বেতন বোনাস ছাড়াই ওদের ঈদ পালন

বিজিএমইএ ও মালিকপক্ষের বার বার দেয়া আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি কোন কাজে আসেনি। ফলে বেতন ও বোনাস ছাড়াই ঈদ পালন করতে হয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিকদের। আসলে ঈদ নয়, ঈদের দিনে তোবা গ্রুপের পাঁচ কারখানার ১৬০০ শ্রমিক পালন করেছেন অনশন। গতকাল পর্যন্তও তারা অনশন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছিলেন। বেতন-বোনাস না পাওয়া পর্যন্ত তা চলতে থাকবে এমনই ঘোষণা তাদের। এদিকে তোবা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় কারাগারে আটক ঐ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গতকাল বৃহস্পতিবার জামিন পেয়েছেন। পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, অনশন কোন সমাধান নয়। শ্রমিকদের উদ্দেশে বিজিএমইএর নেতারা বলেছেন, আপনারা অনেক ধৈর্য ধরেছেন আরেকটু ধরুন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। গতকাল তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ আশ্বাস দেন। গত মে থেকে কোন বেতন বা কোন ধরনের উত্সব ভাতা পাননি তোবা গ্রুপের পাঁচ কারখানার শ্রমিকরা। এ বেতন বোনাসের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন এবং ঈদের আগের দিন থেকে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন শ্রমিকরা। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল সংবাদ সম্মেলন ডাকে বিজিএমইএ। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিজিএমইএর পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল যাতে ঈদের আগে অন্তত এক মাসের বেতন ও ভাতা দেয়া হয়। কিন্তু ওই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেলে থাকায় এবং ব্যাংক থেকে যথাযথ সহযোগিতা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বেতন-ভাতা দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে আজ অফিস আদালত খুলেছে। আমরা সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করছি, যাতে সরকার ও ব্যাংকের সহযোগিতায় কারখানা কর্তৃপক্ষ অচিরেই তোবা ফ্যাশন্সের শ্রমিকদের বকেয়া ও ভাতা প্রদান করতে সক্ষম হয়। সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এসএম মান্নান কচি লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সাবেক সভাপতি টিপু মুন্সী ও আবদুস সালাম মুর্শেদী। সংগঠনের সহ-সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম ও রিয়াজ বিন মাহমুদসহ অন্যরা এসময় উপস্থিত ছিলেন। বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগের দিন পর্যন্ত প্রায় সব কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। যদিও অনেক কারখানায় শুধুমাত্র বেতন দেয়া হয়েছে। কোনটিতে আবার শুধুমাত্র বোনাস দেয়া হয়েছে। আবার কেউবা দিয়েছে কেবল ওভার টাইমের টাকা। তোবা গ্রুপের পাঁচটি কারখানা বাদে জকি, ট্রেড মার্ক ফ্যাশন ও এস নাহার বেতন ও বোনাস দিতে পারেনি। এছাড়া সাব কন্ট্রাকটিংয়ে কাজ করে এমন অনেক গার্মেন্টস বেতন-বোনাস-ওভারটাইম দিতে পারেনি। শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করে এমন ছোট ছোট ৩৫০ কারখানায় বেতন বোনাস বিষয়ে খুব খারাপ অবস্থা ছিল। এসব কারখানা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য না হওয়ায় তাদেরকে কোনভাবে চাপও দেয়া যাচ্ছিল না। এসব কারখানায় ৫০ থেকে ২০০ জন করে শ্রমিক রয়েছে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কিছু কিছু বেতন দিলেও এমন প্রায় ৫০টি কারখানায় বেতন- বোনাস- ওভারটাইম কিছুই পাননি শ্রমিকরা। মে থেকে বেতন-বোনাস পাচ্ছে না তোবা গ্রুপের কারখানার শ্রমিকরা। তাই বেতন-বোনাসের দাবিতে তারা গত এক মাস থেকেই আন্দোলন করে আসছেন। ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আন্দোলনও তীব্র হয়। ওই গ্রুপের শ্রমিকরা কখনো বাড্ডার কারখানা ঘেরাও করেছেন আবার কখনো কাওরানবাজারের বিজিএমইএ ভবন ঘেরাও করেছেন। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার বিকাল থেকে তিন মাসের বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের শাশুড়ি ও শ্যালককে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ সময় মালিক পক্ষ এক মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস দেয়ার কথা বললেও শ্রমিকরা তা না মেনে আন্দোলন চালিয়ে যান। গত শনিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের শ্যালক রুবেল হোসেনকে বেতন-ভাতার অর্থ যোগাড়ের জন্য কারখানা থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেন শ্রমিকরা। তিনি বের হয়ে যমুনা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার চেষ্টা করেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয় ঋণ দেয়া যাবে না। কারণ তোবা গ্রুপের মালিক জেলে থাকায় ঋণের টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। তারপরও বিজিএমইএর তরফ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল গত রবিবার বেতন-বোনাস দেয়া হবে। তিন মাস ধরে বেতন না পাওয়া এই শ্রমিকরা আশা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু গতকাল দুপুরে জানানো হয়, ব্যাংক ঋণ না দেয়ায় বেতন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন শ্রমিকরা। ওই কারখানার শ্রমিকরা বলেন, টাকা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কারখানা ভবন থেকে যাবো না। পরে ঈদের আগের দিন থেকে অনশন কর্মসূচি শুরু করে তারা। বাড্ডার ফুজি ভবনে দু’টি ও হোসেন মার্কেটে তিনটি কারখানা রয়েছে তোবা গ্রুপের। হোসেন মার্কেটে অনশন পালন করছেন ১৬০০ শ্রমিক। জানা গেছে, অনশন পালন কর্মসূচিতে ৩৫ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নার্গিস আক্তার, শিল্পী আক্তার, রাজ্জাক, মাহতাব, রাশিদা, সন্ধ্যা রানী নামের শ্রমিকদের হাতে স্যালাইন লাগানো আছে। এদিকে তোবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের শাশুড়ি লাইলী বেগমকে অবরোধ করে রেখেছেন কর্মসূচি পালনকারী শ্রমিকরা। তাকে হোসেন মার্কেটের ৯ম তলায় রাখা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ২৬ রোজার দিন তাকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। পরে কারখানায় আনলে শ্রমিকরা অবরোধ করেন তাকে। জরুরি প্রয়োজনের জন্য ভবনের সামনে দুই প্লাটুন পুলিশ ও একটি জলকামান মোতায়েন রেখেছে প্রশাসন। তোবা গ্রুপের অনশনরত শ্রমিকদের দেখতে অনশনের স্থানে গিয়েছিলেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি সেখানে বলেন, তারা তো ভিক্ষা চাচ্ছে না। তারা তাদের ন্যায্য পাওনা ও শ্রমের মূল্য চাচ্ছে। তাহলে কেন তা সময়মত দেয়া হবে না। সেখানে যেয়ে একই ধরনের কথা বলেন, বাসদের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেকুজ্জামান। তোবা গ্রুপের মালিকানায় কয়েকটি রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। সাম্প্রতিককালে ওই গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লি. এ সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনার কারণে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে জেলে রয়েছেন। তবে তাজরীন ফ্যাশন্স ছাড়া ওই গ্রুপের অন্যান্য পোশাক কারখানা সচল রয়েছে যেগুলোতে প্রতি মাসে শ্রমিকদের বেতন আসে আনুমানিক আড়াই লাখ টাকা। বিজিএমইএ বলছে, মালিক জেলে থাকায় ক্রেতারা কার্যাদেশ দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার্ড বিল্ডিং এ হওয়ায় সাব কন্ট্রাক্টের কাজও তেমন পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে মে মাস থেকে বকেয়া বেতন ভাতা দিতে পারছে না ওই গ্রুপ। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কিভাবে সমস্যার সমাধান হবে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি টিপু মুন্সী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা আগে থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের থেকে জমি অথবা কারখানা ভবনের কিছু অংশ বিক্রি করে দিয়ে হোক অথবা যে কোনভাবেই হোক শ্রমিকদের বেতন দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তবে দুর্ভাগ্যজনিত কারণে শেষ মুহূর্তেও তা সম্ভব হয়নি। পরে ব্যাংকের সঙ্গেও আমরা আলাপ করেছি। তোবা গ্রুপের যে পরিমাণ এলসি করা আছে তার বিপরীতে প্যাকিং ক্রেডিট (পিসি) হিসেবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। সে ঋণের পরিমাণ দুই কোটি ১০ লাখ টাকা। ওই টাকা পেলেও শ্রমিকদের এক মাসের বেতন দেয়া যাবে। শ্রমিকদের অনশনে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে কোন প্রতিনিধি যায়নি এমন অভিযোগ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য বিজিএমইএর পক্ষ থেকে যত ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার সবই নেয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে সেখানেও যাবে প্রতিনিধি দল। তোবা গ্রুপের এমডিকে মুক্তি না দিলে শ্রমিকরা টাকা পাবে না এমন অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে বিজিএমইএর নেতারা বলেন এটা সত্য নয়।