সিরাজগঞ্জ ও কুষ্টিয়ায় নৌকা ডুবে ১৭ জনের মৃত্যু

সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে যমুনা নদীতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পরিত্যক্ত সেতুর সঙ্গে যাত্রীবাহী নৌকার ধাক্কা লাগলে সেটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাত জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে । নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২০- ৩০ জন। এদিকে, গত মঙ্গলবার ঈদের দিন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীতে নৌকা ডুবির ঘটনায় নিহত ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ আছেন দুইজন। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতার পাঠানো খবর: চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) : নৌকা ডুবির ঘটনার পরপরই এলাকার শতাধিক মানুষ নদীতে নেমে উদ্ধার কাজ শুরু করে। তবে প্রশাসন তাত্ক্ষণিকভাবে উদ্ধার কাজে অংশ না নেয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। বিকালে ঢাকা থেকে একটি ডুবুরিদল ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। নিহতদের মধ্যে চার জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন, চৌহালী উপজেলার খাস কাউলিয়া গ্রামের আমজাদ হোসেনের মেয়ে আঙ্গুরী খাতুন (১৮), একই গ্রামের আকতার হোসেন (৪২), তার স্ত্রী দিলু আকতার (৩৪) ও আব্দুল হালিমের মেয়ে রাশিদা খাতুন (১৬)। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকালে মিটুয়ানী বাজার ঘাট এলাকা থেকে ৬০-৭০ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা চরসলিমাবাদ ঘাটে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর নদীর মধ্যে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত সেতুর সঙ্গে নৌকটির ধাক্কা লাগলে এটি ডুবে যায়। এ সময় কেউ কেউ সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী নদীর স্রোতে ভেসে যায়। এলাকাবাসী সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার কাজ শুরু করে চার জনের লাশ উদ্ধার করে। পরে আরো তিন জনের লাশ উদ্ধার করে এলাকাবাসী। ঘটনার পর সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার এস এম এমরান হোসেন ঘটনাস্থলে ছুটে যান। জেলা প্রশাসক বিল্লাল হোসেন নিহতদের প্রতি পরিবারের জন্য ১০ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদানের ঘোষণা দেন। পাঁচ ঘণ্টা ধরে নদীতে উদ্ধার তত্পরতা চালিয়ে এলাকাবাসী ক্লান্ত হয়ে উদ্ধার কাজ বন্ধ করে দেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার কাজে অংশ না নেয়ায় এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে তারা পুলিশের উপর চড়াও হয়। পরে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। বিকাল ৪টার দিকে ঢাকা থেকে ৫ সদস্য বিশিষ্ট ডুবুরীদল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ পুনরায় শুরু করে। এ সময় টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান উদ্ধার কাজের তদারকি করেন। প্রত্যক্ষদর্শী মিটুয়ানী গ্রামের ইমরান হোসেন জানান, নৌকাটি ঘাট থেকে রওনা করার কিছুক্ষণ পরেই পরিত্যক্ত সেতুর রেলিংয়ের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। নৌকাটি মাঝখান থেকে ফেটে দুই ভাগ হয়ে যায়। পুরুষদের অনেককেই সাঁতরিয়ে পাড়ে আসতে দেখা গেছে। একই গ্রামের রাসেল বলেন, সময়মতো প্রশাসন উদ্ধার কাজ শুরু করলে নিখোঁজ অনেককেই উদ্ধার করা সম্ভব হতো। এলাকাবাসী নদীর প্রবল স্রোতের সাথে যুদ্ধ করে উদ্ধার কাজ চালিয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ নদীতে নামেননি। তবে চৌহালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামসুল আলম দাবি করেন, নৌকা ডুবির পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। কুষ্টিয়া: নিহতরা হলেন, দৌলতপুর উপজেলার গঙ্গারামপুর গ্রামের আব্দুল ওয়াহেদ বিশ্বাসের মেয়ে মালা আক্তার ওরফে পলি (২৭), মালার চাচাতো বোন বিথী আক্তার (১৪), সুবর্ণা আক্তার (৮), পার্শ্ববর্তী ফারাকপুর গ্রামের আবু বক্করের মেয়ে বিভা (২০), একই গ্রামের তুফাজ্জেল হোসেনের ছেলে স্বপন আলী (২২), মোয়াজ্জেম মন্ডলের ছেলে সাহাজুল ইসলাম (২১), মওলা বকসের ছেলে শিপন আলী (২২), বৈরাগীর চরের জামাল মালিথার ছেলে কালু মন্ডল (১৮), ইমরুলের মেয়ে শিখা খাতুন (১৮) ও ছেলে ইমরান (৮)। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঈদের দিন বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে দৌলতপুর উপজেলার গঙ্গারামপুর, ফারাকপুর ও বৈরাগীর চর গ্রামের কয়েকজন ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকায় করে পদ্মায় নৌকা ভ্রমণে বের হন। মাঝিসহ নৌকায় যাত্রী ছিলেন ১৯ জন। নদীর মাঝখানে যাওয়ার পর প্রবল সে াতের তোড়ে নৌকাটি ডুবে যায়। ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় মাঝিসহ সাতজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকি ১২ জন ডুবে যায়। ঘটনার পর কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন, স্থানীয় সাংসদ রেজাউল হক চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সোহেল রেজা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তলব করা হয় খুলনা ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদের। খুলনা থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ৫ সদস্যের ডুবুরি দল এবং উদ্ধার কাজ শুরু করে। জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন জানান, নৌকা ডুবিতে নিহতদের পরিবারকে লাশ দাফনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। এদিকে গঙ্গারামপুর, ফারাকপুর ও বৈরাগীর চর গ্রামে চলছে শোকের মাতম। ঈদের দিন স্বজনদের হারিয়ে এই তিন গ্রামের সবাই এখন বাকরুদ্ধ। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। মুন্সীগঞ্জে নৌকাডুবে দু’ জনের মৃত্যু মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার মারিয়ালয় বেলুয়া গ্রামের কাছে বিটি কলেজের পেছনে নৌকা ডুবে গতকাল দুপুরে দু’জন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের লতিফ মিয়ার কন্যা তানিয়া আক্তার (১৮) ও এবং দেলোয়ার হোসেনের কন্যা আফছানা আক্তার (১৪)। পরিবার দুটিতে ঈদ আনন্দের পরিবর্তে এখন চলছে শোকের মাতম। নিখোঁজ স্কুল ছাত্রের লাশ উদ্ধার মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, মঠবাড়িয়ায় যাত্রীবাহী লঞ্চ থেকে ছিটকে পড়ে হাসিব (৭) নামে নিখোঁজ এক স্কুলছাত্রের লাশ গত মঙ্গলবার (ঈদের দিন) বলেশ্বর নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত হাসিব পৌর শহরের থানাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণির ছাত্র ও কাছিছিঁড়া গ্রামের আলমগীর হোসেনের ছেলে।