরু হবে ইন্দিরার ভিন্নতর ছাত্রজীবন।
শান্তিনিকেতনে পড়তে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ছিল না ইন্দিরার। ওখানকার পরিবেশ, পাঠক্রম সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। নেহরুর ধারণাও পরিষ্কার নয়। জুন, ১৯৩৪। দেরাদুন জেলে বসেই দীর্ঘ নোট তৈরি করলেন- ইন্দু যদি শান্তিনিকেতনে যায়, তাহলে শিক্ষাভবনে, অর্থাত্ ওখানকার ইন্টারমিডিয়েটে তাঁকে ভর্তি হতে হবে। পাঠক্রমের বিষয় হিসেবে বেছে নিতে হবে ইংরেজি, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা ইত্যাদি। আমি মনে করি, হিন্দি আর ফরাসি ভাষাও তাঁর শেখা দরকার। ভর্তির আবেদনপত্রের সঙ্গে এই নোটও জুড়ে দিলেন নেহরু।
রবীন্দ্রনাথের সচিব অনিল চন্দকেও চিঠি লিখলেন-
আমার ধারণা খুব অদ্ভুত। মেয়েদের কেবল বসার ঘরে নিছক একটি ভূমিকা পালনের দায়িত্ব শেখায় যে শিক্ষা তার প্রতি আমার অনীহা তীব্র। আমি মনে করি, অন্তত ১ বছরের জন্য আমার মেয়ে কোন ফ্যাক্টরিতে অন্যান্য শ্রমিকের মতো কাজ করবে- আর এটাই হোক তার বিদ্যান্বেষণের প্রাথমিক প্রয়াস। বর্তমান ভারতবর্ষে এটা অবশ্য অসম্ভব।
৭ জুলাই। কলকাতা থেকে ট্রেনে ইন্দিরাকে নিয়ে বোলপুর এলেন কমলা নেহরু। শান্তিনিকেতনে আসার আগে নানা উদ্বেগ ভর করে ইন্দিরার চিন্তায়। মায়ের অসুখ বাড়ছে, ধর্ম তাঁকে গ্রাস করছে। বাবা দেরাদুনের জেলে, বাড়ি থেকে অনেক দূরে। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেও নিজেকে গুটিয়ে নেন ইন্দিরা। খুব একটা কথা বলেন না। বয়ঃসন্ধির সমস্যা, অব্যক্ত হতাশা, অবরুদ্ধ অবসাদ ছায়া ফেলছে মুখচিত্রে। মেয়ের এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না নেহরু। তাঁকে স্বার্থপর, দায়িত্বজ্ঞানহীন, দ্বিধাচ্ছন্ন ভাবতে থাকেন। শান্তিনিকেতনে পড়তে যাওয়ার ব্যাপারেও তাঁর অনিচ্ছা।
চিঠিতে বাবাকে জানালেন-
ওখানে মেয়েদের হোস্টেলে থাকতে হবে, একসঙ্গে। এ এক সমস্যা। ওখানকার খাবার খেতে পারব কিনা সংশয় আছে। অনভ্যস্ত পরিবেশে হয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ব। যদি কারও কটেজে থাকার ব্যবস্থা হয়, আর বাড়ির কোনো পরিচালক আমার সঙ্গে থাকে, রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার করে দেয়, খুবই ভালো হয়।
মেয়ের চিঠি পেয়ে নেহরু ক্ষুব্ধ। প্রত্যুত্তরে লিখলেন, ‘সাধারণের কাছ থেকে তোমার নিজেকে সরিয়ে রাখার এ প্রস্তাব অসঙ্গত, অদ্ভুত লাগছে। আমি এটা মোটেও পছন্দ করি না। সবাই যা খাবে, তোমাকেও তা খেতে হবে।’
নেহরু তাঁর ইন্দুকে কখনও এভাবে বকেননি। বকুনিতে কাজ হল। এরপর ইন্দু আর কখনও এরকম আবদার করেননি। শান্তিনিকেতনে সাধারণের সঙ্গে মিশে গেলেন, ক্রমশ মেনে নিলেন এখানকার জীবনযাপনকে। না, শুধু মেনেই নেননি, একসময় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বনে গেলেন শান্তিনিকেতনী সংস্কৃতির।
ইন্দু সবদিক থেকেই সফল হোক, স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক, এটাই ছিল নেহরুর স্বপ্ন। কেনো কোনো বিষয় বা পাঠক্রমের ব্যাপারে তাঁর কিছু কিছু আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বুঝেছিলেন, ইন্দুর আত্ম-উন্মোচন বা তাঁকে ঘিরে নিজের স্বপ্ন চাষের সেরা আশ্রয় অবশ্যই কবিগুরুর সান্নিধ্য আর শান্তিনিকেতন। প্রথম দর্শনে মুছে যায়, বদলে যায় ইন্দিরার বিভ্রান্তি। নেহরুকে চিঠিতে নিঃসঙ্কোচে বললেন-
এখানকার নিসর্গ, খোয়াই, ধূলোভরা লালমাটি, উন্মুক্ত আকাশ, গাছে গাছে ঝুলন্ত কালো মুখের শাখামৃগ, রাতে প্যাঁচার স্লোগান, আলো ছড়িয়ে দলবদ্ধ জোনাকির সঙ্গম- সবই অভিভূত করে দেয়।
এই প্রথম সরাসরি ভূপ্রকৃতি আর গ্রামীণ মানুষের মেঠো গন্ধ পেলেন শহুরে বালিকা।
সবার রঙে মিশে যায়
রবীন্দ্রনাথ তখন ৭৩। দুর্বল, ঈষত্ ন্যুব্জ দীর্ঘ দেহ, কাঁধের ওপর ঢেউ খেলছে, চুল, চওড়া কপাল, শ্মশ্রুতে শুভ্রতার দ্যুতি, কোটরাগত চোখে গভীর বিস্ময়কর অন্তর্দৃষ্টির একজন কবি, দার্শনিক আর স্বপ্নদ্রষ্টা। অনুরাগীদের ভিড়ে তাঁকে যতই দেখেন, বিস্ময় ততই বাড়তে থাকে। পরিবেশ, নতুন নতুন বন্ধুত্ব, গাছতলায় পঠন পাঠন, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের নৈকট্যে তিনি মোহিত, উদ্বুদ্ধ। নিজের অজান্তে তাঁর আত্ম-উন্মোচন ঘটতে থাকে, নিজের ভেতরে অন্য ইন্দিরাকে খুঁজে পেয়ে যান। যে নাচতে চায়। গাইতে চায়। আঁঁকতে চায়। প্রতিটি ঋতুবদলে বদলাতে চায় পোশাক। মিশতে চায় সবার সঙ্গে। কালক্রমে উধাও সমস্ত পূর্বভয়। হোস্টেলের খাবারে আর অরুচি নেই। অনীহা নেই মেয়েদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশায়। তিনি নেহরুকন্যা, আনন্দভবনে বিলাসিতার প্রাচুর্য দেখতে দেখতে বড়ো হয়েছেন, ছেলেদের পোশাক পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন- সব ভুলে গিয়ে সবার মধ্যে মিশে যাচ্ছেন।
থাকার জায়গা শ্রীভবন ছাত্রী আবাস। পাথুরে মেঝের ঘরে আরও তিন মেয়ের সঙ্গে থাকতে হয়, ঘুমোন মাটিতে মাদুর বিছিয়ে, কুয়ো থেকে বালতিতে জল তুলে স্নান করেন। বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। রাত মানেই ঘুটঘুটে আঁধার আর নিয়ম মেনে ঘুম। প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ ঘন্টার আওয়াজ শুনেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তে হয়, শুরু হয় ঘর-পরিষ্কার, রান্নাবান্না, বিছানা তোলা- অর্থাত্ স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সানন্দ প্রশিক্ষণ।
শান্তিনিকেতনের পাঠক্রম নিয়ে প্রাথমিক সংশয় কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না নেহরু। ইন্দিরা ভর্তি হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই কর্তৃপক্ষকে তাঁর চিঠি-
বিজ্ঞানের অন্তত দু’টি বিষয় যেন ইন্দুকে পড়তে দেওয়া হয়। রসায়ন আর অন্য যে কোন একটি।
রসায়ন নিয়ে পড়াশুনো শুরু করেও ইন্দিরা ফেল করার ভয়ে ছেড়ে দিলেন। হিন্দি নিয়েও একইরকম ভীতি, যা পরে কেটে যায়। এসবের বাইরে তাঁর প্রবল আগ্রহ ধ্রুপদী নৃত্যে। সবচেয়ে প্রিয় ক্লাস। দ্রুত নানা অঞ্চলের নাচ রপ্ত করলেন। যোগ দিতে শুরু করলেন স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এখানে তাঁর শিল্পচেতনারও উন্মেষ ঘটে। নেহরু পরিবারে মতিলালের আমল থেকে আধুনিকতা আর রক্ষণশীলতা পাশাপাশি বিরাজ করত। আনন্দভবনের অন্দরমহলের বাইরে ছিল পাশ্চাত্য রীতি। এটি নেহরুর মা স্বরূপরানির দখলে। এখানে মধ্যযুগীয়, সংস্কারাচ্ছন্ন ভারতের বসবাস। আধুনিকতা, গানবাজনা, বিলিতি নৈশভোজও নিষিদ্ধ। ৭২ কামরার বিশাল বাড়ি। একদিকে আত্মীয়-স্বজন, বিধবা বোন, নিজের পরিচারিকাদের নিয়ে স্বরূপরানির বসবাস। রক্ষণশীল কাশ্মীরি মহিলা। ভীষণ দাপুটে। আরেক পাশে শৌখিন মতিলাল নেহরুর বৈঠকখানা। ভাইসরয়, নবাব, জমিদার, ব্রিটিশ আমলাদের নিয়ে প্রতিদিন মজলিস বসে। মুঘলাই আর ব্রিটিশ কেতায় অভ্যস্ত তাঁর খাস কর্মীরা। এক সময় হিন্দি, উর্দু চলত। পরে ইংরেজি ঢুকে পড়ে অনায়াসে।
তখন প্রায়ই কারারুদ্ধ হয়ে থাকতে হয় জওহরকে। কমলা অসুস্থতা আর অবসাদে আক্রান্ত। শিল্পচর্চায় মেয়েকে এগিয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই তাঁর। দাপুটে স্বরূপরানিও এ ব্যাপারে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো মহিলা নন।
শান্তিনিকেতনে এসে নিজেকে অবরোধমুক্ত অনুভব করে শিল্পচর্চায়, নাচে, গানে মজে গেলেন ইন্দু। নিজের সৃজনশক্তিকে আবিষ্কার করলেন। এখানেই বর্ণময়তা আর রঙের সঙ্গে তাঁর প্রথম প্রেম। প্রকৃতি যে এত বিচিত্র, ঘনঘন রঙ বদলায়- তা জানা আর দেখার এমন সুযোগ আগে মেলেনি। এই প্রত্যক্ষ অনুভব প্রবিষ্ট হয় তাঁর অভ্যন্তরে, আরো গভীরেও। প্রভাব পড়ে পোশাক-আশাকে। বিশেষ করে শাড়ি নির্বাচনে। পরবর্তী জীবনেও এই রুচি সযত্নে বহাল রেখেছেন। কোথায় গেলে কোন শাড়ি পরবেন, কোন ঋতুতে কোন রঙ মানানসই- এই সূক্ষ্মতা, এই সৌন্দর্যপ্রীতি আমৃত্যু সঙ্গী ছিল তাঁর। রঙের বৈচিত্র্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি করে দেয় শান্তিনিকেতনই। এখানেও তিনি রবীন্দ্রনাথের নিরলস অনুগামী।
নেহরু নিয়মনিষ্ঠ মানুষ। এক্ষেত্রে মেয়ের ব্যাপারে আরও সচেতন। বাঙালি মেয়েরা শরীরচর্চায় আগ্রহী নয়। খায়, ঘুমোয়, মোটা হয়। এই অভ্যাস যেন ইন্দিরার ওপর ভর না করে- চিঠিতেও বারবার লিখতেন। ইন্দিরা হোস্টেলে ব্যায়াম করতেন কিনা, জানা যায় না। পরীক্ষার উত্তরপত্রও জেলে তাঁর কাছে পাঠাতে বলতেন। ইন্দিরা পাঠাতেন কিনা, এই খবরও অজানা থেকে গেছে। কিন্তু ইন্দু যে তাঁর চাপা স্বভাব থেকে দূরে সরছেন, হয়ে উঠছেন ভিন্নতর কিশোরী- তাঁর পড়াশুনোর নিষ্ঠা আর পাঠক্রমের বাইরের অনুশীলনে, সক্রিয় অংশগ্রহণে, উত্তরণেও এর পরিচ্ছন্ন রূপরেখা ফুটে উঠছিল। পোক্ত হচ্ছিল ভবিষ্যতের ব্যক্তিত্বময়, অসাধারণ আত্মবিশ্বাসী ইন্দিরার ভিত। এখানে এসেই খালিপায়ে হাঁটতে শিখলেন।
গান্ধীজিও নগ্নপদে হেঁটে বেড়াতেন। কারণ গরিব মানুষ এভাবেই হাঁটেন। জুতো কেনার সামর্থ্য নেই তাঁদের। শান্তিনিকেতনে খালিপায়ে হাঁটার অন্তরালে রবীন্দ্রনাথের একটা দর্শন ছিল। এতে পা আর দেহ অনুভব করে মাটির স্পর্শ। কোন দর্শনকে বেছে নিয়েছিলেন ইন্দিরা, গান্ধীজির না রবীন্দ্রনাথের? হ্যাঁ, খালিপায়ে হাঁটলেও তাঁর পা কোমলতা হারায়নি। কিন্তু সঙ্কটে, ব্যক্তিগত দুর্যোগে, রাজনৈতিক বিপর্যয়ে তিনি কখনও টলেননি, তার প্রমাণ তাঁর আমৃত্যু অকম্পিত চিত্ত আর উন্নতশির।
শান্তিনিকেতনে ইন্দিরার একমাস কেটে গেল। সব আড়ষ্টতা উধাও। বন্ধুর সংখ্যা বাড়ছে। নিয়মিত ভোরের প্রার্থনায় যোগ দেন। ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে আড্ডা চলে। দূর থেকে রবীন্দ্রনাথকে দেখেন, তাঁকে ঘিরে থাকেন নানা প্রান্ত থেকে আগত দর্শনপ্রার্থীরা। কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক কে নেই এই তালিকায়! কবিগুরুর ব্যক্তিত্বে তিনি মুগ্ধ। সান্নিধ্যে যাওয়ার সাহস হয় না। রবীন্দ্রনাথ শান্ত স্বভাবের ইন্দুর চালচলন আর চোখের ভাষা পড়ে জেনে গেছেন, তাঁকে নিয়ে ওর ব্যাপক কৌতূহল। কাছে আসতে চায়, দ্বিধা এড়াতে পারছে না। একদিন ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি আমাকে ভয় পাও, দেখা করতে আসো না!’
প্রশ্নে ইন্দিরা বিব্রত। কেন এই আচমকা প্রশ্ন? মুহূর্তে ইতস্তভাব কাটিয়ে জবাব দিলেন-
আপনি সবসময় ব্যস্ত। কাজে ডুবে থাকেন। বিরক্ত করতে চাই না বলেই আসি না।
এই প্রথম রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সরাসরি আলাপ। এরপর অন্যদের সঙ্গে তাঁর কাছে যাওয়া শুরু হল। কবি হয়তো তাঁর বাড়ির সামনে ছবি আঁঁকছেন- অদূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন ইন্দিরা। কোথাও কোনো সভায় বলছেন বা গান গাইছেন- শুনছেন প্রিয়দর্শিনী।
একমাসের মধ্যেই শান্তিনিকেতনের চেতনা আর সুরে অনেকটাই মিশে গেলেন। পারিপার্শ্বিকও তাঁকে সাদরে বরণ করে নিল। প্রকৃতি আর ইন্দিরা এখানে একাকার। গাছতলায় পঠন-পাঠন, সংযত, প্রাণচাঞ্চল্য, অকৃত্রিম সংস্কৃতিচর্চা- সর্বত্রই আত্মীয়তার স্পর্শ।
এলাহাবাদের আনন্দভবনে তখন বিপরীত চিত্র। হঠাত্ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন কমলা নেহরু।
বিদায় শান্তিনিকেতন, আলবিদা ফ্র্যাঙ্ক
ক্ষয়রোগ কমলার মনের গভীরে অদ্ভূত অসুখ তৈরি করে দিচ্ছিল। সংশয় আর পরস্পরবিরোধে ক্রমশ আক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন তিনি। মনে করতেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর কাছে আসা-যাওয়া করছেন। রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী অভয়ানন্দকে চিঠি লিখে জানালেন-
একেক সময় মনে হয়, আমি নিজেই কৃষ্ণ।
রোগ ক্রমশ জটিল হয়ে উঠল, ডা. কেকার জওহরলালের সঙ্গে কথা বলে জানিয়ে দিলেন, যত দ্রুত সম্ভব, চিকিত্সার জন্য ইউরোপে নিয়ে যেতে হবে।
নেহরু আলমোড়া জেল থেকে প্রায়ই দেখতে আসেন কমলাকে। মেঘ ঘনিয়ে আসছে, সঙ্কট বাড়ছে। ১৩ এপ্রিল, ১৯৩৫ (অন্যমতে ১৩ মার্চ, ১৯৩৬)। ইন্দিরা শান্তিনিকেতনে মণিপুরি নৃত্যের রিহার্সালে ব্যস্ত। সামনে তাঁর প্রথম একক অনুষ্ঠান। হঠাত্ রবীন্দ্রনাথের হাতে টেলিবার্তা এসে পৌঁছাল, পাঠিয়েছেন স্বয়ং নেহরু। লিখেছেন-
কমলা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। ওকে নিয়ে অবিলম্বে ইন্দুকে ইউরোপে ছুটতে হবে। এতএব, ইন্দিরাকে শান্তিনিকেতনে রাখা আর সম্ভব নয়। যথাসম্ভব দ্রুত, ভওয়ালিতে পৌঁছাতে হবে, সঙ্গে কেউ এলে ভালো হয়।
রবীন্দ্রনাথ রিহার্সাল কক্ষ থেকে ডেকে পাঠিয়ে খবর জানাতেই ইন্দু স্তব্ধ। উপায় নেই। সঙ্গে সঙ্গে হস্টেলে ছুটে গিয়ে তাঁর যাবতীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলেন।
মন ভার। শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার বিলকুল ইচ্ছে নেই। হূদয় জুড়ে আছে গোটা আশ্রম। পড়ে থাকবে এখানেই তাঁর নানা স্মৃতিচিহ্ন, ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফের বিষণ্ন চেহারাও। পরদিন রওনা দিলেন কলকাতার উদ্দেশে। ওখান থেকে ট্রেনে পৌঁছাতে হবে ভওয়ালি। রবীন্দ্রনাথ কাউকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বললেন, রাজি হলেন না ইন্দিরা। একাই বেরিয়ে পড়লেন।
পরের সপ্তাহে জওহরলালকে চিঠি লিখলেন কবি-
ভারাক্রান্ত হূদয়ে ইন্দুকে বিদায় জানাতে হল, সে ছিল এখানকার সম্পদ, শিক্ষকদের সবাই ওর ব্যবহারে, আচরণে মুগ্ধ, ছাত্রদের মধ্যেও জনপ্রিয়তার খবর আমি জানি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সব ঠিক হয়ে যাবে, সে আবার এখানে ফিরে আসবে।
ফিরে আসেননি ইন্দিরা। তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাস, কর্মসূচি থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল শান্তিনিকেতনের অধ্যায়। ইন্দিরা শান্তিনিকেতন ছাড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আরেকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। শিক্ষাভবনে বিদ্যাদানের অবসান ঘটিয়ে আচমকা জার্মানি ফিরে গেলেন ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফ। ইন্দিরাহীন শিক্ষাঙ্গন হয়তো তাঁর দুর্বিষহ লাগছিল, তাড়া করছিল স্মৃতি, চেপে ধরছিল নিঃসঙ্গতা! অসত্য নয় এই অনুমান।
পরবর্তীকালে তাঁর চিঠিতে, ইন্দুর সঙ্গে বাক্যালাপের চেষ্টা এই প্রমাণ আমরা পেতে থাকব। দেখব, ইউরোপেও ইন্দিরাকে ফলো করছেন তাঁর ব্যর্থ প্রেমিক। তাঁকে নিয়ে সুইজারল্যান্ডের ওয়েনজেন-এ স্কি করতে ছুটে যাচ্ছেন। নিভৃতে সময় কাটছে দুজনের। ইন্দিরার ছবিও তুলছেন ফ্র্যাঙ্ক। চোখের আড়াল হয়েও একজন আরেকজনকে চিঠি লিখেছেন।
এ পর্যন্ত আমাদের জানা হয়ে গেছে যে, চিকিত্সকদের পরামর্শে ক্ষয়রোগে গুরুতর অসুস্থ কমলাকে অবিলম্বে জার্মানিতে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেহরু। মায়ের দেখাশোনা করার জন্য সঙ্গে যাবেন ইন্দু। তাই তাঁকে শান্তিনিকেতন ছাড়তে হল, ভারাক্রান্ত হূদয়ে। ইন্দুকে হঠাত্ চলে যেতে হবে, রবীন্দ্রনাথও ভাবেননি। তবু তাঁর আশা ছিল, ইন্দু ফিরে আসবে, এখানেই লেখাপড়া করবে। কবিগুরুর আশ্রমে তাঁর অবস্থান মাত্র একবছরের। মাত্র ১২ মাসে, ঘটে গেল কত বিচিত্র, অপ্রত্যাশিত ঘটনা। এলাহাবাদের আনন্দভবনে একধরনের অশান্তি। কারারুদ্ধ নেহরু। পাঠভবনে পড়তে পড়তে ইন্দিরাও বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিপক্ক হয়ে উঠছিলেন। বাড়ি নিয়ে, মাকে নিয়ে মায়ের প্রতি বাবার উদাসীনতা নিয়ে ভেতরে ভেতরে তাঁর ক্ষোভ জমছিল।
তবু দৈনন্দিন পড়াশুনার প্রতি উপেক্ষা দেখা যায়নি। উড়ন্ত গুজব আর ভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফ আর তাঁর ইন্দিরার-অর্থাত্ ষোড়শী ছাত্রীর সঙ্গে মধ্যবয়স্ক শিক্ষকের মেলামেশাকে আশ্রমিক আর শিক্ষকদের অনেকেই সহজ দৃষ্টিতে দেখেননি। এসব খবর রবীন্দ্রনাথের মতো সতর্ক শিক্ষাসংগঠক, প্রগাঢ় প্রশাসকের অজানার কথা নয়। সম্ভবত তিনি জানতেন এবং ক্ষুব্ধ হয়েও মুখ খোলেননি, এ ব্যাপারে নেহরুকে কোনো বার্তা পাঠিয়েছিলেন কি না, প্রমাণ মেলেনি। জওহরলালের আভিজাত্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত একজন বাবার সূক্ষ্ম দায়িত্ববোধ। মেয়ের পড়াশুনা, চরিত্রগঠন, খাওয়া-দাওয়া, শরীরচর্চা- সব ব্যাপারে সচেতন বাবা কি জানতেন না যে, বিদেশি এক অধ্যাপক ইন্দিরার প্রেমে আত্মহারা? ইন্দিরাও তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করছেন, সঙ্গোপনে আলাপ করছেন। প্রশ্রয় দিচ্ছেন কখনো, আবার নিজেকে গুটিয়েও নিচ্ছেন। যে নেহরু কারারুদ্ধ অবস্থায় মেয়েকে নিয়মিত লিখেছেন, তাঁর লেখাপড়ার বিষয়-আশয় নিয়ে পরিচিতজনদের কাছে প্রায়ই খোঁজ নিচ্ছেন- ইন্দুর বিশেষ পুরুষ বন্ধুটি সেই নেহরুরই অগোচরে পড়ে রইবেন, বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আশৈশব ইন্দিরা গোপনীয়তার বিশ্বাসী-তিনিও অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্ককে নিয়ে বাড়িতে কখনো উচ্চবাচ্য করেননি। এটা তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ। কিন্তু নেহরুর মতো জনপ্রিয়, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং জনসংযোগী নেতা ষোড়শী ইন্দুর আত্মমগ্নতার আড়ালে চেপে রাখা সংশয়, অস্থিরতা কি টের পাননি? দুর্জন আর দুর্মুখেরা এখনো রটিয়ে বেড়ান, শান্তিনিকেতনের ছাত্রী ইন্দিরার অতলে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে ক্রমশ বিরক্ত হচ্ছিলেন নেহরু। রবিঠাকুরকেও ঘেরাও করছিল অস্বস্তি। ঘটনাচক্রে, ঠিক ওই সময়েই কমলার অসুখ বাড়ল। তাঁর সঙ্গে মাতৃভক্ত কন্যাকে ছুটতে হল ইউরোপে। ওখান থেকে শন্তিনিকেতনে আর ফেরা হলো না। ফিরতে চান, ইন্দিরাও কখনো এমন আগ্রহ প্রকাশ করেননি। কারণ কী? ফ্র্যাঙ্কের প্রতি মোহভঙ্গ, না নেহরুর সুদৃঢ় অনিচ্ছা?
ফিরোজের প্রথম প্রবেশ
মার্চ ১৯৩০। শীত যাই যাই করছে। দিনকয়েক পরেই গরম পড়বে। দাবদাহে পুড়তে থাকবে উত্তর ভারত। শীতের শেষ লগ্নেই আপাত শান্ত স্মতরী গান্ধীজি অশান্ত। স্বৈরাচারী ব্রিটিশ রাজশক্তির কোপানলে আমজনতার রেহাই নেই। গ্রাম থেকে শহরে সর্বত্র। অকথ্য জুলুম চালাচ্ছে সশস্ত্র পুলিশ। সর্বাত্মক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদের বুঝতে হবে। মহাত্মার নির্দেশে বানর সেনা তৈরী করল কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবী যুবক-যুবতীরা। স্কুল-কলেজে পিকেটিং। ক্লাস বয়কট চলছে। ফিরোজের দলের তখনো ইঁদুর দেখা হয়নি। ফিরোজ ব্রিটিশতত্ত্ব পরিবারের সন্তান। কলেজ ছাত্র। আড্ডাবাজ, খানিকটা পিতৃহীন তরুণ। কংগ্রেসের আন্দোলনে আগ্রহ নেই। পারিবারিক প্রভাবে যুবশক্তির, মহিলাদের গণসংগ্রামকে তার তামাশা বলে মনে হচ্ছে।
ইন্দিরা তখন বানর সেনার সক্রিয় কর্মী, নিষ্ঠাবান নেত্রী। নেহরু খানদানের, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই রাস্তায় বেরিয়ে আসছেন। তাদের একটাই সঙ্কল্প-চাই দেশের মুক্তি। চাই পূর্ণ স্বাধীনতা। স্বরূপ রাণী (নেহরুর মা), বিবি আম্মা (জওহরের বিধবা মাসী), বিজয়লক্ষ্মী থেকে বাড়ির সব সদস্য সত্যাগ্রহ, অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা যেন প্রথম যুদ্ধ শেষের ঘোমটা খোলা তুর্কি নারী। নেহরু ওই সময় জেলে বন্দী। কিন্তু ফ্রাঙ্ক ওবারডর্ফ? যাঁর সঙ্গে ঠিক চার বছর পর শান্তি নিকেতনে ইন্দিরার দেখা হবে। যিনি একান্ত প্রণব প্রার্থীর আসক্তি নিয়ে ভুবনডাঙ্গা থেকে খোয়াই, গোপালভাটি পর্যন্ত ধুলো মাটির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলবেন, তুমি অসাধারণ দীপ্তিময়ী, অন্যদের থেকে আলাদা- তিনি কি ভারতীয় রাজনীতির, উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের খবর রাখতেন। গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকা অসম্ভব নয়, দু’জনেই একসময় দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করেছেন, ওখানেই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার সংস্পর্শে আসেন, পরে ইউরোপ জুড়ে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়ান। আত্মসচেতন, স্বাধীন বিবেক। সমসাময়িক ঘটনা, স্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষ আর ব্রিটিশ ভারতে গণবিস্ফোরণ, সামাজিক উত্তেজনা, নেহরুর কারিশমা ইত্যাদির খবর তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। নেহরু দম্পতির একমাত্র সন্তান ইন্দিরার নাম ওই মুহূর্তে সম্ভবত তাঁর কানে পৌঁছায়নি। কেননা, ইন্দু উদীয়মান কিশোরী মাত্র।
এলাহাবাদের বাসিন্দা ফিরোজ নেহরু পরিবারকে চিনতেন, নেহরু কন্যাকে দূর থেকে দেখলেও এড়িয়ে চলছেন, তফাত দু’জনের বয়সে, তফাত মতাদর্শে। ফিরোজ ইন্দুর থেকে অন্তত ৬ বছরের বড়ো। পারিবারিক ঘরানা, ধর্মীয় পরিচয়ও আলাদা। ইন্দু কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ কন্যা। অভিজাত পরিবারের সন্তান। ফিরোজের বুনিয়াদ বোম্বাইয়ে। তিনি ইরানী বংশোদ্ভূত। মুসলিম নন, পার্সি। কালক্রমে, আমরা দেখতে পাব, একদিন সব তফাত্ মুছে দিয়ে তিনি ইন্দিরার শৈশবেই নেহরু খানদানের সন্তানতুল্য সদস্য হয়ে উঠছেন। কিন্তু এর আগে, সম্ভবত ১৪ এপ্রিল, তাঁকে আর কমলা নেহরুকে ঘিরে এলাহাবাদ শহরে, অপ্রত্যাশিত নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেল।
বেলা দুপুর। প্রবল সূর্যতাপে এলাহাবাদ পুড়ছে। তীব্রদাহ উপেক্ষা করে দলে দলে রাস্তায় নামছেন বেপরোয়া সংগ্রামীরা। আছড়ে পড়ছে জনস্রোত। উন্মুক্ত মাঠের দিকে এগোচ্ছে। মিছিলের অগ্রভাগ উত্তেজিত, দুঃসাহসী কমলা নেহরু। আজ ময়দানে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেবেন জওহর গিন্নি। ছাতাহীন মহিলা, মাথায় ঝরে পড়ছে নৃশংস রোদ। ঘামে ভিজে যাচ্ছে শাড়ি, ভিজে যাচ্ছে দেহের সমস্ত আবরণ। দূরে থেকে দাঁড়িয়ে তাঁর বেপরোয়া ভঙ্গি, সরোর পদক্ষেপ দেখে যাচ্ছে একটি যুবক। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বংশ পরিচয় অজ্ঞাত। সে সত্যাগ্রহে যোগ দিতে আসেনি। এসেছে ভিড়ের মেজাজ দেখতে, হয়তোবা নিরীহ শ্রোতার মতো ভাষণ শুনতে।
ক্রুদ্ধ অথচ নিরস্ত্র জনস্রোতকে ছয়তলা করতে আচমকা উত্তেজনা বাড়িয়ে জনতার ওপর লাঠি চার্জ শুরু করল ব্রিটিশ পুলিশ। কমলা কোমরে শাড়ির আঁচল গুজে ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো রুখে দাঁড়ালেন। উঁচিয়ে ধরলেন হাতের জাতীয় পতাকা। যুবকটি খানিকটা দূর থেকে লক্ষ্য করল, মারমুখী পুলিশ কমলার দিকে এগোচ্ছে, দ্রুতবেগে। কমলা অবিচল, ভয়শূন্য ভ্রূক্ষেপহীন তেজস্বিনী। পুলিশের লাগামহীন ঔদাত্য, অশ্রাব্য ভাষা প্রয়োগে এবার বেসামাল হয়ে উঠল যুবকটি। ভিড় ঠেলে নিঃশব্দে তড়িত্ বেগে এগিয়ে তাদের লাঠি কেড়ে নিয়ে চলল, ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ল। রাজশক্তির পুলিশ কমলাকে ছেড়ে দিয়ে এবার তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। যুবকের দুঃসাহসে হতভম্ভ, বিস্মিত কমলা। জনতা ছত্রভঙ্গ। পালাচ্ছে। আরেক দল তাকে রক্ষা করতে মরিয়া, টানতে টানতে নিরাপদ আস্তানায় সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। কমলা অসহায়। পেছন দিকে বারবার ফিরে তাকাচ্ছে। যুবকটিকে পুলিশ বেধড়ক পেটাচ্ছে। মারতে মারতে ভ্যানে তুলছে। ভ্যান মুহূর্তে হাওয়া, আটক যুবকসহ পৌঁছে গেল পুলিশের সদর দপ্তরে। কে এই বেপরোয়া তরুণ। তিনি ফিরোজ গান্ধী। ইন্দিরার ভাবী প্রণয়প্রার্থী এবং স্বামী। ওই দিনের ওই ঘটনার ভিন্নতর একটি বয়ানেরও সন্ধান পেয়েছি আমরা। কোনটা সত্য বলা মুশকিল। কমলা নেহরু আর ‘বানর সেনার’ অন্যতম নেত্রী কংগ্রেসের মহিলা স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত এলাহাবাদের অ্যাডউইং খ্রিষ্টান কলেজে পিকেটিং করতে গেছেন। দলে অসংখ্য সদস্য। কলেজের রাজনীতিবিমুখ ছাত্ররা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মহিলাদের বিক্ষোভ দেখছে। কেউ কেউ পাঁচিলের ওপরে। ফিরোজের বয়স তখন ১৮। বলিষ্ঠদেহী তরুণ। ওই কলেজেরই ছাত্র। তাঁর নজরে মেয়েদের এই পিকেটিং তামাসা মাত্র। পাঁচিলে বসে সেও মজা দেখছে। কলেজ চত্বরের বাইরে উত্তেজিত ভাষায় ভাষণ দিচ্ছেন কমলা। পাশে সুদর্শনী ইন্দিরাসহ আরো অনেক তরুণী। মাথায় কারো ছাতা নেই, সূর্যের অসহ্য তেজ, অসহ্য গরম। হঠাত্ অজ্ঞান হয়ে কমলা মাটিতে পড়ে গেলেন। ফিরোজ পাঁচিল থেকে ঝাঁপ দিয়ে নেমে দৌঁড়ে কলেজের ভেতর থেকে পাত্রভর্তি জল আর পাখা হাতে মাতৃসম কমলার দিকে ছুটে গেলেন। পৌঁছিয়ে দিয়ে এলেন বাড়িতেও। ঘটনা পুলিশ আর কলেজের ইংরেজ কর্তৃপক্ষের নজর এড়ায়নি। পরদিনই তাঁকে বহিষ্কার করে দেয়া হল।
বিবরণ যাই হোক না কেন, যেখানেই ঘটুক না কেন, ওই ঘটনাই নেহরু পরিবারে ফিরোজের অবাধ প্রবেশের, অকৈশোর ইন্দিরার সঙ্গে তাঁর মেলামেশার এবং দ্বিধাহীন কমলাতত্ত্ব ও কংগ্রেস অনুগামী হয়ে ওঠার উত্স। আবার, মা মেয়ের সঙ্গে ফিরোজের সংকোচহীন আচরণ অনাকাঙ্ক্ষিত, বিতর্কিত বহু কেচ্ছা আর ঘটনার রসদও যোগাতে থাকল।
বলা জরুরি, এটাই কুত্সা আর কেচ্ছার স্বভাব। সামাজিক সন্দেহ এবং পরশ্রীকাতরতাই কেচ্ছা আর ঘটনার জন্ম দেয়। একই শব্দের ধ্বনিগত, উচ্চারণগত, ব্যবহারগত কিঞ্চিত রূপান্তর বদলে দেয় শব্দের আদি শূন্যতা আর অভিমুখকে। কিসসা শুনে আমরা আনন্দ অনুভব করি, স্বপ্ন দেখি। শোনার বয়স শৈশব হলে পঙ্ক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে উড়তে থাকি। শুনতে শুনতে পাতালপুরির দৈত্যের সঙ্গে দেখা হলেও ভয় পাই না। বরং ছুঁয়ে থাকে রোমাঞ্চ। এ এক অদ্ভুত মজা। যেখানে শঙ্কা নেই। আক্রান্ত হবার ভয় নেই। বয়সের তফাত নেই, একাকার হয়ে যায় কৈশোর আর বার্ধক্য। অথচ এই একই আরবিজাত শব্দ যখন বিকৃতি, কৃত্রিমতা ও অতিরঞ্জন আর হীন উদ্দেশ্য নিয়ে হাজির হয়, তখন কিস্সা আর কিস্সা থাকে না। উচ্চারণ, অর্থ, তথ্য, লক্ষ্যের প্রবল তারতম্য ঘটে যায় ডালপালা বেয়ে স্তরে স্তরে ব্যক্তি আর সমষ্টিকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে কলঙ্ক আর নিভাঁজ ঘটনা। শোভিত, পূজিত ব্যক্তিত্ব, মনোহর চেহারা, কুরসির ক্ষমতা, দাম্পত্যের প্রেম, এমনকি মোলায়েম স্নেহকেও রেহাই দেয় না কেচ্ছার কোলাহল। এই অর্ধদার্শনিক উপলব্ধি বা মনোবিজ্ঞানের বিষয়টি এখানে একারণেই উল্লেখ করতে হচ্ছে যে, যে স্বচ্ছতা নিয়ে, শুভ দৃষ্টি নিয়ে, একজন মায়ের প্রতি বিনম্র আকর্ষণ নিয়ে একদিন নেহরু পরিবারের আনন্দভবনে প্রবেশ করেছিলেন তরুণ ফিরোজ গান্ধী- সেই শুভ্রতাই পরে কেচ্ছার কবলে পড়ে তাঁর এবং কমলার নির্মোহ, নিষ্পাপ সম্পর্ককে মুখরোচক কুিসত রটনার বিষয় করে তোলে। নেহরু, গান্ধীজি আর কংগ্রেসের শুভবুদ্ধির একাংশ এসবকে আমল দেননি। কিন্তু বাড়িয়ে তোলে কমলার মানসিক অসুখ। মন হয় অবসাদগ্রস্ত, প্রায় জেলবন্দী আটক স্বামীর সঙ্গ লাভ থেকে বঞ্চিত কমলার দৈহিক রোগের অন্যতম কারণ ফিরোজের সঙ্গে তাঁর স্নেহকাতর সম্পর্ক নিয়ে তখনকার এলাহাবাদবাসীদের বাড়তি কৌতূহল আর ঘটনার রচনা। আমাদের দুর্ভাগ্য, নেহরু ও শ্রমতী গান্ধীর জীবনী লেখকদের অনেকেই এসব কেচ্ছা আর ভিত্তিহীন, কেলেঙ্কারিকে নস্যাত্ করেননি। বরং সাধারণ মনোরঞ্জনের খোরাক ভেবে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ফিরোজের পিতৃপরিচয় নিয়েও কুিসত প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি, ফ্রাঙ্কের সঙ্গে ইন্দিরার ব্যক্তিগত সম্পর্কের শৃঙ্খলতাকেও রেহাই দেননি। বলতে দ্বিধা নেই, যাঁরা ব্যক্তিজীবনকে ছুঁয়ে ঘটনাকে উঁচু করে, ইতিহাস তাদেরই কলঙ্কিত বলে চিহ্নিত করে রাখে, কেননা এরা ইতিহাসের শত্রু। শ্রীমতী গান্ধী, কমলা নেহরু, ফিরোজ, ফ্রাঙ্ক ওবারডর্ফকে ঘিরে যেসব কেচ্ছা রচিত হয়ে আছে, স্তরে স্তরে তথ্য দিয়ে, যুক্তি দিয়ে বিবেক দিয়ে এসবের সত্যাসত্য আমরা খতিয়ে দেখব। প্রমাণ করার চেষ্টা করব, গত শতাব্দীর সবচেয়ে বলিষ্ঠ এবং ব্যক্তিত্বময়ী একজন মহিলা রাজনীতিকের জীবনসঙ্গী, নির্বাচিত বধূ এবং গুরুজনেরাও ছিলেন তাঁরই মতো উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
বাতাসে কেচ্ছা আর রটনা
ছোটবেলার আমরা ’৬০-’৭০-এর দশকে মিসেস গান্ধীকে নিয়ে অজস্র গুলগল্প শুনেছি। না, এভাবে বলাটা ঠিক হল না। লেখা উচিত রটনার পর রটনাকে কখনো কখনো বিশ্বাসযোগ্যই মনে হয়েছে। বড় হয়েও তাকে নিয়ে রসালো গল্পে খুঁজে পেয়েছি আড্ডার অবাঞ্ছিত রসদ। এই যেমন আসামের একজন মন্ত্রীকে উনি শিল্পদপ্তরের দায়িত্ব দিয়ে দিল্লিতে নিয়ে গেলেন, তখন ইচ্ছাকৃতভাবে রটনা হল-ভদ্রলোক সুদর্শন। বাগ্মী ব্যক্তিময় ইন্দিরার অনুগত। দু’জনের স্বাভাবিক সম্পর্কের আড়ালে তীব্র, স্পর্শচতুর রহস্যময়তা লুকিয়ে আছে। এ কারণেই আসাম রাজনীতির কোন্দলের শিকার বন্ধুকে দিল্লিতে নিজের কাছেই রাখতে চাইলেন। এরকমই আরেকটি গল্প। শান্তিনিকেতনেই নাকি জনৈক ভদ্রলোকের সঙ্গে ইন্দিরার আলাপ। লন্ডনে আবার দেখা। ওখানেও দু’জন একে অন্যের আরো নিবিড় সান্নিধ্যে এলেন।
স্মৃতিকাতার ডাকসাইটে কমিউনিস্ট। নেহরু পরিবারের প্রবল অনুরাগী। ফিরোজেরও একান্ত বন্ধু। লন্ডনে মজলিসে তারা জড়ো হতেন। পরে বাগ্মী নেতাটি পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বহুবার। আমৃত্যু সিপিআই নেতা ’৯০’র দশকে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন। শ্রীমতী গান্ধীর বিরহেই নাকি আজীবন অকুতোদার হয়ে রইলেন। আর যখন শান্তিনিকেতনে যেতেন, চুপ করে পাঠভবনের আশেপাশে কলাভবনে দাঁড়িয়ে থাকতেন— কেননা এসব ধূলোমাটিতে লেগে আছে ষোড়শীর সঙ্গে তার মেলামেশার গল্পগুজবের ধূসর স্মৃতি। হ্যাঁ, ইন্দিরা আর ফিরোজের অভিন্ন বন্ধু ছিলেন তিনি। ফিরোজ যখন বিদেশে ইন্দিরা ওর দ্বারস্থ হয়ে বললেন-
আমরা বিয়ে করব ঠিক করেছি-
ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন-
আর ইউ সিওর, তুমি নিজের চেনা অভ্যাস বদলাতে পারবে তো?
হতচকিত অপ্রস্তুত ফিরোজ নুয়ে ওর হাঁটু ছুঁয়ে জবাব দিলেন-
আমার আন্তরিকতা, ইন্দুর প্রতি আনুগত্যের কী প্রমাণ চাও বলো!
ইন্দিরা তখন হাসছেন। পরনে শাড়ি। কানে দুল। কমলার প্রতি ফিরোজের সুদীর্ঘ শ্রদ্ধাবোধে ইন্দু পরিতৃপ্ত, আশ্বস্ত। সন্দেহ করার মতো বিন্দুমাত্র ফাঁক নেই। ইন্দিরাকে নিয়েও ফিরোজ সবধরনের সংশয়ের, অবিশ্বাসের সম্পূর্ণ উর্ধ্বে। বহু পথ পেরিয়ে স্থির তার সিদ্ধান্ত, দুর্দিনের সুসময়ের সঙ্গীকেই বিয়ে করবেন। কেননা লোকটি সরল। স্পষ্টবাদী। সত্যনিষ্ঠ। দ্রোহ তার নিত্যসঙ্গী। হ্যাঁ, ভিত্তিহীন কলঙ্ক আর গল্পের গরুরা যেমন তাকে, তার মা-বাবাকে রেহাই দেয়নি, তেমনি পার পাননি ফিরোজও। চরাচরে শয়তানের দুর্বুদ্ধি সবসময় ঘুরে বেড়ায়, রুখতে চায় সততার নির্মাণকে। ব্যতিক্রম নন জওহর-কমলার ইন্দু। কেচ্ছা রটনা, কল্পিত প্রেমের গল্প বারবার তাকে নির্দেশ দিয়েছে, পাঁক ঘেঁটে পাতালে প্রবেশ করো। আমল দেননি ইন্দিরা। সপ্রতিভ দীপ্তি নিয়ে জ্বলে উঠেছেন, চুপ থেকে কলঙ্ক লেপনের সব প্রয়াসের উত্সমুখ বন্ধ করে ঘুরে বেড়িয়েছেন। স্বমহিমা আর আত্মমর্যাদার স্বঅর্জিত জমিতে। রাজনৈতিক ভুল করেননি। করেছেন। আবার সে ভুল থেকে বেরিয়ে এসেছেন অনায়াসে। তার ব্যক্তিত্বে, ক্রমঅর্জিত চিন্তায় নারী-পুরুষের ভেদাভেদ কখনো প্রশ্রয় পায়নি। মা কমলা, বাবা নেহরু, দাদা (ঠাকুর্দা) মতিলাল কখনো চাননি, নিছক নারীসুলভ অভ্যাস রপ্ত করুক ইন্দু। প্রকৃতির মতো, নির্সগের ছবির মতো, জোয়ান অফ আর্ক বা ঝাঁসির রানী বা দুঃসাহসী রাজিয়া সুলতানার মতো মাতৃত্ব আর কঠোর বাস্তবকে দেখতে দেখতে, স্পর্শ করতে করতে নির্মিত হোক তার নারীসত্তা।
ইন্দিরা তাদের হতাশ করেননি। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার অভিজ্ঞতা, তার বয়স, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সঙ্কট ও সাফল্য যেরকম বেড়েছে, তেমনি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে সৌন্দর্য, চিত্তাকর্ষক শক্তি ও অপরাজেয় উত্তরণ। একক অথবা সমবেত প্রতিপক্ষ তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পেত না। মুখোমুখি দাঁড়ালে ঐক্যবদ্ধ। প্রবল বিদ্রোহী ছাত্রশক্তিও তার শাণিত ভাষায় ঘায়েল হয়ে পড়ত।
প্রসঙ্গত একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। গুয়াহাটির কটন কলেজে আমরা তখন বিএ ইংরেজি অনার্সের ছাত্র। দ্বিতীয় তেল শোধনাগারের দাবিতে রাজ্যজুড়ে অশান্ত ছাত্র ইউনিয়ন। লাগাতার পিকেটিং ক্লাস বয়কট, মিটিং-মিছিল চলছে। দাবির সমর্থনে গোটা আসাম ঐক্যবদ্ধ। সঙ্কটে আসাম সরকার। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সরাসরি দিল্লি থেকে গুয়াহাটিতে উড়ে আসবেন প্রধানমন্ত্রী। নির্ধারিত, নির্দিষ্ট তাঁর কর্মসূচিতে ঠিক হয়ে আছে, কলেজের ইউনিয়ন হলে ছাত্রদের সামনে ভাষণ দেবেন তিনি। কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত। প্রশাসন সতর্ক। ছাত্রদের সিদ্ধান্ত, যেই তিনি সভাসদনে ঢুকবেন, স্লোগান দিতে দিতে সবাই এক সঙ্গে বেরিয়ে যাবে। পরদিন যথাসময়ে গাড়ি থেকে নেমেই তিনি গটগট করে মঞ্চে প্রবেশ করলেন। গম্ভীর মুখ। পরনে তাঁতের শাড়ি। বৃহত্ ইউনিয়ন হলে থই থই করছে ছাত্ররা। ফিসফিস আওয়াজ উঠছে।
লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান। অ্যান্ড মাই বিলাভেড ইয়ং ফ্রেন্স অফ স্টুডেন্ট কমিউনিটি-এই বলে যেই তাঁর ভাষণ শুরু হল, সবাই চুপ, স্তব্ধ। একটি পাও নড়ল না। কেউ সভা ছেড়ে বেরুল না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁকে শুনতে লাগল-আই ডু আন্ডারস্ট্যান্ড ইওর নীড, ইওর ফিলিংস, অনেস্ট ডিমান্ড অ্যান্ড ইমোশন। ইউ হ্যাড আর্নড মাই রেসপেক্ট, মাই হার্ট লাইজ উইথ ইউ...
সুন্দরী তরুণীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেমন ভীরু প্রেম প্রার্থীর ভাষা হারিয়ে যায়, যেমন প্রবল ঝড়ের মুখে নির্বাক বসে থাকে ভয়ার্ত পথিক, যেমন বন্যার স্রোতে ভেসে যায় বঞ্চিত বানভাসীদের ক্ষোভ, ঠিক এরকমই আমাদের অবস্থা। সব ক্ষোভ, পরিকল্পিত সব দ্রোহ, সভা বয়কটের পূর্ব সিদ্ধান্ত গেল, থমকে গেল শ্রীমতী গান্ধীর সুউচ্চারিত, সুদৃঢ় ভাষণে। এই হলেন ইন্দিরা, ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী।
এমন একজন সিন্ধ, ব্যক্তিত্বময় মহিলাকেও একজন বিদেশি পররাষ্ট্র সচিব ‘ডাইনি’ কটাক্ষ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। আমাদেরও সমাজের একাংশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মুহূর্তে তাঁর জেদ, তাঁর পরোক্ষ লড়াই নিয়ে পরদেশ লোভী, আগ্রাসী-এরকম কত না কটূবাক্য বর্ষণ করেছেন। আর আজ শতবর্ষে পা দেবার প্রাক্কালে হয়তো তাঁরাই এশিয়ার অন্যতম, উজ্জ্বলতর মুক্তিকামী বলে তাঁর ব্যক্তি পূজো শুরু করবেন। ইতিহাস অবশ্য ইন্দিরাকে তাঁর নির্মোহ দৃষ্টিতেই বিচার করবে। খুঁজে দেখবে তাঁর ভালোমন্দ। ‘ইন্দু-বয়’ থেকে ছাত্রনেত্রী, কংগ্রেসের সভানেত্রী, কয়েক দশকের প্রধানমন্ত্রী এবং তুখোড় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী জননায়িকার ক্রম উত্তরণ ও আত্মনির্মাণের কাহিনীর ব্যাখ্যা বলে রাখবে যুক্তি ও তথ্য।
ইন্দিরা, নেহরু দম্পতির প্রথম সন্তান, কিন্তু একমাত্র নন। কমলা একটি ছেলেরও জন্ম দিয়েছিলেন। রুগ্ন। ওজন কম। বেশিদিন বাঁচেনি। তাঁর মৃত্যুশোক ভুলতে পারেননি জননী, সম্ভবত মেয়ের মধ্যেই মৃত ছেলের হয়ে-ওঠার স্বপ্ন দেখতেন। ছোটোবেলা তাঁকে ছেলেদের পোশাক পরিয়ে রাখতেন। গায়ে কোর্তা, পরনে পাজামা, শীর্ণ লিকলিকে চেহারা, চুলে কিশোর কিশোর ছাট, অনেক সময় তাকে ছেলে বলে অনেকে ভুল করতেন। কেউ কেউ ‘ইন্দু-বয়’ বলে মজা করত। মেয়ে বেলার পোশাক-আশাক কি কোনো প্রভাব ফেলেছিল তাঁর চিন্তায়? এ ব্যাপারে লিখিত-অলিখিত তথ্য মেলে না। তবু মনে হয়, পরিধেয় সাজ সজ্জা, বয়কাট চুল শৈশব থেকেই তার নিজেকে নিছক মেয়ে ভাববার গন্ডীর বাইরে বের করে দেয়।
অল্প বয়সে, চেহারা নিয়ে তাঁর কিছুটা অকারণ অস্বস্তিও কাজ করত। নিমের্দ, পাতলা গড়ন। ঘন ভ্রু। মুখের চেয়ে বড়ো বড়ো চোখ। লম্বা, ধারালো নাক। মুখের রং ফর্সা, নীরক্ত, ইতালীয় আদল সব মিলিয়ে অপরূপ সুন্দরী বলতে যা বোঝায়, তা নয়। একবার পিসি নানপণ্ডিত তাঁকে ‘কুিসত্, বুদ্ধিহীন’ বলে মন্তব্য করলে ইন্দু প্রথমে না শোনার ভান করে এড়িয়ে যান। কিন্তু ভুলে যাননি। নিকটাত্মীয় অরুণ নেহরু লিখেছেন, নানপণ্ডিতের মন্তব্য ইন্দিরাকে বিষণ্ন, মুডি করে তোলে। কিন্তু বয়স যত বাড়তে থাকল, বদলাতে থাকে তাঁর বুদ্ধি, তাঁর চেহারা, তাঁর মেজাজ। তাহলে বুদ্ধিবৃত্তির বৃদ্ধির সঙ্গে মুখাবয়ব আর স্বভাবের কোথাও কি মিল আছে? হতে পারে।
ষোল বছর বয়স থেকেই ইন্দুির চেহারায় ঝলকে ওঠে দ্যুতি আর দীপ্তি। মৃত্যুর আগে, পরিণত বয়সেও তাঁকে আমরা দেখেছি, অসাধারণ সুন্দর। যেকোনো পোশাক মুখ আর দেহের সঙ্গে মানানসই। ভারতীয় রাজনীতিতে এমন গ্ল্যামারস মহিলা আর দেখা যায়নি। নাতনি প্রিয়াঙ্কার স্বভাবে, দৃষ্টিতে, অনেক সময় যৌবনের ইন্দিরা এসে যায় না। কিন্তু হাঁটা চলার ভঙ্গিতে, দেহের ভাষায় ঠাকুমা কোথায়? ইন্দু যখন পূর্ণ ষোড়শী, তখনই নিজের নারীসত্তা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠলেন। খাদির পাজামা পাঞ্জাবি উধাও। গায়ে রঙীন সুতির শাড়ি, হাতকাটা ব্লাউজ। মাথায় কোকড়ানো ববকাট কেশগুচ্ছ নিয়ে পুরুষ চিত্তে ঢেউ তোলার মতো যোগ্যতম তরুণী। সহজাত চলাফেরা, স্বাভাবিক দেহভঙ্গি, গলার স্বর অনুচ্চ। পরি নন, রূপ সচেতনও নন, কিন্তু সব অর্থে উদাসীন, ভ্রুক্ষেপহীন সুন্দরী (কেয়ারলেস বিউটি)। চোখে মুখে আভিজাত্যের ভিন্নতর আলো এরকম এক তরুণী যদি ক্রমশ আড্ডায় সঙ্গী হয় ওঠেন, চিত্তাকর্ষক আলাপের খোরাক যোগান, তাঁর প্রতি যে কোনো পুরুষের, বিশেষ করে ইরানি বংশজাত ফিরোজের মতো উদ্দাম, আমুদে, নারী আসক্ত যুবকের হূদয়ে নিঃশব্দ ঝড় ওঠা স্বাভাবিক।
এলাহাবাদের খ্রিস্টান কলেজে পিকেটিং করতে গিয়েই ফিরোজের সঙ্গে ইন্দুর প্রথম দেখা, ১৯৩০ অথবা ৩১-এ। তখন থেকেই ঘটনা প্রবাহ একই খাতে বইতে থাকে। একই অভিমুখ দিয়েও দুজনের পথচলা শুরু। দেখতে দেখতে মধ্যবিত্ত পরিবারের পিতৃহীন পার্সি যুবক আনন্দ ভবনের অবিচ্ছেদ্য সদস্য হয়ে উঠলেন। রাজনীতি, কমলার অসুখ, প্রায় একটানা নেহরুর কারাবাস তাঁদের আরো কাছাকাছি নিয়ে আসে। কিন্তু গোড়ার দিকে ইন্দিরা উদাসীন। ফিরোজ কমলার আস্থাভাজন, স্নেহধন্য, যেকোনো প্রয়োজনে নেহরু গিন্নির অন্দরমহলে তাঁর ডাক পড়ে, ফিরোজ ছুটে যান, কমলার সেবা করতে পারলে গর্বিতবোধ করেন-এসব বিষয়ে ইন্দিরার বাড়তি কৌতূহল নেই। নিঃসঙ্গ মায়ের প্রয়োজনে একজন আসা-যাওয়া করছে, সঙ্গ দিচ্ছে-কাউকেই বিরক্ত করছে না, এতে অস্বাভাবিকতা কোথায়? সহজ মনে ফিরোজের আনাগোনা মেনে নিলেন ইন্দিরা। বহুদিন পর একজন বন্ধুকে জানিয়েছেন-
ও যখন আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইত, অকারণ অনিচ্ছায় আমি ওঁকে এড়িয়ে যেতাম। ভাল্লাগত না, আড়স্ট বোধ করতাম।
তখন থেকেই কমলার অসুখ দানা বাঁধছে। নিজেই তা আঁচ করলেন। বাড়তে থাকল ইন্দুকে নিয়ে তাঁর আশঙ্কা, দুশ্চিন্তা। মেয়ের ভবিষ্যত্ নিয়েও উদ্বেগ জেগে উঠল। দেখছেন, ‘রাস্তার পাশের বৃক্ষের তো’ তরতর করে সে বেড়ে উঠছে, মাটি ছুঁয়ে, বাতাস ছুঁয়ে, ডানা মেলছে নিজের জোরে। বাবা জেল বন্দি, বাড়ির লোকজন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, স্বরূপরানী অসুস্থ। ইন্দুর দিকে খেয়াল করবে, পরামর্শ দেবার, তার ভালোমন্দ বিচার করার কেউ নেই। শৈশব থেকে নিজেই যে নিজের অভিভাবক, একা একা সিদ্ধান্ত নেয়, পড়তে বসে। স্বাবলম্বিতাই তার ভরসা। কিন্তু বয়ঃসন্ধিক্ষণ বড়ো অদ্ভুত, ভয়ঙ্কর। এ বয়সে তাঁর স্নেহ চাই, সহানভূতি চাই, চাই অন্যের সাহচর্য ও পরিচর্যা। হ্যাঁ একজন আছেন, তিনি স্বরূপ রানী, গৃহকর্তী, রক্ষণশীল। ছেলেকে নিয়ে ‘অবশেসন’-এ ভোগেন। মাসের পর মাস যে জেলে বন্দি, পুত্র শোকেই তাঁর অসুস্থতা বাড়ছে। বাড়ছে অস্থিরতা, নাতনির উঠতি যৌবনও উত্কণ্ঠার কারণ হয়ে উঠছে। হঠাত্ যেন জেগে উঠলেন স্বরূপরানী, বলতে শুরু করলেন ওর জন্য যোগ্য কাশ্মিরী পাত্র দেখতে হবে, বিয়ের বয়স হয়েছে, আর দেরি করা চলবে না, কমলার সঙ্গে কথা বললেন। বিষণ্ন পুত্রবধূ প্রথমে নিশ্চুপ, পরে বেঁকে বসলেন। এত অল্প বয়সে ইন্দুকে বিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। দাদির উদ্বেগ দেখে ইন্দিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, এসব কী কথাবর্তা, সরাসরি মাকে সমর্থন করে জানিয়ে দিলেন, এসব অসম্ভব অবাস্তব স্বপ্ন। ফিরোজ ইতিমধ্যে অনেকটাই ইন্দিরার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। সামান্য সুযোগ পেলেই তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, কিন্তু এড়িয়ে যাচ্ছেন নেহরু কন্যা। ফিরোজের প্রতি কমলার টান পরিবারের সবার জানা, জওহর ও ইন্দু ছাড়া কেউই বিষয়টাকে সুনজরে দেখছেন না, আড়ালে-আবডালে, ওকে নিয়ে কথা হয়-কমলা ছেলেটিকে বড্ড বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছেন, লক্ষণ ভালো নয়, রহস্যাবৃত।
সুযোগ বুঝে ফার্সি যুবক ইন্দুর প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগের কথা জানিয়ে দিলেন। সরাসরি বললেন-
আমি ওর প্রণয়প্রার্থী। আমি ওকে বিয়ে করব।
কমলা ওঁর প্রস্তাব শুনলেন। স্বাভাবিক নীরবতা অবলম্বনে প্রসঙ্গকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। গত কয়েক বছরে ফিরোজের প্রতি কমলার আস্থা, নিষ্পাপ অনুরাগ অনেকটাই বেড়ে গেছে। নিঃসঙ্গ অবস্থায় সে তাঁর ভরসা, ফিরোজ কমলার দুর্বলতা দিব্যি জেনে গেছেন। নেহরু গিন্নিকে অন্য চোখে দেখেন, তার স্নিগ্ধতা, মাতৃত্ববোধ তারও আশ্রয় হয়ে উঠছে। প্রতিদিন আসেন, দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করেন, রাজনীতি নিয়ে দুজনের কথাবার্তা হয়, একজনকে ছাড়া অন্যজনের চলে না। ফিরোজ সুদর্শন, শক্তপোক্ত চেহারার যুবক, মুখে দৃঢ়তার চিহ্ন, দৃষ্টিতে অদ্ভুত মায়ামমতা আর সপ্রতিভ আবেদন। কিন্তু কখনো বড্ড আগ্রাসী মনে হলেও নিয়ন্ত্রণ, সংযম হারায় না। কমলা অবগত, তাঁর ভাষা আলাদা, ধর্মীয় পরিচয় আলাদা, নেহরু খানদানের মতো নেই তাঁর আভিজাত্য, ডাঃ শিরিন কমিশরিয়ত ছাড়া পরিবারের কাউকেই তাঁরা চেনেন না। অতএব ফিরোজকে ইন্দুর স্থায়ী জীবনসঙ্গী ভাবা, এ ব্যাপারে কথা বলার চেষ্টা অলীক স্বপ্ন। অসম্ভবের চেয়েও অসম্ভব। শুনলেই পরিবারের সবাই রে রে করে তেড়ে আসবে। ইন্দুর প্রতি ফিরোজের অনুরাগের বিষয়টি মেয়ের কানে তুললেন। আত্মস্থ ষোড়শী সরাসরি জানিয়ে দিলেন-
আই অ্যাম নট অ্যাট অল ইন্টারেস্টেড।
ইন্দুর শীতল অনাগ্রহ ফিরোজের কাছে গোপন রেখে নিঃসঙ্কোচে জওহর-গিন্নি বলে দিলেন—
ইন্দিরা ইজ টু ইয়ং, ওর বয়স এখন অল্প।
ফিরোজের প্রস্তাব এভাবে এড়িয়ে গেলেন বটে। কিন্তু তাঁর হূদয়ের কিনারে কি উঁকি দেয়নি অনুরূপ স্বপ্ন! একবার নয়, বার বার? ফিরোজের ইন্দু-অনুরাগের প্রসঙ্গ জওহরকে কেন বলেননি? ভয়ে, সঙ্কোচে না অন্য কোনো রহস্যময় কারণে?
ইন্দুর প্রত্যাখ্যানে, কমলার পরোক্ষ অসম্মতিতেও থেমে থাকেননি ফিরোজ। পুনের স্কুলে অন্তত দু’বার চিঠি লিখে প্রস্তাব পেশ করলেন ফিরোজ—
আমি তোমার একান্ত অনুরাগী, প্রণয় প্রার্থী।
অবশ্যই গোপনপত্র। দীর্ঘ। টগবগে যৌবনের আবেগে উদ্দীপ্ত। কোনো চিঠিরই জবাব দেননি ইন্দিরা। ফিরোজের বার বার জ্বলে উঠে মশালকে নিভিয়ে দিয়েছেন নীরব কৌশলে।
আমরা ইতিমধ্যে জেনে গেছি, এলাহাবাদের খ্রিস্টান কলেজে পেকেটিং-এর মুহূর্তে ইন্দিরা আর কমলার সঙ্গে ফিরোজের প্রথম দেখা। তারপর আনন্দ ভবনে তাঁর যাতায়াত শুরু। কমলার অনুরাগী, একান্ত ভক্তের পরিচয় নিয়েই ওঁদের বাড়িতে প্রবেশ। ওখানেই নেহরুর সঙ্গে আলাপ। কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ। গান্ধীরও সান্নিধ্যে আসেন এই সূত্রে। কমলার প্রতি তার অনুরাগ ক্রমশ গাঢ় হয়ে ওঠে। কমলাও তাকে অবলম্বন ভাবতে থাকলেন। আর, এই ভাবনার সুযোগ নিয়ে ফিরোজ কিশোরী ইন্দিরার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার ফিকির খুঁজলেন। ঘনিষ্ঠতার আকাঙ্ক্ষা একসময় অনুরাগের জন্ম দেয়, জাগিয়ে তোলে সংরাগের, ভালোবাসার প্রত্যাশা। অদৃশ্য, অস্পষ্ট এ অনুভূতি ব্যবহূত হলে ইন্দুকে নিয়ে তাঁর এক ধরনের ‘অবসেশন’ তৈরি হয়। সরাসরি অথবা একাধিক চিঠিতে কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা জানাতে থাকেন। ১৯৩৪-এ ফ্রাঙ্ক আর ইন্দুর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠলে চিঠি লিখে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বসেন। এবারের প্রত্যাখ্যান অবসেশনকে আরো বাড়িতে তোলে। একপেশে আকর্ষণ বাড়তে থাকে। ইন্দিরা ব্যতিক্রম। কেবল ফ্র্যাঙ্ক বা ফিরোজ নন, অন্য কারো প্রস্তাবেও সাড়া দেননি। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি তাঁকে এভাবে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন বলেও তথ্য মেলে না। যদিও কুকথা, রটনা বহুবার ধাওয়া করেছে তাঁকে।
বলা হয় ফিরোজ ভোগ বিলাসী পুরুষ। নারীর প্রতি, দৈহিক উষ্ণতার পেছনে ছুটতে তাঁর কোনো কার্পণ্য ছিল না। ভালো খাবার, উত্তম পানীয়, যৌনতায় আসক্তি তাঁর মজ্জাগত—এই অভিযোগ তুলেছেন মার্কিন লেখক ক্যাথারিন। আমরা তাঁর প্রমাণহীন মন্তব্যকে নিছক রটনা বলেই ভাববো। কারণ বিষয়টি ব্যক্তিগত। দ্বিতীয়ত, ইন্দিরা ফিরোজের যৌন খিদে নিয়ে জনৈক বন্ধুর কাছে সরস, সংক্ষিপ্ত গল্প বললেও কদাপি নালিশ করেননি। কিন্তু ফিরোজের পরশ্রীকাতর বন্ধু আর লক্ষ্নৌ-এলাহাবাদের কংগ্রেসিরা তাঁকে ছাড় দেননি। এমন কি মাতৃতুল্য কমলার সঙ্গে ফিরোজের সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে, রটনা ছড়াতে রুচিতে বাধেনি। কুিসত অপবাদ ইন্দিরা আর জওহরের কানে পৌঁছোয়নি, তা নয়। তারা মিথ্যাচারিতাকে মিথ্যাচার ভেবেই আভিজাত্যের আড়ালে, আবর্জনার স্তূপে ছুঁড়ে দিয়েছেন।
থ্রু আউট হিজ লাইফ ফিরোজ ওয়াজ অ্যা ওয়ম্যানাইজার’ বলে যাঁরা অপবাদ রটিয়ে রসালো গল্পের মজা পান, তাঁদের মধ্যে হেরু পরিবারের শত্রুমিত্র অনেকে জড়িত। ইন্দিরা আর নেহরুর জীবনকথা কয়েকজন ভাষ্যকারও শোনা গল্পে বিশ্বাস করে সত্যাসত্য, প্রাথমিক তথ্য ও ঘটনাপঞ্জী না ঘেটে রটনাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ভাবতে অবাক লাগে, তাঁদের কি একবারও মনে হয় না ফিরোজ আর কমলার বয়সের দূরত্ব অন্তত ১২ বছর। এই প্রশ্নও কি জাগে না, যে মহিলাকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে দেখে বা তাঁর দিকে পুলিশের উঁচিয়ে ধরা লাঠির হুঙ্কার শুনে যে যুবক দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যায়, মহিলাকে উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে, স্যানাটোরিয়ামে তাঁকে পাহারা দেয়, সঙ্গ দেয় এবং যে ওই মহিলার প্রিয় কন্যার সৌন্দর্যে, ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে ঘন ঘন প্রণয়ের প্রস্তাব পেশ করে-তাঁর পক্ষে কাঙ্ক্ষিত প্রেয়সীর মায়ের সঙ্গে অসামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা কি সম্ভব? ধিক রটনার কুিসত ইতিহাস, ধিক্।
তথ্য, যুক্তি, বিবেককে পাশে রেখে বলা দরকার, ফিরোজ আর কমলার সম্পর্ক ছিল নিঃসন্দেহে নির্মোহ, নিষ্পাপ। অলৌকিক। আধ্যাত্মিক। ধর্মপ্রাণ কমলা ফিরোজকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। ফিরোজও মাতৃসেবার আড়াল থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রণয়ী ইন্দিরার সান্নিধ্যের স্বপ্ন দেখতেন। এই স্বপ্নে কোনো ভুল নেই, ভেজাল নেই। বরং তাঁর স্বপ্নময়তাকে ঘিরে কমলার প্রতি যে আকর্ষণ গড়ে ওঠে-তাকে বড়জোর প্লোটোনিক বলা যেতে পারে। অথবা এভাবেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব যে দান্তে আর বিয়োত্রিচের, সুফি কবি মহিউদ্দিন ইবন-উল-আরবির সঙ্গে তাঁর কল্পিত অথবা বাস্তবের নায়িকা জয়নাবের বা রাবেয়া বসরির সঙ্গে ঈশ্বরের যে নির্মোহ, নির্মেদ সম্পর্ক মধ্যযুগে গড়ে উঠেছিল, ঠিক তেমনি স্পর্শাতীত মাধুর্যে বিভোর ছিলেন ফিরোজ আর নেহরু-গিন্নি। প্রগাঢ় এ সম্পর্কের পবিত্রতা প্রতিমুহূর্তেই অনুভব করেছেন জওহর। গোড়ার দিকে উদাসীন থেকেও আঁচ করেছেন ফিরোজের ইন্দু। সন্দেহ উঁকি দিলে সংশয় তাঁকে ঘেরাও করত। সংশয় অতিক্রম করে ফিরোজকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত থেকে অতি অবশ্য সরে দাঁড়াতেন। তীব্র অসম্মতি প্রকাশ করতেন মহাত্মা। এবার রটনার ভিত্তিহীনতা খতিয়ে দেখা জরুরি।
মিনু মাসানি নামে এক ভদ্রলোককে আমরা অনেকেই জানি। নেহরুর জেলমেট। কংগ্রেসি সহযোদ্ধা, পরে দক্ষিণপন্থী স্বতন্ত্র পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। তিনিই এই রটনার আদি কারিগর। নেহরুকে ঈর্ষা করতেন, ফিরোজকেও প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন। তাঁর ইঙ্গিতেই রটনা এলাহাবাদে ছড়িয়ে পড়ে। কংগ্রেসের কিছু সংখ্যক নির্বোধ সমর্থকেরও কুত্সা তৈরিতে সায় ছিল। তারাই জোট বেঁধে সক্রিয় হয়ে উঠলেন। পোস্টারে, গুজবে, ভরে দিলেন শহরকে। নেহরু তখন জেলে। রটনা তাঁর কানেও পৌঁছল। নীরবতাই কুত্সার সবচেয়ে জোরালো, যুক্তিময়, বিবেকপ্রসূত উত্তর—এ কথা ভেবে নিশ্চুক বসে থাকলেন। পরশ্রীকাতরদের রটনাকে সমাজ পাত্তা দেয়নি, কিন্তু আসামির কাঠগড়ায় মিনু মাসানি ও তাঁর অনুগামীদের আজ দাঁড় করিয়ে রেখেছে। বিবেকের পাথরে ঘায়েল, ভিন্ন ভিন্ন তাদের স্মৃতিও।
সামনে ইন্দু, পেছনে ফ্রাঙ্ক
১৯৩৬-এর মে থেকে জুলাই, কমলার চিকিত্সার তদারকি করতে ইন্দু তখন ইউরোপে। নেহরু বন্দি ভারতের জেলে। ফিরোজ এলাহাবাদে। পিসির নির্দেশ লন্ডনের স্কুল অফ ইকনমিকস-এ ভর্তি হবার প্রস্তুতি শুরু করছেন। বিদেশযাত্রা প্রায় আসন্ন। ইন্দিরার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেমপ্রত্যাশী অথচ বিশেষ বন্ধু ফ্র্যাঙ্কে শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে এসেছে। ঘুরে বেড়াচ্ছেন ইউরোপের নানা এলাকায়। নিয়মিত ইন্দুকে চিঠিও লিখছেন।
১৬ জুন কমলার সার্জারি করলেন বার্লিনের ডাক্তার আনভেরিচ। সফল অস্ত্রোপচার। বিকেলে প্রবল জ্বরে আক্রান্ত কমলা ডাক্তারের পরামর্শে সুইস সীমান্তের কাছাকাছি—ব্যাডেনওয়েইলারের স্যানেটারিয়মে ভর্তি হবেন। ওখানে তাঁর সঙ্গেও রয়েছেন ডা. মদন অটল। দিন কয়েকের মধ্যে অসুখ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে চলে এল। স্বস্তি ফিরল ইন্দুর। কমলাও খোস মেজাজে কথা বলছেন। কাটিয়ে উঠছেন বিষণ্নতা। খবর পেয়ে হাফ ছেড়ে আনন্দিত জওহর। মহাত্মাও উদ্বেগ কাটিয়ে উঠলেন।
চিকিত্সার প্রাথমিক সাফল্য দেখে ডা. আনভেরিচ ঘোষণা করলেন, কমলা সঙ্কট কাটিয়ে উঠছেন। একমাসের মধ্যেই তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন। ইন্দিরা ভাবলেন, মেঘ কেটে যাচ্ছে, পরিচ্ছন্ন আকাশ, শীঘ্রই অন্ধকার ভেদ করে ফুটে উঠবে প্রত্যাশিত আলো। অন্যরাও তাঁর মতো আশাবাদী।
জুলাই-এর শেষ সপ্তাহে, সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেবেন ইন্দু। ওখানে তাঁর পুরনো বেকস-এর স্কুলে আবার ভর্তি হওয়া যায় কিনা, সেই চেষ্টা করবেন। বেকস-এ তিনি যে যাচ্ছেন, জানতেন কমলা, জানতেন ডা. অটল, জওহরও এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। কিন্তু তাঁর সফর যে নিঃসঙ্গ, একাকি নয়, তা অন্যদের জানা নেই। সেখানে দেখা হল তাঁর প্রাক্তন শিক্ষক এম. হেমারলিনের, উনি রোমাঁ রোঁলার বোন। বিদূষী, ভারত অনুরাগী মহিলা। সেখানে খোশ মেজাজে দিন কয়েক ঘুরে বেড়ালেন ইন্দু। কিন্তু কার সঙ্গে? বেকস থেকে লুগানো লেকের কাছাকাছি অ্যাসকোনায় দিন কাটছে, যোগ দিচ্ছেন ‘প্রাচ্য-প্রতীচ্যের চিন্তা’ শীর্ষক আলোচনা সভায়। গাড়িতে ‘বন্ধুদের সঙ্গে’ লং ড্রাইভে যাচ্ছেন। কিন্তু বন্ধু-দলে আর কে আছেন, বহুদিন পরে যাঁর সঙ্গলাভে টগবগ করে ফুটছেন আবেগ উচ্ছ্বল ইন্দু? তিনি ফ্র্যাঙ্ক ওবারডরফ। কখনো সবার সঙ্গে, কখনো দু’জন একা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাধা নেই, সঙ্কোচ নেই, ইউরোপের স্বাধীন দিনযাপনের মতো উন্মুক্ত, প্রাণোচ্ছল তাঁদের মনোহর সফর।
প্রশ্ন ওটা স্বাভাবিক, ফ্র্যাঙ্ক কীভাবে খবর পেলেন মায়ের চিকিত্সার দেখভাল করতে বার্লিন হয়ে বেডেনওয়েইলারে পৌঁছে গেছেন জওহর কন্যা? কোন্ সূত্রে জানতে পারলেন, সুইজারল্যান্ডের বেকস-এ তাঁর অবস্থান? ইন্দিরাই কি চিঠিতে আগাম জানিয়ে রেখেছেন, বলে দিয়েছেন তাঁর সফর সূচি? এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
ইন্দিরা সুইজারল্যান্ডের বেকস-এ, লুগানো লেকে, লাগো ম্যাগিওরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে তাঁর ঘোরাঘুরি খবর কাউকেই বলেননি। ওবারডর্ফের লেখা চিঠিতে এসবের কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু ফ্র্যাঙ্কের হেফাজতে থাকা বিভিন্ন নথিপত্রের ভেতরে লুকিয়ে রাখা একটি আলোকচিত্রে দেখা যাচ্ছে যে, ইন্দিরা তাঁর একান্ত অনুরাগীর সঙ্গে ইউরোপীয় কাফের সামনে বসে আছেন। উজ্জ্বল, হাসিভরা মুখ। নিবিড় হয়ে দু’জন আলাপে ব্যস্ত। এ আলাপের কারণ কী, কী কাজ তাহার সাথে, তাঁর সাথে? এ প্রশ্নের উত্তর জানা যায়নি, বলেননি ইন্দিরা। জানতে পারেননি তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুরাও। তবে ফ্র্যাঙ্ক-ইন্দুর চিঠি আর যোগাযোগের তথ্য ঘেঁটে প্রমাণ মিলছে, ব্যাডেনওয়েইলারে ইন্দুকে প্রায়ই পত্র লিখতেন ফ্র্যাঙ্ক। প্রতিটিতেই থাকত ইন্দিরার ব্যক্তিত্বের, সৌন্দর্যের বিশদ প্রশস্তি। জবাব দিতেন ইন্দিরাও। তবে সংক্ষেপে, নেতিবাচক ভঙ্গিতে। ইন্দুর মনে হত, ফ্র্যাঙ্ক তাঁর হূদয় দখলের চেষ্টায় অহেতুক তোয়াজ করছেন।
তোয়াজ আর প্রশস্তিকে কখনো আমল দেননি ইন্দিরা। তাঁর ধারণা ছিল তিনি সুন্দরী নন, উষ্ণতা তাঁর দেহ ভাষাকে স্পর্শ করে না। শরীরে যৌন আবেদনের ঘাটতি আছে। অতএব কেউ যদি প্রতিটি চিঠিতে দৈহিক সৌন্দর্য নিয়ে ‘ফ্ল্যাটার’ করতে থাকে, তা ভালো দেখায় না। হাস্যকর, অপমানজনক মনে হয়। দ্বিতীয়ত ইন্দিরার ধারণা ছিল, বারবার রূপ আবেদনের কথা বলে তাঁকে বিরক্ত করছেন ফ্র্যাঙ্ক। তাঁর এ স্বভাব রুচিহীন অশালীন। তবু কেন প্রাক্তন শিক্ষক, পরিত্যক্ত অনুরাগীকে লাগাতার আমল দিতে থাকলেন ইন্দু? কারণ কি তাঁর অবচেতনের আত্মতৃপ্তি? না বন্ধুত্বের শর্ত রক্ষার সুদৃঢ় সঙ্কল্প? নাকি দুইজনের মধ্যে এমন কোনো অলঙ্ঘনীয় সম্পর্ক শান্তনিকেতনে গড়ে ওঠে, যা নিয়ে অস্বস্তি আর শঙ্কা ছিল ইন্দিরার? এমন কোনো আশঙ্কা জওহরও কি আঁচ করেছিলেন, যে কারণে ইউরোপে কমলার চিকিত্সা করানোর সুযোগ নিয়ে ইন্দুকে শান্তিনিকেতন থেকে সরিয়ে আনলেন, ময়ের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন জার্মানিতে? এরকম সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া অসম্ভব। কেন? তা একটু বিশদভাবে, ইন্দুকে লেখা তাঁর চিঠির সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
ভাওয়ালি থেকে বিদায় নেবার প্রাক্কালে ইন্দুকে রহস্যঘেরা চিঠি লিখলেন স্নেহকাতর, বিষণ্ন নেহরু। বাবা মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ, যন্ত্রণা, অন্তর্দাহে পূর্ণ এই পত্র-
তুমি যখন আবার সমুদ্রের ওপর দিয়ে জাহাজে ভাসতে ভাসতে এগোবে, আমি তখন তোমার থেকে অনেক দূরে থাকব। ভাবতে গিয়ে চমকে উঠছি, এরপর কখন, কোথায় তোমার আমার দেখা হবে? আমরা নিজেরাই এই দূরত্ব তৈরি করেছি...
চিঠির ভাষায় স্পষ্ট ঈঙ্গিত—
আমরা যখন পরস্পরের কাছে ছিলাম, যখন প্রায়ই দুইজনের সাক্ষাত্ হত তখনই ফটিক ধরে গেছে। গত সপ্তাহে, ৬ মাস পর ভাওয়ালিতে তোমার সঙ্গে দেখা হল। তখনো পুরোনো অভ্যাস, সেকেলে চিন্তার পরিবর্তন লক্ষ্য করিনি।
সম্পর্কের অস্থায়ী ভাঙনের জন্য ইন্দুকেই পুরোপুরি দায়ী করলেন জওহর—
তুমি বড়ো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছ। আনন্দভবনের পরিস্থিতি ও দায় এড়াতে পারবে না। আশা করছি, তুমি এবার ক্রমশ বদলাতে থাকবে। বৃহতের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। বাড়িয়ে তুলবে যোগাযোগ। এতে তোমার-আমার দুই জনেরই মঙ্গল। তোমার নিজেকে তোমার স্বার্থেই বদলাতে হবে, এ ব্যাপারে আমার ওপর ভরসা করতে পারো।
ইউরোপ পাঠানোর আগে কিসের চাপে প্রিয়তম কন্যাকে এমন অভিমানময় চিঠি লিখলেন জওহর? শান্তিনিকেতনে ইন্দুর দিনযাপন নিয়ে কি কোনো ধরনের অস্বস্তি, সংশয়, সন্দেহ গ্রাস করছিল তাঁর চিন্তাকে? জওহর ফ্র্যাঙ্ককে চিনতেন কিনা জানা নেই। তাঁর ভবঘুরে দিনযাপন, মেয়ের সঙ্গে মেলামেশার খবর কানে আসত কি না— প্রমাণ মেলে না। তবে বিষয়টি নিয়ে বাতাসে বাতাসে গুজব উড়ে বেড়িয়েছে— এ তথ্য অসত্য নয়। মনে রাখতে হবে বীরভুম ইউরোপ নয়। বোলপুর তখন ছোট্ট শহর। চারদিকের খোলা প্রান্তরের মাঝখানে শান্তিনিকেতন দ্বীপের মতো ভাসছে। চরাচর সংকীর্ণ। মানসিকতাও ক্ষুদ্র পরিসরে সীমাবদ্ধ। এমন একটি পরিবেশ নেহরুকন্যার সঙ্গে বিদেশি শিক্ষকের অবাধ ঘোরাফেরা আর ধোঁয়াটে প্রণয়ের খবর যে রটনা আর রসগল্পের খোরাক যোগাবে না, তা ভাবা যায় না। ‘দুঃসংবাদ’ নেহরুর কানেও পৌঁছাবে না, তা হতে পারে না। সম্ভবত ফ্র্যাঙ্কের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফিরোজও সন্দেহমুক্ত হতে পারেননি। এ জন্যই, ইন্দিরার প্রতি যেই তাঁর আসক্তি প্রকাশ করলেন ফরাসি ভাষার শিক্ষক, ঠিক তখনই, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ী প্রণয়ের বিবাহের প্রস্তাব পাঠিয়ে দিলেন ফিরোজ গান্ধী। চূড়ান্ত ‘সিক্রেটিভ’— গোপন স্বভাবে অভ্যস্ত ইন্দিরা কমলাকে ফ্র্যাঙ্ক প্রসঙ্গ জানিয়েছিলেন বলে মনে হয় না। ফিরোজ যদি জেনে বলে থাকেন, সে কথা আলাদা। বাড়িতে, আনন্দভবনে ইন্দুর এমন কোনো বন্ধু বা সহজসঙ্গী ছিলেন না, যিদি তাঁকে তাঁর অনুরাগীর কথা বলে থাকতে পারেন। হোস্টেলেও বিষয়টি চারকান হওয়ার কথা নয়, সম্ভবত মেয়ের হাবভাব লক্ষ্য করে, অথবা ভিন্নতর সূত্রে ইন্দিরার প্রেম ছোঁয়া অনুরাগের খবর জেনে যান জওহর। অবশ্য সবই আমাদের অনুমান। এসবের সমর্থনে তথ্য নেই, নেই কোনো নিশ্চিত নথি। তবু নেহরুর সন্দেহ নিয়ে প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, মনে হচ্ছে জেনে-শুনেই ইন্দিরাকে মায়ের সঙ্গে ইউরোপে পাঠিয়ে দিলেন। ইউরোপ যাত্রী মেয়েকে চিঠি লিখলেন এই ভাষায়—
মনকে বন্দী করা যায় না, সে ঘুরে বেড়ায়। আমি নিজে মানস সফরের মহা অভ্যাস আয়ত্ত করছি, আমি চাই তুমি তোমার তারুণ্য উপভোগ করো, সুখী হও। নিজের যৌবনকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আশা করি তোমার সুখের, তোমার আনন্দের শরিক হতে পারব।
কেন হঠাত্, স্ত্রীকে বিদেশ পাঠানোর আগে মেয়েকে এসব ইঙ্গিতপূর্ণ রহস্যময় চিঠি লিখলেন জওহর? একসময় এই মেয়েকেই যিনি লিখেছেন—
মনকে উন্মুক্ত আয়নার মতো গড়তে হবে। তোমাকে তোমার অভিজাত পরিবারের ঐতিহ্য থেকে, প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যা ভালো, ন্যায়সঙ্গত ভাববে, সেটাই করবে।
সেই জওহরই কেন আবার লিখলেন—
অনেকক্ষেত্রে পারিবারিক অভ্যাস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারবে না। কেননা বংশগত ঐতিহ্য তোমাকে আটকে রাখতে চাইবে। তুমি চাও আর না চাও, খানদানি ঘরানা, তোমাকে খানিকটা সামাজিক মর্যাদায় আসীন করবে। এটা দুঃখজনক। কিন্তু এর সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে। পরিবারের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য খারাপ জিনিস নয়। সে আমাদের এগিয়ে নেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় যে, হাতে জ্বলন্ত টর্চ রাখতে হবে। তার আলোয় আমরা জেগে উঠি, পথ দেখি, নিজেকে সস্তা করার রাস্তা থেকে সরে আসি। কদর্য, কুিসতের কবল থেকে রেহাই পাই।
কেবল ইন্দিরাই এসব চিঠির উপলক্ষ? না ফ্র্যাঙ্ক আর ফিরোজও? ফিরোজকে কমলা অনুরাগী, কংগ্রেসভক্ত আপত্তি নেই নেহরুর। কিন্তু মেয়ের চিরসঙ্গীর আসনে বসাতে কি সায় দিত তাঁর ভাবাবেগ, ভাবাদর্শ এবং আভিজাত্যবোধ? বিলকুল নয়। প্রসঙ্গটিতে আমরা পরে আসব। বলব, ফিরোজ-ইন্দুর বিয়ের আগের পরিস্থিতি দেখতে দেখতে, বিশ্লেষণ করতে করতে।
ইন্দিরা উচ্চশিক্ষায় সমৃদ্ধ হোন, ভবিষ্যতে নিজেই খুঁজে নিন তাঁর যোগ্য, সমতুল্য জীবনসঙ্গী, চাইতেন নেহরু। কিন্তু ইন্দুর লক্ষ্যহীনতা, সম্ভবত নির্মীয়মান অসংলগ্ন, বেমানান সম্পর্ক, ছায়াহীন শৈশব ও আত্মকেন্দ্রিক বয়োঃসন্ধির তোলপাড় দেখে আঁতকে উঠছিলেন নেহরু। তাই তাঁকে গড়ে তুলতে, সচেতন করতে চিঠির পর চিঠি লিখতেন জওহর। চিকিত্সকের প্রতিশ্রুতি সত্বেও কমলার সঙ্কট কাটছে না। একদিন সুস্থ তো পরদিন প্রবল অসুস্থ। ইন্দিরা সুইজারল্যান্ডের বেকস স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছেন। জার্মান আর ফ্রেঞ্চও শিখছেন। জওহরের দৃঢ় বিশ্বাস, ভাষা শিখতে তাঁর মেয়ের প্রবল আগ্রহ। দ্রুত যে কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে পারে। ইন্দু বেকস স্কুলে ভর্তি হবার আগে জওহর ঠিক করলেন, ইন্দুকে নিয়ে ইংল্যান্ড যাবেন। ২৯ অক্টোবর, ১৯৩৫ কমলাকে দেখা-শোনার দায়িত্ব দিয়ে সকন্যা লন্ডন পৌঁছালেন জওহর। ওখানে যাওয়ার আগে জানতে চাইলেন বেকস ছেড়ে ইন্দু কি অক্সফোর্ডে লেখাপড়া করার সুযোগ পেতে পারে? মেয়েকে লিখলেন, চেষ্টা করে দেখা যাক।
ইন্দিরা যথারীতি প্রস্তুতি নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসলেন। লন্ডন থেকে ফেরার দুইদিন আগের কথা, কমলার সঙ্কট বেড়ে গেল। বাবা-মেয়ে স্যানাটোরিয়ামে হাজির হয়ে দেখলেন, চকচক করছে সতেজ মুখ। ফিরে আসছে হারিয়ে যাওয়া স্নিগ্ধতা।
এটা কি ওঁদের দৃষ্টিভ্রম। হতে পারে। পরদিনই কমলার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হল। অশুভ লক্ষণ। নেহেরু বুঝে গেছেন, দিন ফুরিয়ে আসছে, অনিঃশেষের পথে পা বাড়াবেন প্রায় নিঃশেষিত হয়ে আসা স্ত্রী। শীতল বাতাস টেনে নিচ্ছে তাঁর দীর্ঘশ্বাস। প্রবলজ্বরে কাতরাচ্ছেন কমলা। এরকম পরিস্থিতিতেও, ২৮ ডিসেম্বর, দাদাভাই নাওরোজির মেয়ে, ঘোষিবেন ক্যাপ্টেনকে চিঠিতে জওহরলাল জানালেন—
কমলার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। তবু আমি আশা হারাই না, কমলা আর আমি বহু সঙ্কটের ভেতর দিয়ে দিন যাপন করেছি, কখনো পরাজয় কল্পনা করিনি, মানতেও রাজি হয়নি।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ। ব্যাডেনওয়েইলারে ইন্দুর মন টিকছে না, মায়ের অবস্থা দেখে অস্থির, বেকস-এ ফিরে গেলেন।
ডিসেম্বর, বরফ পড়তে শুরু করল। ইন্দিরা তাঁর ক্রীড়া শিক্ষকের কাছে স্কি প্রশিক্ষণ শুরু করলেন, ইন্দু খেলাধুলা ভালোবাসে। কাশ্মীরি কন্যা, বরফ তাঁকে হাতছানি দেয়। খুড়তুতো বোন বিদ্যাকে নিয়ে শীতের ছুটি কাটাতে সুইজারল্যান্ডের ওয়েনজেনে চলে গেলেন। চমত্কার মনোরম মওসুম। গাছে গাছে বরফ ঝুলছে। মাটিতেও যেন জমাট ঠান্ডা শ্বেত পাথর। আচমকা দেখা গেল ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফ ওখানে হাজির। গায়ে, মাথায়, হাতে বরফ রোখার পোশাক। দক্ষ খেলোয়াড়। ইন্দিরাকে হাতে ধরে কি করতে শেখাচ্ছেন, সামনে ইন্দিরা, পেছনে ফ্র্যাঙ্ক, দুইজনেই বরফের ওপর দিয়ে ছুটছেন। ছুটতে ছুটতে তিনি ইন্দুর প্রশংসায় মশগুল। তাঁকে ছুঁতে চাইছেন, গায়ে বরফ ছুঁড়ে মারছেন। ইন্দু বিরক্ত, উত্ত্যক্তবোধ করছেন।
ইন্দিরা ওয়েনজেনে যাচ্ছেন, এ খবর কী করে ফ্র্যাঙ্কের কাছে পৌঁছল। সফর কি সুপরিকল্পিত? মুখ খোলেননি ইন্দিরা কিংবা ফ্রাঙ্ক—কেউ? তাঁরা ওখানে কদিন ছিলেন, কোথায় ছিলেন, এ তথ্য অজানা হয়ে রইল।
ওরা যখন ওয়েনজেনে বরফ খেলায় ব্যস্ত, দুজনের ফুরফুরে মেজাজে দিন কাটছে, ফিরোজ তখন ব্যাভেনওয়েইলারে কমলার স্যানাটোরিয়ামে তাঁকে দেখতে এসেছেন। গন্তব্য তাঁর লন্ডন। ওখানকার স্কুল ইকোনোমিক্সে তাঁর লেখাপড়ার পাকা বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তিনি সুইজারল্যান্ডে পৌঁছালেন। স্যানাটারিয়ামে কমলার পাশে বসে থাকা, বিষণ্ন, উদ্বিগ্ন নেহরুর সঙ্গে তাঁর দেখা হল। উনিই ওঁকে বললেন, ইন্দিরা আমাদের সঙ্গে খ্রিস্টমাসের ছুটি কাটিয়েছে। এখন সে ওয়েনজেনে ঘুরতে গেছে। সঙ্গে তাঁর বন্ধুরা? কে এই বন্ধুরা—ফিরোজের সন্দেহ উঁকি দিল। সেদিনই ইন্দিরার সঙ্গে দেখা করতে ওখানে ছুটে গিয়ে হত:ভম্ব—ইন্দিরা উত্তেজিত, আপ্লুত। কিন্তু অন্যদের নিয়ে ব্যস্ত। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুজন কিছুক্ষণ কমলার অসুখ নিয়ে কথা বললেন। বলেই ইন্দিরার পূর্বপরিকল্পিত ব্যস্ততা অনুভব করে সেদিনই সন্ধ্যায় ব্যাডেনওয়েইলারে সোজা কমলার স্যানিটারিয়ামে পৌঁছে গেলেন। গম্ভীর, বিব্রত। নেহরু তখন লন্ডনে, প্যারিসে সংক্ষিপ্ত সফরে গেছেন। কমলাকে পাহারা দিচ্ছেন নার্স।
ওয়েনজেনে ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে ফিরোজের কি সরাসরি সাক্ষাত্ হয়েছিল? তথ্য অপ্রমাণিত। ব্যাডেনওয়েইলারে ফিরে এসে কমলাকে ফ্রাঙ্ক-ইন্দুর সম্পর্কের প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন? এ বিষয়ও অজানা হয়ে রইল। কমলা বুঝতে পারলেন, বরফের দেশে অপ্রীতিকর, অস্বাভাবিক অবস্থার সম্মুখীন হয়ে ফিরোজ তড়িঘড়ি ফিরে এসেছে। কমলা ইন্দ্রিরার প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন। ফিরোজও নিশ্চুপ। কমলা গোটা বিষয় জানতেন। বয়োঃসন্ধিক্ষণে মেয়ের আচরণ নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর মনে হল, ফিরোজ আর ইন্দিরার বিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেবে। নেহরুর উচ্চবাচ্য নেই। তাঁর পরিবারও সম্পর্ক মেনে নেবে না।
ওয়েনজেন থেকে ফিরে ইন্দু ফিরে যাবেন বেকস স্কুলে, ছুটি শেষ হয়ে আসছে। মায়ের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা স্যানাটারিয়ামে কাটালেন। কমলার শেষ লগ্ন ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। মৃত্যুর আগে মেয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে চান। ইন্দু পাশে বসে আছে। কমলা বললেন-ফিরোজকে ভরসা করতে পার। সুদর্শন, বুদ্ধিমান, সাহসী ছেলে। তোমার প্রতি ওর আকর্ষণ গভীর এবং দীর্ঘদিনের। সবদিক থেকেই তুমি ওর কাছে নিরাপদ বোধ করবে। আমিও শান্তি আর তৃপ্তি নিয়ে জগত্ ছাড়ব।
হে বিরহী হায়
স্যানাটারিয়ামে একজন আইরিশ মহিলার সঙ্গে কমলার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। রূপসী। উচ্চশিক্ষিতা। পরোপকারী। হঠাত্ তাঁর মৃত্যু হলে কমলা ভেঙে পড়লেন। দিনকয়েক আগেই প্যারিস আর লন্ডন সফর শেষে ব্যাডেনওয়েইলারে ফিরে এসেছেন জওহর। লন্ডনেই উনি খবর পেলেন, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করেছে। শীঘ্রই তাঁকে দেশে ফিরতে হবে। কিন্তু কমলার অবস্থার ক্রমশ অবনতি ঘটছে। আইরিশ বান্ধবীর মৃত্যুতে তিনি নিজের মৃত্যুকেই দেখতে পাচ্ছেন। শঙ্কিত। বিষাদগ্রস্ততা আরো ভর করল। জওহরকে বললেন—
আমাকে অবিলম্বে সুইজারল্যান্ডে স্থানান্তরিত করো, এখানে আর থাকতে পারছি না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। নেহরু সায় দিলেন। কিন্তু দলের চাপে, তাঁকে যথাসম্ভব দ্রুত ভারতে ফিরতে হবে। কে এল এম ফ্লাইটে ভারতে ফিরবেন ২৮ ফেব্রুয়ারি। ফিরতে হবে, অথচ ভেতর থেকে সাড়া মিলছে না।
ডা. মদন অটল কমলাকে লউসানের কাছাকাছি ক্লিনিক সিলভানায় নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করলেন, নেহরুর লন্ডন হয়ে ভারতে ফেরার কথা। ইন্দিরা শীতের ছুটি কাটিয়ে বেকস স্কুলে ফিরে গেছেন। ওখান থেকে বাবাকে চিঠি লিখলেন—
লউসান যাত্রা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। মা আরো বিধ্বস্ত হয়ে পড়বে। মদন ভাইয়ের সঙ্গে (ডা. অটল) তোমারও যাওয়া উচিত। মাকে নিয়ে।
৩০ জানুয়ারি নেহরু আর মদন কমলাকে নিয়ে লউসানে পৌঁছে গেলেন। পরদিন হাতে ফুলের স্তবক নিয়ে ক্লিনিকে হাজির ইন্দু। ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওখানে থাকলেন। এদিনই জওহরলাল লন্ডন থেকে ফিরছেন। ২১ দিন পর দেশে ফিরে যাবেন তাঁর জওহর। ইন্দু বললেন—
আমি শঙ্কিত। পিতা-মাতার একমাত্র সন্তানের সব খারাপ গুণ আমার আছে। তোমাদের ওপর বড়ো বেশি নির্ভরশীল। যখন একা হয়ে যাব, জানি না কী করে, কার ভরসায় থাকব। জওহরলালের দেশে ফেরার আগেই কমলার অবস্থার আরো অবনতি ঘটল। তাঁর জ্বর বাড়ছে। প্রলাপ বকছেন।
২৬ ফেব্রুয়ারি, লউসান থেকে কলকাতায় স্বামী অভয়ানন্দকে নেহরু চিঠি লিখে জানালেন—
আগামী পরশু আমার ভারতে আসার কথা ছিল। কিন্তু আসতে পারছি না। আরো দশ থেকে বারো দিনের জন্য যাত্রা স্থগিত রাখতে হচ্ছে। অসহায়বোধ করছি।
কমলা নেহরুর বয়স ৩৭। ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে তাঁর দেহাবসান ঘটল। মুখে ওই স্নিগ্ধতা লেগে আছে। বন্ধ মায়াবি দৃষ্টি। আগের দিন অনেকক্ষণ ইন্দু তাঁর পাশে ছিলেন। কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়ে গেলেন, পায়চারি করতে। একা। মায়ের অবস্থা সঙ্কটজনক, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, এ অবস্থায় মাকে দেখা যায় না।
স্যানাটারিয়ামের কামরায় ফিরে আসতেই কমলার প্রশ্ন—
এতক্ষণ কোথায় ছিলে?
এটাই ইন্দিরার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। শেষ শয্যায় জওহরলাল আর ডা. অটল তাঁর পাশে ইন্দিরাও তখন অন্যকক্ষে। শোকে নয়। উদ্বেগে নয়, নিরালম্ব স্তব্দতায় হারিয়ে গেল তাঁর ভাষা। চারপাশে শুধু নৈঃশব্দ আর স্মৃতি। স্মৃতির ভেতরে অক্ষত কমলার ওই ছবি, ওই হাসি, ওই আত্মমগ্নতা।
ঠিক ৩৫ বছর পরের কথা। একজন মহিলা সাংবাদিক ইন্দিরাকে জিজ্ঞেস করলেন, মায়ের মৃত্যু শোক কীভাবে সামাল দিলেন। ‘রিকভার’ করতে কতদিন লাগল?
নির্বোধ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে খানিকটা রেগে গেলেন ইন্দিরা—
আমি জানি না। ‘রিকভার’ কাকে বলে? কারণ এই ক্ষত, এই ধরনের ক্ষত কখনো শুকোয় না। সব সময় দগদগ করতে থাকে।... আমার মনে হয, এই তো তিনি আছেন। সব সময় আমার সামনে। আমাদেরই সম্মুখে।
জওহরলাল শোক মগ্ন। নির্বাক। স্মৃতির ভেতরে ডুবে থাকলেন। দিনের পর দিন। তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশের প্রস্তুতি শেষ। তড়িঘড়ি, সিদ্ধান্ত বদল করে উত্সর্গপত্রে লিখলেন—কমলাকে, যে আর নেই।
কমলার মৃত্যুর খবর করল প্রায় সব দেশের সংবাদপত্র। কোথাও ভেতরে। কোথাও প্রথম পাতার শীর্ষে। অনেকেই নেহরুকে তারবার্তা পাঠালেন। শোকমগ্ন গান্ধীজী নেহরুকে চিঠি লিখে জানালেন—
শেষ পর্যন্ত তুমি কমলাকে চিরতরে ইউরোপে রেখে এলে। কিন্তু তার আত্মা আর ভাবাদর্শ কখনো ভারতের বাইরে থাকবে না, এখানে সবসময় অক্ষত সম্পদ হয়ে টিকে থাকবে।
কমলার আত্মা আর অষ্টদশী ইন্দিরাকে রেখে নেহরু ভারতে ফিরে এলেন। ইন্দু বেকস স্কুলে। এবার শুরু হবে তাঁর ভিন্নতর, ছায়াহীন দিনযাপন। ফিরোজ আবার লন্ডনে। বেকস থেকে ইন্দিরাকে ওখানে চলে যেতে হবে। ওখানকার ব্যাডমিন্টন স্কুলে শুরু হবে তাঁর অক্সফোর্ড ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। এ স্কুলে থাকার খাবার বন্দোবস্ত নেই। পুনের স্কুল জীবনের বন্ধু শান্তা গান্ধীর সঙ্গে একই ফ্লাটে, ২৪ ফেরারফ্যাক্স অ্যাভিন্যুতে থাকতে হবে। ফিরোজের বসবাসও কাছাকাছি এলাকায়। ধীরে ধীরে ইন্দিরার ভেতরে শুরু হল ফিরোজের প্রবেশ। কারণ, কমলার মৃত্যুর আগে, মৃত্যুর পরে বিদেশে তিনিই তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছেন। যতদিন যাচ্ছে, বুঝতে পারছেন, শূন্যতায় এই যুবকই তাঁর পরম অবলম্বন। নতুন করে রবীন্দ্রনাথের চিত্রঙ্গদার অর্জুনকে, নিজের বাবাকে যেন তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেলেন।
কমলার মৃত্যুর মুহূর্তে বা পরে কোথায় ছিলেন ফ্র্যাঙ্ক? একবারও খোঁজ নিলেন না। চিঠিতে যোগাযোগ প্রায় ছিন্ন। বরং ফিরোজ প্রায়ই ছুটে আসেন। ঘুরতে নিয়ে যান। প্রাণচঞ্চল যুবক। একদিন ইন্দু শান্তা গান্ধীকে বললেন, বিশেষ এক বন্ধুর সঙ্গে বাইরে খেতে যাব, এসো।
পরনে রঙিন শাড়ি, মাথায় ঘন ববকাট চুল, ইন্দুকে দারুণ দেখাচ্ছে। ফিরোজ দুই তরুণীকে কাছের রেস্তোঁরায় নিয়ে গেলেন। এক সঙ্গে চুটিয়ে খাওয়া-দাওয়া হল। দুজনেই খুব খুশি। ফিরোজের সৌজন্য স্পর্শ করল ইন্দুর গভীরের গভীরকে। লন্ডনে পড়ার খরচ যোগাতে সাধারণ চাকরি করতে হয় ফিরোজকে। তবু ইন্দুর জন্য খরচ করতে কাপর্ণ্য নেই। এবার তাঁর দরাজ-হস্ত, দরাজ হূদয়ের খোঁজ পেয়ে গেলেন। লন্ডনে কমলার স্মৃতিই তাঁদের সম্পর্কের সেতু বনে গেল। ইন্দিরা তখন অনেকটাই স্বাবলম্বী। সুযোগ পেলেই আবার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেন। ভারতের ভবিষ্যত্ নিয়ে আলাপ করেন, ফিরোজও যোগদেন আলোচনায়।
হঠাত্ একদিন, সকালে না বিকেলে (রেকর্ড নেই) লন্ডনে ওবারডর্ফ এসে হাজির। ঠিক আগের মতোই ইনিয়ে বিনিয়ে পুরোনো, প্রত্যাখ্যাত প্রস্তাব আবার পেশ করলেন। দুজন রিজেন্ট পার্কে অনেকক্ষণ হাঁটলেন। হাঁটতে হাঁটতে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। ইন্দিরা সংযত, অনেকক্ষণ নিরুত্তর। কারো অনুনয়ে গলে যাওয়ার, ভেসে যাওয়ার পাত্রী নন। সরাসরি বলেই দিলেন—
এটা অসম্ভব। অলীক স্বপ্ন। অন্যরা কী বলবে, এ নিয়ে আমি চিন্তিত নই। তুমি আমার বন্ধু হতে পারো। কিন্তু ফিরোজই প্রকৃত আশ্রয়। জার্মানি নয় ইউরোপও নয়, ভারতই আমার ভবিষ্যতে। ফিরোজ এ ভবিষ্যত্-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই আমাকে ছুঁয়ে থাকবে।
ইন্দিরার কথা শুনে ফ্রাঙ্কের প্রতিক্রিয়া অনুমান করা সম্ভব। কিন্তু ওই সময় কী বললেন, আজও জানা যায়নি। ডায়েরি লেখারি অভ্যাস থাকলে, তাঁর খোঁজ পেলে আশা করি একদিন সত্য বেরিয়ে আসবে।
এরপরেও ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে ইন্দিরার যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। তারা একে অন্যকে আরো কয়েক বছর জুড়ে চিঠি লিখে গেছেন। এই যেমন ফ্র্যাঙ্ক খ্রিস্টমাসে ইন্দুকে জার্মানি যাবার আমন্ত্রণ জানালেন। সঙ্গে গভীর অনুরাগের চিঠি। ১৩ অক্টোবর, ইন্দিরা কড়াভাষায় জানিয়ে দিলেন তাঁকে—
আমার জার্মানি যাবার প্রশ্নই ওঠে না। লোকে কী বলবে তা নিয়ে ভাবছি না। আমি যাব না, এটাই আমার পাকা সিদ্ধান্ত। কারণ কখনো, আমি তোমাকে ভালোবাসিনি। তোমার প্রতি বিন্দুমাত্র অনুরাগও অনুভব করিনি। তুমি যদি পৃথিবীর শেষ পুরুষও হতে, তবু তোমার প্রতি আমার কোনো ধরনের আসক্তি জন্মাত না। বিয়ে করা তো দূরের কথা।
তবু ফ্রাঙ্ক আশা ছাড়েনি। চিঠি লিখতে থাকলেন। ওই বছরই ১৯ নভেম্বর ইন্দিরার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে ফুলের স্তবক পাঠিয়ে দিলেন লন্ডনে।
এরপরেও ফ্র্যাঙ্ক মাঝে মাঝে ইন্দিরাকে চিঠি লেখেন। উত্তরের আশায় বসে থাকেন। ৪৬ সালের গোড়াতে আরো একবার লিখলেন। দীর্ঘ ৯ বছরের নীরবতা ভঙ্গে জবাব দিলেন শ্রীমতী গান্ধী—
৪২ সালে মার্চ মাসে আমি বিয়ে করেছি। তোমার মতো সুখী গার্হস্থ্য জীবন পেলাম কোথায়? আমার একটি ছোট্ট ছেলে আছে। শীঘ্রই সে দুই বছর পূর্ণ করবে। আমাদের দিনযাপন এখনো খুব ব্যস্ত। সারাদেশ ঘুরে বেড়াতে হয়। মনে হয়, আমরা সবাই কখনো একই সময়ে, একই শহরে বসবাস করতে পারি না। উপরের ঠিকানা দেখে তুমি বুঝতে পারছ, আমি এখন আমার বাবার সঙ্গেই থাকি।
ফ্রাঙ্ককে লেখা এটাই ইন্দিরার শেষ চিঠি। এখানেই উভয়ের যোগাযোগ শেষ। যতদূর জানা গেছে, ফ্রাঙ্ক, ফ্র্যাঙ্ক ওবারডরফ ইন্দিরার এই চিঠির জবাব দেননি। বিরহের পাগলামি নিয়ে ওই জার্মান শিক্ষক কতদিন বেঁচে রইলেন কে জানে।
ইন্দিরা যখন ফ্রাঙ্ককে চিঠিটি লিখেছেন, তখন ফিরোজের সঙ্গে তাঁর মতান্তর চলছে। মতান্তর থেকে মনান্তরে পৌঁছে গেল সম্পর্ক। তারপর পদবি অক্ষত রেখেই অঘোষিত বিচ্ছেদ। উভয়ের রাজনীতিও আলাদা খাতে বইতে লাগল, কিন্তু দাম্পত্যের ভাঙন, শোক আর দীর্ঘশ্বাস মহা-ভারতের মহান কালোত্তীর্ণ নেত্রীর জীবন আর দুঃসাহসকে, দূরদৃষ্টি আর দেশগড়ার স্বপ্নকে কি রুখতে পারল কখনো?