ভালোবাসে বলেই মানুষ প্রত্যাশা করে

দেশের প্রথম দুই শ ওয়ানডে উইকেট শিকারী, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক; আব্দুর রাজ্জাক যে ছোট দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটে দেশের সেরা বোলার, সেটা আর বলে দিতে হয় না। ম্যাচের পর ম্যাচ বাহাতের ঘূর্ণি জাদুতে জিতিয়েছেন বাংলাদেশকে। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সাকিববিহীন বাংলাদেশ দলে তার ওপর প্রত্যাশার চাপটা আরও বেশি থাকবে। সেই প্রত্যাশার চাপ, ওয়েস্ট ইন্ডিজে বল করার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত কথা বললেন রাজ্জাক। সেই সঙ্গে ঈদের অভিজ্ঞতা, জীবনের পরিবর্তন, ভালো সময় ও খারাপ সময়ে মানিয়ে নেওয়া মিলিয়ে দৈনিক ইত্তেফাককে পূর্ণাঙ্গ এক সাক্ষাত্কার দিলেন ঈদের ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফিরতে থাকা আব্দুর রাজ্জাক। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়— ঈদের শুভেচ্ছা, রাজ্জাক। কেমন কাটলো এবারের ঈদ? আপনাদেরও শুভেচ্ছা। খুবই ভালো কেটেছে। বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাড়িতে ঈদটা খুবই ভালো কাটে। অনেক মজা করেছি, অনেকদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে দারুণ আড্ডা দিয়েছি। আড্ডার ছবি দেখলাম আমরা। ছুটিটা তাহলে বন্ধুদের সঙ্গে খুব মজায় কাটলো... হ্যা। ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই বন্ধুদের সঙ্গে টানা আড্ডা দিয়েছি। আসলে যেটা হয়, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে তো বছরে এই এক দু বার দেখা হয় ঈদ উপলক্ষে। এমনিতে আমি বাড়ি গেলেও দেখা যায়, অনেকে সে সময় থাকে না বলে দেখা হয় না। এই সময়টায় সবাই বাড়ি থাকায় মজা বেশি হয়। অনেক বছর আবার দেশের বাইরে থাকলে আমিও বাড়ি যেতে পারি না। এবার আসলে খুবই আনন্দ হয়েছে। মনে হচ্ছিল, একেবারে আগের দিনগুলোতে ফিরে গেছি। আসলেই কী আগের দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া যায়? জীবনে তো অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারকা হয়েছেন, অনেকের কাছে দূর আকাশের হয়ে গেছেন; তাও অনেক দিন হল... কিছু পরিবর্তন যে হয়নি, সেটা বললে মিথ্যে বলা হবে। কিছু বাধো বাধো তৈরি হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। চাইলেও সেই কিশোর বয়সের মতো করে সব করতে পারি না। সেটা তারকা হয়ে গেছি বলে না, সময়টাই তো অনেক বদলে গেছে; তাই না? তবে আপনি জানেন, আমি বাড়িতে গেলে যতোটা সম্ভব এলাকার ছেলে হিসেবে থাকার চেষ্টা করি। আমার দিক থেকে অন্তত কেউ পরিবর্তনগুলো টের পাক, এটা আমি হতে দিতে চাই না। বন্ধুদের কাছে, পরিবারের কাছে ছোটবেলার রাজই থাকার চেষ্টা করি। সম্প্রতি তো আরও কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিয়ে করেছেন, সংসার হয়েছে। এতে নিশ্চয়ই আরও একটু সীমিত হয়েছে আগের মতো করে সবকিছু করার ব্যাপারটা? হা হা হা...। ওই যে বললাম, সময়ের পরিবর্তন। হ্যাঁ, কিছুটা বদল এসেছে। এটা আসবেই। আগে আমি চাইলেই অনেক কিছু করতে পারতাম। ধরুন, চার বছর আগের কথা বলি। তখনও আমি জাতীয় দলেরই তারকা। তারপরও তখন হয়তো একটা কিছু করার আগে ভাবতাম না। ঝাঁপ দিয়ে পড়তাম। এখন মাথার ভেতর ওগুলো কাজ করে। কোনটা শোভন হবে, কোনটা করলে কার ওপর কী প্রতিক্রিয়া হবে; এসব ভাবতে হয়। এই ভাবনার জগতে পরিবর্তনগুলোর ফলে চলাফেরায়ও কিছু বদল আসে। এই যে সময়ের বদলে যাওয়া, একটু একটু করে মানুষের বদলে যাওয়া, কিছু দায়িত্ব বাড়া, কিছু সামাজিকতা করার দায় তৈরি হওয়া; এগুলো উপভোগ করেন? নাকি মনে হয়, এর চেয়ে আগের জীবনই ভালো ছিল? উপভোগ করি। সত্যিই উপভোগ করি। আমার মনে হয়, মানুষের সবগুলো নতুন নতুন ভূমিকার নতুন নতুন মজা আছে। আমাকে এখন যা করতে হয়, যেসব সামাজিকতায় অংশ নিতে হয়, এগুলোরও একটা নিজস্ব মজা আছে। ফলে আমি উপভোগ করি। একটু ক্রিকেটে ফিরি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাচ্ছেন তো। একটু ওয়েস্ট ইন্ডিজে বল করার অভিজ্ঞতা বলেন... খুবই মজার অভিজ্ঞতা। যদিও ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেট এখন অনেক বদলে গেছে। তারপরও লোকেরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ বললেই পেসারদের ব্যাপার ভাবে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্যারিবিয়ান উইকেটে বল করে খুব মজা পাই। উইকেটে কিছু বাড়তি বাউন্স ওখানে আপনি পাবেন। ওটাকে কাজে লাগাতে পারলে স্পিনারদের জন্যও বল করার জন্য ভালো জায়গা। একেবারে যেগুলো পেস সহায়ক উইকেট, ওগুলোতেও কী স্পিনাররা ভালো বল করতে পারে? একেবারে পেস সহায়ক উইকেট বলতে এখন তো বারবাডোজের কথা বলে সবাই। বারবাডোজে আমি ২০০৪ সালেও বল করেছি। তখনও ওদের উইকেটে এতো পরিবর্তন হয়নি; তখন জেনুইন পেস ফ্রেন্ডলি উইকেট ছিল। তখনও আমি ওখানে বল করে মজা পেয়েছি। পরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওখানে খেলেছিলাম; যদিও ম্যাচটা হেরেছিলাম আমরা। আমার মনে আছে, প্রথম কয়েকটা ওভার আমরা স্পিনাররা খুব ভালো বল করেছিলাম। ২০০৭ বিশ্বকাপেও তো ভালো বল করেছেন। কার্যত ওখানেই আমাদের ‘তিন বাহাতি স্পিনার’ আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেল। হ্যাঁ, ২০০৭ বিশ্বকাপ তো একটা অসাধারণ স্মৃতি। ইনফ্যাক্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজের কথা উঠলে এটাই আগে মনে পড়ে। আমরা পুরো টিম অসাধারণ একটা টুর্নামেন্ট কাটিয়েছি। রফিক ভাই, সাকিব, আমি; আমাদের পার্টনারশিপটাও খুব ভালো ছিল। অনেক অনেক স্মৃতি। পরে ২০০৯ সালে এসে আপনারা ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের হোয়াইট ওয়াশ করলেন। ঠিক। ক্যারিবিয়ান এলাকায় আমাদের ভালো স্মৃতি অনেক। ওই সিরিজে আমি বোধহয় প্রথম ওয়ানডেতে ম্যান অব দ্য ম্যাচও হয়েছিলাম। সেটাও অসাধারণ একটা সফর ছিল। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে, আমরা দু বারই দল হিসেবে দারুণ করেছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত আরেকটা মজার স্মৃতি আছে মনে হয়। আপনার ডাক নামটা... ও হো...। হা হা হা...। হ্যাঁ, ওটা ২০০৪ সালের ঘটনা। প্রথম ক্যারিবিয়ান এলাকায় গিয়েছিলাম। সানবার্ন হয়ে চামড়া জ্বলে গিয়েছিলো। সারা শরীরে লাল লাল দাগ হয়ে গিয়েছিল। তখন সুজন ভাই (সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ) প্রথম বললেন, ‘ও তো লাল্লা হয়ে গেছে।’ সেই থেকেই ডাক নামটা হয়ে গেছে। তা যা বলেছেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজে মনে রাখার মতো অনেক ঘটনা আছে। এবার যখন যাচ্ছেন, আপনাকে হয়তো একটু বেশি চাপ নিতে হবে। সাধারণত ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টিতে আপনি আর সাকিব মিলে বোলিংয়ের পুরো চাপটা নেন। এবার সিনিয়র স্পিনার একা আপনিই। এটা নিয়ে কী আলাদা কোনো চিন্তা আছে? আলাদা করে ভাবি না। আমার ক্রিকেটে চিন্তার ধরন হল, আগে নিজের ওপর আসা দায়িত্বটা পালন করতে হবে। বাড়তি চাপ ভেবে নেওয়া যাবে না। তবে বোলিংয়ে পার্টনারশিপটা ব্যাটিংয়ের মতো আলোচিত না হলেও এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাকিবের সঙ্গে শর্টার ফরম্যাটে আমার পার্টনারশিপটা অনেকদিনের। ও না থাকাটা নিয়ে আমি মন্তব্য করবো না। আশা করবো, যার সঙ্গেই বল করি, বাংলাদেশের হয়ে যারাই বল করুক, এরকম জুটি বেধে ভালো বল যেন করতে পারে। বাকী স্পিনাররাও কিন্তু যথেষ্ঠ ভালো। টেস্ট নিয়ে প্রশ্ন করি? এই প্রশ্ন আপনি শুনতে শুনতে ক্লান্ত। তারপরও ওয়ানডে সিরিজ শেষে টেস্টে থেকে যাওয়ার লক্ষ্য আছে না? এখন টেস্ট নিয়ে ভাবছি না। শুধু সামনে যেটা আসছে, সেটা নিয়ে ভাবছি। এখানে ভালো করে টেস্টে সুযোগ পেতে হবে, এভাবে ভাবলে পারফরম্যান্সে উল্টো প্রভাব পড়ে। ওয়ানডের জন্যই ওয়ানডেতে ভালো করতে হবে। তারপর যদি নির্বাচকরা যোগ্য মনে করেন, রেখে দেবেন। আর না মনে করলে তো কথা নেই। ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় দৈর্ঘের ম্যাচেও দিনের পর দিন অসাধারণ পারফরম্যান্স। কিন্তু টেস্টে নিয়মিত হতে না পারা, তেমন উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স না থাকা। দেশের সেরা ওয়ানডে বোলার রাজ্জাককে এটা কষ্ট দেয়? কষ্ট পেয়ে তো ঠিক লাভ নেই। আমি বড়জোর আমার কাজটা করতে পারি। আমি বারবার চেষ্টা করি ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণ করতে। এ ছাড়া আর কোথায় প্রমাণ করবো? তারপর তো আমাকে টেস্টে প্রমাণ করতে টানা সুযোগ পেতে হবে। যাই হোক, এটা নিয়ে আসলেই বেশি ভাবি না। শেষ দিকে চলে এসেছি। আপনার ক্যারিয়ারে সম্ভবত একমাত্র বিপর্যয়ের সময় গেছে এ বছরের শুরুটা—এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ধকলটা সামলে উঠেছেন? হ্যাঁ, মাঠে আগেও খারাপ সময় আসেনি, তা নয়। তবে এবারে সমালোচনার ভঙ্গিটা আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তাত্ক্ষণিক আমিও একটু হয়তো আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। পরে সামলে নিয়েছি। নিশ্চিতভাবেই আমি এখন ওইসব সময় পেছনে ফেলে এসেছি। মাঠে নামলে বোঝা যাবে, খারাপ সময়টা আসলেই পিছু ছেড়েছে কি না। তবে মানসিকভাবে আমি ওই পর্যায় থেকে বেরিয়ে এসেছি। নিজেকে ঠিক কিভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন ওই সমালোচনাগুলো, নেতিবাচক আচরণগুলো দেখার পরও? আসলে আমার জন্য অভিজ্ঞতাটা একটু নতুন ছিল। এতো বছরের ক্যারিয়ারে এরকম লেখা, এরকম কথাবার্তা আমাকে খুব একটা শুনতে হয়নি। তাই মনে বেশি লেগেছিল। তবে নিজেকেই বুঝিয়েছি, এটা সে ফ পারফরম্যান্সের ব্যাপার। আবার পারফরম করতে পারলে এই লোকেরাই বদলে যাবে, এই কথাগুলোই বদলে যাবে। আমরা পারফরমার, আমাদের যা কিছু করতে হবে পারফরম্যান্স দিয়েই। নিজেকেই বলেছি, মানুষের প্রত্যাশা আছে বলেই খারাপ করলে তারা হতাশ হয়। আমাদের ভালোবাসে বলেই মানুষ প্রত্যাশা করে।