সুন্দরবনে হরিণ শিকার!

প্রবাদে আছে, আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী। হরিণ একটি স্তন্যপায়ী ও নিরীহ প্রাণী। ইহার মাংস সুস্বাদু বলিয়া মধ্যযুগ হইতেই হরিণ শিকার জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রস্তরযুগ হইতেই হরিণকে বিভিন্ন গুহায় আঁকা ছবি বা ছাচে দেখা গিয়াছে। ইতিহাসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী, ধর্মীয় গাঁথা এবং সাহিত্যে হরিণের চমত্কার বর্ণনা রহিয়াছে। ইহাতে বোঝা যায় প্রাচীনকাল হইতেই হরিণ মানুষের নিকট একটি প্রিয় প্রাণী। আধুনিককালে অনেক অভিজাত মানুষ সখ করিয়া হরিণ পালন করেন। ইহার অর্থনৈতিক গুরুত্ব যেমন মাংস হিসাবে, তেমনি চামড়ার ব্যবহারে এবং ইহার শিং দিয়া ছুরির বাট তৈরির কারণেও হরিণের গুরুত্ব বাড়িতেছে; কিন্তু বৈধপথে হরিণ শিকারের তেমন কোনো সুযোগ নাই। তাই অবৈধ ও চোরাইপথে হরিণ শিকার করিয়া থাকে অনেকে। আমাদের দেশে সারা বত্সর চোরাইপথে হরিণ শিকার করা হইলেও বিশেষ করিয়া ঈদের সময় এই শিকারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সুন্দরবনে হরিণ শিকারীরা এখন বেপরোয়া। সম্প্রতি পৃথক ঘটনায় এই বন হইতে উদ্ধার করা হইয়াছে পাঁচ মণ হরিণের মাংস, চামড়া ও মাথা।  বরগুনা, বাগেরহাট ও খুলনার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রহিয়াছে কয়েকটি হরিণ শিকারী শক্তিশালী চক্র। তাহারা কখনো সংগোপনে, আবার কখনো জেলের বেশে মাছ ধরিবার পাস নিয়া সুন্দরবনে ঢুকিয়া ফাঁদ পাতিয়া হরিণ ধরিয়া থাকে। ধৃত হরিণ জবাই করিয়া তাহার মাংস রাতের আঁধারে নিয়া আসে এবং তাহা সাত বা আটশত কেজি টাকা দরে বিক্রয় হয়। এই মাংস রাজধানীতেও সরবরাহ করা হইয়া থাকে এবং একশ্রেণির ক্রেতা অগ্রিম টাকা বুকিংও দিয়া রাখেন।

হরিণের মাংস সুস্বাদু ছাড়াও ইহার মাংস হারাম এমন কথা বলিবার অবকাশ নাই। তবে পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় হরিণ শিকার নিষিদ্ধ। যাহার মাংস আস্বাদনের আগ্রহ ও চাহিদা রহিয়াছে অথচ তাহার বৈধ সরবরাহ ব্যবস্থা নাই, তাহা যে  গোপন ও অবৈধ পথে পাইবার পথ তৈরি হইবে, ইহাই স্বাভাবিক। এই কারণে সুন্দরবনের বনরক্ষীরা যতই বলুন আগের মতো চোরা শিকারীদের তত্পরতা নাই ও তাহারা সার্বক্ষণিক টহল দিতেছেন, তাহার পরও ঠিকই হরিণ শিকার হইতেছে। যাহারা জেলের বেশে বনে প্রবেশ করিতেছে, তাহারা কখন ও কীভাবে ফিরিতেছে, সেই ব্যাপারে তাহারা আসলে দেখিয়াও না দেখিবার ভান করেন বৈকি। ইহাছাড়া কিছুদিন আগে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় জুটি বাঁধিয়া দুইটি হরিণ লোকালয়ে চলিয়া আসে। স্থানীয় জনতা বিপুল উত্সাহে তাহাদের একটিকে পাকড়াও করে এবং একটি বনে পালাইয়া যাইতে সক্ষম হয়। যেটিকে ধরা হয়, তাহা একসময় মারা যায়। আমরা বাঘ ও হাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীরও এইভাবে লোকালয়ে চলিয়া আসিবার খবর পাই মাঝেমধ্যে।

মানুষ ও বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসন ও খাদ্য সংকটের কারণে তাহাদের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত লড়াই চলিতেছে। আবার কোনো প্রাণীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়া গেলেও এমন ঘটনা ঘটিতে পারে। এইজন্য আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রাণী গুলি করিয়া হত্যার কথাও আমরা জানিতে পারি। মোটকথা, প্রকৃতির বিধানেই চমত্কার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রহিয়াছে। তবে ঈদকে ঘিরিয়া সুন্দরবন হইতে যেভাবে হরিণ শিকার বৃদ্ধি পাইয়াছে তাহাতে আমরা উদ্বিগ্ন। সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা নির্ণয়পূর্বক বৈধ পথে ও সীমিত আকারে বাড়তি হরিণ শিকারের অনুমতি দেওয়া যাইতে পারে। তবে তাহা হইতে হইবে নিয়মমাফিক। যথেচ্ছ হরিণ শিকার বিপত্তির কারণ হইতে পারে।