মালিককে মুক্ত করতেই ঈদে শ্রমিকদের বেতন হয়নি
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫৯
সাত কার্য দিবসের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে বিজিএমইএ’র আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করেছেন তোবা গ্রুপের অনশনরত পাঁচ কারখানার শ্রমিকরা। অনশনের পাশাপাশি তারা আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে আজ শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে।
এদিকে টানা পাঁচদিন ধরে শ্রমিকরা অনশনে থাকলেও সরকার বা বিজিএমইএ’র কোন প্রতিনিধি বাড্ডার হোসেন মার্কেটে অবস্থিত কারখানাটিতে উপস্থিত হননি। অনশনে প্রায় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়েছেন বলে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনকে হাসপাতালে নেয়া হলেও বাকীদের অনশনস্থলেই চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে।
গতকাল শ্রমিকদের পক্ষে অনশনস্থলে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু। এ সময় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ওভারটাইম এবং ঈদের বোনাস অবিলম্বে পরিশোধ করা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য সব কারখানা চালু রাখা, অনশনে অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিকদের সরকারিভাবে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিপূরণ দেয়া, তোবা গ্রুপের এমডি দেলোয়ার হোসেনের জামিন বাতিল করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া এবং তাজরীন গার্মেন্টসে হতাহত, নিখোঁজ শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া।
এসব দাবি নিয়ে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ‘তোবা গ্রুপ সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে গতকাল ইত্তেফাককে মোশরেফা মিশু বলেন, এ কমিটি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সমাবেশ করবে। তিনি বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম ছাড়াও সিপিবি, বাসদ, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চাসহ ১১টি প্রগতিশীল সংগঠনের নেতারা সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন। আন্দোলন আরো বেগবান হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
তোবা গ্রুপের কারখানা বুকশান গার্মেন্টসের অপারেটর সুমন বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বেতন পাবো না ততক্ষণ অনশন চালিয়ে যাবো। তিনি বলেন, বিজিএমইএতে সাতবার গিয়েছি। সেখান থেকে নেতারা বলেছেন, তোমাদের বেতন না দিয়ে আমরা ঈদ করতে যাবো না। কিন্ু্ত তারা সে কথা রাখেননি। এখন আর তাদের বিশ্বাস করি না। সরকার উদ্যোগ না নিলে অনশনের পাশাপাশি আন্দোলনও চালিয়ে যাবো। তিনি জানান, অনশনস্থলে প্রায় ১২শ’ শ্রমিক উপস্থিত রয়েছেন।
এদিকে অনশনস্থলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি বিজিএমইএ। টাকা আদায়ের বিষয়ে আজ সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বিজিএমইএ বৈঠক করবে। যোগাযোগ করা হলে সংগঠনের সহ-সভাপতি এসএম মান্নান কচি বলেন, টাকা ছাড়া ওখানে গিয়ে তো কোন লাভ নেই। টাকা মালিককেই দিতে হবে। আমরা কেবল সহায়তা করতে পারি। মালিক ছাড়া এতো টাকা কেউ দিতে পারবে না।
মালিকের জামিনের পক্ষ-বিপক্ষ
এদিকে গত ২৪ জুলাই তোবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনের জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে। তবে তিনি এখনো মুক্ত হননি। তার জামিনের বিরোধিতা করেছেন সুশীল সমাজ ও শ্রমিকদের বড় অংশ। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, তোবা গ্রুপের মালিককে জামিনে মুক্ত করতেই ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন দেয়া হয়নি। বুকশান গার্মেন্টসের অপারেটর সুমন বলেন, এখানে উপস্থিত শ্রমিকদের মধ্যে মালিকপক্ষের ১০/১৫ জন বাদে সব শ্রমিকই তার জামিনের বিপক্ষে। সরকারের কাছে আবেদন যাতে তার জামিন বাতিল হয়। অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শ্রমিক বলেছেন, মালিক জামিন পেয়ে বেতন দিতে পারলে আমাদের আপত্তি নেই।
অন্যদিকে ঈদের আগে শ্রমিকদের আন্দোলন প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার ও তার সংগঠন আওয়াজ ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি অভিযোগ করেছেন, মালিককে জামিন পাইয়ে দেয়ার জন্য ঈদের আগে শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার ও তার সংগঠন আওয়াজ ফাউন্ডেশন কাজ করেছে। শ্রমিকদের বেতন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে এ সময় আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। সর্বশেষ নাজমা বেতন পাইয়ে দিতে ব্যর্থ হন। এ জন্য বিজিএমইএ’র সামনে শ্রমিকদের রোষানলেও পড়েন তিনি। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিজিএমইএ’র কয়েকজন নেতাও জড়িত রয়েছেন।
অবশ্য এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, এটা আমার বিরুদ্ধে শত্রুতা ছাড়া কিছুই নয়। দেলোয়ার আমার কী হন যে আমি তার জামিনের পক্ষে কাজ করব? দেলোয়ারের সঙ্গে আমার জীবনে কোনদিন কথাও হয়নি। মালিকের জামিনে বিজিএমইএ’র হাত রয়েছে—এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন সংগঠনের সহ-সভাপতি এসএম মান্নান কচি। তিনি বলেন, শ্রমিকদের বেতন না দিয়ে মালিককে জামিনে মুক্ত করার চেষ্টা বিজিএমইএ কখনো করেনি। এ ধরনের অভিযোগের তীব্র নিন্দা জানাই।
তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানা বুকশান গার্মেন্টস, তোবা ফ্যাশন, তোবা টেক্সটাইল লিমিটেড, তায়েব ডিজাইন ও মিতা ডিজাইনের শ্রমিকরা গত তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। বকেয়া মজুরির দাবিতে এর আগেও একাধিকবার তারা রাস্তায় নেমেছেন। সর্বশেষ গত ২৩ জুন বিজিএমইএতে কারখানা কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও বিজিএমইএ’র প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে গত ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে জুনের বেতন পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু মালিক বেতন পরিশোধ করেননি। এর পর বিজিএমইএতে এক বৈঠকে ২৬ জুলাই বেতন পরিশোধের বিষয়ে আশ্বাস দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাও হয়নি। নিরুপায় শ্রমিকরা ঈদের আগের দিন থেকেই বাড্ডায় হোসেন মার্কেটে অবস্থিত কারখানায় আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।