দূরদেশে ঈদ উত্সব :আনন্দ বেদনার কাব্য

ঈদ এখন বাঙালির আনন্দ ও ভালোবাসার এক উত্সব। দেশের মতো বিদেশেও জমজমাট এই উত্সব। আমি যখন সিডনি আসি তখন বাঙালির সংখ্যা ছিলো হাতে গোনা। বলা উচিত তেমন বড় কিছু নয়। আর এখন? আপনি সিডনির ট্রেন বাস ট্রাম লাইট রেল যেখানে যে গাড়িতে উঠুন শুনবেন বাংলা কথা ভেসে আসছে। বাংলা কথা তো বটেই চট্টগ্রাম নোয়াখালীর কথা শুনলেও বিস্মিত হবার কিছু নাই। এমন এক পরিবেশ আর হাজার হাজার বাঙালির মিলন মেলা হয় ঈদ উত্সব। 

বাঙালি বিশেষত বাংলাদেশিরা চুপচাপ বা নীরব কোনো জাতি না। বরং আমরা হই চই প্রবণ দেশের মানুষ। আনন্দ বেদনায় একসঙ্গে না থাকলে বাঁচি না। অথচ এই আমরাই দেশের রাজনীতি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এটা দেশের বাইরেও কাজ করে। কিন্তু তার চেয়ে বড় ব্যাপার উত্সব এলেই আমরা একত্রিত হয়ে নিজেদের ভেতর কিছুটা হলেও সমঝোতা করে নেই। জানিনা কেন সারাবছর এই কাজ হতে পারে না। বলছিলাম, বিদেশের কথা। এখানে না আছে বাংলা ভাষার চল, না আমাদের নিজেদের কোনো বাজার। না আমাদের ইফতার না সেহরি। তা বলে কি কিছু কম আছে এখানে? যতটুকু সাধ্য ততটুকুতেই জমজমাট বাঙালি এলাকা। রমজানের শুরু থেকে ঈদ অবধি এসব এলাকা রাতভর জমজমাট। 

বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে দেশের সঙ্গে রাখা, নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে রাখাটা চ্যালেঞ্জ। এই বড় চ্যালেঞ্জ মোকেবিলায় অভিভাবকদের সাহায্য করছে বাঙালি সংগঠনগুলো। যেকোনো বিশেষ দিন বা বিশেষ উত্সবের আগমনে তারা বড় ভূমিকা রাখেন। নিন্দা তো করা যেতেই পারে। শুধু নিন্দায় কি আর কাজ হয়? যখন যা করুক, এসব উত্সবের জন্য এরা আগে থেকেই মেলা, পোশাক প্রদর্শনী, ইফতার মাহফিল বা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে নিজেদের দেশ ও জাতিকে বেগবান রাখেন। বলা বাহুল্য, এর অংশীদার তরুণ-তরুণীরা এখান থেকেই জেনে যায় কোথায় তাদের শেকড়। যারা রুটস মুভিটা দেখেছেন তারা জানেন মানুষ কতটা ঐতিহ্যপ্রিয়। আমরা যারা প্রবাসী আমরা খুব ভালো জানি, দেশ মানে কী। কোথায় দেশের টান। ঈদ তাই এখানে সংযোগসেতু। দেশের সঙ্গে অতীতের সঙ্গে। কারো স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায় চোখের পানি। কারো মনে গেঁথে থাকে ফেলে আসা পরিবার পরিজন। যারা ভাবেন বিদেশ মানেই স্বর্গ তারা কিন্তু সবটা সত্য ভাবেন না। কারণ দেশের সঙ্গে বিদেশের তফাতকে আমি দেখি দুইভাবে। আমার মতে দেশে সুখ আছে শান্তি নাই। প্রবাসে শান্তি আছে সুখ অধরা। কারণ সুখতো একা লুট করার কোনো বিষয় না। সুখ হলো ভাগাভাগি করে নেওয়ার এক সম্মিলিত বিষয়।

মানুষ প্রাচুর্যে থাকার পর একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রক্তে তার যে টান সে কোনো দিনও ছেড়ে কথা বলে না। মধ্যবয়সী মানুষের মনেতো ঈদ মানে বাড়ি ফেরা। যেখানে তার বৃদ্ধ বাবা বয়সের ভারে নত হয়ে পড়া মা সবুর করেন। রাতভর ঘুমহীন থেকে বাচ্চাটা বসে থাকে কখন সে আসবে। হাতের প্যাকেটে নতুন জামা। চুলের ফিতা। চুড়ি বা উপহার। এসব স্মৃতি কেউ কোনো দিন ডলার পাউন্ডে কিনতে পারে না। এসব কেনাবেচার বিষয় না। যেমন বিষয় না প্রচুর বিত্ত আর দালানবাড়ি। তাই আমার এটাও বলতে ইচ্ছে করে, প্রবাসী বাঙালির কাছে যে কোনো উত্সব এক ধরনের বিষাদের উত্সও বটে। আমি খেয়াল করে দেখেছি উপমহাদেশের কোনো জাতিতে এতটা দেশবোধ কাজ করে না। বলছি না তারা দেশকে ভালোবাসে না। তারা নিশ্চয়ই ভালোবাসে, কিন্তু আমাদের যে সম্বল আবেগ! যে আবেগ আমাদের একটি দেশ দিয়েছে। যে আবেগ আমাদের একটি লাল সবুজ পতাকা দিয়েছে। তার বাহক তার ধারক বিদেশের বাংলাদেশিরা কীভাবে দেশের কথা ভুলে ভালো থাকবে?

তবু উত্সব তো উত্সবই। বাংলাদেশিদের মনে ভালোবাসা জাগিয়ে আসা ঈদ এখানেও সংস্কৃতিকে ধারণ করে। নয় নয় করে অনেকগুলো বাংলা মিডিয়া কাজ করে এখানে। বাংলা পত্রিকাগুলো বিশেষ সংখ্যা বের করে। ঈদ নিয়ে মেতে ওঠে অন লাইন মিডিয়া। কী নাই? বাড়ি বাড়ি ঘুরে মজার যতো খাওয়া ওপেন হাউসের আমন্ত্রণ মুখরোচক আনন্দের আড্ডায় প্রেমময়ও বটে। এমন সুযোগ আমরা সবসময় পাই না এখানে। কাজ আর কাজের ভেতর ডুবে থাকা মানুষ একমাত্র সপ্তাহান্তেই জেগে ওঠে। যে দুইদিন তারা উইকেন্ড হিসেবে পায় সে দুইদিন তারা বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়দের নিয়ে কাটায়। সেখানে এমন উত্সব নিয়ে আসে বাঁচার বেঁচে থাকার বাড়তি আনন্দ।

সুখকর দিকগুলোও বলা দরকার। কোথাও কোনো যানজট নাই। দেরি হলেও আপনি রাস্তার ইলেকট্রনিক বোর্ডেই দেখতে পাবেন আর কত সময়ে আপনি আপনার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন। বিলম্বের কারণ আপনাকে নিশ্চিত করা হবে আপডেট দিয়ে। আপনি রাতদুপুরে ফিরলেও কোনো রকমের টেনশান নাই। কেউ পথ আটকাবে না। নাই কোনো চাঁদাবাজি। না কোনো দাদা, কোনো ভাই, কোনো নেতাকে সালাম দিয়ে ধন্য হবারও কারণ নাই। এমন পরিবেশে যদি সাম্য না থাকে  তো সাম্য আর কোথায়? বইপত্রে আমরা যে আদর্শের কথা পড়ি, বলি বা শান্তির দেশ বলে জেনে থাকি এদেশগুলোতো তাই। সামাজিক কোনো চাপও নাই। বড়ছোট মাঝারি বলে কিছু নাই। সবাই এক বাজারে জিনিস কেনে এক দোকানের জিনিসপত্রে ঈদ করে। আর ভেজাল? সেতো খাদ্যদ্র্যব্যে দেওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবে না কেউ। খাবার  হবে পবিত্র। হবে নিরাপদ। পানি, খাবার, ভ্রমণ যেখানে নিরাপদ সেখানে উত্সব নির্বিঘ্ন হবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

এই আমাদের সিডনির ঈদ উত্সবের হালচিত্র। একই দৃশ্য দেখবেন মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, পার্থে তথা সারা অস্ট্রেলিয়ায়। দেশ যে উন্নত তার এটাইতো বড় প্রমাণ। আপনি শহরে থাকুন গ্রামে থাকুন রাজধানীতে থাকুন বা মফস্বলে থাকুন— সবাই এক কাতারে। সমমানে এক জায়গায় এক অবস্থানে। এ দেশে না আসলে বা না থাকলে বুঝতাম না সাম্য আর মিলনেও মানুষ একাকার হয়ে স্বতন্ত্র থাকতে পারে। তাতে তার ব্যক্তিজীবন বা যে কোনো আনন্দ হয় দ্বিগুণ। তবু আমাদের চোখে ঈদ মানে ট্রেনের জন্য ছুটে যাওয়া। রাত দুপুরে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে পারা। ভেজানো কবাট খোলা মাকে জড়িয়ে ধরে ক্লান্তি মুছে ফেলা। সবাই মিলে প্রার্থনা করা আর অল্পে সন্তুষ্ট হয়ে পরেরবারের জন্য ধৈর্য ধারণ করা।

প্রবাসের বাঙালি দেশ ও মানুষের মঙ্গল কামনায় এসব উত্সব অতিবাহিত করে। আবার বুক বেঁধে রাখে পরের বারের জন্য।

n লেখক : সিডনি প্রবাসী