ঈদেও আপনজনদের কাছে পান না প্রবীণরা

ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে প্রতি বছর মানুষজন শত ভোগান্তি-কষ্ট সহ্য করে ছুটে যায় পরিবার-পরিজনের কাছে। কারণ প্রিয় সন্তান, ভাই-বোন, বাবা-মা কিংবা নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঈদের অনাবিল আনন্দের তুলনাই হয় না। তবে কিছু মানুষ আছে যাদের ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, নাতি-নাতনি থেকেও নেই। অসহায় নিঃসঙ্গ মানুষদের দিন কাটে বৃদ্ধাশ্রমে। এমনকি ঈদের দিনেও তাদের খোঁজ নিতে আসে না কেউ। গত বুধবার (ঈদের পরদিন) গাজীপুরের হোতাপাড়া মনিপুর বিশিয়া কুড়িবাড়ি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে (বৃদ্ধাশ্রম) গিয়ে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে। ১৯৮ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থাকেন এখানে। তারা যখন কথা বলছিলেন তাদের কণ্ঠে ফুটে উঠে অভিমান আর কষ্ট। বাগেরহাটের বাসিন্দা, পরবর্তীতে রাজধানীর উত্তর মুগদাপাড়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করতেন শাখাওয়াত হোসেন (৯৫)। তার ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে। স্ত্রী অনেক আগে মারা যায়। ছেলে-মেয়ে ও নাতি- নাতনি নিয়ে ছিল তার সুখের সংসার। সন্তানদের কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকরিজীবী, কেউ বিদেশে থাকেন। এক পর্যায়ে সন্তানরা নানাভাবে তাকে কষ্ট দিতে থাকে। অপমান সহ্য করতে না পেরে একদিন বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে। আশ্রয় নেন বৃদ্ধাশ্রমে। সাত বছর হলো তিনি এই বৃদ্ধাশ্রমে। জানালেন, থাকা খাওয়া নিয়ে তার কোন সমস্যা হয় না। ছায়াঘেরা সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে দিন কাটছে। বলেন, আগে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে যখন ঈদ করতেন তখন বেশ মজা হতো। অথচ আজ তিনি বৃদ্ধাশ্রমে। ঈদের সেই পুরানো স্মৃতি মনে করে তিনি হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলেন। এ প্রতিনিধিকে বারবার তিনি অনুরোধ জানান, তার সন্তানদের একটি খবর পৌঁছে দিতে। তারা যেন অন্তত একবার হলেও তাকে দেখে যায়। মোয়াজ্জেম হোসেন নামে তার এক ছেলে উত্তর মুগদাপাড়া মদিনা মসজিদের কাছে থাকেন বলে জানান। ফরিদপুর সদরের পশরা এলাকার চান্দু মোল্লার স্ত্রী ময়জুন খাতুন (৮৫)। ২০ বছর আগে স্বামী মারা যায়। এরপর অনেক দুঃখ কষ্টে কাটতে থাকে তার দিন। একমাত্র মেয়ের আশ্রয়ে থাকতেন তিনি। মেয়েও তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ফুটপাতে কিছুদিন মানবেতর জীবন-যাপন করেন। পরে কয়েকজন মহত্ হূদয়ের মানুষ তাকে এই বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছে দেন। এক মাস হলো তিনি আছেন এখানে। আপনজনদের নিয়ে সারাজীবন ঈদে আনন্দ করেছেন। আজ তিনি তাদের ছেড়ে একা। তবে চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, অন্য বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সাথে আপনজনদের মত ঈদ উদযাপন করেছেন তিনি। ঈদের দিন নতুন পোশাক, পোলাও, সেমাইসহ নানা ধরনের খাবার পরিবেশন করেন বৃদ্ধাশ্রমের খতীব আব্দুল জাহিদ মুকুল। তিনিই তাদের সন্তান। জন্মের সন্তানের চেয়ে বেশি সেবা-যত্নে তাদের দিয়ে যাচ্ছেন শিল্পপতি মুকুল। টাঙ্গাইল মির্জাপুরের পাকুল্লা এলাকার জব্বার মিয়ার স্ত্রী ফরিদা বেগমের (৭৫) স্বামী ১৫ বছর আগে মারা যায়। ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে এখন তার ১ ছেলে ও ১ মেয়ে বেঁচে আছে। আছে কত আপনজন। ছেলে ও ছেলের বউ শারীরিক, মানসিক নানাভাবে নির্যাতন চালিয়ে ফরিদা বেগমকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আশ্রয় নেন এ বৃদ্ধাশ্রমে। ৪ বছর ধরে এই বৃদ্ধাশ্রমে তার ভালভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল। একদিন তার এক ছেলে এসে বললো মা তুমি আর এখানে থেকো না। আমি যা খাই, তোমাকে তা খাওয়াবো, আমার সঙ্গে বাড়ি চলো। ছেলের কথা শুনে ফরিদা চলে যান বাড়িতে। কয়েকদিন থাকার পর তাকে নিয়ে ছেলে ও ছেলের বউয়ের মধ্যে ঝগড়া এবং মারামারি শুরু হয়ে যায়। ছেলে এ বৃদ্ধা মাকে বলেই ফেললেন, মা তুমি কিভাবে থাকবে তা জানি না। অসুস্থ শরীর নিয়ে বৃদ্ধা ফরিদা ভিক্ষায় নামেন। প্রতিদিন যা পান তা দিয়ে কোন রকমে দিন কাটে বৃদ্ধার। তারপর ছেলে মাকে বলে, ভিক্ষা করে যা পাও আমাকে দেও। প্রতি মাসে ২/৩ হাজার টাকা ভিক্ষা করে বৃদ্ধা ফরিদা একমাত্র পুত্রের হাতে তুলে দেন যাতে ছেলে তার স্ত্রীকে নিয়ে সুখে থাকে। ২ বছর ভিক্ষা করে পুত্রকে সহযোগিতা করেছিলেন ফরিদা। তারপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ৫ মাস আগে চলে আসেন বৃদ্ধাশ্রমে। এবার এখানে অন্যদের সঙ্গে ফরিদার ঈদ কাটে আনন্দে। তিনি আর ঐ ছেলে ও তার বউয়ের কথা মনে করেন না। গফরগাঁও কাজলাবাঘড়া এলাকার গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী মদিনা বেগমকে (৮০) আপনজনরা স্বামীর ভিটা বাড়িসহ দখল করে তাকে বের করে দেয়। এক বছর আগে এ বৃদ্ধাশ্রমে এসে আশ্রয় নেন। বরিশাল মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মাহাদেবপুর এলাকার বৃদ্ধা ফাতেমা বেগম স্বামী সামসু কাজী মারা যাওয়ার পর আপনরা তাকে ঠাঁই দেয়নি। মানুষের বাড়ি কাজ করে কোনভাবে জীবন রক্ষা করতেন। অবশেষে বয়সের ভারে কাজ করতে পারেননি। আপনজনরা বড় বড় চাকরিজীবী। কেউ তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। তিনি আশ্রয় নেন এক বছর আগে এ বৃদ্ধাশ্রমে। নোয়াখালী হাতিয়ার আনোয়ারা বেগম (৮০) স্বামী জেহেল হক মারা যাওয়ার পর শুরু হয় আপনজনদের নির্যাতন। এক বছর আগে এ বৃদ্ধাশ্রমে আসেন। বললেন, আপনজন ছাড়া ঈদ কি ভালো লাগে। খুলনা রূপসার নেহালপুর এলাকার আঞ্জুয়ারা বেগম (৮৫) স্বামী মজনু শেখ মারা যাওয়ার পর তার উপর শুরু হয় সন্তানসহ আপনজনদের নির্যাতন। ৭ মাস আগে এই বৃদ্ধাশ্রমে আসেন। নাতি-নাতনীদের কথা মনে করে চোখ মুছতে থাকেন। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির সুলতান আহমেদের স্ত্রী করিমুননেছা (৮৫)। আপনজনদের নির্যাতনের পর ১২ বছর যাবত্ এ বৃদ্ধাশ্রমে থাকছেন। ১২ বছর তার ঈদ কাটে এখানে চোখের পানিতে। সিলেটের জরিনা বেগেমের (৭৫) স্বামী সুরুজ আলী দ্বিতীয় বিয়ে করে তাকে বের করে দেয়। জরিনার তিন ছেলে ছিল। তারা শিশু বয়সে মারা যায়। এক বছর ধরে এখানে থাকছেন। ভারতের মুর্শিদাবাদের সৈয়দা হোসনে আরার (৮০) স্বামী মোহাম্মদ আলী বিয়ের ছয় বছরের মাথায় মারা যান। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পর তেজগাঁও এলাকায় থাকেন। তারা ৬ ভাই ও ২ বোন। তারা সকলে সুশিক্ষিত। তিনি এক বছর ধরে এ বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। নরসিংদীর আব্দুল মান্নানের (৭৬) সন্তান ও আপনজনরা সুশিক্ষিত। তারপরেও তাকে এক বছর ধরে এ বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হচ্ছে। আপনজনদের কথা ভেবে তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। শরীয়তপুর জাজিরার সামসুদ্দিনের (৯০) ২ ছেলেই উচ্চ শিক্ষিত। অথচ তার সন্তানদের মাঝে ঠাঁই পাননি। ২ বছর ধরে তিনি এই বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। তাকে দেখার জন্য কেউ আসে না। কুষ্টিয়ার কুমারখালী মধুপুরের রহমত শেখের স্ত্রী, ২ মেয়ে ও ৪ ছেলে রয়েছে। তিনি ৭ বছর ধরে এ বৃদ্ধাশ্রমে। ভেবেছিলেন ঈদে কেউ তাকে স্মরণ করবে, আসবে কেউ দেখতে। কিন্তু কেউ আসেনি। দাউদকান্দির বাদশা মিয়ার (৮৫) ৫ ছেলে-মেয়ে। ৭ বছর ধরে এখানে। পাবনার জাসদ নেতা আব্দুল হাই (৭০) এক বছর যাবত্ বৃদ্ধাশ্রমে। হুইল চেয়ারে বসে তিনি বলেন, তার কেউ নেই। বৃদ্ধাশ্রমের ২৪ ঘণ্টা ডিউটিরত ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, বৃদ্ধাশ্রমে ৯৫ জন বৃদ্ধ ও ১০৩ জন বৃদ্ধার জীবনের ঘটনা করুণ। তাদের চিকিত্সাসেবার পাশাপাশি মানসিকভাবে সুস্থ করে রাখা হয় বলে তিনি জানান। এ ধরনের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের বাংলাদেশের যে কোন স্থান থেকে এখানে আনলে ভাতা দেয়া হয়ে থাকে। ডা. জাহিদ ফোন-০১৭৩০৯৭৪৪৩৩ ও সুপার শরীফ ফোন- ০১৭১৪০৯৬৩২৫-এ সংবাদ দিলে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে তারা গিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে। সুন্দর মনোরম পরিবেশে জীবনের শেষ ক’টি দিন কাটান এসব অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল তাদের উন্নত ও আধুনিক পরিবেশের ব্যবস্থা করেন।