গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান
মাধব রায় সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা) ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৫৫
ঘর্ষণ পর্ব— ১৬
আজকে অফিস থেকে আসার সময় নীলকান্তবাবু বেশ কিছু মাছ কিনে আনলেন। জ্যান্ত শিং, কই, মাগুর মাছ। একটা প্ল¬াস্টিকের ছোট বালতি কিনে এতে পানি দিয়ে নিয়ে এসেছেন। বললেন— অফিস থেকে বেরিয়েই মাছওয়ালাকে পেয়ে গেলাম। দেশি মাছ, খেতে খুব মজা হবে।
কমলা বললেন— ভালো করেছো, রাতে কই মাছের ভাজা, আর শিং মাছের ঝোল হবে। তিনি নীলকান্তবাবুকে চা নাশ্তা দিয়ে একটা বটি নিয়ে মাছ কাটতে বসে গেলেন।
রেখা, চন্দ্রা, কণিকা এরাও মাছ দেখে খুব উত্ফুল্ল¬। কে কাটতে আসবে, এর প্রতিযোগিতা। কিন্তু বটি তো চারটে নেই। দুটো বটিতে চন্দ্রা আর কমলা বসলেন। বাকিরা আগ্রহ ভরে দেখতে থাকলো। রেখার জ্বর মাত্র সেরেছে। সে এখন পানি ঘাঁটতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু কমলা মাছ কাটতে পারছেন না, পিছলে যাচ্ছে। শিং মাছ তো ধরতেই পারছেন না। এরপর আছে কাঁটা ফোটার ভয়।
কণিকাকে বললেন— পাশের বাসার বুয়ার কাছ থেকে একটু ছাই নিয়ে আয় তো। এরা মাটির চুলায় রান্না করে।
কণিকা এমনিতেই মাছ কাটতে সুযোগ না পেয়ে মন খারাপ করেছিলো। আরো ছাই আনার কথা শুনে বললো— হ্যাঁ, আমি ছাই আনতে যাবো। ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো।
নীলকান্তবাবু পাশের ঘরে ছিলেন। তিনি গাছের নিচ থেকে ঝরা শুকনো পাতা জোগাড় করে এতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বললেন— আবর্জনাও পরিষ্কার হবে, আর ছাইও পাওয়া যাবে।
ছাই দিয়ে মাছ আরামে কাটা শুরু হলো। আকাশ জিজ্ঞেস করলো, ছাই দিয়ে মাছ কাটতে কী সুবিধা ?
কমলা বললেন— এতে পিচ্ছিলতা কমে যায়। আকাশ এতে সন্তুষ্ট হলো না। নীলকান্তবাবুকে এসে ধরলো। তিনি বললেন— এটি হলো ঘর্ষণবলের প্রভাব।
ঘর্ষণবল কী ?
নীলকান্তবাবু বললেন— একটি বস্তু যখন অন্য একটি বস্তুর ওপর দিয়ে চলার চেষ্টা করে, তখন উভয়ের সংস্পর্শে গতির বিপরীতে একটা বাধার সৃষ্টি হয়। একে বলে ঘর্ষণবল।
কিন্তু মাছ কাটতে গেলে তো মাছ বাধা দেবেই —বললো আকাশ।
না, মাছের বাধা নয়। মাছের শরীরটা পিচ্ছিল, এখানে বাধা কম মানে ঘর্ষণবল কম। হাত দিয়ে ধরা যাচ্ছে না, হাতে ছাই লাগালে ঘর্ষণবল বেড়ে যায়, বাধাও বেড়ে যায়। তখন মাছ কাটা সহজ হয়।
তাহলে ছাই দিলে ঘর্ষণবল বেড়ে যায়, বললো আকাশ।
হ্যাঁ, ঘর্ষণবল শুধু ছাই না, আরো কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
কী কী বিষয় ?
যেমন ধর, যে দুটি পদার্থের ঘর্ষণ হবে, এর মিলন তলের মসৃণতার ওপর।
কীভাবে ? বললো আকাশ।
আমরা যদি একটা চালের বস্তা রাস্তা দিয়ে টেনে আনি, তাহলে দেখবি সহজে আনা যাচ্ছে না, যদি বস্তাটি রুমের ভিতরে মোজাইক করা বা টাইলসের ওপর দিয়ে টেনে আনি, তাহলে খুব সহজে আনা যাবে।
কেন ? বললো আকাশ।
রাস্তা ও বস্তার সংযোগস্থলে ঘর্ষণবল বেশি, কারণ এই দুটো তল মসৃণ নয়। আর টাইলস আর বস্তার ঘর্ষণবল কম। এরজন্য বাধাও কম, কারণ এদের তল মসৃণ।
আকাশ ঘাড় নাড়লো, বুঝেছে।
নীলকান্তবাবু বললেন, দুটি পদার্থের মাঝখানে অন্য কোনো পদার্থের উপস্থিতিও ঘর্ষণবল কমাতে বা বাড়াতে সাহায্য করে।
কীভাবে ?
ঐ দিন যে মার্বেল খেললি না, তুই শেষ দানটা জিতে নিলি। মার্বেল গড়িয়ে চললো মাটিতে, মাটি আর মার্বেলের মাঝখানে কী পদার্থ ছিলো ?
আকাশ বললো— কিছুই না।
না, কিছুই না নয়, বাতাস ছিলো। কেউ যদি ওখানে পানি ঢেলে দিতো, তাহলে কী হতো ?
খেলতে পারতাম না, কারণ মার্বেল দৌড়ে যেতো না।
হ্যাঁ, মাটি আর মার্বেলের মাঝখানে বাতাস থাকলে যে পরিমাণ ঘর্ষণবল, পানি থাকলে ঘর্ষণবল আরো বেড়ে যায়। ফলে মার্বেল দৌড়াতে পারে না। এর জন্যই তোর মামি মাছ কাটতে গিয়ে ছাই হাতে মেখেছে। ছাই হলে মাছ আর দায়ের মধ্যে ঘর্ষণবল বেড়ে যাবে। কাটতে সুবিধা হবে।
ঘর্ষণবল কমাবো কেনো ? বললো আকাশ।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘর্ষণ বল কমানোর প্রয়োজন পড়ে। যেমন ধর গাড়ির চাকা যে বল-বেয়ারিং এর মাধ্যমে লাগানো থাকে, এতে যদি ঘর্ষণবল বেশি হয়, তাহলে তো বেয়ারিং তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে। তখন ঐ বেয়ারিংএ গ্রিজ, মবিল বা এরকম তৈলাক্ত পদার্থ দিয়ে ঘর্ষণবল কমানো হয়। আমাদের বাসার গেটটাও মরচে ধরে গেছে, চাকাটাতে একটু গ্রিজ লাগাতে হবে।
কিন্তু রেলগাড়ির লাইনে তো কোনো গ্রিজ লাগাতে হয় না। বললো আকাশ।
হ্যাঁ, রেলগাড়ির রেললাইন আর চাকা, দুটোকেই ভালোমতো পালিশ করা হয়, যাতে এর ঘর্ষণবল কমে যায়। এটি বাসগাড়ি আর রাস্তার ঘর্ষণের চেয়ে কম। ফলে বাসের চেয়ে রেল দ্রুত দৌড়ে। বিমান আরো দ্রুত উড়ে। কারণ বাতাসের সাথে এর ঘর্ষণবল লোহা-লোহা কিংবা রাস্তা আর টায়ারের চেয়ে কম।
বাতাসের সাথেও ঘর্ষণ হয় নাকি ? বললো আকাশ।
অবশ্যই। বললেন নীলকান্তবাবু। তুই কি কখনো রাতের আকাশে তারা ঝরতে দেখেছিস ?
হ্যাঁ, দেখেছি।
এটা কী ? এটা হলো মহাকাশে ভাসমান কোনো বস্তু বা অপদ্রব্য হঠাত্ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে গেলে বাতাসের সাথে ঘর্ষণে জ্বলে উঠার দৃশ্য। তবে অন্য বস্তুর চেয়ে গ্যাসীয় পদার্থের ঘর্ষণবল কম।
ও, আমরা তো ভাবি তারা খসে পড়েছে— বললো আকাশ। কিন্তু ঘর্ষণবল না থাকলে কী অসুবিধা ?
ঘর্ষণবল না থাকলে আমরা মাটিতে হাঁটতে পারতাম না। দেখিস না বরফের মধ্যে সহজে হাঁটা যায় না ?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বরফে হাঁটতে গেলে বিশেষ ধরনের জুতো পরতে হয়। আমাদের মুহিত আর নিশাত এভারেস্টে উঠতে সময় এই জুতো পরেছে।
হ্যাঁ, বললেন নীলকান্তবাবু। ঐ জুতো বরফের সাথে ঘর্ষণবল বাড়িয়ে দেয়। নইলে ঘর্ষণবল কম থাকায় হাঁটতে অসুবিধা হতো। কোনো কিছু ধরতেও পারতাম না ঘর্ষণবল না থাকলে। মই দেয়ালে লাগাতে পারতাম না, ফলে ছাদে বা গাছে উঠা সম্ভব হতো না। কলম ধরে লিখাও সম্ভব হতো না।
এমন সময় কিচেন থেকে একটা চিত্কার শুনা গেলো। নীলকান্তবাবু আর আকাশ দৌড়ে গেলো। একটু আঙ্গুল কেটেছে চন্দ্রা। সেভলন দিয়ে হাত ধুয়ে একটা শুকনো কাপড়ে বেধে দিলেন নীলকান্তবাবু।