টুপি বানিয়ে স্বাবলম্বী বগুড়া সিরাজগঞ্জের ৪ লাখ মানুষ
আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৯
জালি টুপি বানিয়ে স্বাবলম্বী বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার প্রায় চার লাখ নারী-পুরুষ। জুয়েল আখন্দ নামে এক উদ্যোক্তা জালিটুপি শিল্পকে সামাজিক ব্যবসায় রূপান্তরের কার্যক্রম শুরু করেছেন। এজন্য তিনি বিভিন্ন উদ্যোগও গ্রহণ করেছেন। ক্ষুদ্র পরিসরের জালি টুপি’র ব্যবসাকে তিনি ছড়িয়ে দিতে চান সবার মাঝে। মূলত, টুপি শিল্পের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলছেন তিনি।
তার প্রতিষ্ঠিত মেসার্স জুয়েল ক্যাপ ডিপো নামের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাথমিকভাবে গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর টুপি তৈরির প্রয়োজনীয় সুতা বিনা সুদে বাকিতে তাদের কাছে বিক্রি করা হয়। পরবর্তীতে তাদের তৈরি প্রতিটি টুপি ২৫ টাকা থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত দাম দিয়ে কেনা হয়। এরপর সেগুলো রপ্তানিযোগ্য করে দেশের বাইরে রপ্তানি করা হয়। গ্রামীণ নারীরা শুধু নিজেদের হাতে টুপি সেলাই করে। বাকি সব কাজ করে থাকে জুয়েল ক্যাপ ডিপো।
১৯৯০ সালে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চকধলি গ্রামের ফরিদা বেগম প্রথম টুপি বুননের কাজ শিখেন। স্বামীর বাড়ির পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রথমে টুপি তৈরি করেন। হাতে তৈরি টুপি পছন্দ হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে টুপি তৈরির চিন্তা আসে মাথায়। কিছু টুপি তৈরি করে প্রথম অবস্থায় তার ছোট্ট ছেলে জুয়েলকে দিয়ে বগুড়া শহরের একটি টুপির দোকানে সরবরাহ করেন ফরিদা বেগম। শুরুতেই ক্রেতাদের মাঝে ভালো সাড়া পড়ে যায়। বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির ফলে গ্রামের অন্য নারীদের টুপি বুনানো শেখান ফরিদা বেগম। ধীরে ধীরে গ্রামের বেশিরভাগ নারী টুপি তৈরি শুরু করেন। একপর্যায়ে ফরিদা বেগমের ছেলে জুয়েল আখন্দ টুপি তৈরির কাজটিকে শিল্প হিসাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। গ্রামের নারীদের পাশাপাশি জেলার অন্যান্য স্থানেও এ কাজ ছড়িয়ে দেন। বর্তমানে বগুড়ার শেরপুর, ধুনট, বগুড়া সদর, শিবগঞ্জ, মাঝিড়া, মহাস্থান, সারিয়াকান্দি, নন্দীগ্রাম, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর, রায়গঞ্জ, বেলকুচি এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় জালি টুপি তৈরির কাজ চলছে। এসব এলাকার প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ নারী-পুরুষ এ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
শেরপুরের জয়লা জুয়ান গ্রামের সেলিনা (২৫) জানান, তিনি ৪ বছর যাবত্ টুপি সেলাইয়ের সাথে জড়িত। তিনি টুপি সেলাই করে মাসে প্রায় তিন হাজার টাকা রোজগার করেন। এ টাকায় সংসারে সহযোগিতার পাশাপাশি ছেলের স্কুলে পড়ার খরচ মেটাচ্ছেন। চককল্যাণী গ্রামের মহারানী (৩৮) জানালেন, এক সময় দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জুটতো না। টুপি সেলাইয়ের কাজ করে এখন তিনি বেশ সুখে আছেন। এ পেশায় এসে তার মত গ্রামের অনেক নারীর সংসারে সচ্ছলতা এসেছে বলে তিনি জানান।
জুয়েল আখন্দ জানান, প্রতিমাসে তার কারখানায় ১০ লক্ষাধিক পিস জালি টুপি তৈরি হয়। বিক্রি হয় প্রায় আড়াই কোটি টাকা। দেশে-বিদেশে চাহিদার আলোকে কারখানায় উত্পাদন ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সুতা শোধন থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। তিনি আরও জানান, বগুড়ার শেরপুরে তৈরি জালি টুপি ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ শিল্পের মাধ্যমে অসংখ্য পরিবার স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। জালি টুপি শিল্পকে সামাজিক ব্যবসায় পরিপূর্ণভাবে রূপ দিতে চাই। টুপি শিল্পের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে জালি টুপি শিল্পের বিকাশ আরও দ্রত সম্ভব। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা চাই।