চিকিত্সক সংকট নেই যন্ত্রপাতির অভাব

বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের উপজেলা এলাকা ও শহরের চিকিত্সা ব্যবস্থায় রয়েছে বিরাট ফারাক। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠেছে আধুনিক বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল। উপজেলা পর্যায়ের চিকিত্সকরা প্রাইভেট প্রাকটিস করেন শহরে এসে। কর্মরত চিকিত্সকদের ৮০ ভাগ কর্মস্থলে থাকেন না। তাই ছোটখাট কোন অসুখ-বিসুখ হলেও মানুষ দৌড়ান চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে। উপজেলা পর্যায়ে চিকিত্সক সংকট তেমন একটা নেই। তবে সংকট রয়েছে চিকিত্সা সরঞ্জাম ও এগুলো ব্যবহারের জন্য টেকনিশিয়ান। উপজেলা পর্যায়ে নেই অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। তাই রোগীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সরেজমিনে ১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে এসব চিত্র দেখা গেছে। চট্টগ্রাম জেলার স্বাস্থ্য সেবা প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, জেলার হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামো, চিকিত্সা সরঞ্জাম ও চিকিত্সক সংকট রয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। আশাকরি শিগগির বিষয়টির সমাধান হবে। সন্দ্বীপসহ কয়েকটি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ গাইনি চিকিত্সকের পদ শূন্য রয়েছে। জেলার ১৪টি হাসপাতালে চিকিত্সকের অনুমোদিত ২৫১টি পদের মধ্যে ৬৫টি শূন্য রয়েছে। শূন্য পদগুলো মূলত বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পদ। ৩১টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ১৭টি অচল। যেগুলো সচল সেগুলোও রোগীদের ব্যবহারের সুযোগ হয় না। বিয়েসহ ব্যক্তিগত কাজে ঐ সব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহূত হচ্ছে। ২৪২টি নার্সের অনুমোদিত পদের মধ্যে ৮২টি শূন্য রয়েছে। ল্যাব টেকনোলজিস্টের ২৯টি পদের মধ্যে ১৭টি শূন্য। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যে আয়া, বয়, নাইটগার্ডের অর্ধেকেরও বেশি পদ শূন্য রয়েছে। গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই সন্দ্বীপে চিকিত্সক ও চিকিত্সা সরঞ্জামের স্বল্পতায় এই এলাকার মানুষ চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পদায়ন করেও রাখা যাচ্ছে না। হাসপাতালের অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। জেনারেটর চালিত বিদ্যুত্ ব্যবস্থায় হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চিকিত্সকদের ১৮টি পদের মধ্যে ৯টি শূন্য। ১৫ জনের মধ্যে নার্স রয়েছে ৭ জন। গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পদ দীর্ঘদিন যাবত্ খালি থাকায় জরুরি প্রসূতি সেবা পাচ্ছে না দ্বীপের মহিলারা। সার্জারি, মেডিসিন, কার্ডিওলজিসহ ৫টি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পদশূন্য থাকায় রোগীরা উন্নত চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রোগী পরিবহনের জন্য নিয়োজিত সি অ্যাম্বুলেন্সটি অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। ইসিজি মেশিন সচল থাকলেও এক্স-রে মেশিনটি অচল। এ প্রসঙ্গে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলুল করিম বলেন, সন্দ্বীপে চিকিত্সকদের পদায়ন করেও রাখা যাচ্ছে না। চিকিত্সা সেবায় নানা সংকটে রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আনোয়ারা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিত্সকদের কোয়ার্টার বসবাসের অযোগ্য চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে লাগোয়া আনোয়ারা উপজেলা। তারপরেও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে দৈনদশা। চিকিত্সকের ২১টি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য। ১৫টি নার্স পদের মধ্যে ৬টি শূন্য। কর্মস্থলে কোয়ার্টারে মাত্র দুইজন চিকিত্সক অবস্থান করেন। বাকিরা চট্টগ্রাম শহর থেকে আসা-যাওয়া করে চাকরি করে থাকেন। ফলে হাসপাতালে জরুরি মুহূর্তে রোগীরা চিকিত্সকদের পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র একটি। চিকিত্সকরা জানান, কোয়ার্টারগুলো জরাজীর্ণ ও বসবাস অনুপযোগী। হাসপাতালের প্রবেশ মুখের রাস্তা ভাঙ্গাচোরা হওয়ায় চিকিত্সা নিতে আসা রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। লোহাগাড়া থেকে একজন টেকনিশিয়ান সপ্তাহে দু’দিন এসে এক্স-রে মেশিনে সেবা দিয়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞ গাইনি চিকিত্সক না থাকা ও অপারেশন সুবিধা না থাকায় জরুরি প্রসূতি রোগীদের সেবা দেয়া যাচ্ছে না। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল কাইয়ুম বলেন, নানা সংকটের মধ্যে চিকিত্সা সেবা চালিয়ে যাচ্ছি। জনবল সংকটে রোগীরা পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছে না। চিকিত্সক সংকট নেই বোয়ালখালীতে চিকিত্সকের ২১টি পদই পূর্ণ রয়েছে। অপারেশন সুবিধা না থাকায় প্রসূতি রোগীরা জরুরি সেবা পাচ্ছে না। এক্স-রে মেশিনের টেকনিশিয়ান পদ শূন্য। ডিজেল চালিত একটি জেনারেটর থাকলে জ্বালানি বরাদ্দ অপ্রতুলতায় প্রয়োজনীয় সময়ে বিদ্যুত্ সমস্যায় পড়তে হয়। অ্যাম্বুলেন্স একটি চালু রয়েছে। কর্মস্থলে আবাসন ব্যবস্থা থাকলেও চিকিত্সকরা শহর থেকে দৈনিক আসা-যাওয়া করে চাকরি করছেন। ফলে রাতের বেলায় চিকিত্সাধীন রোগীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। জলাবদ্ধতা হাসপাতালের বড় সমস্যা। আশপাশের নালাগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টিতে পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। ফলে রোগীদের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. খুরশিদ আরা বেগম বলেন, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সংকটে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ওষুধ ও চিকিত্সা সেবা রোগীরা মোটামুটি পাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় নার্স আছে রাউজানে হাসপাতালের ৯টি চিকিত্সকের পদের মধ্যে মাত্র একটি খালি। নার্সের কোন পদই খালি নেই। অ্যাম্বুলেন্সও ২টি সচল রয়েছে। এখানেও অন্যান্য হাসপাতালের মত জটিল প্রসূতি রোগীরা সিজারিয়ানের সুবিধা পাচ্ছে না। এক্স-রে মেশিনের টেকনিশিয়ান নেই। এটি ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের অনুমোদন পাওয়া গেছে। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, হাসপাতালের বিল্ডিং অনেক পুরনো। চিকিত্সকদের কোয়ার্টারগুলো বসবাস অনুপযোগী। স্বল্পতার মধ্যেও চিকিত্সা সেবা চালিয়ে যাচ্ছি। ওষুধ রাখার স্টোর নেই। সকল চিকিত্সক শহর থেকে দৈনিক আসা-যাওয়া করে থাকেন। ফটিকছড়ি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কোয়ার্টারে থাকেন না চিকিত্সকরা হাসপাতালে ৯ জন চিকিত্সকের মধ্যে ১টি মাত্র পদ খালি রয়েছে। চিকিত্সকদের কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক অনুপস্থিতির কারণে রোগীরা পর্যাপ্ত চিকিত্সা সেবা পাচ্ছে না। কোয়ার্টার সুবিধা থাকলেও থাকেন না চিকিত্সকরা। হাটহাজারী থেকে একজন রেডিওগ্রাফি টেকনিশিয়ান সপ্তাহে দু’দিন গিয়ে এক্স-রে মেশিন চালু করেন। রোগী পরিবহনের জন্য ৩টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ২টি অচল। এগুলো মেরামত অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বহির্বিভাগে সীমিত সেবা চালু রয়েছে। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. দেবাশীষ দত্ত বলেন, রোগীরা প্রাথমিক চিকিত্সা সেবা পাচ্ছেন। হাসপাতালের অবকাঠামো সুবিধা বৃদ্ধি ও জনবল বাড়ানো গেলে সেবার মান বাড়ানো যাবে। হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের জন্য অবকাঠামো নির্মাণে ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। শীঘ্রই নির্মাণ কাজ শুরু হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার পদে ২০ জন চিকিত্সকের মধ্যে ১৬টি পদ শূন্য। সীতাকুন্ডে কর্মস্থলে থাকেন না চিকিত্সকরা চট্টগ্রাম শহরে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত এই হাসপাতাল। ২১ জন চিকিত্সকের মধ্যে ৪টি পদ শূন্য রয়েছে। কর্মস্থলে চিকিত্সকদের অনুপস্থিতির কারণে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। সরকারি ওষুধ সরবরাহ থাকলেও রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছে না। হাসপাতাল এলাকায় কোয়ার্টার থাকলেও চিকিত্সকরা শহর থেকে দৈনিক আসা-যাওয়া করে থাকেন। এক্স-রে মেশিন নষ্ট। টেকনিশিয়ান নেই। ১৯ জন নার্সের মধ্যে ৩টি পদ শূন্য রয়েছে। জরাজীর্ণ অ্যাম্বুলেন্সটি প্রায় সময় অচল থাকে। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল মোমেন বলেন, কনসালটেন্ট চিকিত্সক থাকায় রোগীরা উন্নত চিকিত্সা পাচ্ছেন। নতুন ভবন নির্মাণ তিন বছর অতিবাহিত হলেও বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সংযোগ পাওয়া যায়নি। এক্সরে মেশিন থাকলেও টেকনেশিয়ান নেই পটিয়ায় চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজেলা থেকে পটিয়া উপজেলা সদর অনেক উন্নত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল। আবাসন ব্যবস্থাও রয়েছে। তার মধ্যে চিকিত্সকদের ২১টি পদের মধ্যে ৮টি পদই শূন্য। এর মধ্যে কনসালটেন্ট চিকিত্সকের ৬টি ও মেডিক্যাল অফিসারের ২টি পদ শূন্য। ফলে রোগীরা উন্নত চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক্স-রে মেশিন থাকলেও টেকনিশিয়ান পদ শূন্য। চিকিত্সকদের মধ্যে সকলেই শহরমুখী হওয়ায় হাসপাতালে চিকিত্সাধী রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না। একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি জরাজীর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী। প্রসূতি রোগীদের সিজারিয়ান অপারেশন হয় না এখানে। রাঙ্গুনিয়া হাসপাতালের খাবারের মান নিম্নমানের হাসপাতালে ২১ জন চিকিত্সকের মধ্যে ৭ জনের পদ শূন্য। নার্সের তেমন সংকট নেই। তবে ল্যাব ও রেডিওগ্রাফি টেকনিশিয়ানের শূন্যতায় রোগীরা সেবা পাচ্ছে না। ৩টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ২টি অচল। চিকিত্সাধীন রোগীরা অভিযোগ করেছেন, হাসপাতালে খাবারের মান নিম্নমানের। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সরবরাহ পাওয়া যায় না। বাহির থেকে কিনে আনতে হয় রোগীদের। রোগ নির্ণয়ের সকল পরীক্ষা বাহিরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাব থেকে করাতে হয়। ৩১ শয্যার জনবলে চলে সাতকানিয়া ৫০ শয্যার হাসপাতাল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার স্বাস্থ্য কমপে¬ক্স ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও কাজ চলে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে। হাসপাতালের ৯ জন চিকিত্সকের মধ্যে রয়েছে ৭ জন। তার মধ্যে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন ৩ জন। এনেসথেসিস্ট থাকেন দেশের বাইরে আর সার্জারি চিকিত্সকের পদ শূন্য। বিশেষজ্ঞ গাইনি চিকিত্সক ও অপারেশন সুবিধা না থাকায় জটিল প্রসূতি রোগীদের সিজারিয়ান করা যাচ্ছে না। রোগী পরিবহনের সরকারি কোন অ্যাম্বুলেন্স নেই। ২ বছর আগে নষ্ট হয়ে গেছে এক্স-রে মেশিন। মহিলা চিকিত্সকদের দায়িত্ব পালন করেন তাদের মর্জির উপর। এই আছে এই নেই। ১০ জন নার্স এর পরিবর্তে বর্তমানে রয়েছে ৫ জন। আয়া, ওয়ার্ডবয়, নাইটগার্ড, প্রশাসনিক কর্মকর্তা রয়েছে অনুমোদিত জনবলের অর্ধেক। সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা মো. বখতিয়ার আলম জানান, জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সা সেবা দেয়া যাচ্ছে না। গাইনি, চক্ষু ও চর্ম ও যৌন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই লোহাগাড়ায় ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লে¬ক্সটি সদরের পরিবর্তে পদুয়া এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে। ৫ একর জায়গার উপর স্থাপিত হাসপাতালটি বর্তমানে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও উপজেলার ৫ লক্ষাধিক মানুষের জন্য তা যথেষ্ট নয়। নিয়মানুযায়ী ২১ জন চিকিত্সকের মধ্যে ৪ জনের পদ শূন্য রয়েছে। হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি অচল। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও তা বহু পুরানো। গাইনি, চক্ষু ও চর্ম ও যৌন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। হাসপাতালের অধীনে উপজেলার চরম্বা, পদুয়া, আধুনগর ও বড়হাতিয়ায় অবস্থিত ৪টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলা সদর লোহাগাড়া, আমিরাবাদ, পুটিবিলা, চুনতি ও কলাউজানে ৫টি ফ্যামেলি ওয়েলফেয়ার সেন্টারে জনগণ চিকিত্সা সেবা পাচ্ছে না। রোগীরা জানান, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে কোন মতে চিকিত্সা সেবা পেলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। অপরদিকে ২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিকটে নির্মিত ট্রমা সেন্টার উদ্বোধন হলেও আসবাবপত্র, চিকিত্সক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদায়ন না করায় চিকিত্সা সেবা চালু করা যাচ্ছে না। স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ট্রমা সেন্টারে প্রাথমিক চিকিত্সা চলছে বলে জানালেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর। মিরসরাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নানা সংকট উপজেলার প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষের চিকিত্সার জন্য রয়েছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অনুমোদিত ২১ জন চিকিত্সকদের মধ্যে ১১ জনের পদ শূন্য রয়েছে। শূন্যপদগুলোর মধ্যে রয়েছে-মেডিসিন, শিশু, সার্জারি, কার্ডিওলজি, ইএনটি, আই, অর্থোপেডিক্স। আর নার্সদের ১৭ জনের মধ্যে রয়েছে মাত্র ৯ জন। তাদেরকে তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। হাসপাতাল এলাকায় চিকিত্সকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ চিকিত্সক শহর থেকে আসা-যাওয়া করে চাকরি করে থাকেন। রোগীদেরকে বিভিন্ন পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তারদের পছন্দের প্রাইভেট ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করতে হয়। হাসপাতালে নেই বিশুদ্ধ সুুপেয় পানি। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তবারক উল্লাহ চৌধুরী বায়োজীদ বলেন, হাসপাতালে বিশুদ্ধ পানি, গ্যাস, বিদ্যুত্ সুবিধা না থাকায় আবাসিক কোয়ার্টারে থাকতে চান না চিকিত্সকরা। অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট হয়ে গেছে অনেকদিন হচ্ছে। সিভিল সার্জন, স্থানীয় সাংসদ এবং মন্ত্রণালয়ে শূন্য পদগুলোসহ নানা সমস্যা সমাধানে লিখিতভাবে জানানো হলেও কোন সাড়া মিলছে না। বাঁশখালীতে টেকনেশিয়ানের অভাবে অচল এক্সরে মেশিন চট্টগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত ৫০ শয্যার হাসপাতাল। চিকিত্সক সংকট ও হাসপাতালের নানা সমস্যার কারণে উপজেলায় ৭ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন থাকলেও টেকনেশিয়ান না থাকায় চার বছর ধরে এটি কোন কাজে আসছে না। হাসপাতালে ২১ জন চিকিত্সকের মধ্যে ৬ জনের পদ শূন্য রয়েছে। চর্ম ও যৌন, মেডিসিন, নাক-কান গলা, শিশু ও অর্থপেটিক ও গাইনী বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পদ শূন্য থাকায় গ্রামাঞ্চলের রোগীরা উন্নত চিকিত্সা পাচ্ছে না। হাসপাতালের রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ফ্লোরে রেখে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হক জানান, শিগগির নতুন চিকিত্সক নিয়োগ দেয়া হবে। তখন চিকিত্সক সংকট নিরসন হবে। চন্দনাইশে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক পদ শূন্য চন্দনাইশ উপজেলা সদর হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হলেও ৩১ শয্যার চিকিত্সা সেবা চলছে। শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হলেও চিকিত্সকসহ জনবলের নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়নি। হাসপাতালে ১৭ জন চিকিত্সকের মধ্যে রয়েছে ১৪ জন। গাইনীসহ কয়েকটি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পদ শূন্য রয়েছে। গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশন ব্যবস্থা নেই উপজেলায়। রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে সরকারি ওষুধপত্রের বিপুল সরবরাহ থাকলেও তাদেরকে কেবল প্যারাসিটামল, এন্টাসিড, খোলা আয়রন ট্যাবলেট ও মেট্রোনিডাজল জাতীয় সাধারণ ওষুধই দেয়া হয়। ডায়াবেটিস, হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, টাইফয়েড, বাতজ্বর, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ওষুধ পায় না রোগীরা। হাসপাতালের জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গভীর নলকূপটিও ছয় মাস ধরে অচল থাকায় বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। হাসপাতালে পানি সরবরাহ না থাকায় শৌচাগারগুলো অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকলেও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় রোগীরা সেবা পাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের ডা. শাহিন হাসান জানান, চন্দনাইশ উপজেলা হাসপাতালে কোন অনিয়ম নেই। সবকিছু ঠিকমত চলছে। হাটহাজারীতে হাসপাতালে বিশুদ্ধ পানি সংকট উপজেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক সংকট বিরাজ করছে। গ্রামের হাসপাতালে তাদের কোনভাবে রাখা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম শহরের অতি নিকটে এই হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের ৪টি পদ দীর্ঘদিন যাবত্ শূন্য রয়েছে। ২১ জনের মধ্যে বর্তমানে ১৭ জন চিকিত্সক কর্মরত রয়েছে। এদের মধ্যে হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকেন মাত্র ৫ জন চিকিত্সক। বাকিরা শহর থেকে আসা যাওয়া করে থাকেন। কোয়ার্টারে না থাকলেও সকলেই সদর এলাকায় প্রাইভেট চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখে থাকেন। হাসপাতালের অবকাঠামো অবস্থা ভাল। ইসিজি ও এক্স-রে মেশিন চালু রয়েছে। তবে রোগীরা সেবা পেতে হয়রানির শিকার হচ্ছে। চিকিত্সাধীন রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, রোগীরা ওষুধ মোটামুটি পাচ্ছেন। নলকূপ না থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। হাসপাতালের জন্য একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন ও একটি অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।